পিছিয়ে পড়াদের আঁকড়ে ধরে বাইশে এগোতে চাইছে বিজেপি

0

জয়ন্ত মণ্ডল

ছিল ৮, হয়ে গেল ১৫। কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী মন্ত্রীসভায় এখন উত্তরপ্রদেশের প্রতিনিধি সংখ্যা এমনটাই। কারণ সেখানে বছর ঘুরলেই বিধানসভা ভোট। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় উত্তরপ্রদেশ থেকে সদস্য সংখ্যা ছিল ৮, আচমকা তার সঙ্গে জুড়ল আরও ৭। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এই ৭ জনের মধ্যে আবার ৩ জন করে অনগ্রসর ও দলিত, বাকি এক জন ব্রাহ্মণ। সব মিলিয়ে উত্তরপ্রদেশের ভোটের মুখে উচ্চবর্ণ, অনগ্রসর এবং দলিত রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষার তাগিদটাই এখন বিজেপির কাছে বড়ো, ‘পারফরম্যান্স’-এর নিরিখে মন্ত্রীসভার সম্প্রসারণের তত্ত্ব নিছকই কথার কথা।

Loading videos...

কথায় বলে, বিষ উঠেছে মাথায়, তাগা বাঁধবে কোথায়। সে কথা বলার মতো সময় সম্ভবত এখনও আসেনি। তবে বিধ্বস্ত অর্থনীতি, করোনায় বিপর্যয় আর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সমেত হরেক ছোবলে কেন্দ্রের শাসকদলের পরিণতি সে দিকেই এগোচ্ছে। তাই তো তাগা বাঁধার তোড়জোড়। মাঝেমধ্যেই কিছু স্ফূর্তিদায়ক কোভিড প্যাকেজ তো ছিলই, এ বার ভাবমূর্তিতে সাবান ঘষতে মন্ত্রীসভায় মেগা রদবদল। বলা হচ্ছে, কাজের মূল্যায়নের নিরিখে মন্ত্রীসভার এই ঝাড়পোঁছ। কিন্তু পাঁচ রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা ভোট যে এখন মাথা ঘামানোর আর ঘাম ঝরানোর মূল লক্ষ্য, সেটাও আমআদমির কাছে বেশ স্পষ্ট। অন্তত মন্ত্রীসভার সম্প্রসারণে যে ভাবে ভোট হতে যাওয়া রাজ্যগুলিকে সামনের সারিতে নিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী, তাতে রাজনীতির সমীকরণ মেলানোর তাগিদটাই মুখ্য হয়ে ধরা পড়েছে।

২০১৭-য় ক্ষমতায় আসার পর পান থেকে চুন খসলেই সর্বভারতীয় সমালোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। দলিতদের উপর উচ্চবর্ণের আক্রমণ, দলিত কন্যাকে ধর্ষণ ইত্যাদি নিয়ে বার বার বিতর্কের মধ্যমণি হয়ে উঠেছে তাঁর রাজ্য। স্বাভাবিক ভাবেই একটা বৃহত্তর অংশের অ-যাদব অনগ্রসর এবং অ-জাটওয়া দলিতদের সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টি-বিমুখ করে তুলতে এখন থেকেই সব রকমের চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। অন্য দিকে, রাজ্য থেকে মন্ত্রীসভায় নতুন করে ঠাঁই পাওয়াদের মধ্যে রয়েছেন একমাত্র ব্রাহ্মণ অজয় মিশ্র, উচ্চবর্ণের মন রাখতেই যে তাঁর এই অন্তর্ভুক্তি, তা নিয়েও জল্পনা চলছে।

এমনিতে উত্তরপ্রদেশের ভোট মানেই বর্ণ-গণিতের জটিল অঙ্ক। এ বার গেরুয়া শিবিরের অনগ্রসর-দুর্গে দাঁত বসানোর ফন্দি আঁটছে বিরোধী দলগুলো।

[মোদীর পুনর্গঠিত মন্ত্রীসভা]

মোদী মন্ত্রীসভার এই রদবদলে উত্তরপ্রদেশের প্রসঙ্গ উঠে আসার কারণ একটাই, কারণ সেখানে কয়েক মাস বাদেই বিধানসভা ভোট। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব নিজের বৃত্তের বাইরে, অর্থাৎ, অ-যাদব এবং অন্য অনগ্রসর শ্রেণির ভোট দলের ছাতায় তলায় নিয়ে আসতে অপেক্ষাকৃত গোষ্ঠী-নির্ভর ছোটো দলগুলির সঙ্গে সমন্বয়ে জোর দিচ্ছেন। ইতিমধ্যেই তিনি বিআর আম্বেডকরের ভাবাদর্শ প্রচার করে দলিতদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন। অন্য দিকে, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির প্রধান ওমপ্রকাশ রাজভর বিজেপিকে রুখতে ছোটো দলগুলির মোর্চা গড়ার ডাক দিচ্ছেন। রাজনৈতিক আবহাওয়া বলছে, অসামঞ্জস্য ঠেকলেও মায়াবতী বিজেপির প্রতি কিছুটা হলেও নরম মনোভাব দেখাচ্ছেন, তবে নিজের দলিত ভোট ব্যাঙ্ক, বিশেষত জাটওয়াদের সংঘবদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে নতুন দলিত শক্তি হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন চন্দ্রশেখর আজাদ।

