চার বছরেই বেহাল, নীরবতার ইমারত ভাঙছে বেফাঁস মন্তব্যে

0
1818
narendra modi

অরুণ রায়

‘ডায়লগ’ অর্থাৎ কথোপকথন কিংবা সংলাপ গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত। সম্পদও বলা চলে। কিন্তু আমাদের বৃহত্তম গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী ডায়লগ নয়, মনোলগে বিশ্বাসী। সমস্তর থেকে নয়, জনসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। নিজের ভাষণ নিয়ে ভাবেন ও উপদেষ্টাদের ভাবান। ভাষণের ছন্দ, মাত্রা, নাটকীয়তা, বাচন নিয়ে আগাম বিশ্লেষণ করেন। কিন্তু তাঁর প্রথম ও শেষ শর্ত, কোনো প্রশ্নের অবকাশ যেন না থাকে। কীসের প্রশ্ন? দেশের প্রধানমন্ত্রী দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। রাষ্ট্রের শিখরে আসীন যে রাষ্ট্রপতি, তিনিও প্রধানমন্ত্রী-নিয়ন্ত্রিত মন্ত্রিসভার নির্দেশিত পথে চলেন। সুতরাং তাঁর কথাই তো শেষ কথা! তাঁর মুখনিঃসৃত সিদ্ধান্তই গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত। পদাধিকারের তুঙ্গে বসে তিনিই কার্যত প্রথম ও শেষ কথা বলেন মুখ্য নিবার্চন কমিশনার, প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে সিভিসি, সিএজি পর্যন্ত পদগুলির এবং সিবিআই থেকে শুরু করে তাবৎ গোয়েন্দা সংস্থা, অথবা আধা সামরিক বাহিনী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলির শীর্ষপদস্থ কর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে। অতএব এমন সর্বশক্তিমানকে প্রশ্ন করা ধৃষ্টতা দেখানো যায় না, এটাই বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইদানীং।

তা ছাড়া প্রশ্ন মানেই তো বেয়াড়া প্রশ্ন। যে সব বিষয়ে হিরন্ময় নীরবতাই একমাত্র পন্থা সে সব জিনিস নিয়েও সাংবাদিকরা খুঁচিয়ে তোলেন নানা জাগতিক জিজ্ঞাসা। প্রশ্নের মধ্যে থাকে এমন প্যাঁচ যে উত্তর দিলেও বিপদ, না দিলেও। ‘কোনো মন্তব্য করব না’ বলাটাও তো একটা আক্ষরিক অবস্থান। সব কিছু স্পষ্ট হয়ে গেলে আর ধোঁয়াশা থাকে কোথায়? আর ধোঁয়াশা না থাকলে স্বচ্ছ বাতাবরণে জনগণ সবকিছু দেখে ফেলবেন, বুঝে নেবেন। আর কোনো সংশয় বা সন্দেহ বা হেঁয়ালিও থাকবে না। স্বচ্ছতার অভিযান নিয়ে বিজ্ঞাপনে, ঢক্কানিনাদে হাজারো কোটি টাকা খরচা করে লালকেল্লার প্রাকার থেকে ঘোষণার পর ঘোষণা করা হয়। কিন্তু প্রশাসনে, আচরণে, প্রত্যেক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে এবং পদে পদে প্রকল্প রূপায়ণে স্বচ্ছতা আনা চলে না। এটাই তো সরকারি গোপনীয়তার ব্রহ্মাস্ত্র। টপ সিক্রেট।

প্রশ্নহীনতার পরিসর গণতন্ত্রকে গ্রাস করছে ক্রমশ। চার বছর ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর এই চারটি বছরই গণতন্ত্রের অনতিক্রম্য নজির গড়েছে। অতীতের প্রধানমন্ত্রীদের সব রেকর্ড ভেঙে তিনি চার বছরে একটিও সাংবাদিক বৈঠক ডাকেননি। এর আগে প্রধানমন্ত্রীরা সমালোচিত হয়েছেন বছরে একটি মাত্র সাংবাদিক সম্মেলন করার জন্য। কিন্তু এখন তো চার বছরেও একটিও হয় না। অথচ এ নিয়ে তেমন শোরগোল কোথায়? জরুরি অবস্থার প্রধানমন্ত্রীও তো সাংবাদিক বৈঠক করতেন। কিন্তু জরুরি অবস্থার কালো দিনের স্মরণে বিজেপি যে দেশ জুড়ে ঢ্যাঁড়া পেটায় প্রতি বছর, তাদের প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে সরব হয় না গণমাধ্যমও। মোদী শুরুতেই বিদেশ যাত্রার প্রথম কর্মসূচি থেকে বেসরকারি ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে সফরসঙ্গী না করার যে সিদ্ধান্ত চালু করেন তার কারণ নিয়েও কোনো প্রশ্ন সে ভাবে ওঠেনি। সম্প্রতি তথ্যের অধিকার আইন অনুযায়ী কেউ প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের খুঁটিনাটি জানতে চাইলে সেই আইনকেও নিরাপত্তার ঢালে পাশ কাটিয়ে দেওয়া হয়। পিএমও-র নির্দেশ শিরোধার্য। এয়ার ইন্ডিয়া তথ্যানুসন্ধানীকে জানিয়ে দেয়, প্রধানমন্ত্রীর বিদেশযাত্রার তথ্য গোপনীয়। ও সব জানানো যাবে না। ওখানেই সব প্রশ্ন ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। ‘মন কি বাত’ আর ভোঁতা করে দিচ্ছে মানুষের নিত্য প্রশ্নাবলি। মনসবদাররা আওড়াচ্ছেন মহান নেতার মন্ত্র।

নজিরবিহীন ব্যাঙ্ক জালিয়াতির দায় নিয়ে পলাতক যে ভারতীয় নাগরিক এবং পশ্চিম ভারতের বিশেষ রাজ্যবাসী শিল্পপতি, তাঁর নামটাই প্রতীকী। তিনি নীরব মোদী। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন আরেক শাসক-ঘনিষ্ঠ রাঘববোয়াল, মেহুল চোকসি। নিকট অতীতে শিরোনামে ছিলেন ললিত মোদী। এখনও খবরের জগৎ মাতিয়ে রেখেছেন বিজয় মাল্য। যিনি এতটাই মৌজে আছেন যে ৬২-তে পরবাসে ফেরার দশাতেও আরেক বার মাল্যদানের মণ্ডপে। তাবৎ এই দাগী ও পলাতকদের নিয়ে তিনি নীরব। এর মধ্যে নির্বাচনী জনসভাও হয়েছে। ত্রিপুরার লাল দুর্গ দখলের স্বপ্নও পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু সবটাই নীরবতার শর্ত বাঁচিয়ে। গোরক্ষকদের তাণ্ডব নিয়েও দু-এক বার মুখ খুলেছেন সংঘের লাইন মেনে সাবধানী উচ্চারণে। কিন্তু ‘নীরব’ নিয়ে একেবারে নির্বিকার। কিছু করার নেই। গুজরাত থেকে গৈরিক রাজনীতির যাবতীয় গুহ্য তত্ত্ব মিশে আছে নীরব-মেহুলে। একটু অসতর্ক হলেই ইতিহাসের অতলান্ত খাদ। অনেক কষ্টে অমিত-পুত্র জয়ের কীর্তি-কাহিনি এড়ানো গিয়েছে। বিধানসভায় সি-প্লেন গোঁত্তা খাওয়ার পর ফের নীরবকাণ্ড। গুজরাতের গ্রহ ছাড়ছে না বিজেপিকে। অন্য দিকে ত্রিপুরায় লেনিন-কাণ্ডের ছায়া দীর্ঘতর হলেও গোরখপুর-ফুলপুরের হাওয়া বইছে কর্নাটকে। রাজ্যসভায় ক্ষমতা ও অর্থের আস্ফালন যেমন অসম্ভব জোটকে সম্ভব করে মায়াবতী-অখিলেশের মিল ঘটিয়েছে, তেমনই কর্নাটকে দেবগৌড়ার দল সেকুলার শিবিরের ভোট ভাঙার কল করলেও সিদ্দারামাইয়ার কংগ্রেস বিজেপিকে রুখেই দিয়েছে মেরুকরণের মসনদ দখলের কৌশলে। হারের লক্ষণ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে একের পর এক বেফাঁস মন্তব্যে। প্রথমে ইয়েদুরাপ্পাকে সব চেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত বললেন পাশে বসা অমিত শাহ। তার পর প্রহ্লাদ জোশি অমিতের ভাষণের তর্জমা করতে গিয়ে বললেন, মোদীই দেশের সর্বনাশ করবেন। তর্জমাকারী বদলানো হল। কিন্তু দেখা গেল, অমিতেরই সভায় ইয়েদুরাপ্পা নাক ডেকে ঘুমোচ্ছেন। সর্বোপরি অনন্ত হেগড়ে দলিতদের ‘কুকুর’ বলে দলে দলে দলিতকে বিদ্রোহে নামালেন। বোঝা যাচ্ছে কর্নাটকে রামবাণে বিদ্ধ হতে চলেছে বিজেপি।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

loading...

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here