আরও অনেক ‘মাস্টার স্ট্রোক’ ঝুলিতে রাখছেন মোদী

0

জয়ন্ত মণ্ডল

ভোটের খেলা আপাতত শেষ, এখন চলছে প্রশাসনিক খেলা। সঙ্গে রয়েছে গতানুগতিক রাজনীতির বস্তাপচা কিছু গেম প্ল্যান। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যদি বুনো ওল হন, তা হলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাঘা তেঁতুল। গত ২ মে বিধানসভা ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে বঙ্গ-বিজেপির ব-কলমে কেন্দ্রের মোদী সরকার এখনও পর্যন্ত রাজ্য সরকারকে ‘বেকায়দায়’ ফেলতে যতগুলো চাল চেলেছে, আপাতত সব ক’টাতেই অ্যাডভান্টেজ মমতা!

Loading videos...

ভোট-পরবর্তী ‘মাস্টার স্ট্রোক’

ফলাফল ঘোষণার পর থেকে এখনও পর্যন্ত সব চেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে তিনটে ঘটনা। প্রথমত, বিজেপি, রাজ্যপাল এবং কেন্দ্রের এক যোগে ভোট-পরবর্তী হিংসা নিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানানো। দ্বিতীয়ত, সাত বছর আগের নারদকাণ্ডের (Narada Case) রেশ ধরে রাজ্যের চার হেভিওয়েট সুব্রত মুখোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, মদন মিত্র এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়কে সিবিআইয়ের গ্রেফতারি। এবং সর্বশেষটি রাজ্যের মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিল্লিতে বদলির ঘটনা।

নির্বাচনের পর কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন হিংসার ঘটনা নিয়ে রাজ্য প্রশাসন কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে। তার পরেও রাজ্যপাল লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে করোনা মহমারির মধ্যেও জেলা সফর করেছেন এই ইস্যুতে। চার হেভিওয়েট নেতাকে গ্রেফতারের পর ব্যাঙ্কশাল কোর্ট, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করেও তাঁদের গারদে ভরে রাখতে পারেনি সিবিআই। উলটে আদালতের কাছে কঠিন প্রশ্নবাণে জর্জরিত হয়েছে। আর আলাপনের বদলি নিয়ে চলমান সংঘাতে মমতা কার্যত কেন্দ্রের নির্দেশকে পাত্তাই দেননি। বাংলার মানুষের জন্য আগামী দিনে মোদী যে এমনই আরও বেশ কিছু চমকদার ঘটনার অবতারণা করবেন, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ খুবই কম। কিন্তু সে সব কৌশল সাধারণ মানুষের চর্চায় উঠে এলেও মোদী বা বিজেপি কতটা সুবিধা, সমর্থন পাবে, সে বিষয়ে সন্দেহের বহর বেশ চওড়া। কারণ একটা বড়ো অংশের মানুষের তাতে কিছুই যায়-আসে না। মমতার সঙ্গে মোদীর পার্থক্যটা বোধহয় এখানেও।

মানুষের কি যায়-আসে?

মনে পড়ে, ২০১১-য় কলকাতাকে লন্ডন, দিঘাকে গোয়া আর দার্জিলিংকে সুইজারল্যান্ড বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা। সমাজের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত অথবা হাই-ফাইরা এমনটাই দেখতে চেয়েছিলেন কি না, তা জানা মুশকিল। কিন্তু রাজ্যের শহরে-গ্রামে এমন কোটি কোটি মানুষ রয়েছেন, যাঁরা বা যাঁদের নিকটাত্মীয় কেউ দিঘা গেলেও জীবনে কেউ গোয়া বা সুইজারল্যান্ড যাননি। আবার সুইজারল্যান্ডের নাম না শোনা মানুষের সংখ্যাও খুব একটা কম নয়। দশ বছর বাদে ভোটের আসরে নতুন নতুন প্রকল্প যেমন, দুয়ারে রেশন, স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মমতা। কলকাতা লন্ডন, দিঘা গোয়া আর দার্জিলিং সুইজারল্যান্ড হল কি না, সে ব্যাপারে ওই বড়ো অংশের মানুষের কিছু যায়-আসে না।

