Connect with us

প্রবন্ধ

রথযাত্রায় কাঠামোপুজো, বনেদিবাড়ির পুজোর সূচনা

শুভদীপ রায় চৌধুরী

আজ আষাঢ় ১৪২৭, মঙ্গলবার। রথযাত্রার পুণ্যতিথিতে আজ বিভিন্ন বনেদিবাড়ির এ বছরের শারদীয়া দুর্গাপুজোর সূচনা হবে। এই রথযাত্রা থেকে উলটোরথ অবধি বঙ্গের বহু প্রাচীন বনেদিবাড়িতে কাঠামোপুজো অনুষ্ঠিত হবে নিষ্ঠার সঙ্গে, যা এত বছর ধরে হয়ে আসছে। দেবী কাত্যায়নীর আরাধনা এই সমস্ত পরিবারে বহু বছর ধরে হয়ে আসছে এবং বর্তমান সদস্যরা সেই ধারাবাহিকতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে চলেছেন। তাই আমি আজ কয়েকটি পরিবারের কাঠামোপুজোর কথাই তুলে ধরলাম।

দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ি

এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা হয় রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ি বলতেই সবাই এক ডাকে চেনেন নীলমণি মিত্রের বাড়িকে। নীলমণি মিত্রের নাতি রাধাকৃষ্ণ মিত্র এই দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন। এই বাড়ির পুজো হয় বৃহৎনান্দীকেশ্বর পুরাণ মতে। ঠাকুরের চালচিত্র হয় মটচৌরির আদলে। ষষ্ঠীর দিন কুলদেবতা শ্রীশ্রীরাজরাজেশ্বরকে সাক্ষী রেখে পুজো শুরু হয়। বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই বাড়ির সন্ধিপূজায় ১০৮ পদ্মের পরিবর্তে ১০৮ অপরাজিতা নিবেদন করা হয়।

জোড়াসাঁকোর দাঁ পরিবার

এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনাও হয় রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। এমন প্রবাদ রয়েছে, দেবী এই দাঁ বাড়িতেই আসেন গয়না পরতে। এই বাড়ির পুজোর প্রতিষ্ঠাতা গোকুলচন্দ্র দাঁ। ১৮৪০সালে পুজো শুরু হয়। পরিবারের বংশধর শিবকৃষ্ণ দাঁ জার্মানি আর প্যারিস থেকে হিরে, এমারেল্ড জুয়েলারি আর একচালার চালচিত্র সাজানোর জন্য তবক নিয়ে এসেছিলেন। দেবী আকারে প্রায় ১২ ফুট লম্বা ও ১০ ফুট চওড়া। দেবী এখানে পূজিত হন বৈষ্ণবমতে, তাই বলিপ্রথা নেই এই পরিবারে। এই পরিবারের বৈশিষ্ট্য অষ্টমীর দিন সন্ধিপূজার নৈবেদ্য সাজান বাড়ির ছেলেরা।

জোড়াসাঁকো দাঁ বাড়ির পুজো।

চোরবাগান শীল পরিবার

রামচাঁদ শীল ১৮৫৬ সালে এই পরিবারে দুর্গাপুজো শুরু করেন। শীল পরিবারেও রথের দিন কাঠামোপুজো অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টমীর দিন সকলে হয় ধুনো পোড়ানো আর দুপুরে হয় গাভীপুজো। নবমীতে কুমারীপুজোর সঙ্গে সঙ্গে সধবা পুজোও। এই পরিবারে সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে দেবীর আরাধনা হয়, ভোগে থাকে লুচি, ভাজা, তরকারি, শিঙাড়া, কচুরি ইত্যাদি। এই পরিবারের বৈশিষ্ট্য হল দেবীর দুর্গার হাতে খাঁড়ার পরিবর্তে থাকে তলোয়ার।

খড়দহের গোস্বামী পরিবার

এই পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু আনুমানিক ১৪৫২ শকাব্দে (১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ)। এই বাড়ির পুজো শুরু হয় উলটোরথের দিন একটি চার হাত সমান বাঁশ কিনে গোপীনাথের মন্দিরে কাত্যায়নীর পুজো করে। মেজোবাড়ির দুর্গাপুজো কৃষ্ণানবমী তিথিতেই শুরু হয়, অর্থাৎ ১৫ দিন ধরে চলে দেবীর আরাধনা। এই পরিবারে দুর্গার পাশে লক্ষ্মী-সরস্বতীর স্থানে জয়া-বিজয়া বিরাজমান। কারণ প্রভু নিত্যানন্দ বিশ্বাস করতেন কাত্যায়নী পুজো করলে গৌরকে পাওয়া যায়। এই বাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণবমতে, তাই কোনো পশু বলিদান হয় না। তবে এখানে মন্ত্রের সাহায্যে মাসকলাই বলিদান করার প্রথা আছে।

জানবাজারের রাসমণির বাড়ি

জানবাজারের রানি রাসমণিদেবীর শ্বশুরবাড়িতে প্রীতিরাম দাস (শ্বশুরমশাই) এই বাড়ির পুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে রানীর পুজো বলেই বেশি পরিচিত এই পুজো। জানবাজারের এই বাড়ির পুজোও শুরু হয় রথের দিন কাঠামোপুজো করে। মায়ের গায়ের রঙ শিউলি ফুলের বোঁটার মতন অর্থাৎ তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ। প্রায় ১৪ ফুট লম্বা এই প্রতিমার গায়ে সোনার নথ, টিপ, পায়ে  রুপোর মল, মাথায় রুপোর মুকুট। এই বাড়ির পুজো বৃহৎনান্দীকেশ্বর পুরাণ মতে হয়। ২০০৩ সাল অবধি ছাগবলি হয়েছে কিন্তু তার পর থেকে চালকুমড়ো, মাসকলাই ইত্যাদি প্রতীকী বলিদান হয়। এই বাড়ির বৈশিষ্ট্য পঞ্চাঙ্গ স্বস্তয়ন অর্থাৎ চণ্ডীপাঠ, মধুসূদন মন্ত্র জপ, মাটির শিবলিঙ্গ পূজা, দুর্গানাম জপ – প্রতিপদ থেকে নবমী অবধি হয়ে থাকে।

কাশিমবাজার ছোটো রাজবাড়ি

বিখ্যাত রেশম ব্যবসায়ী দীনবন্ধু রায় রেশম ব্যবসার জন্য কাশিমবাজারে এসেছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের আনুকূল্যে ফুলে ফেঁপে ওঠে তাঁর ব্যবসা। ১৭৯৩ সালে তাঁকে জমিদারির স্বত্ব দেয় ব্রিটিশ সরকার। রথের দিন এই বাড়িতেও কাঠামোপুজো হয় দেবীর। পরিবারের সদস্যরা এই পুজোর ক’টা দিন রাজবাড়িতেই কাটান। ষষ্ঠীর দিন দেবীর অধিবাস, বোধন হয়। দশমীর দিন এই পরিবারে অপরাজিতা পুজোর প্রচলন রয়েছে। অতীতে পুজোয় বলিদান প্রথা থাকলেও এখন আর বলিদান হয় না। রাজবাড়িতে আগে বিসর্জনের সময় নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর প্রথা ছিল কিন্তু সেই প্রথাও আজ বন্ধ।

