স্বামী বিবেকানন্দের ১৬০তম জন্মদিনে স্মরণ করি শিকাগোর সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতা

0
Swami Vivekananda at Chicago
শিকাগো ধর্ম-সংসদে স্বামী বিবেকানন্দ।

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

শিকাগোর আর্ট ইনস্টিটিউটে বসেছে ‘দ্য পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস’। ভারত থেকে এক তরুণ সন্ন্যাসী এসেছেন, হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি হয়ে। তাঁর বক্তৃতা করার পালা এল প্রায় বিকেলের দিকে। কিছুটা যেন নার্ভাস। জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীকে প্রণাম করে শরীরে-মনে যেন একটা নতুন উদ্যম পেলেন। মনে হল তাঁর শরীরে কে যেন ভর করেছেন। বক্তৃতা শুরু করলেন ‘সিস্টারস অ্যান্ড ব্রাদার্স অব আমেরিকা’ সম্বোধন করে। সাত হাজার দর্শক-শ্রোতা দাঁড়িয়ে উঠে করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানালেন সেই তরুণ সন্ন্যাসীকে। দু’ মিনিট ধরে চলল হাততালি। ফলে সেই সন্ন্যাসীর জন্য বরাদ্দ সময় বাড়াতে বাধ্য হলেন উদ্যোক্তারা। আমেরিকা-সহ বিদেশ-জয় শুরু হল স্বামী বিবেকানন্দের।

সেই দিনটা ছিল ১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩। শুধু সে দিনই নয়, এর পর ‘দ্য পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিয়নস’-এ স্বামীজি বক্তৃতা করেছিলেন ১৫, ১৯, ২০, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বরেও। ধর্ম, সংস্কৃতি, সভ্যতা নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন তিনি। কিন্তু সব চেয়ে বড়ো কথা হল, সেই ধর্ম-সংসদে তিনি এমন কিছু বলেছিলেন, যা আজ একুশ শতকের একুশটা বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সমান প্রাসঙ্গিক।

কী বলেছিলেন তিনি, এক বার খুব সংক্ষেপে মনে করা যেতে পারে।       

“… আমরা শুধু সব ধর্মের প্রতি সহনশীল – তা-ই নয়। আমাদের কাছে সমস্ত ধর্মই সমান সত্যি। পৃথিবীর সমস্ত ধর্মের, সমস্ত জাতির তাড়া খাওয়া মানুষ, শরণাগত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে যে জাতি, আমি সেই জাতির একজন বলে গৌরববোধ করি। রোমানরা যে বছর ভয়ংকর অত্যাচারে ইজরায়েলের মানুষদের পবিত্র মন্দির ধ্বংস করেন, সে বছরই ইজরায়েলীয়দের মধ্যে অনেকে দক্ষিণ ভারতে এসে আশ্রয় নেন। এ কথা আমার বলতে গর্ববোধ হয় যে, সেই সব খাঁটি ইজরায়েলবাসীর বংশধরদের আমরা বুকে করে রেখে দিয়েছি। লক্ষ লক্ষ মানুষ যে স্তোত্র আজও পাঠ করেন, আমিও যা ছোটোবেলা থেকে উচ্চারণ করে আসছি, তার কয়েকটা লাইন বলছি: ‘নানা নদীর উৎস নানা জায়গায়, কিন্তু যেমন তারা সবাই একই সমুদ্রে তাদের জল ফেলে মিশে যায়, তেমনই, হে ঈশ্বর, মানুষ আলাদা আলাদা সংস্কারের বশে, জটিল বা সরল যে পথেই থাক না কেন, সকলের গন্তব্য এক তুমিই’।”

“… গীতাতেও আছে সেই আশ্চর্য তত্ত্ব। ‘যে যে-ভাব নিয়েই আমার কাছে আসুক না কেন, আমার কাছে পৌঁছয়। মানুষ নানান পথের পথিক হতে পারে, কিন্তু সব পথই শেষে আমাতে এসে মেশে।’ সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি আর তার ভয়ংকর পরিণাম ধর্মোন্মত্ততা, এই সুন্দর পৃথিবীকে ছেয়ে ফেলেছে। পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করেছে, মানুষের রক্তে ভিজিয়ে দিয়েছে, সভ্যতাকে ধ্বংস করে সমস্ত বিশ্বকে হতাশায় ডুবিয়ে দিয়েছে। এই ভয়ংকর দানবগুলো না থাকলে মানুষের সমাজ এখন যতটা না এগিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে যেত।”

“… সংকীর্ণ ভাবনাই আমাদের মধ্যে এত ঝগড়াঝাঁটির কারণ। আমি একজন হিন্দু – আমি আমার ছোট্ট কুয়োর মধ্যে বসে আছি আর সেটাকেই গোটা পৃথিবী ভাবছি। খ্রিস্টান ধর্মে যিনি বিশ্বাসী, তিনি তাঁর নিজের ছোট্ট কুয়োয় আর সেটাকেই গোটা দুনিয়া মনে করছেন। মুসলমানও নিজের ছোট্ট কুয়োয় বসে আছেন আর সেটাকেই গোটা জগৎ মনে করছেন।”

“… যতই মিলমিশের কথা বলো, তার মধ্যে কিছু লোক এমন কথা বলবেই যাতে সেই মিলনের সুরটা কেটে যাবে। আমি সেই কথাগুলোকেও বিশেষ ধন্যবাদ দিই, কারণ তারা জোরালো বিরোধ দেখিয়েছে বলেই তো আমাদের এই সামগ্রিক মিলন গানের সুর আরও বলিষ্ঠ ও দৃঢ় হয়ে উঠছে।”

“…বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সাধারণ ঐক্যের ভিত্তি ঠিক কোন্‌ জায়গাটায়, তা নিয়ে অনেক বলা-কওয়া হয়ে গেছে। এই কথাটা বলা জরুরি মনে করি; কেউ যদি মনে করে একটা নির্দিষ্ট ধর্ম জিতে যাবে, আর বাকি সব ধর্ম খতম হয়ে যাবে, আর সেই ভাবে ঐক্য আসবে, তবে তাকে একটাই কথা বলার – এই আশা বাস্তবে মোটেও ফলবে না। প্রত্যেককে অন্যের ধর্মের সারটুকু নিতে হবে, অন্য ধর্মের প্রতি মর্যাদা দিতে হবে। আবার নিজের ধর্মের নিজস্বতাকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। পবিত্রতা, ঔদার্য — এগুলো কোনও বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়। সব ধর্মসম্প্রদায়ই যুগেযুগে খুব উঁচু চরিত্রের মানুষের জন্ম দিয়েছে।”

“…চোখের সামনে এত সব তথ্যপ্রমাণ সত্ত্বেও, কেউ যদি স্বপ্ন দেখে, তার নিজের ধর্মটি, একলা বিরাট হয়ে বেঁচে থাকবে, আর অন্যগুলি নিপাত যাবে, সেটা ভুল। তাকে জানতে হবে, যতই বাধা আসুক না কেন, সব ধর্মের পতাকায় খুব শীঘ্রই লেখা থাকবে, ‘বিবাদ নয়, সহায়তা। বিনাশ নয়, আত্মস্থ করা। মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি’।”

শিকাগো ধর্মসভা সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দের ঐতিহাসিক বক্তৃতার নির্বাচিত অংশকে আজ ফিরে দেখা খুবই জরুরি – আমাদের দেশ, আমাদের মহাদেশ এবং আমাদের বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে। স্বামীজির এই জন্মদিনে আমাদের বিনম্র নিবেদন –

কেন আজ আমার এ দেশে/আমার এই পৃথিবীতে/নিয়ত ষড়যন্ত্র করে/অমানবিক হিংস্রতা?/কেন আমার দেশের/আর আমার পৃথিবীর/আজকের নাম হল/মৃত্যুর উপত্যকা?/যদিও, ‘শৃন্বন্ত বিশ্বে’/সবাই ‘অমৃতস্য পুত্রার’ –/তবুও কেন খুন হয় মানুষ/অন্য এক মানুষের হাতে।/যদিও পৃথ্বীর নীল আকাশে/ধ্বনিত ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ –/তবুও মানুষ নিপীড়িত হয়/এক অন্য মানুষের ছলনাতে।/ওগো পৃথিবীর অধিদেবতা,/আমার স্বদেশের গণদেবতা –/বাঁচাও আমার দেশ-পৃথিবীকে/ফিরিয়ে দাও তার শাশ্বত পরিচয় –/সেই অনির্বাপিত শান্তির যজ্ঞে/দধীচির অস্থির মতো/দিতে পারি আমার সব কিছু —/যদি প্রয়োজন হয়।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন