Connect with us

প্রবন্ধ

রবীন্দ্র-টান যে উপেক্ষা করতে পারেন না মংপুর শিশির রাহুতও

শ্রয়ণ সেন

‘তোমার খোলা হাওয়া, লাগিয়ে পালে…’, গুনগুন করতে করতে এগিয়ে এলেন শিশির রাহুত। এখানকার কেয়ারটেকার, তথা গাইড, তথা সব কিছু। তাঁর কথা বলার, গান গাওয়ার একটা নিজস্ব ভঙ্গিমা রয়েছে। মাথা কাত করে গান গেয়ে যাচ্ছেন শিশিরবাবু।

একটু আগেই একগুচ্ছ পর্যটককে বাড়িটি দেখিয়েছেন তিনি। এখন আবার বন্ধ করে গাছের ছায়ায় বসে সুখটানে মগ্ন। আমরা যেতেই ফের উঠে পড়লেন। চাবি নিয়ে এগিয়ে এলেন দরজা খুলে দিতে। ভেতরে ঢুকলাম। 

এই বাড়ির একবার দর্শন পাওয়া ভারতের সব রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষের কাছে স্বপ্নের। এই ভবনের উলটো দিকেই কুইনাইন কারখানার প্রধান গেট। দার্জিলিং জেলার এই মংপুতে প্রচুর সিঙ্কোনার চাষ হয়। এই সিঙ্কোনা দিয়েই তৈরি হয় কুইনাইন।

ভবনের সামনেই পাহাড়চুড়ো।

এই কারখানার প্রধান কুইনোলজিস্ট বা মুখ্য অধিকর্তার বাসভবন ছিল আজকের রবীন্দ্রভবন। সাহেবি স্টাইলে গড়া। প্রধান কুইনোলজিস্ট ছিলেন রবীন্দ্রভক্ত লেখিকা মৈত্রেয়ী দেবীর স্বামী মনমোহন সেন।

কবিগুরু যখন কালিম্পং আসেন, তখনই মংপুতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের কন্যা মৈত্রেয়ী দেবী। তাঁর ডাকেই কবিগুরু প্রথম মংপুতে আসেন, ১৯৩৮ সালের ২১ মে। হিমালয়ের কোলে মংপুর শোভা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন কবিগুরু। তাই তিনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ডাকে বারবার ছুটে গিয়েছিলেন মংপুতে। 

১৯৩৮-এর পর ১৯৩৯ সালে মংপুতে দু’ বার গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর শেষ বা চতুর্থ বার আসেন ১৯৪০ সালে। প্রতি বারই তিনি এখানে এক-দু’ মাস করে থেকেছেন। এই বাড়িতেই। ১৯৪০ সালে কবিগুরু তাঁর জন্মদিনও এই ভবনেই পালন করেন।

মংপুর বাংলোয় থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্তত ১২টি কবিতা লিখেছিলেন বলে জানা যায়। দার্জিলিং পাহাড়ের এই ছোট্ট গ্রাম কবির সঙ্গে কী ভাবে জড়িয়ে ছিল, সে সম্পর্কে নানান তথ্য মেলে মৈত্রেয়ী দেবীর লেখা ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইয়েও। কবির মৃত্যুর তিন বছর পর সিঙ্কোনা বাগানের ভিতরে থাকা এই বাংলোয় ‘রবীন্দ্র সংগ্রহশালা’ তৈরি হয়েছিল। বাংলোর নাম হয় রবীন্দ্রভবন।

দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। ২০১৭ সালে ভবনটিকে হেরিটেজ তকমা দেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এর পর সংস্কারের জন্য প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়। শুরু হয় সংস্কারের কাজ। পুরো ভবনটি নতুন করে রং করার পাশাপাশি ভিতরের মেঝের কাঠের পাটাতন নতুন করে তৈরি করা হয়। ২০১৮ সালের ২৫ বৈশাখ নতুন রূপে রবীন্দ্রভবনের দরজা পর্যটকদের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয়।

রবীন্দ্রভবনের সামনে সুন্দর একটি বাগান। সেখানে কবিগুরুর একটি আবক্ষমূর্তি আছে। মূর্তিটি ফাইবার গ্লাস দিয়ে তৈরি।

ফাইবার গ্লাসের তৈরি সেই আবক্ষ মূর্তি।

বাড়ির ভেতরে রয়েছে কবিগুরুর কিছু দুষ্প্রাপ্য জিনিস এবং ব্যবহৃত সামগ্রী। ব্যবহৃত চেয়ার, খাট, বিছানাপত্র, পড়ার ঘর ইত্যাদি। কবিগুরু ছবি আঁকতে যে সব রং ব্যবহার করতেন, সে সব রঙের বাক্সও রয়েছে। আছে একটি দেওয়াল আলমারি। এই আলমারিতে কবিগুরু ওষুধ রাখতেন।

উল্লেখ্য, চার বার মংপুতে এলেও পঞ্চম বারও মংপুতে আসার জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন কবিগুরু। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ায় কালিম্পং থেকেই কলকাতা ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। সে সময় তিনি অবশ্য তাঁর ওষুধসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আগেভাগে পাঠিয়েছিলেন এই রবীন্দ্রভবনে। আজও এই ভবনে কবিগুরুর পাঠানো সে সব ওষুধ সংরক্ষিত রয়েছে।