হাটখোলা দত্ত পরিবার

হাটখোলা দত্তবাড়ি, ছবি সৌজন্যে: এডি ফটোগ্রাফি

১৭৯৪ সালে হাটখোলায় ভদ্রাসন পত্তন করেছিলেন জগৎরাম দত্ত। তাঁর হাত ধরেই পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু। উলটোরথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে শুরু হয় দত্তবাড়ির দেবী আরাধনা। এই পরিবারে দুর্গাপুজো হয় সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে, তাই পশু বলিদান সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। বলি দেওয়া হয় ক্ষীরের পুতুল। এই বলিদানও আড়ালে হয় কারণ পরিবারের কোনো সদস্যের বলি দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরিবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এই দত্ত পরিবারে দশমীর দিন নয় অষ্টমীর দিন সিঁদুরখেলা হয়। এ এক বহু প্রাচীন রীতি যা আজও অব্যাহত রয়েছে দত্ত পরিবারে।

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি

এই পরিবারের দুর্গাপুজোও বহু দিনের। এই বাড়ির দেবী রাজরাজেশ্বরী নামেই পরিচিত, দেবীর সিংহ ঘোটকাকৃতি, দেবীর পরনে লাল শাড়ি, গায়ে বর্ম। রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে এই বাড়ির পুজোর সূচনা হয়। মহালয়া থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজো। সে দিন ভোরে জ্বালানো হয় হোমকুণ্ড, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চলে হোম নবমী অবধি। আগে রাজবাড়ি থেকে বিসর্জনের সময় নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হত। সেই প্রথা আজ বন্ধ। তবু ধারাবাহিকতা ও ঐতিহ্য আজও অব্যহত রাজবাড়ির অন্দরে।

প্রবন্ধ

স্বাস্থ্যসাহিত্য: আত্মহত্যা থেকে বাঁচা

দীপঙ্কর ঘোষ

সত‍্যকাম ভরা সন্ধ্যায় আমগাছটার তলায় বাদুড়ে ঠোকরানো আমগুলোর সঙ্গেই অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল। পচা আম, বৃষ্টিতে পচা পাতা আর দেশি মদের গন্ধে চারপাশ ম ম করছে। না, এই সত‍্যকাম জবালপুত্র নয়, অতিরিক্ত মদ‍্যপানে চাকরি থেকে বিতাড়িত এক স্কুলমাস্টার। সামনের পথ দিয়ে বহু লোক গেছে। মাস্কের ওপরে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে। হেরে যাওয়া মাতালের গন্ধ সহ‍্য করা খুব মুশকিল।

ব‍্যাঙ্কের চাকরি শেষ করে কৃষ্ণা একটু গভীর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছিল। ওই রাস্তা দিয়েই। আগে সত‍্যকামের সঙ্গে প্রতি দিন বাসে দেখা হত। সত‍্যকাম একটা সাদামাটা আটপৌরে সংসারি মানুষ। বাসস্টপেজে হয়তো দু’টো কথাও হত। ও জানে সত‍্যকামের বৌ গরিমা। কৃষ্ণা একলাবাসী, অবিবাহিতা। পড়ে থাকা অচেতন একটা মানুষ দেখে কৃষ্ণা এগিয়ে গেল। পচা পাতা পায়ে দলে, আধখাওয়া আমে হোঁচট খেয়ে। আরে, এ তো চেনা লোক! অসাড়ে পড়ে আছে। কৃষ্ণা দ্বিধা করল। ভাবল। তার পর রাস্তায় ফিরে এসে একটা রিকশা ডাকল।

লকডাউনে রাস্তা অন্ধকার। চমৎকার ঝকঝকে আকাশে বৃহস্পতি জ্বলজ্বল করছে। বাড়িতে বাড়িতে টিভি – প্রতিটি বাড়িতে একপাল সম্মোহিত বিচ্ছিন্ন মানুষ বহু বার দেখা সিনেমায় নিবদ্ধদৃষ্টি বসে আছে।

“দিদি, ইনি তো ইস্কুলের ম‍্যাস্টর ছিলেন। মাল খাউয়ার জন‍্যি চাকরি গেছে…।”

রিকশাওয়ালা বকতে বকতে চলে। কৃষ্ণা ঘামতেল-মাখা কপালে আঁচল বোলায়। লকডাউনের মৃদু হাওয়ায় ওর ঝুরো চুল উড়ে যায়।

“আসলে কী হল জানো দিদি?” মধ‍্যবয়সিনী কৃষ্ণা এ পাড়ার বহু দিনের বাসিন্দা – কার‌ও দিদি, কার‌ও বা মাসি।

“ম‍্যাস্টরের বউ বহু কাল হল ছেড়ে চলে গেছে। শুনেছি ম‍্যাস্টরের নাকি ক্ষ‍্যামতা কম…”, রিকশাওয়ালা দম নেয়। দু’ জনে মিলে সত‍্যকামের এলিয়ে পড়া দেহটা বিছানায় শুইয়ে দেয়। রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে কৃষ্ণা একটুখানি বসে, এক গেলাস জল খায়, তার পর পাশের পাড়ার ওর এক বান্ধবীকে ফোন করে। সুজাতা। সে ডাক্তার। সুজাতা আধ ঘণ্টা পরে এসে পৌঁছোয়।

“শোন কৃষ্ণা, এটা শুধু মদের ওভারডোজ নয়, খুব সম্ভব ভদ্রলোক অন‍্য কোনো কিছুও খেয়েছেন। বাই দ‍্য ওয়ে ইনি সেই স্কুলটিচার না?”

মফস্‌সল শহরে সবাই মোটামুটি সবাইকে চেনে। সকলের কুৎসা সবাই খুব উপভোগ করে। আসলে হেরে যাওয়া আর স্বপ্ন-অসম্পূর্ণ একদল মানুষ অন‍্যের পতনে একটা অনৈসর্গিক আনন্দ পায়। এই লকডাউনের বাজারে একটু রাত হলেই কোনো যানবাহন পাওয়া দুষ্কর। তাই আরেকটা ভ‍্যানগাড়ি ডেকে সত‍্যকামকে বন্ধ হয়ে থাকা দোকান-বাজার পার করে নিয়ে যাওয়া হল কাছের একটা নার্সিংহোমে। পুলিশ কেস। বন্ড স‌ই। একটুও দ্বিধা না করে সুতোয় বাঁধা কলম দিয়ে কৃষ্ণা স‌ই করে দিল। তার পর স্টম‍্যাকওয়াশ, আরও কত কী সব চলল।

রবিবার ডাক্তারবাবু বাড়ির লোককে দেখা করতে বলেছেন। সত‍্যকামের বাড়ির ঠিকানায় কৃষ্ণা এর মধ্যে দু’ বার গেছে। কিন্তু একটা জং পড়া তালা আর শ‍্যাওলা ধরা দেওয়াল ছাড়া কিছুই দেখতে পায়নি। সত‍্যকাম ওর বউয়ের যে ফোন নম্বরটা দিয়েছে তাতে কেউ সাড়া দিচ্ছে না। বাকি নম্বরগুলোয় সবাই ব‍্যস্ত, সময় নেই। একজন বলল, “টাকার প্রয়োজন হলে হসপিটাল বিল কত হয়েছে জানালে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।” শুধুমাত্র টাকা নিয়ে কি মানুষ বাঁচে?

এই সব ভাবতে ভাবতে কৃষ্ণা তিনতলার কোনার রুমে সত‍্যকামের বিছানার পাশে একটা টুল নিয়ে বসল। পাশের জানলা দিয়ে দূরের সবুজ দেখা যাচ্ছে। নারকেল, কলাগাছের ভিড়। মধ‍্য আষাঢ়ে আকাশে এক কোনায় ঘন কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে। সত‍্যকাম অন‍্য মনে জানলায় চোখ মেলে বসে আছে। আজ অনেক ফিটফাট। দাড়ি কামানো। গায়ে পাউডারের গন্ধ। মা যখন হাসপাতালে ছিল তখনও কৃষ্ণা এই গন্ধটা পেত। নার্সদিদি একটা হুইলচেয়ার নিয়ে এসে সত‍্যকামকে বসাল। শূন্য প্রাণ সত‍্যকাম একটা কথাও না বলে সেটায় বসল।

নার্সদিদি বললেন, “আসুন দিদি, ডাক্তারবাবুর চেম্বারে যাই।”

এক তীক্ষ্ণ নাসা ডাক্তার। কাঁচাপাকা চুল তাঁর। একটা বড়ো বিদ‍্যাসাগরী টাক‌ও আছে। সরু লম্বা লম্বা আঙুলগুলো টেবিলে দাগ কাটছে।

“বসুন।”

জড়ভরতের মতো সত‍্যকাম ওঁর সামনের চেয়ারে বসল। কৃষ্ণা পাশেরটায়।

“বাড়ির কাউকে পাওয়া গেল?”

কৃষ্ণার ম্লান হাসি দেখে বৃদ্ধ ডাক্তার উত্তরটা বুঝে নিলেন।

“এই যে স‍্যোশাল মিডিয়ায় সবাই বলছে পাশে থাকুন, হাত বাড়িয়ে দিন – এর পাশে এখন দরকার একজন একান্ত আপনার জন। যে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে পারবে – আমি আছি, তুমি নিশ্চয়ই ভালো হবে, হবেই।”

কৃষ্ণা আনমনে আঙুলে শাড়ির আঁচলটা পাকায়। তার পর সোজা চোখে জানতে চায়, “এ রকম কেন হয় ডাক্তারবাবু? কেন কেউ কেউ জীবনের এই সব ওঠা-পড়া মেনে নিতে পারে না…হেরে যায়…পালিয়ে যেতে চায়?”

বুড়ো ডাক্তার উত্তর না দিয়ে সত‍্যকামকে প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা সত‍্যকামবাবু, আপনি মরে যেতে চাইছেন কেন?”

সত‍্যকাম টেবিলে চোখ নিবদ্ধ রেখে বলে ওঠে, “ডাক্তারবাবু, আপনি জানেন তো? ইয়োর ডেজ আর নাম্বারড, আমারও। প্রতিটা দিন গোনা আছে – যে দিন নম্বরটা লেগে যাবে আপনাকে যেতে হবেই।”

সত্যকাম একটু ক্ষণ ভাবে। একটু যেন দ্বিধা করে, “তা হলে জীবনযাপনের এই অসহ্য কষ্টটা বেশি দিন কেন ভোগ করব? আমার যাওয়ার দিনটা আমিই ঠিক করে নিলে ক্ষতি কীসের? ইচ্ছামৃত‍্যু – ভীষ্মের মতো?”

সত‍্যকামের মুখে একটা ক্লান্ত হাসি ফুটে ওঠে।

কৃষ্ণা শিউরে ওঠে। প্রতিটি কথা কী ভয়ানক বাস্তব। কী অসম্ভব যন্ত্রণাসঞ্জাত এই বাক্যবন্ধ। এ মানুষকে কে বাঁচাবে?

“আপনি কত দিন ধরে এই সব ঘুমের ওষুধ খাচ্ছেন?”

“বহু দিন…অনেক দিন ধরে…যখন মাথার মধ্যে অসম্ভব কষ্ট হয়…রাতে বিছানায় থাকতে পারি না…পাগলের মতোন…মনে হয় রাস্তায় গিয়ে গাড়ির সামনে…বিশ্বাস করুন আমি ওই ঘুমের বড়ি না খেলে ঠান্ডা মাথায় ক্লাস‌ও নিতে পারতাম না… তবু ঘুম হতো না…একটা থেকে দু’টো…তার পর আর‌ও বেশি…অনেক অনেক ওষুধ খেতাম। তবুও ওই কষ্টটা আমাকে… ওই অস্থিরতা…রাত হলেই মনে হত চিৎকার করে কাঁদি…দেওয়ালে মাথা ঠুকি…সঙ্গে ছিল মদ…মদ কেনার অত পয়সা কোথায় পাব…কী হবে এ ভাবে বেঁচে থেকে? প্রতি দিনের এই একঘেয়ে বমি করার মতো করে কাজ উগরে দেওয়া? তার পর এক রাত অস্থিরতা…কষ্ট…।”

সত‍্যকাম টেবিলে মাথা রাখে, “আমি একজন স্পোর্টসম‍্যান – হার স্বীকার করে নিচ্ছি ডাক্তারবাবু। ব্রাজিল যেমন জার্মানির কাছে সাত গোলে হেরে গেছিল, তেমনি আমি একটা হেরো মানুষ – জীবনের খেলায় গোহারা হেরে গেছি। আমি তা হলে এ বার আসি ডাক্তারবাবু?”

সত‍্যকাম কুঁজো শরীর আর কালি পড়া চোখ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কাঁপা কাঁপা হাতদু’টো জোড় করে নমস্কার করে।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যসাহিত্য: বাড়ির পুজো আর সেই গোপন কথাটি

ডাক্তার মুখ থেকে মাস্ক নামিয়ে হাসেন, “যেতে তো হবেই সত‍্যকাম – ছুটি হয়ে গেছে – ওই যে কার একটা গান আছে না? পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই? যাবার বেলায় এক কাপ চা তো খেয়ে যান। আর আপনার এই আত্মীয়টি একটা প্রশ্ন করেছিল, কেন এ রকম হয়? ওটার উত্তর দেওয়া বাকি আছে তো। চা পান করতে করতে আমরা একটু কথা বলি?”

ডাক্তারের বিষণ্ণ চোখ দু’টিতে কৌতুক খেলা করে। এই করোনাকালে একমাত্র এই ডাক্তারবাবুই আসছেন, রোগী দেখছেন। সে ক্ষেত্রে এঁর কথা ফেলাও যায় না।

“উষা, তিনটে চা দিবি মা?”, ডাক্তার সহকারীকে হাঁক পাড়েন, “আমাদের এখানে কিন্তু সব‌ই গুঁড়ো চা, দুধ-চিনি সহ।”

কৃষ্ণা বলে ওঠে, “এ মা! তাতে কী? আমাদের সব চলে।” ‘আমাদের’ কথাটা বলে কৃষ্ণা নিজেই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।

চায়ে চুমুক দিয়ে বৃদ্ধ বলতে আরম্ভ করেন, “আমাদের মানুষদের মধ্যে অনেক রকম মানসিকতা দেখা যায় – রগচটা, বদরাগী, নরমসরম, স্নেহপ্রবণ প্রভৃতি। এগুলোর অনেকগুলোই হর্মোন রিলেটেড। অক্সিটোসিন বেশি বেরোলে স্নেহপ্রবণ, আবার ভ্যাসোপ্রেসিন বেশি বেরোলে বদরাগী। আবার অনেক ক্ষেত্রে মাথার ঘিলুর কোনো কোনো জায়গা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। ও সব কথা থাক – এ কি সত‍্যকাম চা তো জুড়িয়ে গেল। নাও নাও শুরু করো, এখানে তো আমরা আর দারুর বোতল দিতে পারব না…।” সত‍্যকাম হেসে চায়ে চুমুক দেয়।

“আমাদের ভালো লাগা, আনন্দে থাকা, এগুলো সেরোটোনিন নামে আমাদের নার্ভের একটা রাসায়নিক যার ডাক্তারি নাম নিউরো ট্রান্সমিটার তার ওপরে নির্ভর করে। এটা যদি একেবারে টইটুম্বুর হয়ে থাকে তা হলে ঘুম থেকে উঠে সূর্য উঠলেই মনে হবে, আঃ কী চমৎকার সকাল… সমস্ত দুঃখ সহ‍্য করাটা সহজ হয়ে যাবে।” সত‍্যকাম কৃষ্ণা দু’জনেই ঘাড় নাড়ে।

“যত আমরা চাপের মধ্যে থাকব, ততই আমাদের ভালো রাখার জন্য নার্ভগুলো সেরোটোনিন খরচ করবে। হ‍্যাঁ আবার তৈরিও হবে” – বৃদ্ধের চোখ সত‍্যকাম আর কৃষ্ণার মুখে ঘুরতে থাকে।

“যতটা খরচ হয় আবার সেটা তৈরিও হয়ে যায়। আমি কিন্তু খুব সহজ করে বলছি। এখন বয়স যত বাড়বে ততই নানা চাপে চিন্তায় সেরোটোনিন বেশি বেশি খরচ হবে। আবার যারা ভয়ানক চাপের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটায় তাদের সেরোটোনিন যেমন তাড়াতাড়ি খরচ হয় তেমনই উৎপাদন‌ও কমে আসে।”

বৃদ্ধ একটা সিগারেট বার করে বলেন, “উইথ ইয়োর কাইন্ড পারমিশন।”

তার পর অনুমতির তোয়াক্কা না করেই খচখচ করে দেশলাই জ্বেলে হুশ হুশ করে ধোঁয়া ছাড়েন।

কৃষ্ণা বলে, “ইস কী বাজে নেশা…এটা ছেড়ে দেবেন আপনি। কিন্তু সেরোটোনিন কমে গেলে কী হয়?”

বুড়ো ডাক্তার চায়ের গেলাসে ছাই ঝাড়েন।

“হুম গ‍্যুড ক‍্যোয়েশ্চন। প্রথমত, ঘুম কমে আসবে…ভোররাতে ঘুম ভেঙে যাবে এটাকে বলে লেট ইনসমনিয়া। বুক ধড়ফড় করবে, ঘাম হবে…সেক্সুয়াল ইচ্ছে টিচ্ছে একদম চলে যাবে। পরের দিকে অসম্ভব দুশ্চিন্তা আসবে, শুয়েও ঘুম আসবে না – অস্থিরতা আসবে – শুলেই সারা দিনের বা সারা জীবনের কথাবার্তা, কাজকর্ম – স‌অঅব মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকবে অর্থাৎ আর্লি ইনসমনিয়াও হবে এবং ফলে যেটা ভীষণ স্বাভাবিক সেই বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা আস্তে আস্তে চলে যাবে।”

সত‍্যকাম ঘাড় নাড়ে। সে সহমত।

কৃষ্ণা অস্ফুটে বলে, “বাঁচার ইচ্ছে চলে যাবে? বুঝলাম না।”

ডাক্তার আরেকটা সুখটান দিয়ে বলেন, “প্রথম প্রথম নিজের মৃত্যু-দৃশ‍্য কল্পনা করে নিজেই চোখের জল ফেলবে। তার পর মৃত‍্যুর পদ্ধতি কল্পনা করবে – এবং সেটাকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করবে এবং শেষকালে…।”

ডাক্তার সিগারেটে আরেকটা টান দেন। সত‍্যকাম এখন আর ওঠার চেষ্টা করছে না দেখে ডাক্তার বলেন, “সত‍্যকাম বেঁচে থাকা বড়ো কষ্টের – তাই না? যেমন ক‍্যানসার ছড়িয়ে পড়লে যন্ত্রণায় রোগী মরতে চায় ঠিক তেমনই?”

সত‍্যকাম নিরুত্তর।

“আর যদি এই যন্ত্রণা কমে যায়? তা হলে? তা হলে যে প্রাণ তোমার মা-বাবা দান করেছেন, ভালোবাসায় যত্নে বড়ো করেছেন, তাঁদের সেই দান নষ্ট করার কোনো অধিকার কি তোমার থাকবে? যাও, বাড়ি যাও, তোমার সব কষ্ট আমি নিয়ে নিলাম। ঠিক সাত দিনের মধ‍্যে তোমার সকাল আবার ছোটোবেলার মতো বর্ণময় হয়ে উঠবে – শুধু ওষুধটা ঠিক মতো খাবে…যাও ফিরে যাও।”

ওরা একটু এগোতেই বুড়ো পিছু ডাকেন, “এই যে মামণি, এক বার একটা কথা শুনে যাও।”

কৃষ্ণা ফিরে আসে।

“আর দ‍্যাখো মা, ও যেন আর একা না থাকে।”

টাকাপয়সা মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গভীর। কৃষ্ণার বাড়িতে একটা ঘুপচি কামরা আছে। যত রাজ‍্যের সব অকেজো জিনিসে বোঝাই। ফিরেই সত‍্যকাম সেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে ছিল। দু’জনে এ ভাবে থাকা সমাজ তো মানবে না। ওকে ফিরে যেতে হবে…নিজের একলা ঘরে।

একটু পরে কৃষ্ণা দরজা ঠকঠক করে ডাক দিল, “চা করেছি, খেতে আসুন।”

সত‍্যকাম ধীরে ধীরে দরজা খুলে বারান্দায় চেয়ারে এসে বসে। ম‍্যাক্সি পরা কৃষ্ণার শরীর শিল‍্যুয়েটে থাকে। জোনাকিরা ঝাড়বাতি জ্বালে। ব‍্যাঙ আর ঝিঁঝিঁপোকার কলতানের মধ্যেই সত‍্যকাম চায়ের কাপে ঠোঁট ঠেকায়। সত‍্যকাম বেঁচে ওঠো।

চিত্রাঙ্কন: লেখক

(লেখক একজন চিকিৎসক)

Continue Reading

প্রবন্ধ

মুখ থুবড়ে পড়েছে ফুটপাথকেন্দ্রিক সমান্তরাল অর্থনীতি, অভূতপূর্ব সংকটে হকাররা

অর্ণব দত্ত

২০০৮-২০০৯ সালে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ মন্দার স্মৃতি এখনও আতঙ্কিত করে। তৎকালীন মন্দা পরিস্থিতি থেকে ভারতের অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল। এর অন্যতম প্রধান কারণ এ দেশের নিম্নবিত্ত মানুষের চাহিদা মেটাতে সচল ছিল বিকল্প অর্থনীতি। 

বিকল্প এই অর্থনীতি ফুটপাথকেন্দ্রিক। ভারতের আশি কোটি মানুষ ফুটপাথ থেকে নানা দ্রব্যাদি কিনে প্রতি দিনের প্রয়োজন পূরণ করেন। পোশাকআশাক থেকে শাকসবজি – এক কথায় ফুটপাথের হকারদের কাছে মিলবে আলপিন টু এলিফ্যান্ট। 

