‘নো ভোট টু বিজেপি’ স্লোগানই কার্যকর করেছেন বামপন্থী ভোটার

0

শৈবাল বিশ্বাস

বামপন্থীরা এ বারের নির্বাচনে প্রায় ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু কেন? এই নিয়ে কাটাছেঁড়া চলছে, আগামী দিনেও চলবে। সিপিএমের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য‌ তন্ময় ভট্টাচার্য ইতিমধ্যেই টিভি চ্যানেলে বলে দিয়েছেন গোটাটাই নেতৃত্বর দোষ। কেউ কেউ সংগঠনের দুর্বলতার প্রশ্নও তুলছেন। আংশিক ভাবে হয়তো সবটাই সত্য‌, কিন্তু সেটাই সব নয়।

Loading videos...

এ বারে বামপন্থীদের পরাজয়ের সঠিক পরিপ্রেক্ষিত বোঝার জন্য‌ সর্বভারতীয় রাজনীতির দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। সেই প্রেক্ষিতে বিচার না করলে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের এই ‘ভয়াবহ’ ফলাফলের কারণ বের করা সম্ভব হবে না।

অনেকেই যুক্তি দিচ্ছেন, কেরলে বামপন্থীরা যে রেকর্ড করে দ্বিতীয় বারের জন্য‌ ক্ষমতায় ফিরেছে সেটা তো কংগ্রেসকে পরাজিত করে। সত্যিকারের লড়াইটা যদি বিজেপির সঙ্গে হত, তা হলে হিম্মত বোঝা যেত। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, কংগ্রেস সে রাজ্যে শক্তিশালী বলে, বিজেপি একেবারে চেপে বসে গিয়েছিল তা মোটেই নয়। মেট্রোম্যান শ্রীধরনকে সামনে রেখে তারা কেরলে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ঝাঁপানোর চেষ্টা করেছিল। সে রাজ্যে আরএসএসের সংগঠন যথেষ্ট মজবুত। সেই সূত্রে বিজেপি সাম্প্রদায়িক লাইনে ভোট করে ফায়দা লোটার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। শবরীমালার মতো কয়েকটি স্থানীয় বিষয়কে সামনে এনে সিপিএমকে ‘নাস্তিক’ প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছি্ল। কিন্তু তারা জনগণের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। হ্যাঁ, প্রত্যাখ্যাত যে হবে সেটা আগাম অনুমান করে প্রচারের রাশ খানিকটা আলগা করেছিল, এই সত্য‌ও অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু বামেদের ফাঁকা মাঠ ছেড়ে দিয়ে তারা চলে এসেছিল, এটাও ভাবার কোনো কারণ ঘটেনি। বরং বিষয়টা এ ভাবে দেখা ভালো, চেষ্টা করেও দক্ষিণের এই রাজ্যে বিজেপি তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে সম্পূর্ণ ব্য‌র্থ হয়েছে।

তামিলনাড়ুতে তারা চেষ্টা করেছিল ক্ষমতাসীন এআইডিএমকের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে দক্ষিণের রাজনীতিতে পা ফেলতে। হয়তো বিজেপির সঙ্গে হাতে হাত মেলানোটাই পালানিস্বামীদের পক্ষে কাল হল। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ব্রাহ্মণ্য‌ সংস্কৃতি বিরোধী যে ধারা রয়েছে, তার সম্পূর্ণ ফায়দা তুলতে সক্ষম হল স্টালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে জোট। ইচ্ছা করেই অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদীরা সে রাজ্যে ঘনঘন গিয়ে ব্রাহ্মণ্য‌বাদে সুড়সুড়ি দেওয়া থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দ্রাবিড় জনতা মোদী-শাহকে বাদ দিয়েও সমগ্র বিজেপি দলটাকেই মনুবাদী সংস্কৃতির সঙ্গে এক করে ধরেছে। তারা মনে করেছে, তামিলনাড়ুতে এই দল আগ্রাসী রাজনীতির প্রকাশ ঘটিয়ে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে গুলিয়ে দেবে। প্রশ্ন তুলে দেবে দ্রাবিড় সংস্কৃতি নিয়ে।

এই সত্য‌টা বাংলার ক্ষেত্রেও খানিকটা কাজ করেছে। রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি রাখলেই যে রবীন্দ্রপ্রেমী হওয়া যায় না, বরং ভুল উচ্চারণে রবীন্দ্রনাথের কবিতা বললে বাঙালির রাগ হয়, এটা নরেন্দ্র মোদীর বোঝা উচিত ছিল। সে যা-ই হোক, তামিলনাড়ুতে বিজেপির সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশলী প্রতিপক্ষ হিসাবে ডিএমকে-কেই সেখানকার জনতা বেছে নিয়েছে।

ছবি ফেসবুক থেকে নেওয়া।

একমাত্র অসম ও পুদুচ্চেরিতে এনডিএ-র লাভ হয়েছে। অসমে কংগ্রেস ভালো ভাবেই প্রচারে এগোচ্ছিল। কিন্তু তরুণ গগৈ-এর মতো শক্তপোক্ত নেতার অভাবে প্রচারের ধার অনেকটাই কমে যায়। তার উপর সেখানে বাঙালি ও অহমিয়া ভোটারদের মধ্যে বিভাজন এতটাই তীব্র হয়েছে যে কংগ্রেসের পক্ষে জাতিস্বাতন্ত্র্যের রাজনীতিকে ভেদ করে অসাম্প্রদায়িক-বিভাজন বিরোধী রাজনৈতিক অস্তিত্ব তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। অসমের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলি মনে করে, কংগ্রেস তাদের প্রধানতম দুশমন কারণ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে অনুপ্রবেশের সুবিধা করে দিয়ে তারা জনজাতির অস্তিত্বকেই অতীতে বিপন্ন করে তুলেছিল। এই জায়গা থেকে কংগ্রেস সরে আসতে না পারায় লাভের গুড় বিজেপিতে খেয়ে গিয়েছে।

এই কথাগুলি বলার অর্থ একটাই – সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মানচিত্রে বিজেপি এ বারের নির্বাচনে কতটা অপ্রাসঙ্গিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে, সেটা তুলে ধরা। পশ্চিমবঙ্গ এই হিসাবের বাইরে নয়। পশ্চিমবঙ্গে এ বারের ভোট হয়েছে মূলত বিজেপিকে আটকানোর জন্য‌। তৃণমূল কংগ্রেসের ৫০ শতাংশর কাছাকাছি ভোট পুরোটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সুশাসনের’ ভোট এমনটা মনে করা বৃথা। এই ভোটের একটা বড়ো অংশই ‘নো বিজেপি’ ভোট। প্রতিষ্ঠান-বিরোধী ভোট এ বার মমতার বিরুদ্ধে পড়েনি, পড়েছে মোদীর বিরুদ্ধে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। এর মধ্যে যেমন দক্ষিণপন্থী ভোটার রয়েছেন, তেমনই বামপন্থী ভোটাররাও রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের সৎ বামপন্থীদের একটা বিরাট অংশই এ বার মনে করেছেন, বিজেপিকে আটকানোই প্রধান কর্তব্য‌। বিজেপি কর্পোরেটের হাত ধরে দেশকে বেচে দিতে চলেছে। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপই কর্পোরেট স্বার্থে।

এ প্রসঙ্গে আরও অনেক ব্যাখ্যা তুলে ধরা যায়। আসল কথাটা প্রকাশ করেছেন, আমার বন্ধু এক বিশিষ্ট বামপন্থী নেতা। তিনি ভোটের দিন পরিচিত বামপন্থী বন্ধুদের মধ্যে যে মনোভাব লক্ষ করেছেন, তা কতকটা এ রকম – “নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহর বিভাজনের রাজনীতি রুখতে তৃণমূলকে ভোট দিতেই হবে। ভোট বিভাজন করে বিজেপির সুবিধা করে দেওয়াটা বামপন্থীদের উচিত হবে না। বরং প্রকৃত বামপন্থীদের কাজ হবে যে কোনো মূল্যে বিজেপিকে পরাজিত করা।”

গোটা দেশ জুড়ে কৃষক আন্দোলন, অন্যান্য‌ গণআন্দোলনের অভিমুখ এখন বিজেপির বিরুদ্ধে। উত্তরপ্রদেশের মতো হিন্দিভাষী রাজ্যেও এখন বিজেপি কোণঠাসা। সাংস্কৃতিক আধিপত্য‌বাদ, গুন্ডামি, কৃষকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কর্পোরেট তোষণ, বিভাজনের বিরুদ্ধে উত্তরপ্রদেশের জনতাও ক্ষিপ্ত। অর্থাৎ গোটা দেশ জুড়েই বিজেপির রাজনীতির বিরুদ্ধে জনমত তুঙ্গে উঠেছে। এই অবস্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরা মনে করেছেন তাঁরা ‘ফ্যাসিস্ত’ শক্তিকে প্রতিহত করার লড়াইয়ে নেমেছেন। এই অবস্থান যে বামপন্থী ভোটাররা নিতে চলেছেন তা সিপিআইএমএলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যর বিবৃতিতেই স্পষ্ট হয়েছিল। সিপিএম নেতৃত্ব যে তা বোঝেননি তা নয়, কিন্তু ভোটে তৃণমূল ও বিজেপিকে একাসনে বসিয়ে লড়াই না করলে দলেই হয়তো বিদ্রোহ হয়ে যেত।

আরও পড়ুন: Bengal Polls 2021: ভয়ংকর খেলা! আরও মজবুত কেষ্টর গড়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.