এখন তো রবীন্দ্রভবন পর্যন্ত গাড়ি চলে যায়। কিন্তু আগে তো সেই সুবিধা ছিল না। তখন মংপু আসার জন্য ভরসা করতে হত ঘোড়ার গাড়ি বা পালকি বা নিজের পায়ের ওপরেই। শিলিগুড়ি থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে রাম্বিবাজার পর্যন্ত গাড়িতে আসা যেত। সেখান থেকে পালকিতে মংপুতে পাড়ি দিতেন কবিগুরু।

কবিগুরুকে পালকিতে করে নিয়ে আসেন ভীমলাল রাহুত। শিশির রাহুত তাঁরই সুযোগ্য নাতি। দাদুর সুবাদে, শিশিরবাবুর বাবাও কবিগুরুকে দেখেছেন। শিশিরবাবুর রক্তে কী ভাবে রবীন্দ্রনাথ মিশে গিয়েছেন, সেটা খুব ভালো করেই বোঝা যায়।

রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের এই দুষ্প্রাপ্য ছবিটি রয়েছে রবীন্দ্রভবনে।

কত আর আয় হয় তাঁর! সকাল সকাল এসে রবীন্দ্রভবন পরিষ্কার করেন। কোনো পর্যটক না থাকলে, দরজা বন্ধ করে গাছতলায় কিছুক্ষণের জন্য বসেন, আবার কেউ চলে এলে খুলে দেন। এই নিয়ে চলছে তাঁর জীবনসংগ্রাম।

রবীন্দ্রনাথের টান যে অমোঘ টান। রবীন্দ্রপ্রেমীদের পাশাপাশি শিশির রাহুতও যে সেই টান উপেক্ষা করতে পারেন না।

ছবি: লেখক

প্রবন্ধ

একুশের পাশাপাশি আমাদের একটা উনিশেও আছে

শম্ভু সেন

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রাণ দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, সফিক, জব্বার, বরকতরা। তাঁদের সেই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। সেই আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার মর্যাদা তো আদায় করে নিয়েই ছিল, উপরন্তু সেই আন্দোলন আরও এক বৃহত্তর আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। যার পরিণতিতে ১৯৭১-এ জন্ম হল বাংলাদেশের। কালক্রমে ২১ ফেব্রুয়ারি পেল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সম্মান।

কিন্তু ১৯ মে দিনটাকে আমরা ভুলতে বসেছি। এই দিনের ইতিহাস আমাদের এমনিতেই স্মরণে থাকে না, তার ওপর আবার এখন চলছে বিশ্বব্যাপী করোনা-ত্রাস। যা-ই হোক, করোনা রুখতে ঘরবন্দি আমরা আপাতত ফিরে যাই সে দিনটায়।  

সে-ও ছিল এক রক্তঝরা দিন। ঠিক ৫৯ বছর আগে ১৯৬১ সালের এই দিনেই বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন এগারো জন ভাষা সৈনিক – দশ জন তরুণ, এক জন তরুণী।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা আর বরাক উপত্যকা নিয়ে আজকের অসম। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা অসমিয়া হলেও করিমগঞ্জ, কাছাড়, শিলচর, হাইলাকান্দি নিয়ে গড়া বরাক উপত্যকা হল বাঙালিদের এলাকা। দেশবিভাগের এক বছর পর রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সুরমা ভ্যালি (বর্তমান বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ) পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু বৃহত্তর সিলেটের তিন-চতুর্থাংশ নিয়ে গঠিত বরাক ভ্যালি থেকে যায় অসমে। ১৯৬০ সালের ২১ ও ২২ এপ্রিল অসম প্রদেশ কংগ্রেস অসমিয়াকে রাজ্য ভাষা করা নিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করে। মাস দুয়েক পরে মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা বিধানসভায় ঘোষণা করেন অসমিয়াকে রাজ্যভাষা করা নিয়ে সরকার শীঘ্রই একটি বিল আনছেন।

২ জুলাই শিলচরে ‘নিখিল আসাম বাংলা ও অন্যান্য অনসমিয়া ভাষা সম্মেলন’ ডাকা হয়। ভাষার প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করার জন্য কেন্দ্রকে অনুরোধ করা হল। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শুরু হল ‘বঙ্গাল খেদাও’। বাংলাভাষীরা দলে দলে অসম ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে শুরু করলেন। ১৯৬০ সালের ১৫ আগস্ট। কলকাতা পালন করল শোক দিবস। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা উত্তেজনায় ফেটে পড়ল। প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু গোবিন্দবল্লভ পন্থকে শান্তিদূত করে পাঠালেন অসমে। পন্থজি ফর্মুলা দিলেন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা তা সরাসরি নাকচ করে দিল। কাছাড়বাসীরা ছুটলেন দিল্লি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার নির্বিকার। ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর রাজ্যভাষা বিল পাশ হয়ে গেল অসম বিধানসভায়। নতুন আইনে সমগ্র অসমে সরকারি ভাষা হল অসমিয়া। শুধুমাত্র কাছাড়ে জেলাস্তরে রইল বাংলা ভাষা।

বরাক উপত্যকা প্রতিবাদে সরব উঠল। ভাষার প্রশ্নে এক মন এক প্রাণ হয়ে শপথ নিল ‘জান দেব, তবু জবান দেব না’। মাতৃভাষার মর্যাদা যে কোনো মূল্যে রক্ষা করার শপথ নিলেন বরাকের বাঙালিরা। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি করিমগঞ্জ রমণীমোহন ইনস্টিটিউটে কাছাড় জেলা সম্মেলন আহ্বান করা হল। সম্মেলন থেকে জন্ম হল কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদের। সম্মেলনে দাবি তোলা হল, ‘বাংলাকে অসমের অন্যতম রাজ্য ভাষা হিসাবে মানতে হবে’। অসম সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ১৩ এপ্রিলের মধ্যে জবাব চাওয়া হল।