২০০৮ সালে গঠিত অর্জুন সেনগুপ্ত কমিটির পেশ করা রিপোর্ট অনুসারে, এ দেশের অন্তত পক্ষে ৭৭ শতাংশ মানুষ ফুটপাথ থেকে দৈনিক কুড়ি টাকার জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন। সে হিসেবে দৈনিক বিক্রিবাট্টার পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকা।

এটা সমগ্র ভারতের খতিয়ান। করোনার প্রাদুর্ভাবে সারা দেশেই হকারদের মাধ্যমে পরিচালিত বিকল্প অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ দেশের অন্তত পাঁচ কোটি হকার-পরিবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। করোনা বিদায় নেওয়ার পরেও সরকারি আর্থিক সহায়তা ছাড়া হকারদের মাথা তুলে দাঁড়ানো যে সম্ভব নয়, ইতিমধ্যেই সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন হকার সংগঠনগুলির নেতারা।

কলকাতা শহরের ফুটপাথে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন ২ লক্ষ ৭৫ হাজার হকার। মহানগরীর যে কোনো প্রান্তে ফুটপাথ জুড়ে অসংখ্য দোকান। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষের চাহিদা মেটায় ফুটপাথে সাজানো হরেক রকম পসরা।

দু’ একজন চেষ্টা করছেন দোকান খোলার। ছবি: রাজীব বসু।

লকডাউন পর্বে বাঙালির পয়লা বৈশাখ পেরিয়েছে। দেখতে দেখতে কেটে গেল ইদও। আর কয়েক মাস পরে দুর্গোৎসব। লকডাউনে চৈত্র সেলের বাজার পুরোপুরি মার খেয়েছে। কোটি কোটি টাকার বেচাকেনা বন্ধ। ইদেও সেই একই পরিস্থিতি। হকার সংগঠনগুলির আশঙ্কা, আসন্ন পুজোতেও ব্যবসাপত্র ব্যাপক মার খেতে পারে।

লকডাউন কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিল হচ্ছে। এর ফলে নির্দিষ্ট সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কলকাতার হকাররা ফের ফুটে পসরা সাজিয়ে বসলেও ব্যবসা আদৌ জমবে কিনা, এই আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। হকার সংগঠনগুলির নেতাদের মতে, এর অন্যতম কারণ মানুষের হাতে পয়সা নেই। লকডাউনে ইতিমধ্যে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন। ফলে বাজার করার মতো আর্থিক সামর্থ্য বহু মানুষের থাকবে না। ধরে নেওয়া যায়, অনেকেই এ বছর পূজোয় নতুন জামাকাপড় কিনবেন না।

কলকাতার ফুটে বসে যে হকাররা ব্যবসা করেন তাঁদের ৬০ শতাংশই কলকাতার বাসিন্দা। বাকিদের অধিকাংশই মহানগরীতে ব্যবসা করতে আসেন আশপাশের জেলাগুলি থেকে। এ ছাড়া কলকাতার ফুটে যাঁরা হকারি করেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন উত্তরপ্রদেশ, বিহারের বাসিন্দারাও। তাঁরাও সংখ্যায় বেশ উল্লেখযোগ্য। লকডাউনে তাঁদেরও এখন না-চলার দশা। এ দিকে ঘরে ফেরার রাস্তা বন্ধ। দিন চলছে কোনো মতে। যদিও কলকাতার ৮০ শতাংশ বাসিন্দাই হকারদের উপর নির্ভরশীল। 

হকার সংগ্রাম কমিটি সূত্রে জানা গেল, কলকাতা শহরের ২ লক্ষ ৭৫ হাজার হকারের মধ্যে ৪০ শতাংশ মহিলা। দৈনিক যে পরিমাণ সামগ্রী হকাররা বিক্রি করেন, তাতে লভ্যাংশ থাকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ।

এ-ও জানা গেল, কলকাতার হকারদের একটা বড়ো অংশ কেবলমাত্র খাবার বিক্রি করেন। এঁরা মোট হকার সংখ্যার ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া একটা বড়ো অংশ সবজি ও ফলমূল বেচেন। অন্যরা বেচেন পোশাকআশাক কিংবা অন্য নানা ধরনের সামগ্রী। লকডাউনের পর থেকে মহানগরীর ফুটপাত শুনশান। শহরের সর্বত্র একই ছবি।

হকার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক শক্তিমান ঘোষ বললেন, কলকাতা-সহ সারা ভারতে হকাররা লকডাউন পর্যায়ে যে মার খেলেন তাতে ওদের ঘুরে দাঁড়ানো মুশকিল – যদি না সরকারি সহায়তা মেলে। লক্ষ লক্ষ হকারের হাতে এখন পুঁজি নেই। লকডাউনে পুঁজি ভাঙিয়ে সংসার প্রতিপালন করছেন ওঁরা। এ দিকে পুঁজি নেই উৎপাদকের কাছেও। ফলে পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ।

হকার সংগ্রাম কমিটির তরফে সরকারের কাছে ইতিমধ্যে কয়েক দফা দাবি পেশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়েছে, অবিলম্বে আগামী তিন মাস প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে হকারদের নগদ সহায়তা করা হোক। কলকাতা-সহ সারা বাংলার ১৬ লক্ষ হকারকে এই আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য দাবি জানানো হলেও এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে সাড়া মেলেনি।

লকডাউন কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিল হয়েছে। নির্দিষ্ট সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে হকারদের ফুটপাতে বসার অনুমতি মিলেছে। তাতেও পুজোর বাজার জমবে বলে আশা করছে না হকার সংগঠনগুলির নেতৃত্ব। এ ব্যাপারে হকার সংগ্রাম কমিটির বক্তব্য, লকডাউনে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন। এখন সংসার টানতেই তারা হিমশিম খাচ্ছেন। পুজোর বাজার করার মতো উদ্বৃত্ত টাকা বেশির ভাগ মানুষের হাতেই থাকবে না।

দুর্গাপুজোর সময় হকাররা ফি বছর যে পরিমাণ ব্যবসা করেন তাতে দুর্গাপুজোর পরের ৬ মাস চলার মতো পুঁজি তাঁদের হাতে জমে। এ বছর সে আশাতেও জল। এ দিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে হকার সম্প্রদায়ের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা তলানিতে ঠেকেছে।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পসরা নিয়ে বসে জীবন ধারণের চেষ্টা। ছবি: রাজীব বসু।

শহরের নানা প্রান্তে ডালা নিয়ে বসতেন যে হকাররা তাঁদের অনেকেরই এখন খাবারটুকু জোগাড় করারও সংস্থান নেই। মহাজনের কাছে হাত পাতলেও মিলছে না কিছুই।

তা হলে কি লকডাউন উঠে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে? হকার সংগ্রাম কমিটির বক্তব্য, তেমন আশা নেই। লকডাউনে হকাররা যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন তার মোকাবিলা করতে হলে বিশেষত কেন্দ্রীয় সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করে রূপায়িত করতে হবে।

হকার সংগঠনগুলির নেতাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত হকারদের ৪ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ মঞ্জুর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়িত করতে হবে কেন্দ্রকে। এ ছাড়া জিডিপির খরচের অনুপাত বাড়াতে হবে। তাঁদের অভিযোগ, দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হল, এ পর্যন্ত হকারদের টিকিয়ে রাখতে কোনো ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি কেন্দ্র।