ভোটের প্রচারেও ঝুলি থেকে একের পর এক ‘মাস্টার স্ট্রোক’ বের করছিলেন মোদী। ঘন ঘন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের উদ্বোধন, ভোটপ্রচারে বঙ্গ-সফরে যেন ঝড় তুলে দিয়েছিলেন তিনি। দশ বছর বয়সি তৃণমূল সরকারকে কঠিন বাক্যবাণে আক্রমণ, সঙ্গে ৩৪ বছরের বামশাসনকে তুলোধনা কিছুই বাদ দেননি। বাংলার মানুষ মমতার কাছ থেকে কী চেয়েছিলেন, আর কী পেয়েছেন, সে সবের বিস্তারিত বিবরণও তিনি পেশ করেছেন পদ্ম-মঞ্চে দাঁড়িয়ে। হাততালি পেয়েছেন। ভোটও পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর সোনার বাংলা তৈরির পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছেন বাংলার মানুষই। কিন্তু এখান থেকে শিক্ষা নিয়েও সম্ভবত ‘খেলা’ শেষ করতে চান না মোদী। ভোটের পরে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতকে আরও তীব্র করে সেটাই হয়তো বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

এ বার সেকেন্ড পার্ট

প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী ফের সম্মুখসমরে। ঘূর্ণঝড় ইয়াস-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনায় কলাইকুন্ডায় এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথাগত ভাবেই সেখানে উপস্থিতির কথা ছিল মমতার। কিন্তু একাধিক কারণে সেই বৈঠকে যোগ দেননি তিনি। প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা (দাবি নয়) তুলে দিয়েই দিঘার উদ্দেশে রওনা দেন মমতা। ভারতজোড়া শোরগোল উঠল, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রধানমন্ত্রীকে এ ভাবে ‘অপমান’ করতে পারেন না কোনো মুখ্যমন্ত্রী। সে কথা মমতারও যে অজানা নয়, তা বলাই বাহুল্য। তবুও সে কাজ-ই করেছেন মমতা। আবার কোনো নির্দিষ্ট কারণ না দেখিয়ে শুধুমাত্র মমতার সফরসঙ্গী মুখ্যসচিবকে বদলির নির্দেশ দিয়ে ‘প্রত্যেক ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়া’ সূত্র ধরেই এগিয়েছে কেন্দ্র।

প্রশ্ন উঠছে, মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্যই কি মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Alapan Bandyopadhyay) টার্গেট করল কেন্দ্র। এই আধিকারিকের জন্যই তো তিন মাসের মেয়াদ বৃদ্ধির অনুরোধ করেছিলেন মমতা। কেন্দ্র অনুমতিও দিয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে না থেকে মমতার সঙ্গে চলে যাওয়ার জন্যই মুখ্যসচিবকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হল কি না, সেটাও স্পষ্ট করছে না মোদী সরকার। এ ব্যাপারে কেন্দ্রের গভীর নীরবতায় রহস্য আরও গভীর হচ্ছে।

তৃতীয় বারের পরীক্ষার মুখোমুখি মোদী

এখানেও নিরুত্তাপ সাধারণ মানুষের একটা বড়ো অংশ। ভোট-পরবর্তী হিংসা (Post-Poll Violence) কাম্য নয়। কিন্তু তৃতীয় বার দায়িত্বে আসার পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা হিংসা দমনে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার প্রশংসা করেছে খোদ হাইকোর্ট। সাত বছর পরে হলেও নারদকাণ্ডে ঘুষ নেওয়ার ব্যাপারটা সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও হাইকোর্ট অভিযুক্তদের জামিন মঞ্জুর করেছে, মাঠে মারা গিয়েছে সিবিআইয়ের দৌড়ঝাঁপ। আর মুখ্যসচিবকে দিল্লিতে বদলির নির্দেশের সঙ্গে রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা, অপশাসনের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এখন দেখা যাচ্ছে, এই ইস্যুতে বিরোধী বাম-কংগ্রেসও পাশে দাঁড়াচ্ছে মমতার। ঠিক যেমনটা করোনা পরিস্থিতিতে হেভিওয়েটদের গ্রেফতারির ঘটনায় দেখা গিয়েছিল। সব মিলিয়ে ‘দিদি’ ব্র্যান্ড কিন্তু আরও মজবুত হচ্ছে। এ ভাবেই মোদীর একের পর এক ‘মাস্টার স্ট্রোক’ হয়তো বাংলার রাজনীতিতে নতুন স্রোতের জন্ম দিচ্ছে, আগামী দিনে যা আরও অর্থবহ উঠতে পারে। মমতা তৃতীয় বারের পরীক্ষায় সম্মানের সঙ্গে উতরে গিয়েছেন। ও দিকে ২০২৪-এ তৃতীয় বার পরীক্ষায় বসতে চলেছেন মোদী! তখন শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, দেশের সব রাজ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্যই ‘মাস্টার স্ট্রোক’ মজুত রাখতে হবে গুজরাতের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন