ঈদের চাঁদ ও অন্য সব অনুভূতির মণিমুক্তো

0
jahir raihan
জাহির রায়হান

ঈদের চাঁদ খুব প্রিয় আমার। পশ্চিমাকাশের ওই এক ফালি শুভ্র চাঁদ দেখেই বিশ্বের তামাম মুসলিম জনসমষ্টি হয়ে ওঠে আনন্দে উদ্বেল। আর সে কথা মনে করেই আমার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে মন কেমন করা সুখানুভূতি। ছোটোতে আধা সন্ধ্যায় এক ছুটে ছাদে চলে যেতাম ভাইবোনেদের নিয়ে মেখে নিতে ওই এক ফালি আনন্দ। ওই টুকরো চাঁদের দেখা মিললেই তো বাজার থেকে আনা একই কাপড়ের, একই রঙের সব ভাইবোনের প্যাকেট মোড়া নতুন জামা পরার আবশ্যক চাঁদমারি, চাঁদটিই তো ঘোষণা করবে মিষ্টি হেসে, আজ রোজা শেষ, কাল খুশির ঈদ।

এখন চাঁদ দেখতে ছাদে গেলে কোলে জড়িয়ে থাকে মেয়ে। ছোট্টো রায়াকে আঙুল তুলে দেখাই, পাপান ওই দ্যাখ চাঁদমামা। চাঁদ দেখে চাঁদের হাসি ছড়িয়ে পড়ে আমার কন্যার নিষ্পাপ চোখে-মুখে। আমাদের ছোটোবেলায় ঈদের সময় একখানিই জামা জুটত। এখনকার ব্যাপার আলাদা। মামা-খালা-ফুপু-নানু মিলে আমার মেয়েরই এ বার জামা হয়েছে গোটা আষ্টেক, সঙ্গে বাহারি জুতো। তার খেলার সাথিরা এলে বা অন্য যে কোনো সময়ই সে প্যাকেট খুলে জামা দেখছে, দেখাচ্ছে, হাসছে, পাকা পাকা গলায় বন্ধুদের বোঝাচ্ছে কখন কোনটা পরবে। তার আনন্দ দেখে আমাদেরও খুশি লাগছে, আমরাও হাসছি, ফিরে ফিরে যাচ্ছি আমাদেরও শৈশবে। জানি, এ গল্প আসলে এ সময় সব পরিবারেরই অঙ্গ। নতুন জামাকাপড়ের আলাদা একটা সুবাস থাকে, পৃথিবী যতই আধুনিক হোক না কেন সে সুবাস আজও রয়েছে, একই ভাবে।

এ বার রোজা রেখেছি, ২৬টা। না, পূণ্য অর্জনের প্রচেষ্টা নয়। আমি যে দোজখে (নরক) যাব, সেটা চূড়ান্ত হয়ে আছে বরাবরই। এক মাস রোজা রেখে সে বাস্তবতার হেরফের ঘটাতে পারব না, জানি আমি। তবুও রেখেছি, কারণ বাড়ির মেয়েরা রোজা রাখে, প্রায় সারা দিন রান্নাঘর বন্ধ থাকে রমজান মাসে, আমার কারণে মেয়েদের অহেতুক ব্যতিব্যস্ত করতে জান চায়নি। শারীরিক কারণেও রোজা রাখা যায়। পরিপাকযন্ত্র বিশ্রাম পায় কিছু দিন। ধর্মের জন্ম সহস্র সহস্র বছর আগে, আমি মাত্র চল্লিশ, ধর্মকে অস্বীকার করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। মেয়ে বড়ো হচ্ছে, সে তার পাপাকে দেখবে রোজা রাখে না, খুব ভালো উদাহরণ হয়ত হবে না তার বেড়ে ওঠার পথে, তাই রেখেছি। এই পৃথিবীতেই বহু মানুষ দু’বেলা দু’মুঠো এখনও খেতে পায় না নিয়মিত। তাদের কষ্টটা অনুধাবন করা, রোজা প্রচলিত হওয়ার একটা পবিত্র কারণ বলে পড়েছি, তাই সেটাও ছিল মাথায়। মৌলভী সাহেব বলেছিলেন মসজিদে, এক মাস রোজা রাখলে ঈদের আনন্দ শতগুণ বৃদ্ধি পায়, আমার রোজা রাখার সেটাও একটা কারণ বই-কি।

looking at moon of eidআমার মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে, রোজা শুরু হয়েছিল সে বার। এক দিন বাংলা শিক্ষক আবিরবাবুর মা, যাঁকে স্যারের দেখাদেখি আম্মা ডাকতাম আমিও, ডেকে বললেন, জাহির শোন, এই একমাস তুই আমাদের বাড়িতে থাকবি, এখানেই খাওয়া-দাওয়া করে পরীক্ষার প্রস্তুতি চালাবি। তোর বাড়িতে দিনে তো এই এক মাস রান্না হবে না, আর আমরাও চাই না তোর কারণে তোর বাড়ির রোজা রাখা মানুষগুলোর কষ্ট দ্বিগুণ হোক, তোর স্যারেরও একই ইচ্ছে। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম আম্মার এই সিদ্ধান্তে, আদ্যপান্ত মুসলিম এক সাধারণ কিশোরের জন্য ব্রাহ্মণবাড়ির হাঁড়ি হেঁসেল খুলে গেল এ ভাবে? অবলীলায়? তবে যে কারা কত রকমের কথা বলে, মারামারি কাটাকাটির কথা শোনায়, ভয় দেখায়। তারা কি মুসলিম? তারা কি হিন্দু, না তাদের কোনো জাত নেই?

দু দু’বার স্কুলের সরস্বতী পূজার দায়িত্বে ছিলাম। অমুসলিম বন্ধুরাও বাড়ি গিয়ে সাঁটিয়ে এসেছে গোস্ত রুটি। আমিও জমাদার পরিবারের দীপকের বাড়িতে পৌষ-কালীর খিচুড়ি খেয়েছি গলা অবধি। খড় গুঁজে প্রতিমা তৈরি করিস বলাতে, সুমন্ত আমার সামনেই দুগ্গি ঠাকুরকে সাক্ষী মেনেছিল, মা, মাগো মা, ছোড়াকে ক্ষেমা দাও, ছোড়া জানে না সে কী বলছে! দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি বিজয়াদশমীর প্রণাম করতে যাওয়া, ক’টা নারকেল নাড়ু খাওয়া হল এ বছর, তার হিসেব রাখা। এ সব ছোটো ছোটো আনন্দগুলো মিশে আছে স্বপ্নিল স্মৃতিতে আমার। পচা শামুক ঝেড়ে ফেলে, ভালো মণিমুক্তের ঝিনুকগুলি কুড়িয়ে নিতে পারলেও তো জীবন চলে যায় স্বচ্ছন্দে, স্বমহিমায়।

সে দিন মসজিদে নামাজ শেষে, এক বয়স্ক ভদ্রলোক ওঠে দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়ার পর, উপস্থিত সকলকেই দিলেন ইফতারের দাওয়াত। ভাবা যায়, মসজিদে তখন প্রায় শ খানেক লোক, কাউকে তিনি চেনেন, কাউকে বা চেনেন না। কিন্তু একশো অজানা অচেনা লোককে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানোর সদিচ্ছাও তো তাঁর আছে, সেটাই বা কম কী? আবার আসানসোলের পুত্র-হারানো ইমাম সাহেব, বা রোজা ভেঙে রক্ত দান করা তরুণ-তরুণী বা বেঙ্গালুরুর হৃৎপিন্ড উড়ে এসে বসল ঝাড়খণ্ডের বুকে কলকাতার হাতযশে, এ-ও কি কম বড় কথা? এগুলো সব মানবতার এক একটা উজ্জ্বল আধার যা হৃদয়ে আশার আলো জাগায়, নিরন্তর।

ধর্মের অর্থ ধারণ করা। ধর্মের প্রচলন মানুষকে বিশৃঙ্খলার হাত থেকে রক্ষা করা। আমি বিশ্বাস করি, বিশ্বের কোনো ধর্মই মানুষে মানুষে ভেদাভেদের কথা বলেনি। ধর্মের মূল লক্ষ্যই হলে নানান সামাজিক ও ব্যক্তিগত আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষকে একটি সুস্থির জীবনযাত্রা দান করা। সহজ ভাবে ভাবলেই সহজেই তা অনুধাবন হবে, জটিল ভাবনাই জটিলতার বৃদ্ধি করে। সব আগাছা আর অন্ধকারকে ছাড়িয়ে মাড়িয়ে আসুন আমরা সকলেই আলোর পথযাত্রী হই, একে অপরকে বিদ্ধ করার আগে, নিজেকে প্রশ্ন করি, কতটুকু জানি একে অপরের সম্পর্কে? বকধার্মিক নয়, প্রকৃত ধার্মিক হিসেবে নিজেকে মেলে ধরি। আসুন সকলে মিলে ঈদের চাঁদ দেখি, তার পর কোলাকুলি, তার পর সিমাই, কাবাব, বিরিয়ানি এক সাথে, একযোগে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.