এমনই বৈশাখের একটি দিনে মুখোমুখি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও শ্রীরামকৃষ্ণ

0

পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায়

সে দিনটাও ছিল তাপদগ্ধ বৈশাখের একটি দিন – ২০ বৈশাখ, ১২৯০ বঙ্গাব্দ। চাক্ষুষ সাক্ষাৎ হল বাংলা তথা ভারতবর্ষের দুই মহাপথিকের, দুই মহামানবের।

Loading videos...

এক জন বাঙালির প্রাণের ঠাকুর, ভারতের শেষ অবতার, কল্প ভারতাত্মা। নির্লোভ, নিরহংকার, নিরাভরণ, আক্ষরিক অর্থে নিরক্ষর অথবা স্বল্পাক্ষর। কিন্তু তাঁর কথামৃত – সে যে এক অপার বিস্ময়। শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমে বাকরুদ্ধ হয়ে যান পৃথিবীর জ্ঞানীগুণীজন। তাঁর জীবনধারা সে তো যুক্তিবাদী বিজ্ঞানের অতীত, যেন অলৌকিক মহিমা বিস্তার করে হয়ে উঠেছেন ভক্তের ভগবান। হয়তো তাই-ই হয়। যুগে যুগে ঈশ্বর-মানবেরা যথা যিশু, মহম্মদ, বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য, কনফুসিয়াস, মহাবীর, নানক, কবীর, জরথ্রুস্ট তাই তো চিরকাল মানবসভ্যতার বিস্ময়। সাধারণ, নিঃসম্বল গ্রামবাংলার গরিবঘরের এক জনের কাছে ছুটে এসেছেন বিশ্বের জ্ঞানীগুণীজন। তাঁর কথা শুনে তাঁরা বাকরুদ্ধ – এ যেন লালন ফকির, সিরাজ সাঁই, রামপ্রসাদের ব্যাখ্যাতীত দর্শনের অনুভূতিকেও সহজ কথার সরলতায় ছাপিয়ে যায়। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস।

অন্য জন তাঁর চেয়ে প্রায় ২৫ বছরের ছোটো, ভবিষ্যতের মহামানব, বিশ্বমানব। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর সৃষ্টিতে শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃতের আর্তি যেন মূর্ত হয়ে ওঠে – “জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো”।

এক দিকে রবীন্দ্রনাথ, যিনি নিরাকার ব্রহ্মের উপাসক, ব্রহ্মবাদী আর অপর দিকে শ্রীরামকৃষ্ণ, যিনি সর্ব ধর্মে অবগাহন করে হয়েছেন সর্ব ধর্মের ঋদ্ধ একক বিনম্রতার প্রতীক। এ হেন দু’ জনের মুখোমুখি সাক্ষাৎ ঐতিহাসিক ভাবে ঘটেছিল উত্তর কলকাতার কাশীশ্বর মিত্রের বাড়িতে।

“ঁকাশীশ্বর মিত্রের বাড়ি নন্দনবাগানে। তিনি পূর্বে সদরওয়ালা ছিলেন। আদি ব্রাহ্মসমাজভুক্ত ব্রহ্মজ্ঞানী। তিনি নিজের বাড়িতেই দ্বিতলায় বৃহৎ প্রকোষ্ঠমধ্যে ঈশ্বরের উপাসনা করিতেন, আর ভক্তদের নিমন্ত্রণ করিয়া মাঝে মাঝে উৎসব করিতেন। তাঁহার স্বর্গারোহণের পর শ্রীনাথ, যজ্ঞনাথ প্রভৃতি তাঁহার পুত্রগণ কিছুদিন ওইরূপ উৎসব করিয়াছিলেন। তাঁহারাই ঠাকুরকে অতি যত্ন করিয়া নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়াছেন।

“ঠাকুর প্রথমে আসিয়া নিচে একটি বৈঠকখানাঘরে আসন গ্রহণ করিয়াছিলেন। সে ঘরে ব্রাহ্মভক্তগণ ক্রমে ক্রমে আসিয়া একত্রিত হইয়াছিলেন। শ্রীযুক্ত রবীন্দ্র (ঠাকুর) প্রভৃতি ঠাকুরবংশের ভক্তগণ এই উৎসবক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন।” (শ্রীম কথিত শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত)  

সে দিন ছিল চৈত্র মাসের কৃষ্ণা দশমী তিথি, ১৮৮৩ সালের ২ মে। কাশীশ্বর মিত্রের বাড়িতে নন্দনবাগান ব্রাহ্মসমাজের বিংশ সাংবাৎসরিক উৎসব অনুষ্ঠান। অনেক সম্মাননীয় জ্ঞানীগুণী সেখানে আমন্ত্রিত। আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন রবীন্দ্রনাথও, এবং সকলের ঐকান্তিক ভাবে প্রার্থিত পুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। রবীন্দ্রনাথ তখন বাইশ। বাড়ির সব থেকে বড়ো ঘরে সভার আয়োজন করা হয়েছে। প্রার্থনাসভার শুরুতে রবীন্দ্রনাথ পিয়ানো বাজিয়ে গান শুনিয়েছিলেন। “সংগীত শুনিয়া ঠাকুরের আনন্দের সীমা রহিল না” (শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত)।  নিবিষ্ট মনে গান শুনতে শুনতে ঠাকুরের ভাব আসে। সবাই পরম বিস্ময়ে এক অতীন্দ্রিয় মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকলেন। তার পর ধীরে ধীরে ওই অবস্থা কাটিয়ে উঠে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সে দিন সকলের সঙ্গে এক পংক্তিতে লুচি, ডাল, তরকারি, মিষ্টি খেয়ে উপস্থিত সকলকে বিদায় জানিয়ে দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যান।

সে দিনের সেই অনুষ্ঠানের বিবরণ পরের দিন অর্থাৎ ৩ মে, ১৮৮৩-এর ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ থেকে পরবর্তী কালে ১৩৪২ বঙ্গাব্দে ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে বসে ‘পরমহংস রামকৃষ্ণদেব’ কবিতাটি রচনা করেন –

“বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা/ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা/তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে/নতুন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে;/দেশবিদেশের প্রণাম আনিল টানি/সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি।”

আজ ৯ মে বিশ্বকবির ১৬১তম জন্মদিনে দুই মহামানবের মহামিলনের সেই বিরল মুহূর্তটি স্মরণ করি। সেই ঐতিহাসিক ঘটনারও ১৩৮তম বর্ষ উদযাপিত হল।  শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – এই দুই মহামানবের পদপ্রান্তে আমাদের শত কোটি প্রণাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.