ষাঁড়-দৌড় বলে দিচ্ছে শেয়ার বাজারে কার্যত ‘অচ্ছে দিন’-এর শুরু!

0
Stock Market
প্রতীকী ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

শুক্রবারে ১,৯২১ পয়েন্ট ঝুলিতে পুরে ফেলার পরে সোমবার বিএসই সেনসেক্সে ফের ১,০৭৫ পয়েন্টের লম্বা লাফ দেওয়ায় দালাল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীরা বেশ খুশির মেজাজে রয়েছেন। প্রথমে বিভিন্ন তথ্যে প্রকাশিত ভারতীয় অর্থনীতির মন্দা-চিত্র, গত সপ্তাহের শুরুতে সৌদি আরবের জ্বালানি তেলের খনিতে ড্রোন-হামলার জেরে ধুঁকতে থাকা বাজার, কার্যত একেবারেই গায়েব এই দু-দিনের অবাক করা উল্লম্ফনে। যা দেখে শেয়ার বাজারের বিশেষজ্ঞরা মানছেন, সত্যি, সামগ্রিক ভাবে না হলেও এত দিন বাদে শেয়ার বাজারে তথাকথিত ‘অচ্ছে দিন’-এর সূচনা বোধহয় হয়ে গেল।

আগস্টের শুরু থেকেই বিভিন্ন সংস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকের আয়-ব্যয়ের রিপোর্ট চিন্তার ভাঁজ গভীর থেকে গভীরতর করে তুলছিল সরকার থেকে অর্থনীতির বিশারদদের কপালে। যার স্পষ্ট প্রভাব পড়ছিল দালাল স্ট্রিটের বিনিয়োগেও। বিদেশি বিনিয়োগে চরম ভাঁটা, স্বদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রবল হতাশা ক্রমশ বাড়ছিল। কিন্তু গত শুক্রবার কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর একটা মাত্র ঘোষণায় শেয়ার বাজারে বলদ-দৌড় অতি-শক্তিশালী হয়ে উঠল। এখনও পর্যন্ত যা খবর, এই দু’ দিনে এনএসই-বিএসই মিলিয়ে প্রায় পাঁচশোর বেশি স্টক ৫২ সপ্তাহের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছে। একের পর এক প্রকল্পে একাধিক দিন গাড়ি উৎপাদন বন্ধ রাখা অশোক লেল্যান্ডের স্টকের দামও রাতারাতি ভোলবদলে বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি দিচ্ছে। এই না হলে ‘অচ্ছে দিন’?

গত সপ্তাহের আগে আগে পর্যন্ত শেষ সাত বছরে, নিফটির এক সপ্তাহের ঊর্ধ্বগমনে ছ’টি নজির ছিল, যেখানে নিফটির আন্ত-সপ্তাহের সম্মিলিত বৃদ্ধি পাঁচ শতাংশ বা তারও বেশি দেখা গিয়েছিল। তবে এর পরের তিন মাসে এই জাতীয় প্রতিটি ঘটনার পরে নিফটি ১৩ শতাংশ লাফ দিয়েছিল। আবার ওই বছরের শেষে দেখা গিয়েছিল নিফটি সম্মিলিত ভাবে এক বছরে ১১-২৫ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু শেষ ১০ বছরে এই প্রথম ঘটনা ঘটল, যেখানে নিফটি একটি মাত্র কেনাবেচার দিনে ৫.৩২ শতাংশ বা তার বেশি বৃদ্ধি পেল!

শুক্রবারের কর্পোরেট কর কমানোর পরে, বেশির ভাগ বিদেশি ব্রোকারেজ হাউজ তাদের মডেল পোর্টফোলিওগুলিতে ভারতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে, দালাল স্ট্রিটের বিশ্লেষকরাও সেনসেক্স এবং নিফটির জন্য বছরের শেষ লক্ষ্যমাত্রা ১১ শতাংশ বাড়িয়েছেন। এর পরে ইতিহাস বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তবে সেই লক্ষ্যগুলিও যথেষ্ট অর্জনযোগ্য বলেই মনে হচ্ছে। কী কারণে এতটাই আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল রুগণপ্রায় ভারতীয় স্টক মার্কেট?

প্রথম কারণ, অবশ্যই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর কর্পোরেট কর কমানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা। ৭২,০০০ কোটি টাকার কর ছাঁটাইয়ের লোভনীয় সুযোগ একেবারে শুরুতেই কবজা করতে চায় শেয়ার বাজার। বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা এফআইআইগুলি ফের নিশানা করছে এ দেশের বিস্তৃত লগ্নিবাজারকে। অর্থনৈতিক মন্দার একের পর এক রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর তারা ভারত থেকে আপাতত পাততাড়ি গোটানোর পরিকল্পনা ছকে ফেলেছিল। প্রয়োগও করেছিল সেই পরিকল্পনা। গত জুন মাসে সেনসেক্সের ইতিহাসে সর্বকালীন সেরা ৪০ হাজারের চুড়ো ছুঁয়ে আসার পর মাত্র মাসখানেকের ব্যবধানে চার হাজারের বেশি পয়েন্ট খোয়াতে হয়েছিল ৩০ স্টকের এই সূচককে। বিদেশি বিনিয়োগ বানের বেগে বেরিয়ে যাওয়াতেই ওই দুর্দশা।

কিন্তু সেই ছবিটাও আমূল বদলাচ্ছে। সোমবার সেনসেক্স ছুঁয়ে ফেলেছে ৩৯,৪৪১ পয়েন্ট। এ বারের লক্ষ্য যে আর চড়া সুরে বাঁধা তেমন কথাই বলছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। দেশীয় অর্থনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক সিদ্ধান্তেও প্রভাব পড়ছে দালাল স্ট্রিটে।

মাত্র দু-দিনে সেনসেক্সে ৩,০০০ পয়েন্টের বাড়বাড়ন্তের দ্বিতীয় কারণ সেটাই। আমেরিকার সঙ্গে চিনের বাণিজ্যিক চুক্তিতে বুক বাঁধছেন বিনিয়োগকারীরা। একই সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের দামের তীব্র হ্রাসের পরের মাসে সূচকে ৩.২৩ শতাংশ এবং পরের ছয় মাসে ১১.৩৩ শতাংশ বৃদ্ধির আশা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গেই চলে এসেছে ২০১৬ সালের ২৭ মার্চে শেষ হওয়া একটি কেনাবেচার সপ্তাহের কথা। ওই সপ্তাহে সূচক বৃদ্ধি পেয়েছিল ৫.৭১ শতাংশ, পরের তিন মাসে ওই হার ছিল ৫.১০ শতাংশ। একই ভাবে ওই বছরের ২ মার্চ শেষ হওয়া সপ্তাহে নিফটি অর্জন করেছিল ৯.৬৬ শতাংশ,পরের তিন মাসে যা ঠেকেছিল ১৬.১৯ শতাংশে এবং ২ মার্চ থেকে পরের ছ-মাসে ওই প্রবৃদ্ধির হার পৌঁছেছিল ২৫.২৪ শতাংশে।

তবে তার পরেও ঘটনার ঘনঘটার অন্ত নেই। বাজার শুধু ইতিহাস-পরিসংখ্যান নয়, সূক্ষ্ম আবেগেও নিয়ন্ত্রিত হয়, সে কথা তো আর নতুন করে বলার নয়!

অনুমান: বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আপাতত নিফটির দৌড় পৌঁছোতে পারে ১২,১০০ পয়েন্টে। একাধিক ইতিবাচক প্রভাবের গুঁতোয় সাম্প্রতিক ৪০ হাজারের সীমা পার করা সেনসেক্সও ৪২ হাজারে পাড়ি দিতে পারে ‘অচ্ছে দিন’-এর সৌজন্যে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.