দরিদ্র মানুষের রোজনামচায় অভিনবত্ব কিছু নেই। দু’ বেলা দু’ মুঠো অন্নের সংস্থানের উপায়ের সন্ধানে তাঁদের দিনগুজরান করতে হয়। এ ছাড়াও আছে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, পরিবারের সদস্যদের অসুখ-বিসুখবাবদ আনুষঙ্গিক খরচ।সে সব কী ভাবে জুটবে তা ভেবে পাচ্ছেন না হকাররা।

হকার সংগ্রাম কমিটির নেতারা জানালেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক। আপাতত হকার পরিবারগুলিকে দু’ মুঠো খাবার জোগাতে মহানগরীতে চালু করা হয়েছে তিনটি কমিউনিটি কিচেন। সেক্টর ফাইভ, বউবাজার এবং অভিষিক্তাতে আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত চলবে কমিউনিটি কিচেনগুলি।

কিন্তু সংকট এতই গভীর যে এ ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সিন্ধুতে বিন্দুসম। লকডাউন পর্বে ভারতের হকারদের দৈনিক ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতির যোগফল চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতোই।

Continue Reading

প্রবন্ধ

ঐতিহ্যবাহী বঙ্গের প্রাচীন জগন্নাথ মন্দির, স্নান পূর্ণিমাতিথি

শুভদীপ রায় চৌধুরী

বঙ্গদেশের আভিজাত্য ও ঐতিহ্য আজও যে অটুট, উৎসব-মুখরতাই তার প্রমাণ। কলকাতা-সহ বঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে আজও বিভিন্ন পুজোপার্বণকে কেন্দ্র করে মেতে ওঠেন আপামর বাঙালিসমাজ। দুর্গাপুজো থেকে শুরু করে জগদ্ধাত্রী, কালীপুজো থেকে শুরু করে রাসযাত্রা – আজও সমান অব্যাহত এই বঙ্গে। আজ স্নানযাত্রার পুণ্যতিথি, এই তিথিতেই কলকাতার কালীঘাটে মায়ের সতী-অংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এক টুকরো পট্টবস্ত্রের ওপর। আবার আজকের দিনেই রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী কালীমন্দির।

স্নানযাত্রা তিথিতে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ধুমধাম করে উৎসব পালিত হয়। এই উৎসবে বঙ্গদেশও পিছিয়ে নেই। এখানকার বিভিন্ন প্রাচীন জগন্নাথমন্দিরে নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় স্নানযাত্রা, ভক্তদের ভিড় হয় দেখার মতন। বঙ্গের প্রাচীন কিছু জগন্নাথমন্দিরের ইতিহাস ও রীতিনীতিই তুলে ধরা হচ্ছে এই লেখায়।

শ্রীরামপুরের মাহেশের জগন্নাথ মন্দির

প্রাচীনত্বের দিক থেকে পুরীর জগন্নাথধামের পরেই মাহেশের স্থান। বঙ্গের সব থেকে প্রাচীনতম রথযাত্রা এই মাহেশর রথ। বহু ভক্তের কাছে এ এক পুণ্যভূমি। মাহেশের রথযাত্রা এ বছর ৬২৫ বছরে পদার্পণ করল। ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম শুরু হয় মাহেশের রথযাত্রা উৎসব। চতুর্দশ শতাব্দীতে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী পুরীধামে তীর্থ করতে গিয়ে জগন্নাথকে নিজের হাতে রেঁধে ভোগ খাওয়ানোর কথা ভাবেন। সেই সময় পুরীর জগন্নাথধামের পুরোহিতরা সেই উদ্দেশ্যে বাধা দিলে তিনি মনঃকষ্টে অনশনে বসেন। তখন জগন্নাথের স্বপ্নাদেশ পেয়ে মাহেশে আসেন।

একদিন প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝার সময় গঙ্গায় নিমকাঠ ভেসে আসায় তিনি সেই কাঠ তুলে নিয়ে এসে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবীর মূর্তি তৈরি করেন ও শুরু হয় রথযাত্রা। সেই মূর্তিতে আজও রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়। স্নানযাত্রার দিন ২৮ ঘড়া জল ও দেড় মণ দুধ দিয়ে দেবতারা স্নান করেন। সেই স্নানে দেবতারা জ্বরে পড়েন, তখন আরামবাগ, গোঘাট থেকে কবিরাজ ডাকা হলে তাঁদের তৈরি পাচন খাইয়ে ভগবান সুস্থ হন। সেই সময় সাধারণ মানুষের প্রবেশ থাকে না মন্দিরে।

বড়িশার রথযাত্রা উৎসব

এই রথযাত্রা উৎসবও বহু প্রাচীন, প্রায় ৩০০ বছরের। কলকাতার প্রাচীনতম রথযাত্রা উৎসব হিসাবে পরিচিত এই বড়িশার রথ। এই অঞ্চলে রথযাত্রা উৎসব শুরু হয় ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে, শুরু করেছিলেন সাবর্ণগোত্রীয় রায় কৃষ্ণদেব মজুমদার চৌধুরী। মহাপ্রভু জগন্নাথদেবের মন্দির সখের বাজারে অবস্থিত। বর্তমান মন্দিরটি শ্রী তারাকুমারের জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রী লালকুমার রায়চৌধুরী ১৯১১ সালে নির্মাণ করেন। পরবর্তী কালে ভক্তবৃন্দ দ্বারা মন্দিরের সংস্কার সাধিত হয়। এই মন্দিরকে কেন্দ্র করেই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। 

প্রতি বছর রথযাত্রার দিন বিকেলবেলা মন্দির থেকে মহাপ্রভু জগন্নাথদেব, দেবী সুভদ্রা, বলভদ্রদেবের দারুবিগ্রহ এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে বড়োবাড়িতে নিয়ে আসা হয় রথোপরি স্থাপনের উদ্দেশ্যে। তার পর প্রথা অনুযায়ী, যিনি উদ্বোধন করতে আসেন, তিনি প্রথমে নারকেল ভেঙে রথের দড়িতে টান দেন। পরে ভক্তবৃন্দ ও জনসাধারণ রথরজ্জু আকর্ষণ করেন। বড়োবাড়ি থেকে ডায়মন্ড  হারবার রোডের পূর্ব সরণি দিয়ে উত্তরে বেহালা সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির ও দক্ষিণে শীলপাড়া ভজন আশ্রম পর্যন্ত (বর্তমানে এটাই যাত্রাপথ) প্রায় চার কিলোমিটার পথ এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা-সহ বিগ্রহ-অধিষ্ঠিত রথের পরিক্রমা হয়।

পরে বোসপাড়ায় এসে রথযাত্রা সমাপ্ত হয়। প্রথা অনুযায়ী এর পর বিগ্রহগুলি স্বর্গীয় শ্রী হীরালাল বসুর বাড়িতে অবস্থান করে। নয় দিনের মাথায় পুনর্যাত্রা বা উল্টোরথ অনুষ্টিত হয়। এ দিন রথযাত্রা শুরু হয় বোসপাড়া থেকে। আর অনেকটা একই ভাবে পরিক্রমা করে সখেরবাজার স্থিত মন্দিরে এসে শেষ হয়।

এককথায় শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা বহন করে চলেছে দ্বিশতাব্দী প্রাচীন এই উৎসব। ‘বড়িশা রথযাত্রা উৎসব’, কলকাতা শহরের অন্যতম এক রথযাত্রা উৎসব। বড়িশা রথযাত্রা বাৎসরিক উৎসব আয়োজিত হয় ভক্তবৃন্দের সাহায্যে ও সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণে।

নৈহাটির কাঁঠালপাড়া গ্রামের রথযাত্রা

এই রথযাত্রা নৈহাটি অঞ্চলের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের রথযাত্রা হিসাবে পরিচিত। বহু প্রাচীন এই রথযাত্রা উৎসব। কাঁঠালপাড়ার এই বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন সাহিত্যসম্রাট শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ১৮৬২ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের বড়োভাই শ্রী শ্যামচরণ চট্টোপাধ্যায় মা দুর্গাসুন্দরীর নামে রথযাত্রা উৎসব শুরু করেন, যা এত বছর বাদেও আভিজাত্যে উজ্জ্বল। রাধাবল্লভকে রথে বসিয়ে শুরু হয় সেই রথযাত্রা, ভক্তদের টানে রথে চলেন রাধাবল্লভ আর জয় জয় রব ওঠে রাধাবল্লভের নামে। শ্যামচরণ চট্টোপাধ্যায় তমলুকের কারিগর দিয়ে কাঠের ওপর পিতলের পাত দিয়ে রথ তৈরি করেন। যাঁকে কেন্দ্র করে এই রথযাত্রা তিনি শ্রীশ্রীরাধাবল্লভ জীউ, চট্টোপাধ্যায় পরিবারের কুলদেবতা হিসাবে বিরাজ করছেন।

বঙ্কিমচন্দ্র এই রাধাবল্লভকে খুব মানতেন। তাঁর বহু চিঠিপত্রে তাঁর কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করতেন চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বিপদেআপদে রাধাবল্লভই রক্ষা করেন। ১৮৭৬ সালে তিনি একটি প্রেস কিনে সেখানে ‘বঙ্গদর্শন’ ছাপা শুরু করেন এবং প্রেসটিকে রাধাবল্লভের নামেই উৎসর্গ করেন। প্রায় ৪০০ বছরের আগের এই বিগ্রহ শ্রীশ্রীরাধাবল্লভ জীউ, আজও রথের দিন রথে বসে ভক্তদের টানে এগিয়ে যান।

রাসমণিদেবীর রথযাত্রা

তিলোত্তমার ইতিহাসে রানি রাসমনির নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত। তাঁর বাড়িতে তিনিই শুরু করেছিলেন এই রথযাত্রা উৎসব। মূলত রাসমণি দেবী শাক্ত আরাধনা করলেও, তিনি পিতৃসূত্রে বৈষ্ণবভাবাপন্ন ছিলেন এবং শ্বশুরালয়েও ‘রঘুনাথজীউ’ পরবর্তীকালে গৃহদেবতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। স্বামী রাজচন্দ্র দাসের জীবদ্দশায় বাড়িতে দোল উৎসব, দুর্গাপুজো প্রভৃতি অনুষ্ঠান মহাসমারোহে হলেও রথযাত্রা হত না। স্বামীর মৃত্যুর পর রাসমণি দেবী রথযাত্রা উৎসব করতে এবং সেই রথে গৃহদেবতা শ্রীশ্রীরঘুনাথজীউকে বসাতে মনস্থ করেন। ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে রাসমণিদেবী প্রথম রথযাত্রা উপলক্ষ্যে রথ নির্মাণ করেন সওয়া লক্ষ টাকা ব্যয় করে এবং ধুমধাম করে রথযাত্রা উৎসব পালন করেন।

বাংলার নানান স্থানে নানা প্রকার রথ হত, কিন্তু রাসমণি দেবীর ইচ্ছানুযায়ী, সেই বাড়িতে কাঠের পরিবর্তে রুপোর রথ তৈরি হল। কলকাতার অভিজাত পরিবারের কাছে বিলাতি জহুরি হিসাবে হ্যামিলটন কোম্পানির তখন খুবই খ্যাতি। রাসমণির জামাতা মথুরমোহন বিশ্বাসের ইচ্ছা ছিল সেই বিদেশি কোম্পানিকে দিয়েই তৈরি করাবেন, দামি রুপোর রথ। কিন্তু তাঁর জ্যেষ্ঠ জামাতা রামচন্দ্র দাসের পরামর্শ অনুযায়ী রাসমণি দেবী দেশি কারিগর দিয়েই রথ তৈরি করালেন। সিঁথি, ভবানীপুর প্রভৃতি স্থান থেকে যোগ্য কারিগর নিয়ে এসে বাড়িতেই তৈরি হল রূপোর রথ।

রাসমণিদেবী প্রতি বছরই ধুমধাম করে রথযাত্রা উৎসব পালন করতেন। রথযাত্রার সময় ঢাক, ঢোল, সানাই, বাঁশি, জগঝম্প প্রভৃতি নানান বাজনা আনতেন। বাজনা ও কীর্তনের দল রথের পেছনে পেছনে যেত। লোকে দলে দলে আসতেন ‘রানির রথ’ দেখতে। রানি রাসমণি দেবীর রথযাত্রা উপলক্ষ্যে প্রায় ৮/১০ হাজার টাকা খরচ হত। একবার তিনি এই উৎসব দেখার জন্য সাহেবদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বর্তমানে দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী কালীমন্দিরে ধুমধাম করে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়।

গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা

বাংলার প্রাচীন রথযাত্রা উৎসবের মধ্যে গুপ্তিপাড়ার রথ বিখ্যাত। আনুমানিক ১৭৪০ সালে এই রথযাত্রা উৎসব শুরু হয়, যা আজ প্রায় ২৮০ বছর অতিক্রান্ত। স্বামী মধুসুদনানন্দ শুরু করেছিলেন এই রথযাত্রা উৎসব। এই রথের উচ্চতা প্রায় ৩৬ ফুট, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ৩৪ ফুট করে। রথে থাকে চারটি দড়ি, প্রতিটি দড়িই ৩০০ ফুট দীর্ঘ। প্রফুল্ল কুমার পান লিখেছেন,

‘গুপ্তিপাড়া-রথ-কাছি ক্রমে ছোটো নয়।/রথের টান-কালে তা ছিঁড়ে ছিঁড়ে নেয়।।/ ছেঁড়া-কাছি ঘরে রাখে শান্তির কারণে।/কত শত মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় মনে।।’

অন্য স্থানের মতন এই দিন জগন্নাথদেব তাঁর মাসির বাড়িতে সকল মানুষের অন্তরালে বন্ধ থাকেন। এই দিন হয় চিরায়ত প্রথা ‘ভাণ্ডারা লুঠ’, অর্থাৎ সেই প্রাচীন রীতি মেনে প্রতি বছর উল্টোরথের আগের দিন মাসির বাড়ির মন্দিরের তিনটি দরজা এক সঙ্গে খোলা হয়। ঘরের ভিতরে থাকে রকমারি খাবারের পদ মালসায় করে। দরজা খোলার পর এই প্রসাদ নেওয়ার জন্য ভক্তের ভিড় দেখার মতন হয়। কত দূরদূরান্ত থেকে ভক্তবৃন্দ আসেন এই দিন প্রসাদ পাওয়ার জন্য। ভাণ্ডারা লুঠের জন্য থাকে খিচুড়ি, বেগুনভাজা-সহ নানান রকমের ভাজা, ছানার তরকারি, পায়েস, ক্ষীর, ফ্রায়েড রাইস, মালপোয়া, সন্দেশ, রাবড়ি-সহ মোট ৫২ রকমের পদ প্রায় ৫৫০টির বেশি মালসা থাকে। এই সমস্ত প্রাচীন প্রথা মেনে নিষ্ঠার সঙ্গে মহাসমারাহে পালিত হয় গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা।

