শঙ্খ ঘোষ নেই, তাঁর ধুম লেগেছে হৃৎকমলে

0

তাপস রায়

বাংলা কবিতা আজ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল। শঙ্খ ঘোষের শরীর অতীত। কিন্তু তাঁর কবিতা! যেন রাত্রি এসে স্পর্শ করেছে, যেন তার সৌন্দর্যে সুরভিত হয়ে আছে ছড়ানো চারপাশ … অনুভব এমন আততি নিয়ে জেগে উঠল, চোখ বন্ধ করে নিজের ভেতর মঞ্জরিত হবার কাল পাঠকের। শঙ্খ ঘোষ তাঁর ‘জার্নালে’ মধ্যরাত শিরোনামের ভাবনাটিকে যেন সেতারের ধ্বনিতরঙ্গের মূর্চ্ছনা দিয়েছিলেন … এর অধিক কবিতা আর কী, তার গম্যতাই বা কোথায়! বললেন,

Loading videos...

“ অন্ধকারের ভেতর দিয়ে স্তবকে স্তবকে উঠে আসা নিঃশব্দ গানে ভিজে যায় ঘাস, ভিজে যায় অবোধ প্রাণীদল, ঘূর্ণিত হতে থাকে সময়, গ্রহণে গ্রহণে ভরে যায় অঞ্জলি, করপুট উঠে যায় আলোড়িত আকাশের দিকে। না-এর মধ্যে দিয়ে ঝলকে ঝলকে এগিয়ে অস্তি, অশ্বত্থের গুড়ি ছুঁয়ে মধ্যরাত বলে: স্তব্ধ হও, শোনো। শুনি। অবিরল উত্রোল অনাবিল পদধ্বনি শুনি সারারাত।”

শুধু মধ্যরাত নয়, ‘জার্নালের’ প্রতিটি রচনাই কবিতার হার্দ্য আলিঙ্গন নিয়ে যেন বসে আছে, যেন চোখাচোখি হলেই কোনো অতিন্দ্রিয় ঈপ্সার দিকে ছড়িয়ে পড়বে রং। ‘জার্নালের’ মোমের আলোর মতো উদ্ভাসিত কবিতার ঘোরের ভেতর থেকে সপ্রশ্ন মনে পড়তে পারে, আজ যেন তাঁর ‘ধুম লেগেছে হৃৎকমলে’। তাঁরই কবিতার বই এটি। যেখানে অন্তহীন প্রশ্ন আর না-এর বিভঙ্গ দেখে ভয় জাগে … শুধু কি প্রলয়ের কথা হবে, নাকি ঊনজন্মের ভেতর থেকে নতুন প্রাণপ্রবাহের এই সে অভিমুখ!

একটি কবিতাই পাঠকের চেতনাকে অনিঃশেষের দিকে নিয়ে যেতে চায়। শরীর থেকে অ-শরীরের দিকে। মৃত্যু থেকে অমৃতের দিকে। একটি কবিতার ভেতর লুকিয়ে থাকে আবিষ্কারের শতজল ঝর্ণার ঈপ্সিত আবাহন। ফলে কবিকে বলার চেয়ে না-বলাটা বেশি করে দেখতে হয়, তিনি দেখেন শব্দ-উত্তীর্ণ কোনো এক অরূপতা তাঁর সামনে উপস্থিত। তাঁকে ছুঁতে চাওয়ার কোনো মানে হয় না, তিনি শঙ্খ ঘোষ শুধু লিখতে পারেন, “ যে গ্রহনক্ষত্র ছিল ওই চোখে তার কিছু স্বাদ/ এই অমাবশ্যা থেকে ঝরুক তোমারও চোখেমুখে/ প্রায় শিশিরের মতো অগ্নিকণা বুকে বিঁধে নিয়ে/ ব্রতপালনের দিকে ঝুঁকে থাকা নিশিজাগরণ।”( ব্রত, ধুম লেগেছে হৃৎকমলে)।

‘হুমায়ুন নামা’ থেকে জানা যায় মৃত্যুশয্যা থেকে হুমায়ুনকে ফিরিয়ে আনতে বাবর নিজেকে উৎসর্গ করছেন, “ On me be all thy suffering”। এর ফলে হুমায়ুন বেঁচে উঠেছিলেন কি না সেটা বিষয় নয়। কিন্তু ঐ উচ্চারণের অনুরণনে বোনা হয়েছিল একটি অমোঘ সময়ের প্রতিবাদের ইতিহাস। আধুনিক বাংলা কবিতায় মানবতাবাদের সে এক অমোঘ চিহ্ন — ‘ বাবরের প্রার্থনা’। যেখানে লেখা হলঃ

এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম

আজ বসন্তের শূন্য হাত …

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

এ কবিতা শুধু কাল চেতনার বলে উল্লেখের নয়, প্রকরণেরও। এ কবিতা একটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সত্য চিরে তৈরি। কিন্তু যেহেতু আত্মউন্মোচন ও আত্মগোপন হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে, ফলে এক সামান্য আড়াল হয়ত রাষ্ট্রীয় রোষের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে আমাদের কবি শঙ্খ ঘোষকে সেসময়। তাঁর সমস্ত কাব্যকৃতিই সাংবাদিকতার বিপরীত,জনগণের কথা হলেও আড়ালকে অবলম্বনে রেখেছে। আর তিনি, কবি শঙ্খ ঘোষ বলেও ফেলেন, “ তোমাকে বক্‌ব/ ভীষণ বক্‌ব আড়ালে।”

শুধু কালিক ইতিহাস নয়, মানুষের মনের ইতিহাসকেও বিবেচনায় রাখেন শঙ্খ ঘোষ। মানসিকতার যে পরিবর্তন ঘটে যেতে থাকে নিরন্তর, তাকেও মূল্য দেন। এখানে কবির যে ডিসকোর্স তাতে যুক্তি অধরা থাকে না। আর কবি মনের ইতিহাসও যে নমনীয় নদীর মতো হয়ে বয়ে এসেছে তা-ও অস্পষ্ট থাকে না। তাঁর স্বরভঙ্গির এই চলিষ্ণু পদ্ধতিকে মিত কথনের বিস্তৃত বাকভঙ্গি বলা যেতে পারে। যেখানে কোথাও ভাবনার গাঢ় ও গহনকে অসরলের অবাকত্ব দিতে হয়নি। আর আশ্চর্যের ‘তুমি কোন দলে’ বলে তাঁকে চিহ্নিত করার ঝোঁক আজও দুর্লভ। এক ছন্দোময় মন্ত্রোচ্চারণের ধ্যান যেন তাঁর সমস্ত কবিতা পরিমণ্ডলে স্বভাবতা পায়। নীরবতার ভাষা আলোময় করে দেয় চেনা ও অচেনা।

সমাজের সঙ্গে তন্বিষ্ঠ থেকেও একজন কবির যাত্রা এককতার দিকে, এটাই তাঁর সম্পূর্ণতা। অনবচ্ছিন্ন ওই সব মুহূর্তকে কবি ধরে রাখতে চান কোনো অখিল সুরভি দিয়ে। তিনি তো বলবেন, “ এরও পর যখন জেগে উঠবে দু’একটা গন্ধরাজ, মনে রেখো/ নিঃশ্বাসের জন্য এই অসাড় আঙুল দিয়ে আকড়ে ধরেছিলাম ন্যুনতম ঘাসবিন্দুটুকু।”( নিঃশ্বাস, ধুম লেগেছে হৃৎকমলে)।

