উনিশের বুকে আঠারোর বাংলায়, ফিনিশ নয়, ফিনিক্স হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ মোদীর

0
narendra modi wins
বিজয়ী মোদী।
debarun roy
দেবারুণ রায়

আমাদের মুখ‍্যমন্ত্রী ২১শে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে তাঁর আশু রাজনৈতিক কর্মসূচির রূপরেখা ঘোষণা করে থাকেন। এই প্রথা অনুযায়ীই তাঁর বিজেপিবিরোধী মতাদর্শ ও রণনীতির কথা জানিয়েছিলেন গত বার। বলেছিলেন, উনিশে ফিনিশ হবে বিজেপি।তারও আগের বার মঞ্চে মুকুলকে বসিয়ে রেখেই শুনিয়েছিলেন তাঁর বিজেপির বিরুদ্ধে ফোকাস। সেই থেকে তৃণমূলের ঘরভাঙার গল্পও শুরু। যা গল্প হলেও সত্যি। যে তৃণমূলের ধাত্রী ছিলেন মুকুল রায়, সেই তিনিই বিনিদ্র রাত্রি যাপন করছেন পদ্মবনে। যদিও তাঁর সব চেয়ে আপনজন হাপন যথারীতি বাবার পূর্বাশ্রমেই পড়ে আছে। সে জন্যই দলভাঙার কারিগর বলে তাঁর বদনাম কতটা বায়বীয় তা নিয়ে সবারই সন্দেহ। এ হেন পদ্মপরব চলছে তো কতকাল ধরেই। তাই বলে বাংলার ঘরে ঘরে কানাছেলের নাম পদ্মলোচন রাখার হিড়িক যে এতটাই, কে তা জানত? একজিট পোল দেদার সিট বিলিয়েছে যত না ইউপিতে ততই বঙ্গে। এমবেডেড জার্নালিজমের বেহেড অঙ্ক, শ্রেষ্ঠ ভোটতাত্ত্বিক অমিত শাহর সূত্র সব একাকার হয়ে গিয়েছে ধরে নিয়ে অনেকেই নাকে তেল দিয়ে থেকেছেন। কিন্তু না। শেষ হাসি হেসেছে ‘আজতক’, ‘চাণক্য’ কিংবা ‘নিয়েলসন’ বা ‘সি ভোটার’রাই। অবিশ্বাস্য অঙ্ক মিলিয়ে দিয়ে দেখিয়েছে বাংলার বেয়াল্লিশের রঙ্গমঞ্চের আঠারো আনাই পদ্মফুল। আসনে বসনে গৈরিক গড়। বাংলার বুকে উনিশে এ কোন আঠারো!

মাননীয় মোদী বিজয়-বাচনে মহাভারতের কৃষ্ণকে টেনেছেন। বাংলার আঠারো সাংসদ হয়তো অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী নারায়ণী সেনা। কিন্তু একটা গেরো আছে। ওঁরা কুরুক্ষেত্রে ছিলেন কৌরবদের সঙ্গে। সুতরাং সে প্রসঙ্গ থাক। বিজেপির রাজ‍্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ স্লোগান-পটু। তাঁর ওয়ান লাইনারেও চটক। বলছেন গোড়া থেকেই, “উনিশে হাফ/একুশে সাফ।” মাননীয়া মমতার উনিশে ফিনিশের পালটা তরজায়। কবির লড়াইয়ে নাম করেই ক্ষান্ত নন। রাজ‍্য রাজনীতিতে কার্যত শিকড়বিহীন দিলীপ সংঘের স্বয়ংসেবক পরিচিতিটুকু সম্বল করেই সুকুমার বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়, বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী, তপন শিকদারের মতো দলের স্টলওয়ার্টদের আসনে বসেছেন। শ‍্যামাপ্রসাদ যা পারেননি তা কি দিলীপের সাধ‍্য, এ কথা শুনতে শুনতেই বামন হয়েও চন্দ্রযানে চড়ে বসার জেদ দেখিয়েছেন। খড়্গপুরের এমএলএ থেকে মেদিনীপুরের এমপি হলেন। বাংলার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সাংসদ ইন্দ্রজিৎ গুপ্তর স্মৃতিচিহ্নিত আসনে। এ হেন দিলীপের রেকর্ডে আছে খড়্গপুরের চলমান ইতিহাস, অজাতশত্রু কংগ্রেস বিধায়ক চাচা জ্ঞান সিং সোহনপালকে হারানোর সাফল্য। সেই সঙ্গে জুড়ল দীর্ঘদিনের বিধায়ক ও সাংসদ ডা. মানস ভূঁইয়াকে রুখে দেওয়ার মাইলস্টোন। এই প্রথম লোকসভায় তৃণমূলের টিকিটে লড়ছিলেন মানস।

