আজ বিশ্ব সংগীত দিবসে বাংলা সংগীতজগতের চার কিংবদন্তিকে শ্রদ্ধাঞ্জলি

    আরও পড়ুন

    শুভদীপ রায় চৌধুরী

    বাঙালি বরাবরই সংগীতপ্রেমী। যে কোনো মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে তারা বেছে নেয় গানকে। স্বর্ণযুগের সেই সমস্ত বিখ্যাত গান আজ বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে রয়েছে। বাংলা সংগীতজগতে ছিলেন এমন বহু গুণী মানুষ যাঁদের অবদান বাঙালি কোনো দিন ভুলবে না। আজ ২১ জুন বিশ্ব সংগীত দিবসে তেমনই চার কিংবদন্তির সংগীতজীবনের কিছু টুকরো অংশ তুলে ধরল খবরঅনলাইন

    Loading videos...

    প্রণব রায়

    বাংলা আধুনিক গান শুনতে কে না ভালোবাসে। বাসে-ট্রামে যেতে যেতে গুনগুন করে গানের দু’কলি অনেকেই গেয়ে থাকে। গীতিকার প্রণব রায়কে বলা হয় বাংলা আধুনিক গানের জনক।

    - Advertisement -

    ১৯১১ সালের ৫ ডিসেম্বর বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কট্টর ব্রাহ্মণ জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি অন্য ভাবধারার মানুষ হয়ে ওঠেন। তার অন্যতম কারণ তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম। প্রথম জীবনে ব্রাহ্ম বয়েজ স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হলেন সিটি কলেজে। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি লিখে ফেলেছিলেন ‘বিশ্বদূত’ পত্রিকায় ‘কমরেড’ নামে এক কবিতা, যার জন্য বহু দিন কারাবাসে থাকতেও হয় তাঁকে।

    পরিবার সূত্রে জানা যায় যে, তিনি খুবই কম কথার মানুষ ছিলেন। সারাক্ষণ নিজের কাজ নিয়ে থাকতেন। তবে তিনি গীতিকার হলেও স্বাধীনতার সময় ‘রোমাঞ্চ’ ও ‘নাগরিক’ নামে দু’টি পত্রিকা সম্পাদনাও করেন।

    প্রণব রায়।

    ছেলেবেলা থেকেই বাংলা সাহিত্যের বিশেষ আকর্ষণ ছিল তাঁর। তবে তিনি চলে এলেন গান রচনার কাজে। বলা বাহুল্য, এই কাজে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন নজরুল ইসলামের। তাঁর বহু গানের সুর দিয়েছিলেন নজরুল। কাজী সাহেব বলেছিলেন, “এই সময়ে আমরা এক তরুণ গীতিকারকে পেয়েছি যিনি নতুন তারকার বিস্ময় নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। প্রণব রায় হলেন সেই গীতিকার। তাঁর লেখা গান বহু তাবড় তাবড় গীতিকারের পাশাপাশি স্থান করে নিতে পারে। তাঁর গানের প্রতিটি শব্দ সদ্য তোলা ফুলের মতো। গন্ধ, বর্ণ, স্বাদে ভরপুর।”

    গানের সংখ্যা হিসাবে করলে দেখা যাবে প্রণব রায় ৩৫০০ গান লিখেছিলেন। তিনি শুধু গীতিকারই ছিলেন না, তিনি বহু বাংলা ছবির চিত্রনাট্যও তৈরি করেন। এমনকি তাঁর লেখা কাহিনি থেকে তৈরি হয়েছে বহু সিনেমা। ১৯৪৬ সালে তাঁর লেখা চিত্রনাট্য থেকে তৈরি হয় ‘সাত নম্বর বাড়ি’। এর পর ‘পথের দাবী’, ‘পরিণীতা’, ‘কে তুমি’ ইত্যাদি একের পর এক কালজয়ী ছবির চিত্রনাট্যকার ছিলেন প্রণব রায়।

    প্রণব রায়ের গানের ঝুলিতে রয়েছে – ‘আমি ভোরের যুথিকা’, ‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা’(১৯৪২), ‘এখনি উঠিবে চাঁদ’, ‘নাইবা ঘুমালে প্রিয়’, ‘মধুমালতী ডাকে আয়’, ‘আমি বনফুল গো’, ‘এমনি বরষা ছিল সেদিন’, ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, ‘শোন গো সোনার মেয়ে’, ‘তুমি এসেছিলে জীবনে আমার’, ‘কতদিন দেখিনি তোমায়’, ‘সাঁঝের তারকা আমি’, ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’, ‘মনের দুয়ার খুলে কে’ ইত্যাদি।

    অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, “আমি প্রণব রায়ের গানের খুব অনুরাগী। আমি প্রায় প্রতি দিন তাঁর গান ‘যদি ভুলে যাও মোরে’ গুনগুন করে গাই। কবে থেকে যে এই অভ্যাস হয়ে গেছে, মনে পড়ে না।”

    মান্না দে

    রাহুল দেববর্মণের সঙ্গে মান্না দে।

    সংগীতজগতের কিংবদন্তিদের তালিকায় যাঁদের নাম প্রথমেই মনে আসে তাঁদের অন্যতম মান্না দে। তিনি ক্লাসিকাল মিউজিকে দিক্‌পাল শিল্পী হলেও বিভিন্ন ঘরানার সংগীত অনায়াসে গাইতেন। ১৯১৯ সালের ১ মে উত্তর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে স্কটিশচার্চ কলেজিয়েট স্কুল ও পরবর্তী কালে স্কটিশচার্চ কলেজের ছাত্র ছিলেন। সংগীতশিক্ষা শুরু হয় কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে’র কাছে এবং তার পর পৌঁছে যান ওস্তাদ দাবির খাঁ, ওস্তাদ আমান আলি খাঁ এবং ওস্তাদ আব্দুল রহমান খানের কাছে। বাংলা ছাড়াও হিন্দি, মারাঠি, গুজরাতি, অসমিয়া-সহ একাধিক ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।

    তিনি শুধুমাত্র শিল্পীই ছিলেন না, ছিলেন সুরকারও। শিষ্যা হৈমন্তী শুক্লার ‘আমার বলার কিছু ছিল না’ গানটি সুর দিয়েছিলেন তিনিই। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শিল্পী বলেছিলেন, গান গাওয়ায় তাঁর একমাত্র অনুপ্রেরণা তাঁর স্ত্রী সুলোচনা কুমারন। সংগীতজগতে তাঁর খ্যাতির অন্যতম কারণ হল গানে শব্দের উচ্চারণকে একটা ভিন্ন উচ্চতায় তুলে নিয়ে যাওয়ান। ‘সোলো’ গায়ক হিসাবে তাঁর প্রথম গান করার সুযোগ আসে ‘রাম রাজ্য’ ছবিতে। ‘গয়ি তু তো গয়ি সীতা সতী’ গানটি রেকর্ড করেন মান্না দে। ১৯৪৩ সালে মুক্তি পায় এই ছবি। জানা যায় স্বয়ং গান্ধীজি এই ছবিটি দেখেছিলেন।

    স্ত্রী সুলোচনার সঙ্গে।

    যে সব জনপ্রিয় বাংলা গান তাঁর ঝুলিতে রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা’, ‘বাজে গো বীণা’, ‘আমি যে জলসাঘরে’, ‘এই কূলে আমি’, ‘যদি কাগজে লেখ নাম’ ইত্যাদি। এমন বহুমুখী প্রতিভার শিল্পী ভারতবর্ষে খুব কমই এসেছেন। কমেডি ফিল্মের জন্য অনায়াসে গেয়ে ফেললেন, দিল কা হাল শুনে দিলওয়ালা’। আবার ‘আনন্দ’-এর মতো বিষাদের ছবিতে রাজেশ খন্নার গলায় গাইলেন জিন্দেগী ক্যায়সি হ্যায় পহেলি’।

    মান্না দে প্রসঙ্গে লতা মঙ্গেশকরের উপলব্ধি, “এত ডুয়েট গাইলাম এত জনের সঙ্গে। কিন্তু ‘প্যার হুয়া ইকরার হুয়া’-র মতো গান কোথায়?” একই অভিজ্ঞতা আশা ভোঁসলেরও। মান্নাদার সঙ্গে প্রচুর ডুয়েট গান গেয়েছেন – ‘বুটপালিশ’, ‘শ্রী৪২০’, ‘বরসাত কি এক রাত’, ‘আমানত’, ‘মিস ইন্ডিয়া’, ‘মাদার ইন্ডিয়া’, ‘নবরঙ’, ‘ছোটি বহিন’, ‘লালপাথর’….দীর্ঘ তালিকা। মান্নাদা-র প্রতি অসীম শ্রদ্ধাবোধ আশাজির। কী বলছেন তিনি?- ‘‘যখনই হিন্দি ছবির প্রযোজক-পরিচালকরা বিপদে পড়েছেন, তখনই শরণাপন্ন হয়েছেন মান্নাদার। আর উনি ঈশ্বরের মতো তাঁদের সাহায্য করে গেছেন।”

    হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

    ‘সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা’ – সত্যিই তিনি সুরের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। উত্তমকুমারের লিপে যাঁর গান আমাদের মনকে ছুঁয়ে যায় তিনি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ১৯২০ সালের ১৬ জুন বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন। বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করলেও চলে আসেন তাঁদের আদিবাড়ি দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বহড়ুতে। ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটউশনে পড়াশোনার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যান। কিন্তু সেই পড়াশোনা শেষ করে উঠতে পারেননি সংগীতের জন্য। প্রথাগত ভাবে সংগীতের শিক্ষা কোনো দিনই নেননি তিনি। কিন্তু আপামর বাঙালি আজও তাঁকে স্মরণ করে তাঁর স্বর্ণকণ্ঠের জন্য। একাধারে ছিলেন শিল্পী, সুরকার এবং প্রযোজক। যিনি অনায়াসে বলে দিতে পারতেন, “আমার গান আমি নিজেই শুনি না”। আবার কেউ গানের প্রশংসা করলে বলে বসতেন “ও আচ্ছা তাই নাকি?”

    এ ভাবেই মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করতেন হেমন্ত।

    ভারতীয় সংগীতকে দিয়ে গেছেন ঝুড়ি ঝুড়ি রত্নের সম্ভার। সরাসরি প্রশংসা না করলেও একজন বরাবরই হেমন্তর প্রশংসার তালিকায় থেকেছেন। তিনি তাঁর ‘মান্নাবাবু’। একটাই কথা বলতেন, “মান্না তো ভীষণ ভালো গান করে। ওর তুলনা হয় না”। 

    হেমন্তর ‘এই মেঘলা দিনে একলা’, ‘পথ হারাবো বলেই এবার’, ‘কোন এক গাঁয়ের বধূ’, ‘এই রাত তোমার আমার’, ‘তারে বলে দিও’, ‘চঞ্চল মন আনমনা হয়’, ‘দুরন্ত ঘূর্ণির এই লেগেছে পাক’ ইত্যাদি গানের সুরে আজও বাঙালি অবসর পেলেই মেতে যায়।

    জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়

    বিষাদগ্রস্ত হলেই বাঙালির মনে আজও বেজে ওঠে, ‘এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার’। এক বিস্ময়কর রচনা শিল্পী জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের। ১৯৩৪ সালের ১৩ ডিসেম্বের হুগলির চুঁচুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। গান গাওয়ায় সব থেকে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন জটিলবাবুর মা অন্নপূর্ণা মুখোপাধ্যায়। ১৯৫৩ সালে গান শিখতে আসেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। তার পর একে একে চিন্ময় লাহিড়ি, সুধীন দাশগুপ্তের শিষ্য হয়ে ওঠেন।

    তখন সুরকার জটিলেশ্বর। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

    জটিলেশ্বরের প্রথম রেকর্ড বের হয় মেগাফোন কোম্পানি থেকে ১৯৬৩ সালে। অ্যলবামটির সব ক’টি গানই সুধীন দাশগুপ্তের সুরে। জীবনের স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছিল ‘এ কোন সকাল’ রচনার প্রেক্ষাপট। সেই সময় তিনি চাকরি করতেন। একদিন সন্ধ্যায় তিনি চারু অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে ফিরছেন আর শুনছেন কোথাও একটা অসাধারণ ভাটিয়ার রাগে সেতার বাজজে। সেই সুর শুনে বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতেই গানের কথা তৈরি হয়ে গেল আর সেই গান ১৯৭৪ সালে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হল।

    এতেই প্রমাণ শুধু সংগীতশিল্পীই ছিলেন না জটিলেশ্বর, তিনি ছিলেন দক্ষ গীতিকার ও সুরকারও। যেমন অসাধারণ দক্ষতায় গান লিখতেন, তেমনই অনায়াসেই সেই কথায় বসিয়ে দিতেন সুর।

    আরও পড়ুন: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ১০২তম জন্মদিবস পালিত হল শিল্পীর পৈতৃক ভিটে বহড়ুতে

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

    - Advertisement -

    আপডেট খবর