those days of singur agitation
সিঙ্গুর আন্দোলনের সেই দিনগুলি। ছবি সৌজন্যে দ্য হিন্দুস্তান টাইমস।
debarun roy
দেবারুণ রায়

সিঙুর আন্দোলন ভুল হয়েছে এ কথা স্বীকার করতে করতে এগারো বছর পার। এক যুগ হতে যখন আর মাত্র এক বছর বাকি। যখন অকূলে ভেসে গেছে সিঙুর, নন্দীগ্রাম, ঠিক সেই সময় মুকুল রায় ঝোপ বুঝে কোপটি মারতে চাইলেন। কিন্তু অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে…। এখন আর তিনি ইতিহাসের শেষ বিচার এড়াতে পারবেন? সেই বিচারের প্রক্রিয়া অবশ্যই শুরু হয়েছে। আপনার এই মন্তব্য সে কথাই প্রমাণ করছে। এবং সেই সঙ্গে আপনাকে বলছে না বেছে বেছে স্পষ্ট কথা বলতে? যদিও সত্যনিষ্ঠা এমনই এক অবিভাজ্য অবস্থান যে আপনি ইচ্ছেমতো তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, পারেননি। এটা অমোঘ। আপনাকে এই অনিবার্যতার গতিপথটুকু ছেড়ে দিতে হবে। এ পথ আটকানো যায় না।

সিঙুর আন্দোলন ভুল হয়েছিল, বেশ কথা। জোরালো স্বীকারোক্তি। কিন্তু তৃণমূলে থেকে নয়। এমনকি তৃণমূল থেকে বেরিয়ে যেতে যেতেও নয়। অনেক দিন ধরে অনেকটা জল মেপে। ছেলের দলত্যাগ এবং বিজেপিবরণ সাঙ্গ হওয়ার পর। দায়িত্বশীল বাবা হিসেবে উপযুক্ত অবস্থান। কিন্তু তাকে ভুল স্বীকার বলা কঠিন। বলা যেতে পারে, ইতিহাসের অঙ্ক কষার চেষ্টায় বিপজ্জনক অধ্যায় উহ‍্য রেখে চলা।

আরও পড়ুন বাংলা যদি গুজরাত হয়ে যায়, সব থেকে ক্ষতি কার?

সিঙুরের আন্দোলনের মূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেও প্রতি পদে ওই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রামধনু জোট। কমিউনিস্ট আন্দোলনের পাদপীঠ কৃষকের জমি। সেই জমিতেই ধরাশায়ী হবে বামফ্রন্ট, এমন এক বেদবাক‍্য শুনিয়ে রোডম্যাপ তৈরিতে ওভারশিয়ারের ভূমিকায় ছিলেন যে পোড় খাওয়া বামজীবী সাংবাদিক, কালে কালে তিনি বুঝেছেন ইতিহাসের পূর্ণগ্রাস কাকে বলে। যেমন বুঝেছেন সমীর পুততুণ্ডর মতো বাম নেতা এবং কতিপয় বামন বিধাতা। রামধনু জোটে কে না ছিল। এমনকি ক্ষমতাসীন শরিকদের মধ্যেও দাদা-বৌদির দাক্ষিণ‍্যে বঞ্চিত হননি মমতা।

সিঙুরের মাচায় রাতভর বসে মশার কামড় খেয়ে বাধ্যতার রাজনীতিকে অভিসম্পাত করেছেন সোমেন মিত্রর মতো সংগঠক। আবার ৩২ বছর পর শিল্পায়নের সূচনাকে সিপিএমের কালোয়াতি বলে জনাদেশকে ভাংচি দিতে অগ্রণী অনেকেই শুধু ডানে নয়, দাঁড়িয়ে ছিলেন বামেও। লোকসভা ভোটের পর রাম নাম শোনার ও শোনানোর হিড়িক উঠেছে। কিন্তু সেই এগারো বছর আগেই বাম বিতাড়নের একদফা কর্মসূচি রূপায়ণকল্পে রামধনু জোটের রমরমা। লোকসভা নির্বাচনে বাংলার গ্রামেগঞ্জে বামভোট রামে পড়া নিয়ে ডনবৈঠক চলছে। বাম পলিটব্যুরো, সেন্ট্রাল কমিটির চুলচেরা তর্কাতর্কি হল দফায় দফায়। শেষ পর্যন্ত সীতারাম ইয়েচুরি দল ও ফ্রন্টের সমর্থকদের স্থানীয় তত্ত্ব খাড়া করার কথা স্বীকার করলেন অকপটে। বললেন, রাজ‍্যের শাসকদল যে ভাবে আক্রমণ করছে সাধারণ বাম সমর্থকদের, তার ফলে এ বার ভোটে বড়ো অংশের শাসকবিরোধী ও মূলত বাম ভোটাররা বলেছেন, এ বার রাম, পরে বাম। সীতারাম মুখে না বলেও বুঝিয়ে দেন, বামপন্থীরা আগের মতো সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে ভোটারদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে অপারগ বলেই নিচু তলায় বামভোট রামে যাচ্ছে। মূলত এই কারণেই বিজেপি ২ থেকে ১৮-য় উঠেছে এ বার। এই গতি অবশ্যই বিপজ্জনক বলে মনে করছে বামদলগুলো। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন দুয়ে আটকে ছিল রাজ‍্য বিজেপি। এনডিএ-তে তৃণমূল থাকাকালীন তাদের কল‍্যাণেই বঙ্গ বিজেপির প্রথম লোকসভায় পদার্পণ। দমদম থেকে তপন শিকদার ও কৃষ্ণনগর থেকে জুলু মুখার্জি।

তার পর আসানসোলে একা ও দার্জিলিংয়ে মোর্চার দয়ায় দোকা বিজেপি সেই দুয়েতেই আটকে থাকে ২০১৯ পর্যন্ত। এবং তৃণমূল স্তরে বাম-রাম মিশে ও তৃণমূলবিরোধী হাওয়ায় সেই ২ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮। এই বাড় ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধির দ‍্যোতক বলে মনে করা হচ্ছে। বিজেপির সূচনালগ্নে লোকসভায় ছিল মাত্র ২। সেই থেকেই একশো ছুঁই ছুঁই। তার পর ১১৯ এবং ১৮০-তেই তেরোমাসের সরকার। প্রথম সরকার ছিল একক দলের। কিন্তু ১৩ দিন ছিল আয়ু। বাস্তবতা বুঝে একক সরকারের গোঁ ছেড়ে সঙ্গে সঙ্গেই এনডিএ গড়া হয়। কিন্তু এই কোয়ালিশন বাস্তবতা বুঝতে ও মানতে অনেক দেরি করে কংগ্রেস। ২০০৪-এ প্রথম কংগ্রেস নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার।

২০১৪-য় একক ভাবে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পাওয়ার রাজতিলক বিজেপির কপালে ফুটে ওঠায় তারা ভেবেছিল মোর্চার গাছটি বুঝি মুড়োল। কিন্তু এই ভোটেই বিরোধীদের বোঝাপড়ার মুখে প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দেন, বিজেপি একা গরিষ্ঠতা পেলেও সরকার হবে এনডিএরই।

কিন্তু এই স্বীকারোক্তিতে বিজেপির বিষয়ে নীরবতাও লক্ষণীয়। রামধনু জোটে প্রত‍্যক্ষ-পরোক্ষ যোগদানে বিজেপির রণকৌশলের ছক করেছিলেন তৎকালীন বিজেপি সভাপতি রাজনাথ। গুজরাতের মুখ ও মুখ‍্যমন্ত্রী হিসেবে মোদীই শেষ হাসি হেসেছিলেন শিল্পায়নে।

আচমকা পাততাড়ি গুটিয়ে টাটাবাবু হাঁটা দিয়েছিলেন। নীতীশ, নবীন-সহ উত্তরাখণ্ডের মুখ‍্যমন্ত্রীকে পাশ কাটিয়ে গুজরাত মডেলের ছত্রছায়াই ছিল তাঁর ডেসটিনেশন। গন্তব্য গুজরাত। যা তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্তারা ব্যাখ্যা করেছিলেন ডেসটিনি বা ভাগ্য বলে। আর দুষেছিলেন বাংলার প্রশাসনের গণতান্ত্রিকতা ও নরম পন্থাকে। এবং সমস্ত তরজা বিতর্ক মন্তব্য থেকে যোজন দূরে দাঁড়িয়ে মোদী নীরবে সানন্দে জমি, পরিকাঠামো ও ছাড়ের বিপুল আয়োজন করেছিলেন। মুকুল শুধু ‘ভুল’ বললেন। ‍’ফুল’ ফুটল গুজরাতে। সে কথা কে বলবে? ‘ফুল’ বলতে বাংলা ও ইংরেজিতে ‘ফুল’।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here