অসম সরকার নিরুত্তর। সরাসরি লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হল বরাক। ১৪ এপ্রিল শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জের মানুষজন সংকল্প দিবস পালন করলেন। ২৪ এপ্রিল থেকে বরাক উপত্যকায় শুরু হল পদযাত্রা। পদযাত্রীরা ২ মে পর্যন্ত ২০০ মাইল পরিক্রমা করে বরাকের গ্রামে গ্রামে বাংলা ভাষার দাবির সমর্থনে প্রচার চালিয়ে গেলেন। ছাত্রসমাজের ডাকে ১৮ মে করিমগঞ্জ শহরে যে শোভাযাত্রা বেরোল, তা যেন এক গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নিল। মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার দাবিতে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা যোগ দিল শোভাযাত্রায়। আর সেই শোভাযাত্রার মোকাবিলা করতে সারা জেলা ছেয়ে গেল পুলিশ আর মিলিটারিতে। জারি হল ১৪৪ ধারা। করিমগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদের নেতা রথীন্দ্রনাথ সেন, নলিনীকান্ত দাস ও বিধুভূষণ চৌধুরী এবং ছাত্রনেতা নিশীথরঞ্জন দাসকে গ্রেফতার করা হল।

ভাষা শহিদ কমলা ভট্টাচার্য

১৯ মে। ভোর চারটে থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত বরাক উপত্যকায় হরতালের ডাক দিল কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ। ডাক উঠল, ট্রেনের চাকা ঘুরবে না, বিমানের পাখা ঘুরবে না, অফিসের তালা খুলবে না। ভোর হতেই সত্যাগ্রহীরা রেললাইন অবরোধ করলেন, রানওয়ের ওপর শুয়ে পড়লেন, দল বেঁধে দাঁড়ালেন বিভিন্ন অফিসের সামনে। সত্যাগ্রহে উত্তাল হয়ে উঠল শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, পাথারকান্দি, বদরপুর সহ গোটা বরাক উপত্যকা।

বেলা দু’টো, দুপুর গড়িয়ে চলেছে। ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে শিলচর রেলস্টেশন মুখর। হঠাৎ গুলির আওয়াজ। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে এল ‘শান্তিরক্ষক’দের রাইফেল থেকে। রক্তে ভেসে গেল শিলচর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম। ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিতে দিতে গুলিতে লুটিয়ে পড়ল ১১টি তাজা প্রাণ। ১৯৬১-এর ১৯ মে জন্ম দিল আরও ১১ জন ভাষা-শহিদের – কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্রচন্দ্র পাল, কানাইলাল নিয়োগী, হিতেশ বিশ্বাস, সুকোমল পুরকায়স্থ, তরণী দেবনাথ, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সুনীল সরকার, কুমুদরঞ্জন দাস, সত্যেন্দ্র দেব এবং বীরেন্দ্র সূত্রধর।

১৬ বছরের কমলা দু’ দেশের বাংলা ভাষা আন্দোলনে একমাত্র নারী শহিদ। কমলাদের আত্মবলিদান বৃথা যায়নি। ১৯৬০ সালের অসম ভাষা আইন সংশোধন করা হয়। শহিদের রক্তভেজা বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষা সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেল।

’৫২-এর পরে ’৬১। একই ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ন’ বছরের ব্যবধানে দু’টি আন্দোলন দু’টি ভিন্ন দেশে। বিশ্বের ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা। আমরা, বাঙালিরা যেন মনে রাখি, একুশের পাশাপাশি আমাদের একটা উনিশেও আছে। ১৯ মে – কমলাদের আত্মত্যাগের দিন।

পড়তে থাকুন

প্রবন্ধ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক সংকর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে চিন

(এশিয়া টাইমস-এ প্রকাশিত পেপে এসকোবারের মূল নিবন্ধটির অনুবাদ করেছেন ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিপ্লব রঞ্জন সাহা।)  

করোনাভাইরাসের (coronavirus) দুনিয়া তছনছ করা অগণ্য ভূরাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে একটা বিষয় ইতোমধ্যেই সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত। চিন নিজের অবস্থানকে পুনঃস্থাপিত করেছে। ১৯৭৮ সালে দেং শিয়াও পিং-এর সংস্কার কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এই প্রথম বেইজিং খোলাখুলি ভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে একটা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই চলাকালীন মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে চিনা বিদেশমন্ত্রী ওয়াং পি এমনটাই বলেছেন।

করোনাভাইরাসের আক্রমণের গোড়া থেকেই চিনা নেতৃবৃন্দ জানতেন, যে এটা একটা সংকর যুদ্ধাক্রমণ (hybrid war attack) – বেজিং অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং জোরালো ভাবে তাদের এই বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করছে। এ ব্যাপারে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তারই মধ্যে রয়েছে একটা বড়ো সূত্র। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, এটা ছিল একটা যুদ্ধ। আর একে ঠেকাতে শুরু করতে হয়েছিল ‘জনযুদ্ধ’।

উপরন্তু শি এই ভাইরাসটিকে একটা পিশাচ বা শয়তান বলে বর্ণনা করেন। শি একজন কনফুসিয়াসবাদী। অন্য অনেক চিনা চিন্তাবিদের থেকে ভিন্ন পথে চলা কনফুসিয়াস অতিপ্রাকৃত শক্তি এবং মৃত্যু-পরবর্তী বিচার নিয়ে আলোচনা করতে অনাগ্রহী ছিলেন। যা-ই হোক, চিনা সাংস্কৃতিক প্রকরণে শয়তান মানে ‘সাদা শয়তান’ বা ‘ভিনদেশি শয়তান’, ম্যান্ডারিনে যাকে বলে গুয়াইলো, ক্যান্টোনিজে গোয়েইলো। এ ভাবেই সংকেতের মাধ্যমের একটি শক্তিশালী বিবৃতিই দিয়েছেন শি।

চিনা বিদেশ মন্ত্রকের এক মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান তাঁর এক টুইটে একটা সম্ভাবনার কথা স্পষ্ট বললেন – “এটা হতে পারে মার্কিন সামরিকবাহিনীই উহানে মহামারি এনেছে”। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার তরফে যখন প্রথম এই বিস্ফোরণ ঘটল, বোঝা গেল বেজিং তার গ্লাভস খুলে পরীক্ষামূলক বেলুন উড়াতে শুরু করল। ঝাও লিজিয়ান ২০১৯ সালের অক্টোবরে উহানে অনুষ্ঠিত সামরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সঙ্গে করোনার একটা প্রত্যক্ষ যোগসুত্র স্থাপন করলেন। ওই ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় মার্কিন সামরিকবাহিনীর ৩০০ সদস্য যোগদান করেছিলেন।

আরও পড়ুন: করোনা-পরিস্থিতিতে একটি প্রাথমিক প্রস্তাবনা

মার্কিন সিডিসি (সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন, CDC) ডিরেক্টর রবার্ট রেডফিল্ডের কথা সরাসরি উদ্ধৃত করেছেন ঝাও লিজিয়ান। রেডফিল্ডের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিছু মৃত্যুর কারণ যে করোনাভাইরাস তা মৃত্যুর পরে বোঝা গিয়েছিল কিনা। জবাবে তিনি বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এ ভাবে মৃত্যুর কযেকটি ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে।”

ফ্লু’য়ের সঙ্গে কোভিড ১৯-এর পার্থক্য নির্ণয়, পরীক্ষানিরীক্ষা ও শনাক্তকরণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অক্ষমতা পুরোপুরি প্রমাণিত হওয়ার সূত্রেই ঝাওয়ের বিস্ফোরক সিদ্ধান্ত – কোভিড-১৯ উহানে শনাক্ত হওয়ার আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল।

ইরান এবং ইতালির করোনাভাইরাস জিনোম-ভিন্নতার আনুপূর্বিকতা বিচার করে এই তথ্য প্রকাশ্যে এল যে, উহানে প্রকোপ ছড়ানো ভাইরাসের ধরনের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। এই সমস্ত তথ্য একত্র করে চিনা গণমাধ্যম আজ খোলাখুলি প্রশ্ন তুলছে এবং গত বছরের আগস্টে ফোর্ট ডেট্রিক-এ (Fort Detrick) সামরিক বাহিনীর জৈব-অস্ত্র ল্যাবরেটরিটা (bioweapon laboratory) বন্ধ করে দেওয়া, উহানে অনুষ্ঠিত সামরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং উহান মহামারির মধ্যে যোগসূত্র রচনা করছে। এ সব প্রশ্নের কোনো কোনোটা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও উঠেছিল, কিন্তু কোনো জবাব মেলেনি।

২০১৯-এর ১৮ অক্টোবর নিউইয়র্কে যে ইভেন্ট ২০১ (event 201) হয়েছিল তার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ইভেন্টটা ছিল এক মারণ-ভাইরাসের কারণে বিশ্বজোড়া মহামারির মহড়া। ঘটনাক্রমে সেটাই ঘটল, এল করোনাভাইরাস। এই বিশাল কাকতালীয় ঘটনাটা ঘটেছিল উহানে ভাইরাস সংক্রমণের ঠিক এক মাস আগে।

আরও পড়ুন: হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইভেন্ট ২০১-এর স্পনসর ছিল বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন (Bill & Melinda Gates Foundation), ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF), সিআইএ (CIA), ব্লুমবার্গ (Bloomberg), জন হপকিন্স ফাউন্ডেশন (John Hopkins Institute) এবং রাষ্ট্রপুঞ্জ (The United Nations)। ঠিক একই দিনে উহানে বিশ্ব সামরিক ক্রীড়া উৎসব শুরু হয়েছিল।

করোনাভাইরাসের সূত্রপাত কী ভাবে তা এখনও চূড়ান্ত ভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। এই সব বিচারবিবেচনা দূরে রেখেই ডোনাল্ড ট্রাম্প একে ‘চাইনিজ ভাইরাস’ অভিহিত করে টুইট করলেন। যা-ই হোক, জৈব-রাজনীতি (ফোকাল্ট আপনি কোথায়, আপনাকেই তো আমাদের প্রয়োজন এখন) এবং জৈব-সন্ত্রাস সম্পর্কে সাংঘাতিক গুরুতর সব প্রশ্ন সামনে আনছে কোভিড-১৯।

করোনাভাইরাস খুবই শক্তিশালী জৈব-অস্ত্র বটে, তবে বিশ্বব্যাপী ধ্বংস সাধন করার মতো মারণাস্ত্র নয়। তবে এই ভাইরাস যে বিশ্ব জুড়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি নিখুঁত মাধ্যম তা এর কাজকারবার থেকেই অনুমিত হয়।

জৈবপ্রযুক্তির শক্তি হিসেবে কিউবার উত্থান

ঠিক যে ভাবে পুরোপুরি মাস্ক ঢাকা অবস্থায় শি-র উহান ফ্রন্টলাইন পরিদর্শন গোটা পৃথিবীকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল যে চিন কী গভীর ত্যাগের মাধ্যমে কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে ‘জনযুদ্ধে’ জয়লাভ করছে, তেমনই রিয়াধের ব্যাপারে চিনা দার্শনিক সান জু-র মতো রাশিয়ার চালে তেলের ব্যারেলের দাম অনেকটাই কমে যাওয়াটা চিনা অর্থনীতির পুনরুদ্ধার-পর্ব শুরু করতে কার্যত সাহায্য করল। এ ভাবেই একটা স্ট্রাটেজিক পার্টনারশিপ কাজ করে।

দাবার চাল বদলে যাচ্ছে মারাত্মক গতিতে। করোনাভাইরাসকে জৈব-অস্ত্র আক্রমণ হিসেবে চিন শনাক্ত করতেই রাষ্ট্রের সর্বশক্তি দিয়ে শুরু হয়ে গেল ‘জনযুদ্ধ’। একেবারে নিয়মমাফিক, ‘যা করা দরকার’ তার ভিত্তিতে। এখন আমরা একটা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছি, যেটা সামগ্রিক ভাবে পশ্চিমের সঙ্গে এবং ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রটি সুদৃঢ় ভাবে পুনর্নিণয়ে বেজিং ব্যবহার করবে।

শক্তি যদি কোমল ভাবে প্রদর্শিত হয়, তা হলে তা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ। এয়ার চায়নার উড়ানে ২,৩০০টা বড়ো বাক্সভরতি মাস্ক ইতালিতে পাঠিয়ে বেজিং লিখে দিয়েছিল “আমরা একই সমুদ্রের ঢেউ, একই গাছের পাতা, একই বাগানের ফুল”। চিন ইরানেও পাঠিয়েছিল মানবিক সাহায্যের একটা বিশাল ‍প্যাকেজ মাহান এয়ারের আটটি উড়ানে। লক্ষনীয় হল, এই বিমান সংস্থাটি ট্রাম্প প্রশাসনের অবৈধ, একতরফা নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।

আরও পড়ুন: মোদীর কাছে লকডাউনে বিরাট চ্যালেঞ্জ মন্দামুক্ত ভারতের নেতা হওয়ার!

সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিক-এর চেয়ে বেশি স্পষ্ট করে হয়তো আর কেউ বলবেন না – “একটা মাত্র দেশ আমাদের সাহায্য করতে পারে আর সেটা হল চিন। এরই মধ্যে আপনারা বুঝতে পেরেছেন যে, ইউরোপীয় সংহতি বলে কিছু নেই। সেটা ছিল কাগজে-কলমে একটা রূপকথা।”

শুরু থেকেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও আসুরিক শক্তির চাপে থেকেও কিউবা নানা সাফল্য অর্জন করে, এমনকি জীবপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও। করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় তারা অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করে চলেছে অ্যান্টিভাইরাল হেবেরন বা ইন্টারফেরন আলফা ২বি। এটা কোনো টিকা নয়, রোগ নিরাময়ের ওষুধ। চিনে  যৌথ উদ্যোগে এই ওষুধটির একটি অন্য সংস্করণ উৎপাদিত হচ্ছে যা ইনহেলার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। অন্তত ১৫টি দেশ ইতোমধ্যে এই ওষুধটি আমদানি করার আগ্রহ দেখিয়েছে।

এখন উপরে বর্ণিত সব কিছুর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ১ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাবটি তুলনা করুন। কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে ‘শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য’ পরীক্ষামূলক টিকা পেতে জার্মানির থুরিঙ্গিয়ায় বায়োটেক ফার্ম ‘কিওরভ্যাক’-এ কর্মরত জার্মান বিজ্ঞানীদের জন্য ওই অর্থ দিতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন।   

সামাজিক প্রকৌশল মনস্তাত্ত্বিক অভিযান?

‌কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমরা ঠিক কোন অবস্থায় আছি তা ইতোমধ্যে উপলব্ধি করার চেষ্টা করছেন ব্রেট নেইলসনের ‘দ্য পলিটিক্স অব অপারেশনস: এক্সকাভেটিং কনটেমপোরারি’-এর সহযোগী লেখক সান্ড্রো মেজাদ্রা।

আমাদের সামনে এখন দু’টি পক্ষ, এর মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে। এক দিকে হল সামাজিক ডারউইনবাদ দ্বারা অনুপ্রাণিত ‘জনসন-ট্রাম্প-বলসোনারো অক্ষ চালিত’ মালথুসীয় মতবাদীরা। আর দ্বিতীয়টি হল সেই পক্ষ যারা মৌলিক অস্ত্র হিসাবে জনস্বাস্থ্যের গুণগত পুনর্মূল্যায়নের দিকে নির্দেশ করছে, যে দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে  চিন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইতালি। গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এবং সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে।

মেজাদ্রা দেখিয়েছেন বিকল্প দু’টি – একটি হল ‘প্রাকৃতিক ভাবে জনসংখ্যা নির্বাচন’ যেখানে হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে আর দ্বিতীয়টি হল ‘আত্মরক্ষামূলক সমাজ’ যেখানে ‘বিভিন্ন মাত্রার কর্তৃত্ববাদ এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ’ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ যেন এডগার অ্যালান পো’র ‘দ্য মাস্ক অব দ্য রেড ডেথ’- এর একুশ শতকীয় রিমিক্স। এই সামাজিক রি-ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে কারা লাভবান হবে তা  সহজেই অনুমান করা যায়।

এত শত ধ্বংস ও বিষাদের মাঝেও বিবেচনায় নিতে হবে ইতালিকে, যারা চিত্রশিল্পী টিপোলোর স্টাইলের আলোছায়া দেখিয়েছে আমাদের। ইতালি তার অর্থনীতির চরম ভঙ্গুর দশার মধ্যেও আরও মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হয়ে গ্রহণ করেছিল উহানের বিকল্পটাকেই। গৃহবন্দি অবস্থাতে থেকেও ইতালিবাসী ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে গান গেয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে, নিগুঢ় তত্ত্বজ্ঞানসমৃদ্ধ বিদ্রোহের এক খাঁটি নজির।

আসল সেন্ট করোনার ক্ষেত্রে আদর্শ বিচার (পোয়েটিক জাস্টিস তথা ধর্ম-অধর্মের জয়-পরাজয়) হয়েছিল কিনা, সে প্রসঙ্গ এখানে নাই-বা তুললাম। সেন্ট করোনা (লাতিন ভাষায় ‘ক্রাউন’ মানে মুকুট) নবম শতাব্দী থেকে আনজু শহরে সমাধিস্থ রয়েছেন। সেন্ট করোনা ছিলেন একজন খ্রিস্টান যাঁকে ১৬৫ খ্রিস্টাব্দে মারকাস অরেলিয়াসের অধীনে হত্যা করা হয় এবং তখন থেকেই শত শত বছর ধরে মহামারির পৃষ্ঠপোষক সেন্ট হিসাবে তিনি পরিগণিত হয়ে আসছেন।

এমনকি স্বর্গের করুণায় আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো কোটি কোটি ডলার ঝরে পড়লেও কোভিড-১৯ থেকে তা নিরাময় করতে পারবে না। জি-৭-এর নেতৃবৃন্দ যে আদৌ থই পাচ্ছেন না, তা বুঝতে তাঁদের ভিডিও কনফারেন্স করতে হচ্ছে।

সংক্রামক রোগ সংক্রান্ত অন্যতম প্রধান চিনা বিশেষজ্ঞ যাঁর গবেষণামূলক বিশ্লেষণের দিকে এখন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ, সেই সাংহাই-ভিত্তিক ডাক্তার ঝ্যাঙ ওয়েনহং এখন বলছেন, কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে ‘জনযুদ্ধে’ চিন তার সব চেয়ে অন্ধকার দিনগুলো থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু তিনি মনে করেন না গ্রীষ্মের আগে এই কোভিড-১৯ যাবে। এখন ওঁর এই বক্তব্য পশ্চিমি দুনিয়ার ক্ষেত্রে কী ভাবে প্রযোজ্য তা অনুমান করুন।

আরও পড়ুন: ভয় নয়, জয় করুন করোনাকে: কী বলছেন বিশ্ব থেকে স্মলপক্স দূর করার অগ্রদূত ডা. ল্যারি ব্রিলিয়্যান্ট

আমরা ইতোমধ্যেই জানি, বাণিজ্যের দেবীকে নির্দয় ভাবে তছনছ করার দিকে কী ভাবে নিয়ে যায় একটা ভাইরাস। গোল্ডম্যান স্যাক্স বলেছে, অন্তত পক্ষে ১৫০০ কর্পোরেশনের কোনো ঝুঁকি নেই। এটা ডাহা মিথ্যা।

নিউ ইয়র্কের ব্যাংকিং সূত্র থেকে সত্যটা জানতে পারলাম – ১৯৭৯, ১৯৮৭ অথবা ২০০৮-এর চেয়ে ২০২০ সালে ঝুঁকি অনেক বেশি, কারণ এ বারের  মারাত্মক বাড়তি বিপদ হল ১.৫ কোয়াড্রিলিয়ন (১ কোয়াড্রিলিয়ন মানে ১ হাজার ট্রিলিয়ন, অর্থাৎ ১-এর পরে ১৫টা শূন্য) মার্কিন ডলারের অমৌলিক বাজার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।

নব্যউদারনীতিবাদী দৈত্যাকার পুঁজিবাদের ভবিষ্যতের উপর কোভিড-১৯-এর প্রভাব কী হতে পারে তা আমরা সবেমাত্র বুঝতে শুরু করেছি। যা নিশ্চিত তা হল বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনীতি একটা গোপন অদৃশ্য সার্কিট ব্রেকারের আঘাতে আহত। এটা হয়তো একটা ‘কাকতলীয়’ ব্যাপার অথবা যেমনটা অনেকেই জোরালো ভাবে মনে করেন, এটা সম্ভাব্য বিশাল মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের একটা অংশ, যাতে করে পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটা নিখুঁত ভূ-রাজনৈতিক সামাজিক প্রকৌশলের পরিবেশ তৈরি করা যায়।

বিশ্ব অর্থনীতির এই বিপর্যস্ত দৃশ্যপটের মধ্যে একটা অপেক্ষাকৃত জরুরি প্রশ্ন থেকেই যায়: উপনিবেশবাদী অভিজাতরা এখনও কি পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য চিনের বিরুদ্ধে এই দোআঁশলা যুদ্ধটা চালিয়ে যাবে?

সূত্র:  https://asiatimes.com/2020/03/china-locked-in-hybrid-war-with-us/

পড়তে থাকুন

প্রবন্ধ

দেবেশ রায়ের লেখার ও বাঁচার বৃত্তটা ছিল বেশ বড়ো

debesh roy

প্রসিত দাস

দেবেশ রায় ছিলেন অন্তত গোটা দশেক সংবাদপত্রের দৈনিক পাঠক। একাধিক বাংলা কাগজে তিনি নিয়মিত লিখতেন। তাই তাঁর কোনো গল্প-উপন্যাস কোনো দিন হাতে নিয়েও দেখেননি, বাংলা খবরের কাগজের এমন পাঠকরাও তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ঘটনাচক্রের বিচিত্র পরিহাসে বৃহস্পতিবার একটু বেশি রাতে তাঁর মৃত্যুসংবাদ আসায় পরদিন সকালের বাংলা কাগজগুলোতে তাঁর খবর যথেষ্ট জায়গা পায়নি।

দেবেশ রায়ের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। নিশ্চয়ই এই ধরনের বাক্য আগামী দিনের কাগজগুলোতে অনেক দেখা যাবে। বস্তুত এ জাতীয় বাক্য পড়লে আজকাল আর কারও কোনো ভাবান্তর হয় না। সোশাল মিডিয়ার দৌলতে মুড়ি, মিছরি, সকলেরই এক দর। তাই উজ্জ্বল অধ্যায়টা ঠিক কী সেটা একটু ভেঙে বলা দরকার।

পঞ্চাশের দশকে এক দিকে ‘পরিচয়’ আর অন্য দিকে ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে এক ঝাঁক তরুণ গদ্যকার উঠে আসছিলেন, দেবেশ রায় তাঁদেরই একজন। দু-চার বছরের আগুপেছুতে তাঁর সমসাময়িক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। স্বাধীনতা তখন সবে কৈশোরের পথে হাঁটি হাঁটি পা-পা। বাংলার মসনদে কংগ্রেসি সরকার। উদ্বাস্তু আন্দোলন, বাম ছাত্র-যুব আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলনের ঘটনায় বাঙালি মধ্যবিত্তের জগৎটা আজকের তুলনায় অনেক বেশি সঙ্কটাপন্ন ছিল। ও দিকে বাংলা সাহিত্যের মহারথীরা অনেকেই তীর-ধনুক নামিয়ে রেখে বিদায় নিয়েছেন। যাঁরা তখনও সক্রিয় তাঁরাও চর্বিতচর্বণ করে চলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি পাঠকরা, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম নতুন ভাষার জন্য ক্ষুধার্ত। অন্য দিকে বামপন্থী আন্দোলনের জোয়ার সাহিত্যেও টাটকা বাতাস বইয়ে দিচ্ছে। আধুনিক প্রজন্মের বাঙালি কবি ও গদ্যকাররা অনেকেই কমিউনিস্ট পার্টির সংবাদপত্র ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু এ সবের বাইরেও সক্রিয় ছিলেন একাধিক দিকে। সাম্প্রতিক সমাজ-রাজনীতির নাড়িতে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর হাত ছিল। বিতর্কের যাবতীয় ঝুঁকি নিয়েও খোলাখুলি নিজের অবস্থান জানাতে কখনও পিছপা হননি।

দেবেশ রায়ের লেখালিখি নিয়ে ভাবতে হলে এ সবই মাথায় রাখতে হবে। ব্যক্তিগত ভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ফেডারেশনের রাজনীতি ও পরবর্তী কালে উত্তরবঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত ছিলেন। সেই সূত্রে গোটা উত্তরবঙ্গকে হাতের তালুর মতো চিনতেনও বটে। এ সবই তাঁর গল্প-উপন্যাসে ছায়াপাত করেছে। কিন্তু তাঁর লেখা নিছক এই সমস্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে আটকা পড়া বিবরণ হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল তাঁর নিজস্ব স্বাক্ষর বহনকারী ‘বৃত্তান্ত’। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে প্রান্তিক জনজীবন নিয়ে সেই গত শতকের বিশের দশক থেকে অনেকেই লিখে আসছেন, দেবেশ রায় তাঁদের সকলের থেকে এখানেই আলাদা। এখানেই আলাদা ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’, ‘সময় অসময়ের বৃত্তান্ত’, ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’, কিংবা ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’। চেনা অভিজ্ঞতার বাইরের মানুষজন, ভূ-প্রকৃতি কিংবা রাজনীতি নিয়ে লেখার জন্য ভাষা বা উপন্যাসের আঙ্গিককে যে ব্যতিক্রমী হতে হবে সে বিষয়ে তিনি দীর্ঘ লেখকজীবনের প্রথম থেকেই সচেতন ছিলেন। তাই তাঁর উপন্যাসের নাম হয় ‘মানুষ খুন করে কেন’ কিংবা গল্পের নাম হয় থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস’। ‘মারী’ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদের নাম ‘এই উপন্যাসটা লেখার সময় লেখকের কিছু প্রাইভেট অসুবিধে এবং সে বিষয়ে পাঠকদের সঙ্গে আলোচনা’। এ জাতীয় শিরোনামের উদ্দেশ্য কিন্তু নিছক পাঠকদের চমকে দেওয়া নয়। লেখকের বাড়ির বিভিন্ন সদস্যের বাড়িতে ঢোকা-বেরনোর সময়ের আলোচনা থেকে শুরু হয়ে কখন যেন উপন্যাস গড়িয়ে যায় বিশ্বায়নের রাজনীতির দিকে। নমঃশূদ্র নেতা বরিশালের যোগেন মণ্ডলের জীবনকে কেন্দ্র করে সুদীর্ঘ উপন্যাসের পাশাপাশি লিখেছেন প্রায় সম্পূর্ণ প্লটহীন একাধিক উপন্যাস। কিংবা প্লটটাকেই করে তুলেছেন উপন্যাসের অতিরিক্ত। শেষের কয়েক বছরের কিছু উপন্যাসে পাওয়া যায় আরব্য রজনী ও বিভিন্ন কিস্‌সার ধাঁচা।

কিন্তু এ সবের বাইরেও সক্রিয় ছিলেন একাধিক দিকে। সাম্প্রতিক সমাজ-রাজনীতির নাড়িতে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর হাত ছিল। বিতর্কের যাবতীয় ঝুঁকি নিয়েও খোলাখুলি নিজের অবস্থান জানাতে কখনও পিছপা হননি। এ রাজ্যে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ঝোড়ো পর্যায়ে তিনি বামফ্রন্টের শিল্পনীতিকে আগাগোড়া সমর্থন করে গিয়েছেন, আবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র শক্তিবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের অনেকের আগেই সাধারণ ভাবে তৃণমূল-বিরোধী বলে পরিচিত দেবেশ রায় সমর্থন জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

এ সবের পাশাপাশি সম্পাদক হিসেবেও নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন, ১৯৭৯ সাল থেকে প্রায় এক দশক ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদক থাকাকালীন তাঁর হাতে বেশ কয়েক জন নতুন লেখক তৈরি হয়েছেন। একই ভূমিকা পালন করেছেন ‘প্রতিক্ষণ’-এর সম্পাদক হিসেবেও। আবার ‘প্রতিক্ষণ’ প্রকাশনার মাধ্যমে জীবনানন্দ দাশের গল্প-উপন্যাসকে বাঙালি পাঠক যে নতুন করে আবিষ্কার করে, তার পেছনেও দেবেশ রায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ‘পয়েন্ট কাউন্টার-পয়েন্ট’ নামে এক ইংরেজি পত্রিকারও সম্পাদক ছিলেন কিছু দিন। প্রাক-ঔপনিবেশিক ও ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ করেছেন, বাংলা ভাষায় ফিদেল কাস্ত্রোর জীবনী লিখছেন এবং লিখেছেন নন-ফিকশনধর্মী আরও বেশ কিছু বই।

শুরু করেছিলাম সংবাদপত্রে দেবেশ রায়ের লেখালিখির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে। বস্তুত উত্তর-সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখক হিসেবে তিনি যে কোনো পেশাদার লিখিয়ের কাছে ঈর্ষনীয় উদাহরণ, পলকে যে কোনো পাঠকের মনোযোগ টানতে সক্ষম। লেখার বিষয় যা-ই হোক না কেন – ভোট রাজনীতির হিসেবনিকেশ থেকে শুরু করে বাংলা বানান, কিংবা রবীন্দ্রসংগীত থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের পরিবহণ – প্রত্যেকটা লেখাকে কলমের মোচড়ে তিনি করে তুলতে পারতেন নিজস্বতায় ভরপুর, সে লেখা হয়ে উঠত সংবাদপত্র-পাঠকের সেই দিনকার পুঁজি, আবার মতামতটাও তার মধ্যে জোরালো ভাবে চারিয়ে দিতে কসুর করতেন না।

এই মুহূর্তে মনে পড়ে যাচ্ছে কী ভাবে একটা লেখায় কৈশোর বয়সে সুদূর জলপাইগুড়ি থেকে কলকাতা আসার যাত্রাপথের (সেই সময় উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গে আসাটা খুব সহজ ব্যাপার ছিল না) বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন তলস্তয়ের ‘রেজারেকশন’ উপন্যাস পড়ার অভিজ্ঞতা। এই সমস্ত নিবন্ধের কোনো নির্বাচিত সংকলন দিনের আলো দেখতে পারে কি? আশা করা যায় বঙ্গীয় প্রকাশককুল ভেবে দেখবেন।

বস্তুত দেবেশ রায়ের লেখার ও বাঁচার বৃত্তটা ছিল বড়ো, বেশ বড়ো। তাই তাঁর লেখায় নেহাত ঘরোয়া রোজনামচার পাশাপাশি অনায়াসে দেখা দিতে পারত আন্তর্জাতিক রাজনীতির হাজারো প্রসঙ্গ। তিনি সেই বিরল থেকে বিরলতর হতে থাকা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রতিনিধি যাঁরা একই সঙ্গে সাম্প্রতিকতা ও ইতিহাসে, নিজস্ব শিকড় ও দেশ-দুনিয়ার মাটিতে পা রেখে বেঁচেছেন। দিন কয়েক আগেই কলকাতা হারিয়েছে ইতিহাসবিদ হরিশঙ্কর বাসুদেবনকে। দেবেশবাবুর সঙ্গে একই দিনে বাংলাদেশে প্রয়াত হয়েছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। এঁরা সকলেই নিজেদের চর্চা ও কাজে বহুত্বের চিন্তাকে কোনো না কোনো ভাবে তুলে ধরেছেন। এই সন্ত্রস্ত ও একপেশেমির মৌলবাদে বিপর্যস্ত সময়ে দেবেশ রায়ের মৃত্যুতে এই শহরের বৈচিত্র্যের রংটা আরও দু-এক পোঁচ ফ্যাকাশে হল।

পড়তে থাকুন

নজরে