কে প্রকৃতি? সে কি কেবল গাছ, নদী, পাহাড়? এই মানুষ … মানুষের বসবাস, তার পরিমণ্ডল, তার কেঁপে ওঠা আত্মা … এসব প্রকৃতি নয়? একটি নিঃশ্বাস পতনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রম ও চেতনার অবিমিশ্র প্রকৃতি। ওই বৃহতের সমস্ত অসংগতির দিকেই কবির নির্দেশনামা ঘুরে যায়। আর পাঠকের জানালা খোলে। কোনো একটা কবিতা থেকে তখন পাঠকের অনুভবে এসে লাগে বাইরের মিষ্টি প্রাণ ভরানো হাওয়া, তার আকুলতা। ঘর ও বার মিলে মিশে যায়। এই মেলবন্ধনই যেন কবির ধ্যেয় ছিল, যেন পাঠকের ওই সামান্য শুশ্রুষায় তাঁর সমস্ত কবিজীবনের সার্থকতা। শঙ্খ ঘোষ লিখতে পারেন ঃ

চিতা তখন জ্বলছে আমার হৃৎকমলে

ধুম লেগেছে, ঘুম লেগেছে চরাচরে, পাপড়ি জ্বলে

এই তো আমার?

এই তো আমার জন্মভূমির আলোর কথা।

( হৃৎকমল, ধুম লেগেছে হৃৎকমলে)

কবির আত্মার মুক্তি ধ্বনিত হল সামাজিক সংকটের আলোড়নে। নিজস্ব নিঃশ্বাসের কম্পন, যন্ত্রণা, ব্যথা বাঁশির ভেতর দিয়ে চলাচল করে গান হয়ে গেল। শেষ লাইনটি লিখবার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত যে যন্ত্রণা ও মুগ্ধতা, যে তর্ক ও উদবেগ-পোড়েন, তা থেকে যেন মুক্তি এল। এই দ্বিধা পৃথিবী নিয়ে, তার সংঘর্ষ ও চলাচল নিয়ে ‘পা তোলা, পা ফেলা’ শীর্ষক একটি রচনায় শঙ্খ ঘোষ বলেছেনও — “ কী নিয়ে লেখা হবে কবিতা? আমার বাইরের পৃথিবী নিয়ে? না কি আমারই ব্যক্তিগত জগত নিয়ে? এই ছিল তর্ক, দেশ-বিদেশের বহুকালের পুরনো তর্ক। কিন্তু এই দুই কি ভিন্ন নাকি? এই দুয়ের মধ্যে নিরন্তন যাওয়া-আসা করেই কি বেঁচে নেই মানুষ?তার থেকেই কি প্রতি মুহূর্তে তৈরি হয়ে উঠছে না একটা তৃতীয় সত্তা?”

একেই হয়ত সমগ্রতা বলেছেন কবি আলোক সরকার। তাত্ত্বিক চোখে তবে একেই কি বলা হবে synthesis! এই পূর্ণতাকে আলোক সরকার আমাদের কাছে ব্যাখ্যা করেন এভাবে। “ কবিতার ব্যবহারিক উপস্থাপন এবং তার সারাৎসারের ভিতর এই মৌল দ্বন্দ্ব বা বিরোধ যে ভাব বা ইমোশনের সঙ্গে রস অথবা অভিনিবেশকে একাত্ম করে দেখার ফলেই উদ্ভূত তা অলঙ্কারশাস্ত্রের পাঠক মাত্রেই জানেন। বস্তুত একটি গাছের হয়ে ওঠা এবং একটি পূর্ণাবয়ব গাছের মধ্যে অসেতুসম্ভব ব্যবধান। একটা গাছ তার ডাল নয়, তার পাতা নয়, ফুল নয়, … একটা গাছ সর্বাঙ্গ নিয়ে একটা গাছ, যেমন একটা ছবি সামগ্রিক একটা ছবি। বিশ্লিষ্টভাবে একটা গাছ পাতাও নয়, ফুলও নয়, একটা ছবি দশ-বারোটি রেখাও নয় কিংবা তিন-চারটি রঙ। কেবল একটা সমগ্রতা”

শঙ্খ ঘোষের এই কবিতাটি সেই সমগ্রতার কথাই বলেঃ

পিছনে সূর্যাস্ত সামনে ছোটো থেকে বড়ো শিশু জিমন্যাস্টিক মিছিলে চলেছে

শাদা জামা শাদা শর্টস নীরব আর্দ্রতা নিয়ে ছন্দোময় পায়ে পায়ে তারা

সূর্যের ভিতর থেকে বেরিয়ে চলেছে যেন আধোদূর চন্দ্রিমার দিকে

মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অদৃশ্য পাথরে গড়া অতিকায় স্ফিংকস ঘরবাড়ি

যেন বা তোরণ পথে সেই মুখে ঢুকে গেলে জমি পড়ে থাকে সামনে ফাঁকা

পদ্মের শূন্যতা থেকে পান্ডুর নীলাভ ছায়া নেমে আসে পথের ওপারে

মুহূর্তে মুর্ছিত বোধ সমস্ত শরীর দিয়ে ঘাসের কিনার ছুঁয়ে বলেঃ

‘এই তো উঠেছে দেখো সকলের অগোচরে আমাদের দুঃখজলনিধি।’

( পিছনে সূর্যাস্ত, ধুম লেগেছে হৃৎকমলে)

এই কবিতাতেও তো সেই ভেতর বাহির একাকার করে নেবার আত্যন্তিক সংবেদন। এই সমগ্রতাও তো উপনিষদের স্মিত আলোয় স্নান শেষের শুদ্ধতা নিয়ে উপস্থিত। হৃৎকমলের বৃন্তলগ্ন পাতায়েকটি আলোকণার টলটল করে ওঠার ছবি পাঠকের চোখে আসে।

কল্যাণবোধ ও নৈতিকতার যে অংশটিকে রবীন্দ্রনাথ surplus of man বলেছেন… সেই আকুলতা বা অন্তরের এথিকস-এ একজন কবির জাগ্রত চেতনায় বিবেকের আধ্যাত্মিকতা অপরিহার্য হয়ে আসে। এই প্রেক্ষিতেই হৃদয় জ্বলে ওঠে। মানবতাকে posture দিয়ে নয়, সর্ব আত্মিকতায় এক বিপন্ন বিস্ময়ে নিজেকে সম্পর্কিত করেন কবি শঙ্খ ঘোষ। বলেন, “ কাল রাত্রিবেলার বিশ্বাসের কথা ভাবি/ ভাবি এই-বা কী কম, এই যে বর্শার ফলক নিয়ে বেঁচে থাকা।” ( ফলক, ধুম লেগেছে হৃৎকমলে)। এবং দ্বিধার অনিবার্যে তিনি আরও সপ্রশ্ন হলেন, “ সবই ঠিক। কিন্তু ঘর? সে কি বেঁচে আছে? আজও?” ( মর্মর, ধুম লেগেছে হৃৎকমলে)।

চৈতন্যের এই আধ্যাত্মিকতাকে বহন করেই শঙ্খ ঘোষের কবিতায় এক একটি বীজক তৈরি হতে থাকে। অথবা কবি নিজেই নিজেকে এই চৈতন্যের দহনে পীড়িত করতে করতে কবিতার মুখোমুখি হন। এই পীড়িত আত্মাই হয়ত তাঁকে দিয়ে বলিয়ে নেয়, “ কোনো যে মানে নেই সেটাই মানে/ অন্ধ চোখ থেকে বধির কানে / ছোটে যে বিদ্যুৎ সেটাই মানে।”

চৈতন্যের এই উৎক্রান্তিকে পাঠক আরো সহজে পেয়ে যান স্মৃতিকথার মতো করে লেখা ‘ বটপাকুড়ের ফেনা’-য়। “ বিরাটের মধ্যে নিজের অস্তিত্বের তুচ্ছতাকে অনুভব করে কেউ ভাবতে পারে যে তার জীবনটার কোনো মানেই নেই। আবার উল্টো দিকে, সেই বিরাটের মধ্যে নিজেকে যুক্ত করে নিয়ে কেউ ভাবতে পারেন তিনি পেয়ে গেছেন তার সম্পূর্ণ মানে। কিন্তু এই দুটো অবস্থানই দৈনন্দিন থেকে মনকে সরিয়ে নিতে পারে, বিযুক্ত করে নিতে পারে জীবনপ্রবাহ থেকে। মানে না থাকাটাই যে জীবনের একটা মানে হতে পারে, সেইটে একবার মেনে নিতে পারলে হয়তো অস্তিত্বের মধ্যে জোর পাওয়া যায় অনেক বেশি।”