এ সব ঘটছে এমন একটা সময়ে, যখন উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা ভোট মেরেকেটে ৯ মাস দূরে। ফলে বিজেপির গেমপ্ল্যানেও প্রাধান্য পাচ্ছেন অনগ্রসর, দলিতরা। সেটা এখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় প্রকাশ্যে এল, পরে ভোটের প্রার্থীতালিকাতেও যে দেখা যাবে, সে কথা নি:সন্দেহে বলা যায়।

অনুপ্রিয়া পটেল এবং পঙ্কজ চৌধুরীর মতো দুই কুরমি এবং এক লোধ বিএল বর্মাকে মন্ত্রীসভায় শরিক করা হয়েছে অনগ্রসর শ্রেণি থেকে। অনুপ্রিয়া এনডিএ শরিক অপনা দলের দু’ বারের সাংসদ। তবে পঙ্কজ মহারাজগঞ্জের বিজেপি সাংসদ। গেরুয়া শিবিরের অনগ্রসর-দুর্গে বিরোধী দলগুলো দাঁত বসানোর ফন্দি আঁটতেই কুরমি সমাজকে ধরে রাখতেই অনুপ্রিয়া, পঙ্কজদের এগিয়ে রাখছে বিজেপি। কারণ, তাঁরা যে কেন্দ্রগুলিতে প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেখানে এই সম্প্রদায়ের মানুষই বেশি। তবে আট বারের সাংসদ, অটলবিহারী বাজপেয়ীর জমানার মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট কুরমি নেতা সন্তোষ গাঙ্গোয়ারের মতো প্রবীণকে মন্ত্রীসভা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও বিশেষ ভাবে তাৎপর্য বহন করছে।

শ্রমমন্ত্রকের দায়িত্ব ছিল গাঙ্গোয়ারের কাঁধে। তাঁর সময়েই পাশ হয়েছে নয়া শ্রমবিধি। যদিও তা কার্যকর করতে পারেনি কেন্দ্র। তবুও কাজের মূল্যায়নে তাঁকে ছেঁটে ফেলার তত্ত্ব খাড়া করা যাচ্ছে না। কারণ, তাঁর থেকে আরও জটিল পরিস্থিতি নরেন্দ্র সিং তোমরের মন্ত্রকে। নতুন তিন কৃষি আইন নিয়ে কৃষকদের বিদ্রোহ এখনও বাগে আনতে পারেননি কৃষিমন্ত্রী। ফলে শুধুমাত্র পারফরম্যান্সের নিরিখে গাঙ্গোয়ার-বিদায়, সেটাও বলা চলে না। এর শিকড় আরও গভীরে। ২০১৯ লোকসভা ভোটের আগে থেকেই বিজেপির বিরুদ্ধে ফোঁসফাঁস করছিলেন অনুপ্রিয়া। তখনও তিনি কেন্দ্রের মন্ত্রী ছিলেন। আশ্চর্যজনক ভাবে ভোটের মুখে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ত্যাগের ইচ্ছাপ্রকাশও করেছিলেন। এমনকি উত্তরপ্রদেশে বিজেপির কাছ থেকে রাজনৈতিক ভাবে অসম্মানের অভিযোগ তুলে এনডিএ ছাড়ার হুমকি দিয়েছিল এই অপনা দল। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মোদী সরকার দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফিরে অনুপ্রিয়াকে এ বার আর মন্ত্রী করেনি। কিন্তু এখন আর না করলেই নয়।

যে ৭ জনকে মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে: এসপি সিংহ বাঘেল, ভানুপ্রতাপ সিংহ বর্মা, কৌশল কিশোর, বিএল বর্মা, অনুপ্রিয়া পটেল, পঙ্কজ চৌধুরী, অজয়কুমার মিশ্র।

[দিল্লিতে মোদী-যোগী সাক্ষাৎ]

অন্য দিকে, বিএল বর্মার মতো লোধ নেতাকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে মন্ত্রীসভায়। এই সম্প্রদায়ের উপর বাজি ধরতে এক সময়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বর্মার উপর ভরসা রাখছে গেরুয়া শিবির। একই ভাবে দলিত ভোট ব্যাঙ্কে প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যও সমানে মজুত। মোহনলালগঞ্জের সাংসদ কৌশল কিশোর এক জন পাসি, জালৌনের সাংসদ ভানুপ্রতাপ সিংহ বর্মা এক জন কোরি এবং আগ্রার সাংসদ এসপি বাঘেল এক জন পাল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই কৌশলের ছত্রে ছত্রে রয়েছে মায়াবতীকে রুখে দেওয়ার মোক্ষম চাল। যা অ-জাতব ভোট ব্যাঙ্ক ফিরে পেতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে মায়াবতীর সামনে।

এমনিতে উত্তরপ্রদেশের ভোট মানেই বর্ণ-গণিতের জটিল অঙ্ক। কিন্তু তার আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় নাম বাছাইয়ের সময়েও জাতিগত সংমিশ্রণ ও প্রভাবের উপর নজিরবিহীন জোর দিতে দেখা গেল বিজেপিকে। যেখানে পিছিয়ে পড়া, দলিত সম্প্রদায়ের মন জয় করার প্রয়াস জলের থেকেও স্পষ্ট। তাবড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে এ বারের বিধানসভা ভোট হয়েছে তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণের আবহে। তাতেও ক্ষমতা দখল থেকে অনেক আগেই থামতে হয়েছে বিজেপিকে। এ বার উত্তরপ্রদেশে দলিত এবং অনগ্রসর ভোটব্যাঙ্ককে একজোট করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পরিকল্পনায় লাভ কতটা হয়, সেটা জানতে আর মাত্র ৯ মাসের অপেক্ষা!

আরও পড়তে পারেন: ছালের রাজনীতি আর কত দিন

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন