central force
একশো শতাংশ বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করেও অশান্তি থামেনি

জয়ন্ত মণ্ডল: রাজ্যে দুই দফার ভোট মিটতেই নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক অজয় ভি নায়েকের মন্তব্যে শোরগোল পড়ে যায় বাংলায়। তিনি ১০ বছর আগের বিহারের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা টেনেছিলেন আজকের পশ্চিমবঙ্গের অবস্থাকে। গত মঙ্গলবার বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের রোড শো-কে ঘিরে তৈরি হওয়া উত্তেজনা কি অজয়ের সেই মন্তব্যের স্পষ্ট প্রতিফলন?

অজয় বলেছিলেন, “বিহারে ১০ বছর আগে যে পরিস্থিতি ছিল এখন পশ্চিমবঙ্গে তাই অবস্থা…বিহারে পরিস্থিতি বদলাতে পারে, তাহলে কেন পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি বদলাবে না। এটা গণতন্ত্রের জন্যে ভাল নয় “। সে দিনই তিনি তৃতীয় দফা থেকে রাজ্যের প্রতিটি বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের আশ্বাস দেন। পরবর্তীকালে তা বাস্তবায়িতও হয়। কিন্তু তার পরেও ভোটের দিন রাজনৈতিক হানাহানি, খুন ঠেকানো যায়নি।

ওই তৃতীয় দফার ভোটেই মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলায় বুথের কাছেই ছেলের সামনেই টিয়ারুল শেখ নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে খুন করা হয়। আক্রান্ত হতে হয়েছে সংবাদ মাধ্যমকেও। উত্তরবঙ্গ থেকে সেই অশান্তি বহরে বেড়েছে নীচের দিকে নামার সঙ্গেই। চতুর্থ দফায় আসানসোল, বীরভূম বা পঞ্চম দফায় ব্যারাকপুর, হুগলির দফায় দফায় রাজনৈতিক সংঘর্ষ থামানো যায়নি প্রায় একশো শতাংশ কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের পরেও। শেষ দফার ভোটের আগে সর্বশেষ সংযোজন অমিত শাহের রোড শো এবং কলকাতার ঐতিহ্যবাহী দু’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে রাজনৈতিক হিংসা।

দলীয় কর্মী-সমর্থকরা তো আছেনই, খোদ প্রার্থীরা যখন আক্রান্ত হন তখন প্রশ্ন উঠতে বাধ্য- অজয় কি ভুল বলেছিলেন? আসানসোলে বাবুল সুপ্রিয়, ঘাটালে ভারতী ঘোষ, ব্যারাকপুরে অর্জুন সিং, হাওড়ায় প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়দের নিগৃহীত হতে হয়। আবার ফেসবুকে মেমে শেয়ার করে গ্রেফতার হলেও প্রশ্ন ওঠে গণতন্ত্র ঠিক কোন সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে?

১০ বছর আগের বিহারের পরিস্থিতির সঙ্গে রাজ্যের তুলনা টানায় অজয়ের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কড়া নেড়েছিল রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল। এটা যে বাস্তবতাকে অতিক্রম করে অক্ষমতা ঢাকার নির্বোধ প্রয়াস, সেটা তো একে একে প্রকাশ্যে আসছে। তা না হলে কোচবিহারের ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী গোবিন্দ রায়কে কেন আক্রান্ত হতে হয়? কেন নিজের এলাকায় নির্বাচনী প্রচার ছেড়ে কলকাতার হাসপাতালে দৌড়াতে হয় আসানসোলের সিপিএম প্রার্থী গৌরাঙ্গ চট্টোপাধ্যায়কে? একই সঙ্গে কেন-ইবা সিপিএমের বিরুদ্ধে কনভয় ভাঙচুররের অভিযোগ তুলতে হয় রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে? যে আইন সক্রিয় হয়ে তৃণমূল কাউন্সিলারের অভিযোগের ভিত্তিতে ফেসবুকে মেমে শেয়ার করা বিজেপি নেত্রীকে গ্রেফতার করে গারদে পাঠায়, সেই রকমের শৃঙ্খলার ছোঁয়া কেন পাওয়া যাচ্ছে না সার্বিক কার্যকলাপে?

যদিও অমিতের রোড শো বা আরও স্পষ্ট করে বললে এমন মেগা রোড শো এর আগে দেখেনি বাংলা। জাঁকজমক তো ছিলই, একই সঙ্গে ছিল রাজ্যে রথযাত্রা না-করতে পারার একটা চাপা ক্ষোভও থাকলেও থাকতে পারে। রথযাত্রা নিয়ে হাজারো আয়োজন ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে প্রশাসনের দর কষাকষিতে। ভোটের আবহে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর চিন্তা যদি কোনো বিজেপি কর্মীর মনে জাগে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নয়। অনন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গেরুয়া বসনধারীদের আচরণ যা ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের ভিতর থেকে ভেসে আসা তৃণমূল ছাত্র পরিষদের ‘গো ব্যাক’ স্লোগান সেখানে উপলক্ষ্য মাত্র। সুযোগ পেলেই সবক শিখিয়ে দেওয়ার সুযোগ কে-ইবা হাতছাড়া করতে চায়। রোড শো না কি ভোট শেষ হওয়ার আগেই বিজয়মিছিল, দেখে বোঝা মুশকিল হচ্ছিল অনেকের। প্রতিমা বিসর্জনের শোভাযাত্রার মতোই কোথাও যেন বেসামাল মিল ছিল ওই রোড শোয়ের। সেখানে বিদ্যাসাগর কে, তা নিয়ে বাড়তি মাথা ঘামানোর প্রয়োজনটুকুও না থাকতে পারে।

বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙায় কোনো অভিনবত্ব নেই। উত্তরপ্রদেশ, ত্রিপুরা কোন দূর, বাংলার বুকেই এর আগে মূর্তি ভাঙা হয়েছে। সে যাঁরই মূর্তি হোক। ফলে মূর্তি ভাঙাটাও এখানে বড়ো কোনো লক্ষ্য বা স্বার্থপূরণের হেতু নয়। সেই মূর্তি যে রাজনৈতিক দলের কর্মীদের হাতেই ভাঙা পড়ুক না কেন। এটা তাদের দীর্ঘমেয়াদি অ্যাজেন্ডার বাস্তবায়ন নয় মোটেই। আসলে পুরোটাই অজয় নায়েকের তির্যক সেই মন্তব্যের বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন মাত্র। যে প্রতিফলন বহরে আরও বাড়তে পারে বলেই ইঙ্গিত দিচ্ছে বহুবিধ ঘটনা পরম্পরা। গোয়েন্দা বিভাগের দুঁদে আধিকারিক হওয়ার প্রয়োজন নেই, মামুলি দৃষ্টিতে তাকালেই দেখা যাচ্ছে, অশান্তি আসছে। তৈরি হও কলকাতা!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here