Miss Shefali

পাপিয়া মিত্র

সকালেই দুঃসংবাদটা পেলাম। চলে গেলেন মিস শেফালি। সোদপুরের বাড়িতে তাঁর জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হল, ৭৭ বছর বয়সে। সেই সঙ্গে সাঙ্গ হল এক জীবনসংগ্রাম।

Loading videos...

নামটা শুনলে আজও এক রাশ কৌতূহল, প্রশ্ন গুনগুন, ফিসফিস করে অনেকেরই মনে। সেই রকম এক রাশ কৌতূহল নিয়ে এক দিন পৌঁছে গিয়েছিলাম তাঁর যশোর রোডের ফ্ল্যাটে। শুনিয়েছিলেন তাঁর জীবনসংগ্রামের কাহিনি। আরতি থেকে শেফালি হয়ে ওঠার কাহিনি। খুব আলাপি ছিলেন মানুষটা। যখনই মনের মধ্যে কথার পাহাড় জমেছে, তখনই ফোন করেছেন। মনের দ্বার খুলে দিয়েছেন আমার কাছে। আমিও বার বার গিয়েছি তাঁর ফ্ল্যাটে। মানুষটাকে আরও কাছে পেয়েছি, তাঁকে আরও ভালো করে চিনেছি।

সে দিনের লাস্যময়ী মিস শেফালি।

কথায় কথায় আমায় এক বার বলেছিলেন, তাঁর প্রায়ই মনে হয় দাঁড়িয়ে আছেন আহিরীটোলার ঘাটে। আশপাশ থেকে ভেসে আসছে নানা রান্নার সুগন্ধ। চপ, কাটলেট, ফিশফ্রাই, মাংস, মাছ, ভাত, ডাল। তিনি সব খাবেন, এক সঙ্গে গপ গপ করে খাবেন। সব হজম করতে পারবেন। এতটাই অভুক্ত থাকতেন তখন। সেই দারিদ্যের কথা কোনো দিনও ভুলতে পারেননি।

দোলপূর্ণিমায় জন্ম আরতির। দেশভাগের বলি হয়ে মাত্র ৬ বছর বয়সে চলে এসেছিল এ-পার বাংলায়, সঙ্গে বাবা-মা-ঠাকুমা আর ভাইবোনেরা। উঠল আহিরীটোলায়। বাবা রামকৃষ্ণ দাস ছিলেন সে সময়কার এমএ। ভালো পুরাণকথক ছিলেন। অনেকেই তাঁকে ডেকে নিয়ে যেতেন। দু’ চার পয়সা জুটত, কিন্তু সংসারনির্বাহের মতো কোনো উপযুক্ত কাজ জুটল না। দারিদ্র্য চেপে বসল। অভাব দিন দিন প্রকট হতে লাগল। ছ’ বছরের আরতির ভালো থাকা, ভালো পরা ভীষণ আঘাত পেতে লাগল।

বয়স যখন ১১, আহিরীটোলা থেকে বাসা বদলে চলে আসা হল উলটোডাঙায়। সেখানেই আলাপ হল এক দিদির সঙ্গে। আরতি দেখত দিদি সেজেগুজে রোজ সন্ধেবেলায় কোথায় যেন যায়। একটা কাজের জন্য একদিন দিদিকে ধরল। দিদি জানতে চাইল, আরতি মাকে ছেড়ে থাকতে পারবে কিনা। আরতি রাজি। মা-ও সম্মতি দিলেন। বললেন, “যদি ভালো থাকিস, খাওয়া-পরা পাস, তা হলে যা।” আরতি চলে এল চাঁদনি চকে এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারে পরিচারিকার কাজ নিয়ে।

উত্তমকুমারের সঙ্গে।

এই ভাবে আরতির জীবনের চাকা ঘুরতে লাগল। আহিরীটোলা থেকে উলটোডাঙা, সেখান থেকে চাঁদনি চক, চাঁদনি চকের ট্রামলাইনের ধার থেকে ফিরপোজ, ফিরপোজ থেকে গ্র্যান্ড, হোটেলের ডান্সফ্লোর থেকে মঞ্চ, মঞ্চ থেকে টলিউড আর সার্কাস অ্যাভেনিউয়ের চার কামরার ফ্ল্যাট। তার পর এত সব পার করে সম্মান, অভিমান, অপবাদ মাথায় নিয়ে অচ্ছুৎকন্যা হয়ে যশোর রোডের এক কামরার ফ্ল্যাটে অথবা সোদপুরের বাড়িতে দিনগত পাপক্ষয়।      

মিস শেফালি বলেছিলেন, “সেই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারে নিয়মিত চলত নাচগান, খানাপিনা। আমার কাজ ছিল নাচের সময় স্ন্যাক্স পৌঁছে দেওয়া। পৌঁছে দিয়েই চলে আসতাম। আড়াল থেকে সব দেখতাম – ওদের ডান্স, ওদের কথা বলার ভঙ্গি। সব আদবকায়দা ফলো করতাম। যখন ওরা কেউ থাকত না, তখন পেনসিল হিল জুতো পরে যা খুশি নাচতাম। পরে জেনেছি ওই সব নাচ ছিল রক অ্যান্ড রোল, টুইস্ট, ওয়ালস্‌, রাম্বা সাম্বা। আমার মনে হত আমিও পারব, আমিও নাচব।”

এই রকমই একটা পার্টিতে আরতি আলাপ করল মোকাম্বো রেস্তোরাঁর গায়ক ভিভিয়ান হ্যান্ডসানের সঙ্গে। তাঁরই হাত ধরে বাড়ি থেকে পালানো। ভিভিয়ান নিয়ে গেলেন এক নেপালি মহিলার কাছে। ১১ বছরের আরতিকে ফ্রক ছাড়িয়ে শাড়ি ধরালেন ওই মহিলা। তার পর নিয়ে যাওয়া হল এক বিশাল বাড়িতে। মিস শেফালি পরে জেনেছিলেন সেটা গ্র্যান্ড হোটেল। কিন্তু সেই বিশাল বাড়িতে নিয়ে গিয়েও ফিরিয়ে আনা হল। নিয়ে যাওয়া হল ফিরপোজে। আর থাকতে দেওয়া হল গ্রেট ইস্টার্নের পাশে এক বাংলো টাইপের বাড়িতে।

“সেই বাড়িতে আলোর ঝাড়, নানা বাজনার সরঞ্জাম, বড়ো বড়ো আয়না আর আমি একা এগারো বছরের এক কিশোরী” – বলেছিলেন শেফালি। শুরু হল ট্রেনিং। কয়েক দিনের মধ্যেই নানা লোকের সামনে নাচ দেখানো শুরু হল। শেষ পর্যন্ত চাকরি পাকা হল। মাইনে সাতশো টাকা। আনন্দে উড়তে লাগল আরতি, লাইসেন্স পাওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হল লালবাজারে। শেখানো মিথ্যে কথা বলতে হল। রাতের কলকাতায় যখন আরতির খুব চাহিদা, তখন একদিন ফিরপোজের ম্যানেজার ও আর এক কর্তা মিস্টার ডেভিড আর মিস্টার ভ্যালে বললেন, “তোমার আরতি নাম বদলে হোক ‘লিটল ফ্লাওয়ার’ ‘মিস শেফালি’।”

মিস শেফালি ফিরপোজ থেকে গ্র্যান্ডে চলে এলেন ষাটের দশকের মাঝামাঝি। ক্রমে গ্র্যান্ড হয়ে উঠল তাঁর স্বপ্নপুরী। কলকাতার নামীদামি হোটেলগুলো তাঁকে পাওয়ার জন্য টানাটানি করত। অভিজাত ক্লাবগুলো থেকেও ডাক পড়ত মিস শেফালির।

বিশ্বরূপায় ‘চৌরঙ্গী’র পোস্টার।

এ দিকে হোটেলে নাচের পাশাপাশি ডাক এল পেশাদারি মঞ্চ থেকে। হোটেলের ক্রাউড আর থিয়েটারের ক্রাউড সম্পূর্ণ আলাদা। থিয়েটার তাঁকে গৃহস্থের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। “বুড়োদা (তরুণকুমার) আমাকে প্রথম নাটকে এনেছিলেন। আমার প্রথম নাটক ‘চৌরঙ্গী’। অভিনয় চলল ‘অশ্লীল’, ‘রঙ্গিনী’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘সম্রাট ও সুন্দরী’তে। রঙ্গমঞ্চ আমায় এক অন্য পরিচয় দিল। আমাকে নিয়ে আলোচনা ভাতের হাঁড়িতে ঢুকে গেল। অন্য এক পরিচয়ে তখন প্রতিদিনের লড়াই ‘বিষকন্যা’র। ভগবান সহায় হলেন। ডাক পড়ল সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ আর ‘সীমাবদ্ধ’ ছবিতে অভিনয় করে মনে হল জাতে উঠলাম” – বলেছিলেন মিস শেফালি।

আরও পড়ুন: দীপিকার ঘাড়ে মাথা একটাই, সেটা আর কতবার কাটা যায়!

যৌবনের বুকে ঝড় তোলা মিস শেফালি শুনিয়েছিলেন তাঁর জীবনের আরও অনেক কাহিনি – তাঁর ভালোবাসার কাহিনি, তাঁর প্রতি মঞ্চ-ফিল্মের তাবড় তাবড় মানুষের দুর্নিবার আকর্ষণের কাহিনি। সে সব আজ নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক। সমস্ত লড়াইয়ের শেষে আজ তিনি চিরশান্তির দেশে।  

ছবি: রাজীব বসু            

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.