যা-ই হোক, যা হল তাতে বাংলার গদিতে মোদীর নিঃশ্বাস আরও তীব্র ও নির্ভেজাল প্রমাণিত হল। বঙ্গরঙ্গে সারদা, নারদ, গারদ নিয়ে যুক্তি দিয়ে সেলিম কথিত ‘মোদীভাই দিদিভাই’ তত্ত্ব সমদূরত্বের ঘোমটা টেনে সহমরণে গেল। হয়তো আদপে কিছু যুক্তি ছিল ঠিকই। কিন্তু যাঁরা ডায়ালেকটিকস নিয়ে ডিল করেন, তাঁদের চিন্তা কুঠুরির জানলা খোলা রাখতে হয়। মথুরাপুর বিজেপির জন্য ছেড়ে ডিল করা হয়েছে বলে বড়ো বামনেতা যে বললেন, তা কি মেলানো গেল? শূন্য পাবেন বামেরা বলে আগাগোড়া ভবিষ্যদ্বাণী বামেদের দুঃখিত করেছে। তাঁরা প্রথমে ৩ আসন, তার পর আরও ক’টি আসনে জয়ের, এবং সব শেষে দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে উঠে আসার কথা বলেছেন। বলেছেন, যাদবপুর, দমদম, রায়গঞ্জে এমনকি মূর্শিদাবাদের মরুভূমিতেও মাথা তোলার নিশ্চিত সম্ভাবনার কথা।

আরও পড়ুন শপথ ৩০-এ, আশীর্বাদ নিতে আডবাণী-জোশীর বাসভবনে মোদী-শাহ

কিন্ত শুধু তাঁরা নন, কংগ্রেসের রাজ‍্য দলও আত্মঘাতী পাস দিয়েছে কোথাও তৃণমূল কোথাও বিজেপির পায়ে। উদাহরণ, রায়গঞ্জ, মূর্শিদাবাদ, মালদা উত্তর। এবং যা করলে এই ঝড়েও নৌকোয়, তুমি কষে ধর হাল, আমি তু্লে বাঁধি পাল, হতে পারত। বহরমপুর ও মালদার মতো। ধর্মযুদ্ধে শিখণ্ডীই শেষ কথা নয়, প্রমাণ হত আরেক বার। এখানে শাসকদলের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত বাঙালি সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী শিবিরের লৌহবাসরে রেখে দিলেন কালনাগিনীর ছিদ্রপথ। সেই ছিদ্র বুঝে আত্মরক্ষার আয়োজনে শুধু বহরমপুরেই আটকে পড়তে হল অধীরকে। জঙ্গীপুর, মুর্শিদাবাদের হাজার টাকার বাগানও বাঁচানো গেল না। পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দীঘে সমান হইবে টানা বলে আগ্রাসী জমিদার অপেক্ষা করছেন তখন মুর্শিদাবাদ জেলায়। মোদীর ডাকে মেরুকরণের যজ্ঞে বাইশ নিয়ে বাঁচল তৃণমূল। ধংস হয়ে গেল বাম, আর অন্তর্জলিতে গেল কংগ্রেস। এ বার ঈদ মহম্মদের ভোট জুটল ১৩ হাজার। সেকুলারিজম সেলাম জানাল বহরমপুরের গরিষ্ঠ মুসলমানদের। তাঁরা রাজনীতির দোকানদারি চালাতে দেননি ইমান বেচে দিয়ে। প্রশ্ন তো উঠেই গেছে, কোটার ঠিকেদারি না মেরুকরণের ধসের মুখে বোল্ডার ফেলা, কোনটা আশু কর্তব্য?

প্রশ্ন উঠেছে, বামফ্রন্টের কাঠামো রেখে কী লাভ? তার থেকে বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা সেকুলার ফ্রন্ট নয় কেন? বামফ্রন্টের ঐতিহাসিক পটভূমি বদলে গেছে। বাম ঐক্যের রাম নামাবলি নানা দৃশ্যে ও অদৃশ্যে দৃশ্যমান।

মোদী কিন্তু ব‍্যাকরণ মেনে পা ফেলছেন। অক্ষরে অক্ষরে রূপায়ণ করছেন মতাদর্শ। বাম ও কংগ্রেস নেতারা শুধু মুখে বলছেন বিচারধারার লড়াই। কিন্তু আঁতাঁতের ক্ষেত্রে যাচ্ছেন টেকনিক্যালিটিতে। আর কংগ্রেসের তরুণ নেতৃত্ব অভিজ্ঞতার খামতি পুষিয়ে নিতে যেমন ভিসন দরকার ছিল তার অভাবে নিজের পায়ে কুড়ুল মারছেন। প্রিয়ঙ্কাকে এমন সময় এমন জায়গায় নামাচ্ছেন যাতে হিতে বিপরীত হচ্ছে। মহাজোটের ভোট ভেঙে গিয়ে অটুট প্রতিপক্ষের পোয়াবারো হচ্ছে। আর সর্বোপরি, সংবিধানের অতিরিক্ত যে পদ্ধতিটি বিজেপি অনেক কাল আগেই চালু করেছে, সেই প্রেসিডেন্ট ভোটের ধাঁচ গ্রহণ করেছে দেশ। মানুষ নিরন্তর খুঁজেছে মোদীর বিকল্প কে? কেউ বলেছে রাহুল, কেউ মমতা, কেউ বা মায়াবতী। এতে সৃষ্ট ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখিয়ে মোদী বলেছেন, দেখো এক দিকে মোদী আর অন্য দিকে মহাভেজাল। পূরোটাই যদির গর্ভে!

আরও পড়ুন হারলেন হেভিওয়েট, দেশ জুড়ে গেরুয়া ঝড়ের মধ্যেও ধর্মীয় শহর অধরাই থাকল বিজেপির

কাল বিজয়ী প্রধানমন্ত্রী যখন মেঘরাজা ভি সাথ হ‍্যায় বলে প্রহরীর ছাতা সরিয়ে দিয়ে বৃষ্টি ভেজা মাথায় গোলাপের পাপড়ি নিয়ে মাইকে দাঁড়ালেন তখন তাঁর বক্তৃতায় বাগ্মীর বাগাড়ম্বরের বদলে ছিল রাজনীতি আর মতাদর্শের অঙ্ক। দেশের সর্বোচ্চ নেতার কাছে সেটাই আশাপ্রদ। প্রথমেই বিজেপি ও তাঁর জয়কে বললেন ভারতের জয়। বললেন, লড়াই ছিল ১৩০ কোটি ভারতবাসীর অভিমানের সঙ্গে। বিকাশ নিয়ে পার্টি যতই গান শোনাক, তিনি শুধু শৌচাগার, চুলা আর আয়ুষ্মান ভারতটুকু বললেন। না পাকিস্তান, না বালাকোট, না নামদার, না চৌকিদার। বললেন, আমি সব তিক্ততা ভুলে গেছি। আপনারা বহুমত তো দিয়েইছেন। এটা সরকার গড়তে লাগে। কিন্তু সরকার চলে সর্বমতে। বুঝিয়ে দিলেন, আরও বেশি নিরঙ্কুশ তিনি আরও বেশি উদার হতে চান। ঔদার্য বিজয়ীরই অলংকার। যা পরেছেন অহংকারের অভিযোগ সরিয়ে রেখে। এবং বললেন সব চেয়ে জরুরি কথা, যা দিল সরল বার্তা। গত তিরিশ বছরে সেকুলারিজমের মুখোশ পরে আর সার্টিফিকেট বুকে সেঁটে সবাই ঘুরেছে। এ বারের ভোটে কিন্তু সেকুলারিজমের নাকাব পরার হিম্মত দেখায়নি কেউ। ২) কেউ মহংগাই নিয়ে কোনো কথা বলেনি। আর ৩) পাঁচ বছরের সরকারের পরেও কেউ কোনো দুর্নীতি আর কেলেঙ্কারির কথা উচ্চারণ করেনি।

রাফালাস্ত্র কি এটাই। অমেঠির হারের পর আর পরিবারতন্ত্র, রাজীব ভ্রষ্টাচারী, এবং সংখ্যা নিয়ে সব বিনা মন্তব্যে। স্পষ্ট কথা, এ বার পলিটিক্যাল পণ্ডিতদের বিগত শতকের মনোবৃত্তি ছাড়তে হবে। এটা একুশ শতক, মনে রাখতে হবে।  আর আমি আজ ওয়াদা করছি, ভুল হতে পারে কিন্তু নিজের জন্যে কিছু করব না।

আমার সমস্তটুকু সময় শুধু দেশের জন্য উৎসর্গ করছি।

আমার শরীরের প্রতিটি কোষ, সমস্ত অনু-পরমাণু দেশের জন্যে নিবেদিত।

আপনারা এই ফকিরের ঝোলা ভরে দিয়েছেন। ২০১৪-য় আপনারা আমাকে চিনতেন না। এখন সবটুকু চিনে আরও বিশ্বাস করে, ভরসার যোগ্য মনে করেছেন। দু’জন সাংসদ দিয়ে বিজেপির সূচনা। সেই থেকে পর পর দ্বিতীয়বার জেতার ইতিহাস। এটা ভারতের পক্ষে ভোট। কৃষ্ণ যেমন ছিলেন হস্তিনাপুরের পক্ষে। আমরা আদর্শ, সংস্কার ভুলে যাইনি।

২০১৪-য় এই মোদীকে দেখেনি। ২০১৯-এর নবীকরণ তাঁকে যে বিরল সুযোগ দিয়েছে তার সদ্ব্যবহার করে উঠতে পারলে মেরুকরণের নায়ক মোদী দেশের প্রথম জননায়ক হতে পারেন। সে জন্য কোনো আইকনের মূর্তি নয়, নিজের মূর্তিই গড়তে হবে নিজস্ব মানবজমিনে। তা হলে উনিশে ফিনিশ নয়, ফিনিক্স হয়ে উঠবেন পাঁচ বছরের শেষ বিন্দু থেকে পাঁচ তারকাখচিত বিশেষত্বে। এর পর আর অচ্ছে দিনের, পাকিস্তানের কথা অর্থহীন।

এমন সুযোগ সবার হাতে আসে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.