মহাত্মা গান্ধীর হাত ধরে যে খাদির যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা এক বড়ো শিল্পোদ্যোগ

0

মহাত্মা গান্ধীর কথা ভাবলেই তাঁর সেই খাটো ধুতি পরা ছবিটা চোখের সামনে ভাসে। পরণে খাটো ধুতি, গায়ে একটা শাল জড়ানো। গান্ধীজির এই পোশাক দেখেই সেই সময়কার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তাঁকে ‘অর্ধনগ্ন ফকির’ আখ্যা দেন। কিন্তু বরাবরই এ রকম পোশাক পরতেন না মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।

দক্ষিণ আফ্রিকায় আইনজীবী হিসেবে মোহনদাস করমচাঁদ তিন ধরনের স্যুট ব্যবহার করতেন। ১৯১৫ সালে ভারতে ফিরে এসে তিনি সাধারণ গুজরাতি পোশাক পরা শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ‘মহাত্মা’ নামে অভিহিত করার পর তিনি খাদির ব্যবহার শুরু করেন, যা আমৃত্যু তাঁর সঙ্গী ছিল।

১৯১৭-১৮-এর চম্পারণ সত্যাগ্রহের সময় থেকে নিজের স্বাভাবিক পোশাক ধুতি-শার্ট-টুপি ছেড়ে তিনি খাটো ধুতি পরা শুরু করেন। চম্পারণ সত্যাগ্রহের সময়ই দেশের মানুষের দারিদ্র তাঁকে চিন্তায় ফেলেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের দরিদ্র মানুষের সঙ্গা একাত্ম হতে গেলে তাঁকে সেই পোশাকই পরতে হবে, যাতে তারা তাঁর আপন হতে পারে। শেষ পর্যন্ত ধরলেন খাটো ধুতি আর শাল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওই খাটো ধুতি আর শালই তাঁর পরিচায়ক পোশাক হয়ে দাঁড়ায়। 

১৯১৮ সালে মহাত্মা গান্ধী ভারতে গ্রামে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষের জীবনধারণের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ত্রাণ কর্মসূচি হিসেবে খাদির জন্য আন্দোলন শুরু করেন। মূলত বয়ন ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা আনার জন্যই এই আন্দোলন শুরু হয়। প্রতিটি গ্রামে সুতো তৈরির জন্য কাঁচা মালের চাষ, পুরুষ এবং মহিলাদের সুতো পাকানোর কাজে যুক্ত করা ও সেই সুতোয় তৈরি কাপড় ব্যবহারের জন্য উদ্বুদ্ধ  করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। গান্ধীজীর হাত ধরে খাদি আন্দোলন এক অন্য মাত্রা পায়।

Shyamsundar

সময়টা ১৯২১ সালের সেপ্টেম্বর মাস। মাদ্রাজ (এখনকার চেন্নাই) থেকে ট্রেনে মাদুরাই যাচ্ছিলেন মহাত্মা। বিদেশি পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। বিদেশি কাপড় ছেড়ে দেশি খাদি পরার আহ্বান জানিয়েছিলেন দেশবাসীর কাছে। কিন্তু গান্ধীর নিজের লেখা থেকে জানা যায়, ট্রেনের কামরাতেই তিনি দেখেছিলেন বিদেশি পণ্য বর্জনের বিষয়ে মানুষের বিশেষ হেলদোল নেই। অধিকাংশের পরনেই বিদেশি কাপড়। কারণ জিজ্ঞাসা করাতে তারা বলল খাদি কেনার মতো অর্থ তাঁদের কাছে নেই।

স্বাভাবিক ভাবেই এর কোনো উত্তর তখনই তার কাছে ছিল না। তাদের মন্তব্য তাঁকে কুরে কুরে খেয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন, খাদির উৎপাদন বাড়াতে হবে। দেশবাসীর জীবনের সঙ্গে এই খাদিকে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ফেলতে হবে। সেখান থেকে শুরু হল তাঁর খাদি আন্দোলন।

ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে খাদির উৎপত্তি হয়েছিল সরবমতী আশ্রমে। খাদিকে শুধু বিদেশি পোশাকের বিকল্প হিসাবে নয়, দেশাত্মবোধের পরিচায়ক পোশাক হিসাবে তুলে ধরলেন মহাত্মা গান্ধী। একই সঙ্গে খাদি হয়ে উঠল আত্মনির্ভরতা ও শ্রমের মর্যাদার প্রতীক। গান্ধীজি বলেছিলেন, “স্বদেশি ছাড়া স্বরাজ একটি প্রাণহীন শব। স্বদেশি যদি স্বরাজের আত্মা হয়, তা হলে খাদি হল স্বদেশির সত্তা।” 

১৯৩৪-৩৫ সালে সাবলম্বী গ্রাম গঠন এবং দরিদ্র মানুষদের আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর করার উদ্দেশ্যে খাদি উৎপাদনে বিশেষ উদ্যোগ নেন গান্ধীজি। ১৯৪২-৪৩ সালে দেশব্যাপী খাদির পোশাক ব্যবহার সম্পর্কে চিন্তাভাবনার প্রসারে শ্রমিক এবং গ্রাম সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এই ভাবে খাদি কেবল শুধুমাত্র একটি কাপড়ের টুকরো নয়, ভারতবাসীর জীবনযাত্রায় পরিণত হয়।

মহাত্মা গান্ধীর চিন্তাধারা ও উদ্যোগকে সম্মান জানিয়ে ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার খাদি ও গ্রামোদ্যোগ কমিশন (কেভিআইসি, KVIC) গঠন করে। আজ দেশ জুড়ে কেভিআইসি-র ৭ হাজারেরও বেশি আউটলেট আছে। ২০১৮-১৯ আর্থিক বছরে তাদের ৭৪,৩২৩ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে বলে কেভিআইসি জানিয়েছে।

এ ভাবেই জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর শুরু করা একটি উদ্যোগ আজ দেশের একটি অন্যতম প্রধান শিল্পোদ্যোগ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়তে পারেন

মহালয়া এলেই মনে পড়ে যায় ‘মহিষাসুরমর্দিনী’, শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই ত্রয়ীকে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন