মোদী মিথ ভাঙছে, বিকল্পের আলো দেখাচ্ছে ইতিহাস

0

অরুণ রায়

মিথটা ক্রমশ ভাঙছে। ভাবমূর্তির ভাব রঙ হারাতে শুরু করেছিল আগেই, এখন শুধু মূর্তি ভাঙার অপেক্ষা। তিরিশ বছর পর ভারতের লোকসভা কোনো একটা দলকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছিল ২০১৪-য়। যদিও এই তিরিশ বছরের মধ্যে পনেরো বছর দিল্লির মসনদে ছিলেন কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীরাই, পিভি নরসিংহ রাও এবং মনমোহন সিংহ। এই সময়ে অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীর সংখ্যা পাঁচ। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ, চন্দ্রশেখর, এইচডি দেবগৌড়া, ইন্দ্রকুমার গুজরাল এবং অটলবিহারী বাজপেয়ী। এই সব প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে, ভারতবর্ষের রাজনীতি নানান ধরনের সমীকরণ আবিষ্কার করেছে। বৃহত্তম গণতন্ত্রের সৃজনশীল কুশীলবরা শামিল হয়েছে নানা রকম পরীক্ষানিরীক্ষায়। যার পরিণামে এসেছে জনমোর্চা, রাষ্ট্রীয় মোর্চা, যুক্তফ্রন্ট, এনডিএ এবং ইউপিএ। এমনকি ইদানীং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং চন্দ্রশেখর রাওয়ের কথিত ফেডেরাল ফ্রন্টও নতুন নয়, সেই সময়েরই সৃষ্টি। ‘৯৬-এর যুক্তফ্রন্টে শামিল চন্দ্রবাবু নাইড়ু, করুণানিধিরাই আঞ্চলিক দলগুলিকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিতে ফ্রন্টের ভেতর ফ্রন্ট হিসেবে ফেডেরাল ফ্রন্ট ঘোষণা করেছিলেন। বৃহত্তর বিজেপি-বিরোধী ছাতার নীচে সবাইকে রাখার স্বার্থে যুক্তফ্রন্টের দু’জন মূল রূপকার ভিপি সিংহ এবং হরকিষন সিংহ সুরজিত ছিলেন ফেডেরাল ফ্রন্টের পাশে।

এ রকম জোটের তত্ত্ব খারিজ করেই জন্ম নিয়েছিল অনেক বেশি পাকাপোক্ত ইউপিএ। কারণ ৯৮-এর পর ভারতীয় জনগণ আঞ্চলিক নেতাদের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার গড়ার উদ্যোগে শামিল না হয়ে একটি জাতীয় দলের নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যার সঙ্গে ছিল দেশের প্রতিটি আঞ্চলিক দল। মানুষের আকাঙ্ক্ষা কেন্দ্রীভূত ছিল কেন্দ্রে একটি স্থায়ী সরকারের লক্ষ্যে। তাই ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত কেন্দ্রে থাকতে পেরেছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকার। সারা ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও মিশ্র অর্থনীতির মৌলিক ভাবনাগুলির ভিত যখন নড়ে উঠেছে, সেই সময় সমস্ত ধরনের কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে উদারপন্থার লাইনই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে উঠে আসে। আজম্ম শত্রুতা বিসর্জন দিয়ে বামপন্থীরা ইতিহাস পালটে দেয় ইউপিএ সরকার গঠন করে। ৬০ জন বাম সাংসদ লোকসভায় থাকা সত্ত্বেওও সরকারে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মূল লক্ষ্য বিজেপি এবং সংঘ পরিবারকে ক্ষমতার শীর্ষস্থানে পৌঁছোতে না দেওয়া। এবং ক্ষমতার রাজনীতিতে অভ্যস্ত সাধারণ ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলিকে মন্ত্রিত্বে রেখে সরকারকে স্থিতিশীল করে তোলা। সেই লক্ষ্য সম্পূর্ণ হয় প্রথম পাঁচ বছরে এবং বিজেপির বিকল্প শক্তি হিসেবে মানুষ ইউপিএকে এতটাই গ্রহণ করে নেয় যে বামেরা সমর্থন তুলে নেওয়ার পরেও সরকারের স্থিতিশীলতা অটুট থাকে। ২০০৯-এর ভোটে বিচ্ছিন্ন বামেদের ভুল লাইন পরিত্যক্ত হয়। দেওয়াল লিখন পড়ে তৃণমূল সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করে বাংলায় জনভিত্তি বাড়ানোর সুযোগ নেয়। দ্বিতীয় ইউপিএ অনেকটাই পূর্বঘোষিত মোর্চা হিসেবে একই নেতার অধীনে ভোটে গিয়ে বাড়তি আসন পেয়ে যায়। আর মোর্চার বিরোধিতা করতে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের বাইরে বেরোনো বামেরা ক্রমশ প্রান্তিক শক্তির চেহারা নিতে থাকে। সেই থেকেই বাংলায় বাম দুর্গ পতনের সঙ্কেত স্পষ্ট হয়।

সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছায়া পড়েছে আজকের রঙ্গমঞ্চে। ফেডেরাল ফ্রন্টের প্রবক্তা চন্দ্রশেখর রাওকে প্রচ্ছন্ন ভাবে তোল্লা দিচ্ছে বিজেপি। যাতে তাদের সাজানো বাগান শুকিয়ে না যায়। লোকসভার সংখ্যার দিকে তাকান। মূল শাসকদল বিজেপির হাতে এখন ২৭৪ সাংসদ। লোকসভার ম্যাজিক সংখ্যা অর্থাৎ গরিষ্ঠতার অঙ্ক ২৭২। কোনো দল বা জোট ২৭৩ আসন পেলে কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারে। নরেন্দ্র মোদীর মিথ হয়ে ওঠার পিছনে ছিল এই সংখ্যাই। তাঁর মুখ দেখিয়েই বিজেপি পেয়েছিল ২৮২ আসন। এটাই ছিল তিরিশ বছরে কোনো একটি দলের সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা। এই সংখ্যার গরবে গরবিনি বিজেপি কংগ্রেস-মুক্ত ভারতের স্বপ্ন ফেরি করতে শুরু করে। মনে রাখতে হবে মোদী তৃণমূল-মুক্ত, বা সপা বা বসপা, বিজেডি বা ডিএমকে-মুক্ত ভারতের কথা বলেননি, বলেন না। এমনকি, মতাদর্শগত ভাবে যারা তাদের মূল শত্রু, সেই কমিউনিস্টদের কথাও বলেন না। কারণ একটাই, সর্ব ভারতীয় ক্ষেত্রে এরা কেউই বিজেপির পথের কাঁটা নয়। একমাত্র কমিউনিস্টরা বাদে আর সবাই কখনও না কখনও তাদের মোর্চায় এসেছে। এমনকি, কমিউনিস্টরাও কংগ্রেসের রামমন্দির ঘেঁষা লাইনের দরুন ’৮৯-তে রাষ্ট্রীয় মোর্চার সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করেছে বিজেপির পাশে দাঁড়িয়ে। যদিও সেখানে প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিংহ ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতার কষ্টিপাথরে সসম্মানে উত্তীর্ণ। ’৯০-এর ৭ নভেম্বর কংগ্রেসের অনাস্থায়, বিজেপির মদতে সেই সরকার পরাস্ত হলেও ভিপি বাম হাত ছেড়ে গেরুয়া হাত ধরেননি।

সর্বোপরি ’৯১-এর সন্ধিক্ষণে সংখ্যালঘু কংগ্রেস সরকারকে টিকিয়ে দেয় তাদেরই মূল শত্রু বাম ও তৎকালীন জনতা দল। তারা বিজেপির হাত ধরলে সংখ্যালঘু কংগ্রেস লোকসভার ফ্লোরে আস্থা ভোট পেত না। সমস্ত সমালোচনা স্বীকার করে বামেরা তখন আস্থা ভোট-সহ লোকসভার যাবতীয় নির্ণায়ক অর্থনৈতিক বিলে ওয়াকআউট করে সরকার বাঁচিয়েছে। জনতা দলকে অর্থনৈতিক ভাবে ভেঙে, আয়ারাম গয়ারাম নিয়ে সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যাগুরু হয়ে ওঠার কংগ্রেসি কৌশলেও কাঁটা দেয়নি ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীরা, শুধুমাত্র জাতির সন্ধিক্ষণে ধর্মীয় মেরুকরণের অশ্বমেধের ঘোড়া রুখতে। একেবারেই নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গ। ’৯৬-তে সেই বীজই যুক্তফ্রন্টের মতো মোর্চার জন্ম দিয়েছিল।

ফের তেমনই সন্ধিক্ষণে লোকসভায় অনাস্থার প্রশ্ন এসেছে। বাইরে কংগ্রেসের ছোঁয়াচ বাঁচানোর ভুল রাজনীতির ফাঁদে যাঁরা পা দিচ্ছেন, তাঁরাও কিন্তু সংসদের ফ্লোরে বৃহত্তর সমন্বয়ের পক্ষে। এটাই আশার আলো দেখাচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবাসীকে। ২৭৪-এর সংখ্যা ধরে রাখতে না পারলেও, শরিকদের নিয়ে সরকার বাঁচাতে পারবে বিজেপি। তবে তাদের মোদীময় অহংকার চূর্ণ হবে। এবং শরিকদের মতিগতি (চন্দ্রবাবু, শিবসেনা) বুঝতে না পেরে সেই ঝুঁকিও নিতে নারাজ বিজেপি। তাই অনাস্থা আনতেই দেওয়া হচ্ছে না সভায়। ইতিহাসের এই স্বাভাবিক সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়েও বাংলার মমতা রাহুলের দল নিয়ে চিন্তায়। রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কোনো জায়গা নেই এই যুদ্ধে। এখানে সেই নেতাই সবার নেতা হবেন যিনি মানুষের মন বুঝে লক্ষ্য স্থির করতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.