খিদিরপুরের শ্রীশ্রীজগন্নাথ মন্দির

রথযাত্রা উৎসব বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু প্রাচীন যুগ ধরে চলে আসছে, খিদিরপুর অঞ্চলও বাদ নেই সেই তালিকা থেকে। মূলত স্বাধীনতার আগে খিদিরপুরে বৃহৎ বন্দর গড়ে তোলেন ইংরেজরাই। সেই স্থানেই চাকরি করতে এসেছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষজন। সেই সময় ওড়িশার বহু বাসিন্দা বন্দরে এবং বন্দর সংলগ্ন অঞ্চলে বসবাস করতে শুরু করেন। স্বভূমি ছেড়ে আসা ওড়িশার জগন্নাথভক্তরা বন্দরের বিপরীত দিকে গড়ে তুলতেন শ্রীজগন্নাথ মন্দির, ১৯৪৬ সালে। ভারতের স্বাধীনতার আগে গড়ে ওঠা শ্রীজগন্নাথ মন্দির আজ বিশাল আকারে পরিণত হয়েছে।

দীর্ঘ চল্লিশ বছর অতিক্রম করার পর ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে আবার মন্দিরের সংস্কার করা হয়। পুরীর সদাশিব রথশর্মা পৌরোহিত্য করে নতুন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান শতাব্দীর শুরুতেই শ্রীজগন্নাথ মন্দির সেবা সমিতি সিদ্ধান্ত নেন যে ভক্তদের ইচ্ছা এবং রীতিনীতি মেনেই উৎসব পালনের সুবন্দোবস্ত করা হবে। সেই সময় নতুন করে আবার দোতলা মন্দির নির্মাণ করা হয়। ২০০৩ সালে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের প্রধান সেবক পুরীর রাজা গজপতি মহারাজের অনুমতি ও পরামর্শে বর্তমান শ্রীমন্দির গড়ে ওঠে। ৭ জুন ২০০৩ সালে পুরী থেকে আনা নতুন বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

স্নানযাত্রার দিন সকালে ভোগের পর ভক্তদের কাঁধে চেপে পহাণ্ডি বিজয় করে শ্রীজগন্নাথ আসেন স্নানের বেদিতে। রীতি অনুযায়ী একশো আট কলস স্নান। তার পর পনেরো দিন প্রভু অন্তরালে থাকেন। রথযাত্রার আগের দিন আবার ভক্তরা প্রভুর দর্শন পান। রথযাত্রার দিন মন্দিরেই সকালে মঙ্গল-আরতির ও পূজা করে নিবেদন করা হয় খিচুড়িভোগ। খিদিরপুরের এই শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের উৎসবকে সফল করতে এগিয়ে আসে ওড়িশা রাজ্য সরকারও। পুরীর মন্দিরের নিয়ম অনুযায়ী এখানে ভোগ রান্না করা হয়। অষ্টম দিনের পর পুর্ণযাত্রা শেষে প্রভু ফিরে যান মন্দিরে। একাদশীতে হয় সোনাবেশ। ত্রয়োদশীর দিন রসগোল্লা ভোগ নিবেদনের পর নীলাদ্রি বিজয়ের শেষে প্রভু মন্দিরে ওঠেন, অবস্থান করেন রত্নবেদীতে।

শান্তিপুরের রথযাত্রা

শান্তিপুর বিখ্যাত রাসযাত্রা উৎসব এবং কালীপুজোর জন্য। কিন্তু বহু প্রাচীন উৎসবও পালিত হয় এই শান্তিপুরে। শাক্ত-বৈষ্ণব এবং শৈব ধারার মেলবন্ধন দেখা যায় এই শান্তিপুরে। এই অঞ্চলে রঘুনাথকে কেন্দ্র করে হয় রথযাত্রা উৎসব, সঙ্গে থাকে জগন্নাথও। এই শান্তিপুরের গোস্বামীবাড়ির রথযাত্রা উৎসব খুবই প্রাচীন। প্রতিটি গোস্বামী বাড়িতেই রথের দিনে রামচন্দ্রের দারুমূর্তি রথে বসেন, বলা যেতে পারে তিনিই রথযাত্রার মূল আকর্ষণ। তবে তিনি অধিক পরিচিত রঘুনাথ হিসাবে, এই বিগ্রহের গঠনও একটু আলাদা। এই রঘুনাথ মূর্তিটি বাবু হয়ে পদ্মাসনে বসে আছেন, পরনে ধুতি আর চাদর আর গায়ের রঙ সবুজ। তবে রথে জগন্নাথদেবও থাকেন রঘুনাথের সঙ্গে। বড়ো গোস্বামীবাড়ির রথযাত্রা আবার আড়াইশো বছরেরও প্রাচীন, তৎকালীন সময়ে রথের আকার ছিল অনেক বড়ো তাই ছোটো জগন্নাথ বিগ্রহ মানানসই না হওয়ায় রঘুনাথকে রথে তোলার প্রচলন শুরু হয়। সেই থেকে রঘুনাথই এখানকার রথের কেন্দ্রবিন্দু। বড়ো গোস্বামীবাড়ি ছাড়াও গোকুলচাঁদ গোস্বামীবাড়ি, গোপালপুর সাহাবাড়ির রথ উল্লেখযোগ্য। রথযাত্রার দিন রঘুনাথকে বিশেষ পুজো করা হয়, তার পর ভক্তের ইচ্ছায় তিনি রথে বসেন আর শুরু হয় প্রাচীন সেই রথযাত্রা উৎসব, যা আজ বঙ্গের ইতিহাসে অনন্য স্থান দখল করে আছে।

(লেখক ইতিহাস-গবেষক)

Continue Reading
Advertisement
রাজ্য39 mins ago

এ বার মাস্ক না পরলে শাস্তি‍! নতুন নির্দেশিকা রাজ্য়ের

ক্রিকেট45 mins ago

২০১১ বিশ্বকাপ কাণ্ড: ম্যাচ গড়াপেটার তদন্ত বন্ধ করল শ্রীলঙ্কা

দেশ1 hour ago

নাগাল্যান্ডে নিষিদ্ধ হল কুকুরের মাংস

দেশ1 hour ago

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, রেল বেসরকারিকরণের প্রতিবাদে ট্রেড ইউনিয়নগুলি

দেশ3 hours ago

‘বিস্তারবাদ’ অতীত, বিশ্বে এখন ‘বিকাশবাদ’ প্রাসঙ্গিক, লাদাখে বললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

gst
শিল্প-বাণিজ্য3 hours ago

জিএসটি-তে বড়োসড়ো স্বস্তি, কমল জরিমানা

দেশ4 hours ago

এক মাসে ভারত-বাংলাদেশ পণ্যবাহী শতাধিক ট্রেন চলেছে

thunderstorm
রাজ্য4 hours ago

কলকাতা-সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গে সন্ধ্যার মধ্যে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা

নজরে