আত্মায় সঞ্চারিত এই জোর থেকেই ‘বাঁচা’ কবিতাটি মুক্তি পেল হয়তো‌:

“ দুনিয়ার যদি কিছু লাভ হতো আমি না থাকলে

আমার না-থাকা সহজই হতো …

কিন্তু সেটা কি হবে বলে তুমি ভাবো?

কিছু জঞ্জাল জমে আছে আজও মাথার ভিতরে

রক্তবীজের বংশধরেরা

বেড়ে চলে অকাতরে।

ভেবেছ কি তাতে ভারি আসে যায় কারও?

বহু দেখেঠেকে শিখেছি বাপুরে

মোটের উপরে বেঁচে থাকাটাই ভালো।

( বাঁচা, ধুম লেগেছে হৃৎকমলে)।

এই গ্রন্থের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে ‘ধুম তাতা তাতা থৈ’। এ কি শিবের নৃত্যের অনুষঙ্গ! সময় প্রবাহে শাশ্বত চৈতন্যের অপরাভবকে নিয়ে হেঁটে যাবার কর্মময়তা! নির্যাতিত প্রেমের অন্ধকার থেকে কান্ট কথিত Metaphysic of moral এর উদবোধন! নাহলে কীভাবে প্রত্যক্ষত মাত্রাবৃত্তে উঠে আসে … “ অন্ধ আমি দেখতে পাই না, আমিই তবু রাজ্যশিরে / এবং লোকে বলে এদেশ যে তিমিরে সেই তিমিরে”। ( অন্ধবিলাপ, ধুম লেগেছে হৃৎকমলে)। এ কবিতার বহিরঙ্গে ধ্বনির শাসন থাকলেও , সমস্ত নৈরাজ্যের, রাষ্ট্রীয় অন্ধতার প্রকাশে উদাসীনতার প্রতিরোধ দিতে চাইলেন যেন। নির্মানে গ্রাহ্যতার দিকে ঝুঁকে শঙ্খ ঘোষ যথেষ্ঠ সরল । সময়ের রিক্ততার ছবি, তার সম্পর্ক, আর কবির দহন বৃত্তান্তের এই ‘অন্ধবিলাপ’ আমরা আগেও পেয়েছি তাঁর ‘প্রহর জোড়া ত্রিতাল’ গ্রন্থে। সেখানেও এরকম এক অসহায়তার কথা… “ শরীর থেকে শীতের বাকল শহর গেছে খুলে/ মাথার উপর ছড়িয়ে গেছে হাঁস…/ ঠিক তখনই সৌর ধুলোর অন্ধ, বলেছিলাম/ এই গোধুলি অনন্ত সন্ন্যাস।”

এই বিপন্নতা কি একজন কবির অনিবার্য ভবিতব্য? সময়ের অসহনীয়তাকে মানিয়ে না নিতে পেরে ক্রমে নিজেকে বিচ্ছিন্ন, নিরুদ্দিষ্ট করার ট্রাজিক পরিধি? এই দ্বন্দ্বদীর্ণ কবিসত্ত্বার উন্মোচনে রবীন্দ্র অনুধ্যায়ী শঙ্খ ঘোষ হরপ্রসাদ মিত্রের চিঠির অনুষঙ্গে এভাবে বলতে চেয়েছিলেন, “ যে Super consciousness-এর কথা উনি তুলেছিলেন, তাকে কি অস্বীকার করি আমি? চিঠিতে হয়তো রবীন্দ্রনাথের একটা মন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলাম ওঁকে। অমিয় চক্রবর্তীর কাছে লেখা চিঠিতে যে মন্তব্য জুড়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেইটের কথা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেনঃ ‘ হয়তো একটা কোনো সত্তা আছে, যা এইখানেই, অথচ যা অদৃশ্য আলোকে অগোচর। তার বৃহৎ চেতনায় যা প্রকাশ পাচ্ছে সে আমি ভাবতেই পাচ্ছি নে … যে চেতনার আমি অন্তর্গত। এইখানে ভাবনাটাকে এগিয়ে নিতে এমন একটা ছেড়ে দেওয়া আছে, এমন একটা অসহায়তার সমর্পণ যে সেটাই আমাকে ওই কথাগুলোর দিকে বারে বারে টানে। ব্যপ্ত ভাবে, স্পষ্টতর ভাষায়, এসব প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ কথা বলেছেন অনেকবারই, কিন্তু সেসবের তুলনায় এই উচ্চারণ্টার মধ্যে একটা স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত ধাক্কা আছে, আছে অদৃশ্য অগোচরের সত্যিকারের প্রহেলিকা। এই বৃহৎ চেতনা … অন্য ভাষায় Super conscious — যে চেতনার আমি অন্তর্গত … তাকে তো ভাবতেই হবে এই নদীজল-গাছ পাথর পাহাড় আকাশের সঙ্গে মিলিয়ে, যদি জীবনের পরিমণ্ডলে বিশ্বরহস্যের কথা এক লহমার জন্যও ভাবি।”

হয়ত চৈতন্য আর পরাচৈতন্যকে সে ভাবে আলাদা করে চিহ্নিত করার অভিমুখটিও আর তেমন গ্রাহ্য নোয়, যখন একটি কবিতা পাঠকের অনুভববেদ্যতায় হার্দ্য সংযোগ তৈরি করে ফেলে, যখন সময় আর সময়হীনতা মিলেমিশে যায়। যখন কবিতার অক্ষরপাতা রূপটিও আর ফ্রেমে থাকে নাঃ

তোমার মৃত চোখের পাতা ভেঙে উঠে আসছে বাষ্পগহবর আর তাকে ঢেকে দিতে

চাইছে কোনো অদৃশ্য হাত যখন চারপাশে ফাটলে ফাটলে ভরে গিয়েছে

টলমল পাহাড়

দৃষ্টিহারা কোটরের প্রগাঢ় কোলে ঝর্ঝর গড়িয়ে নামছে অবিরাম কত নুড়ি পাথর

আর আমরা হলুদ হতে থাকা শ্বেতকরোটির সামনে দাঁড়িয়ে আছি

স্থির …

যেন কুয়াশার ভিতর থেকে উঠে আসছে চাঁদ

অথচ শনাক্ত করা যায় না আজও এত অভিসম্পাতের ভিতরে ভিতরে বিষাক্ত

লতাবীজের ঘন পরম্পরা কে তোমার মুখে তুলে দিয়েছিল সেদিন, ঝিমধরা

শীতরাত্রির অবসরে।

( টল্‌মল্‌ পাহাড়, ধুম লেগেছে হৃৎ কমলে )

কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ‘সুন্দর’ কবিতাটিকে প্রসঙ্গে রেখে বলেছিলেন, “ কোনো কোনো কবিতার ক্ষেত্রে সূচনা-অন্তরা-সমাপ্তি … এই ত্রিনীতি একটি অনিবার্য সত্য।” আমাদের এই গ্রন্থটিও এই ত্রিনীতি লালিত হতে দৃশ্যমান। প্রথম পর্বটির নাম ‘ঘাসবিন্দু’। নামকরণটিই উত্থাপিত করে অ-চমককে। অর্থাৎ কোনো স্মার্টনেস বা পোশাকের অভিজ্ঞানে ঢেকে দিতে চান না তাঁর কবিতা। কবিতাগুলির নামও অতি তুচ্ছ, চোখে না-পড়ার মতো। যেমন ‘ধুলো’, ‘মুখ’, ছবি’, ‘আলস্য’, ‘সাঁচী’ – ইত্যাদি। দ্বিতীয় পর্ব অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত চারিত, অন্তরা অংশটির নাম ‘বৃত্ত’। কবি কি কোনো রচিত বৃত্তের সমাপণের কথা ভেবেছেন! এর আগের দশটি কবিতার বইতে তিনি যে নিহিত পাতাল ছায়ার কথা বলেছেন তাই কি এখানে কোনো সমগ্রতায় উপনিত হল? এই পর্বের প্রথম কবিতা ‘শেকল বাঁধার গান’ ও শেষ কবিতা ‘ অন্ধবিলাপ’ অন্তত যে ফ্রেমটি রচনা করে তা এক জাগ্রত ক্রুদ্ধ চেতনার পরিপূরক হিসেবে উপস্থিত। শেষ পর্বটির নাম ‘সৈকত’। হয়ত এখানে শঙ্খ ঘোষ আসতে চেয়েছেন। কী বলেছেন এই কবিতাতে? এই কি প্রকৃত সন্ন্যাস?

— আজ আর কোনো সময় নেই এই সমস্ত কথাই লিখে রাখতে হবে এই সমস্ত কথাই

যে নিঃশব্দ সৈকতে রাত তিনটের বালির ঝড় চাঁদের দিকে ঊড়তে উড়তে

হাহাকারের রুপোলি পরতে পরতে খুলে যেতে দেয় সব অবৈধতা আর সব

হাড়পাঁজরের শাদাধুলো অবাধে ঘুরতে থাকে নক্ষত্রে নক্ষত্রে শুধু একবার

কবারই ছুঁতে চায় বলে।

যেটা আগেই বলা গেছে ব্যষ্টি ও সমষ্টিকে মেলাতে মেলাতে তিনি কবি নিজেকে আবিষ্কার করতে থাকেন। তাঁর কবিতার আড়ালটি যে প্রপঞ্চকের কাজ করে তার ফলে মনে হতে পারে তাঁর কবিতা সরল, সমাহিত, স্নিগ্ধতার অনুকূল কোনো অলঙ্কার । আসলে প্রচ্ছদটি পেরোতে পারলেই দেখা যাবে কীভাবে তপ্ত হয়ে আছে তাঁর অন্তরাত্মা।

‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’-র ওই পঙ্‌ক্তিটিই যেন তাঁর ভাষামুখ হয়ে আসে । “ মাটি খুব শান্ত, শুধু খনির ভিতরে দাবদাহ”। আশ্চর্য সংযমে এই দাবদাহ পরিবেশন করেছেন শীলিত অ-তীব্রতায়, একরকম নির্লিপ্ত শান্তিতে। এভাবে মান্য করা যেতে পারে যে শঙ্খ ঘোষের হৃৎকমলে ধুম প্রথম থেকেই। কী এক অশান্তিতে তিনি আত্মনাট্যের আঙ্গিকে বিশ্বজীবন পরিবেশন করেন। সমস্ত হীনমানতার হয়ে তাঁকেই বলতে হয়, “ আর কত ছোট হব ঈশ্বর/ ভিড়ের ভেতর দাঁড়ালে/ আমি কি নিত্য আমারও সমান/ সদরে, বাজারে, আড়ালে?”

আমরা শুরু করেছিলাম আড়াল করার প্রবণতাটিকে সামনে রেখে। আড়ালে থাকার অন্তরঙ্গতা থেকেই ‘ঘাসবিন্দু’র কবিতা। এর’আলস্য’ কবিতাটিতে যেন নিজেকেই মেলে দিয়েছেন শঙ্খ ঘোষঃ

ওসব নিয়ে ভেবো না, ওর তো কোনো শেষ নেই,

তার চেয়ে বরং এইখানে এসে জানো, দেখো

দেখো কোনো কোনো ছোটো জিনিসকে বড়ো দেখালে

কেন মনে হয় এত অশালীন

আর দূরে মাটির ওপর ওরা দৌড়ে গেলে ভয়ে

তোমারও বুকে কেন জাগতে থাকে নরম ঝাঁপ

কেন আলস্যে দুচোখ এত ভার হয়ে এলেও

দেখতে ইচ্ছে হয় সব ঠিকমতো আছে।

এই কবিতাপাঠের সঙ্গে তাঁর একটি গদ্যাংশকেও সাজিয়ে দেয়া যেতে পারে যা কবির দর্শনের উচ্চারিত নিচয়ঃ

লিখতে হবে নিঃশব্দে কবিতা, এবং নিঃশব্দ কবিতা। শব্দই জানে কেমন করে সে নিঃশব্দ পায়, ঐশ সূত্র না ছিঁড়েও। তার জন্য বিষম ঝাঁপ দেবার দরকার আছে দুঃসহ আড়াল থেকে। দুঃসহ, কেননা ইন্তরাল সহ্য করাই মানুষের পক্ষে সবার চেয়ে কঠিন। কবিকে তো আজ সবটাই খেয়ে ফেলছে মানুষ, তাই মানুষের এই শেষ দায়টা মেনে নিয়েও ঘুরছে সে, অন্তরাল ভেঙে দিয়ে এক শরীর দাঁড়াতে চাইছে অন্য শরীরের সামীপ্যে। তা যদি না হয়, তাহলেই সহ্য যায় পেরিয়ে — কিন্তু তবু সেই দুঃসহ আড়ালে বসে সে তৈরি রাখবে একটা দৈনন্দিনের মুখোশ; তাকে কেউ চিনবে না, আঙুল তুলে বলবে না, ‘ এ লোকটা কবি’, আর তার ভেতর থেকে গোপনে জন্ম নেবে নিঃশব্দ কবিতা।

এই মানসিক গঠনে কখনও শঙ্খ ঘোষ সামাজিক সংকটকে সামনে রেখেছেন, কখনও বা অপ্রেমের বেদনা ভেতরে নিঃশব্দে সেই রেশমকীট তন্তু বয়ন করে চলেছে। তারপর যখন রেশমের মুক্তি তখন দেখা গেল তরঙ্গায়িত এক আলো , দৃপ্ত — যা সমস্ত অন্ধকার বুকে করেই বলবেঃ

চন্ডালকেই মুক্তি ভেবে খুঁচিয়ে দেব আগুন

ফুলকি দেখে দেখে বলব আলোর কথা

ভাবব ওই তো জয়ধ্বজা , শ্মশান, বড়ো ধুম লেগেছে হৃৎকমলে।

( হৃৎকমল, ধুম লেগেছে হৃৎকমলে)

কবি শঙ্খ ঘোষ মুহূর্তের সজ্জা থেকে পরের মুহূর্ত, একটি স্মৃতি থেকে অন্য স্মৃতি ধরে ব্যষ্টি ও সমষ্টিকে নিয়ে চলতে চলতে একটা বৃত্তায়ণের এই পরিসরে শব্দের সখ্যতায় কোনো এক মুক্তি চেখে নিতে চেয়ে নিজেকে প্রতিটি অপ্রেমের বিরুদ্ধে আত্মমোচন করে, প্রতিটি দিনের পরে নতুন দিনে নিজেকে সঞ্চারিত করতে থাকেন। আর ভেজা বিকেলের পাশে ডানা মুড়ে বসে থাকা আলোকে দিয়ে যে নিবিড় আবহ তৈরি হয়, আমরা সামান্য পাঠক তার বাইরের মূর্চ্ছনায় মুগ্ধ হতে হতে ভেতরের দিকে উঁকি মারার সাহসে ওই পৌরুষ দেখে বিস্মিত ও হ্লাদিত হয়ে নিজেদের হৃৎকমলের দিকে তাকাবার প্রেরণা পাই, যেন ঐশী প্রেরণা। তাঁর শরীর, হ্যাঁ আজ আমাদের সামনে নেই। কিন্তু তাঁর কবিতায় আমরা রোজ রোজ নবীন আধ্যাত্মিকতায় স্নান সেরে নেব।

আরও পড়তে পারেন: নিঃশব্দেই, তিনি তর্জনী উঠিয়ে থাকবেন

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন