নিঃশব্দেই, তিনি তর্জনী উঠিয়ে থাকবেন

0

সৃজন দে সরকার

‘বিসর্গ-এর ভুঁড়ো পেট, চন্দ্রবিন্দুর মাথা হেঁট।’ – চন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে প্রথম আলাপ, এই ছিল তাঁর। ব্যবহারের দিক দিয়ে প্রথম যখন জানলেন রবীন্দ্রনাথ নেই, সেই দিন। খবরটি পেয়েই মনে মনে কথা কয়ে উঠল আরও একটি মন। রবীন্দ্রনাথ নেই! ‘মেঘের ডানা মেলে রাত্রির দিকে উড়ে গেছেন? আমার তাহলে কি করণীয়?’ সত্যিই তো, সে দিনের সেই ছোট্ট ছেলেটির কী-বা করণীয় হতে পারে রবীন্দ্রনাথকে সম্মান জানাতে?

Loading videos...

কি না, নিঃশব্দে কলমের ডগায় কালি মাখিয়ে নিয়ে একটি মস্ত চন্দ্রবিন্দু এঁকে দিলেন ছাপার রবীন্দ্রনাথের নামে। সেটিই ছিল তাঁর ‘প্রথম মসীচিহ্নিত প্রতিক্রিয়া’। ছোট্ট ছেলেটির যাত্রাপথ থেমে থাকেনি সেখানেই। সেই চন্দ্রবিন্দুর পর থেকেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নিবিড়তার সন্ধান শুরু হয়েছিল। শুরু হয়েছিল এক নতুন অভিযাত্রা। যে পথে বাঙালি জাতি পেয়েছে ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’, ‘কালের যাত্রা ও রবীন্দ্র নাটক’ কিংবা ‘নির্মাণ আর সৃষ্টি’। এ সবের লেখকই সেই ছোট্ট বালক, আমাদের শঙ্খ ঘোষ (৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ – ২১ এপ্রিল ২০২১)।

উল্টোডাঙার ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসের তেতলার ঘরে প্রতি রবিবারে সভা বসে। সেখানে আসেন নানা মহলের নানা জন। আসেন অনেক তরুণ-তরুণী, তাঁদের সবুজ মন নিয়ে। তিনি সময় নিয়ে সকলেরই কথা শোনেন, মাঝে মাঝে নিজের মনমতো দুই-একটি কথাও জানিয়ে দেন। সেই চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার থেকে সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে বাঁচাতে সদা সচেষ্ট থাকে তাঁর মন। নিজের শত শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করেও এগিয়ে আসেন নানা মঞ্চ-মিছিল-মহড়ায়। না পারলেও, অভিভাষণ লিখে নিজের মত জানিয়ে দেন ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসের সদা জাগ্রত দরজা দিয়েই।

৬৫তম বিবাহবার্ষিকীতে কবি ও তাঁর সহধর্মিণী প্রতিমাদেবী। ছবি ফেসবুক থেকে নেওয়া।

কিন্তু, সময় যে বড়োই নিষ্ঠুর। কোন দিক দিয়েই সময়ের করাল চন্দ্রবিন্দুর প্রকোপ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না যেন। তাই এ বারে, নিজের নামের পাশেই অদৃশ্য কলমের আঁচড়ে চন্দ্রবিন্দু এঁকে নিলেন শঙ্খ ঘোষ। এমন একটি সময়ের স্রোতে দাঁড়িয়ে এই চন্দ্রবিন্দুটি তাঁকে এঁকে নিতে হল, যে সময় মানুষের পাশে মানুষের খুব প্রয়োজন, মেরুদণ্ডের পাশে বলিষ্ঠ হাতটা তুলে রাখাটা ছিল দরকারি। সেই সময় সকলের থেকে ছুটি নিয়ে চলে গেলেন তিনি। দিন কিছু আগেই, অসংখ্য গুণমুগ্ধ মানুষের কাছে একটি আলোকচিত্র পরম গর্বের কারণ হয়ে উঠেছিল। সেটি ছিল শঙ্খবাবু আর সহধর্মিণী প্রতিমাদেবীর বিবাহবার্ষিকীর আলোকচিত্র। দু’ জনের মুখে লেগে আছে এক আলোকোজ্জ্বল হাসি – যা ভরসা দেয়, দেয় অনেকটা আশ্রয়।

সত্যিই সময় বড় নিষ্ঠুর। সেই ছোট্ট ছেলেটির রবীন্দ্র-নামের পাশে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহারের দিনগুলির এক একটি খণ্ডচিত্র মেলে ১৯৯৮-তে প্রকাশিত ‘ছোট্ট একটা স্কুল’ শীর্ষক বইয়ে। শিল্পী বন্ধু পূর্ণেন্দু পত্রীর উৎসাহে তাঁর সম্পাদিত ‘সকাল’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবেই প্রকাশ পেয়েছিল লেখাগুলি। একজন শিশুর বেড়ে ওঠার এমন নিটোল চিত্র,  বাংলাতে এমন ভঙ্গিতে স্বল্পলিখিতই বটে। এরই পিঠোপিঠি তাঁর দু’টি বই আছে – একটি ‘সকালবেলার আলো’ আর একটি ‘সুপুরিবনের সারি’। অনেক পাঠকের অভিযোগ ছিল তাঁর কাছে, এমন আশ্চর্য বই আর লেখেন না কেন? সহাস্য মুখে মৌন হয়ে থাকা ছাড়া অন্য উত্তর বিশেষ দিতেন না তিনি। এ জন্যেই, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সভায় নবনীতা দেব সেনের গ্রন্থপ্রকাশ হবে। শঙ্খ ঘোষ সেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত। শঙ্খবাবু কোনো সভাতে আলোকস্তম্ভ হিসেবে উপস্থিত হলে, সকলেই ধরে নিতেন তিনি কিছু বলবেন না। বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে তাঁর নিজের কিছু বক্তব্য থাকলে, নিজেই উঠে এসে কথা বলতেন।

একবার বাংলা আকাদেমিতে দর্শকদের জানার সুযোগ হয়, তাঁর এই কথা না বলবার কারণ। সে বারে পঙ্কজ সাহার কবি-জীবনভিত্তিক একটি অনুষ্ঠানে শঙ্খবাবু জানালেন, এক বিশেষ রোগের জন্যে দীর্ঘ দিন উনি কথা বলতে পারতেন না, সে সময়ে পঙ্কজবাবু তাঁকে বিদেশ থেকে একটি ছোট মেশিন এনে দিয়েছিলেন। যার সাহায্যে তিনি আস্তে কথা বললেও তা স্পিকারের সাহায্যে বেশ জোরেই শোনা যাবে। সে দিন সভায় এটুকু বলেই তিনি কথার ইতি টানেন। আর নবনীতা দেব সেনের সভায় কিছু বলবার জন্যে ভয়ে ভয়ে সঞ্চালক সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে শঙ্খবাবুর দিকে তাকালে, তিনি যথারীতি মৌন অবস্থানে রইলেন। এমন অবস্থায় নবনীতা দেব সেন শঙ্খবাবুর একটি নতুন নাম দিলেন, ‘বোবা কবি’। যদিও পরে অধ্যাপক দেব সেনের ৭৯-তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে দীর্ঘ  সরস বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে শঙ্খবাবু নবনীতা দেব সেনের এই অভিনব অভিধা গ্রহণ করে নেন।    

‘বোবা কবি’র কলম কোনো দিন চুপ থাকেনি, চুপ থাকেনি তাঁর মুখও। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ঈর্ষণীয় সে সকল ছাত্র-ছাত্রী, যাঁরা তাঁর কাছে পড়বার সুযোগ পেয়েছেন ‘রক্তকরবী’, ‘বিসর্জন’, ‘গোরা’ কিংবা, ‘আধুনিক কবিতা’র মতো বিষয়। যদিও রেকর্ডের ‘গিনেস বই’তে নাম নেই, তবু পঙ্কজ সাহা আজও গর্ব করতে পারেন, শঙ্খ ঘোষের প্রথম ও শেষ যাদবপুরের ক্লাস করতে পারার সৌভাগ্যের মধ্যে দিয়ে। আজও এমন অনেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছাত্র-ছাত্রী আছেন, যাঁরা বিশেষ অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে শঙ্খ ঘোষের ক্লাস করেছেন বলে গর্ব বোধ করেন।

শেষ বারের মতো প্রকাশ্যে – গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায়। ছবি: লেখক

একজন কবির দৈনিক দিনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে নিতে হয় সমকাল, সমমননকেও। শঙ্খবাবু সেই পল্লবিত বৃক্ষ যিনি ধারণ করেছিলেন এক দীর্ঘকালের ক্ষেত্রকে নিজ ছায়াতলে। তাঁর কবিতার ভূমিকা কবিতা হিসেবে ‘সময়’ কবিতাটিকে তিনি চিহ্নিত করতে পছন্দ করতেন সব সময়। তারই শেষ কয়েকটি শব্দে তিনি বলেছেন, তিনি চান ‘অজ্ঞাত সময়’। অনেক প্রাজ্ঞজনের লেখায় আলোচিত হয়েছেন তিনি – তারাপদ আচার্য, সৌরীন ভট্টাচার্য, তপোধীর ভট্টাচার্য প্রমুখ। অনেক পত্রিকার পক্ষ থেকে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে – তবুও যেন আরও চর্চার অপেক্ষা রয়েছে তাঁকে নিয়ে। তিনি নিজেই সম্পূর্ণ একজন প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানের এক একটি স্তম্ভ তাঁর এক একটি ‘নির্মাণ’এর সৃষ্টি। যা নিয়ে নতুন আলোচনার দ্বার তিনি নিজেই অনেকখানি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।

ফিরে আসা যাক জীবনের মধ্য পর্বের আরও একটি ছোটোদের লেখার কথায়। ২০০৩ সালে প্রকাশিত এই বইয়ের নাম ‘ওরে ও বায়নাবতী’। লেখাগুলি লেখা হয়েছে একেবারে শিশুদের জন্যেই। নিজের ছোটোবেলার কথা বলতে বলতেই অনেক না-বলা কথা বুঝি থেকে গেছিল। সেই কবেকার পাবনার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠে পড়ুয়া বালকের স্মৃতির সঙ্গে অনেক জায়গাতেই ধাক্কা লাগছিল এ কালের শিশুদের চাহিদা। ‘বেড়াতে যাওয়ার সিঁড়ি’র একটি লেখায় দাদু আর নাতির কথায় মেলে সেই দুইমুখো কালের গতিই। তাই, যখন আবার ছোটোদের জন্যে ভাবতে হল – লিখতে হল। তিনি তাকালেন নিজের স্বকালের দিকে। উঠে এল নিজের আশেপাশের তথাকথিত আধুনিক মনের শিশু-কিশোররা। এই প্রসঙ্গে বলা যায়, শঙ্খবাবুর ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তনীরা। সেখানে অনেকের সঙ্গে অধ্যাপক বরেন্দু মণ্ডল ভাগ করে নিয়েছিলেন তাঁর এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। মঞ্চে উপস্থিত শঙ্খবাবুর সামনে তিনি বলেছিলেন তাঁর কথা। তাঁর (বরেন্দু মণ্ডল) ভালোবাসার ক্ষেত্র সুন্দরবনের জন্যে নানা সাংগঠনিক কাজের সূত্রে একবার সেখানে একটি সভায় তিনি বলেছিলেন – শঙ্খ ঘোষকে তিনি দেখেছেন। সভা শেষে একটি ছোট্ট মেয়ে এগিয়ে এসেছিল তাঁর কাছে। এসে মেয়েটি বলেছিল, “তুমি শঙ্খ ঘোষকে দেখেছ? সত্যি বলছ তুমি শঙ্খ ঘোষকেই দেখেছ?” বরেন্দুবাবু জানিয়েছিলেন, সত্যিই তিনি শঙ্খ ঘোষকে দেখেছেন, এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলারও সৌভাগ্য হয়েছে তাঁর। মেয়েটি এ কথা শোনার পরে চুপ করে বরেন্দুবাবুর হাতটি ধরে নেয়। সে মনে মনে স্পর্শ করে নিতে চায় শঙ্খ ঘোষকে। চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠের বালকটির কথা সে জানে, সে পড়েছে তাঁদের পাঠ্য ‘আয় আয় আরো বেঁধে বেঁধে আসি’- সে জানে না মানুষটি কে, কী তাঁর কাজের পরিসীমা! তবু সে নিজের মনের সঙ্গে মানুষটিকে মিলিয়ে নিতে চায়। সে ভাবে সত্যিই শঙ্খ ঘোষ সেই আশ্চর্য জগতের একজন, যিনি পারেন একজন শিশুর মতো করেই – শিশুর মনের কথাকে বের করে আনতে। বরেন্দুবাবুকে ছুঁয়ে যেন সে প্রণাম জানায় শঙ্খবাবুকে।

সেই গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালায়। ছবি: লেখক

দু’টি বইয়ের কথা বলতে গিয়ে নানা কথার ভিড় হয়ে গেল, সময় বলবে এমন ভিড় ভালো নয়। কেউ বা অদৃশ্যে তর্জনী তুলে ধরবে। আসলে শঙ্খ ঘোষের একটি বা দু’টি গ্রন্থকেন্দ্রিক আলোচনার থেকেও বেশি প্রয়োজন সামগ্রিক অর্থের শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে চর্চা- যা বাঙালির শিরদাঁড়াকে নির্দেশ করে দিয়েছে এবং দেবেও। কিছু ঘটনার অবতারণা আসলে, সেই পথের দিকেই নির্দেশ করে তাঁর ‘তর্জনী’। শেষ বারের জন্যে গগনেন্দ্র শিল্প প্রদর্শশালাতে এলেন তিনি সময়ের শাসন মেনে ‘আননবদ্ধ’ অবস্থায়। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত ‘পাঁচটি তারার তিমির’ (সদ্য প্রয়াত অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, সুধীর চক্রবর্তী, অরুণ সেন, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দেবেশ রায় বিষয়ক) শীর্ষক একটি বিশেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপক প্রদর্শনী দেখতে, তখন যাওয়ার আগে মৃদু স্বরে বলে গেছিলেন, ‘আমার ওপরেও জিনিসপত্র সংগ্রহ শুরু করতে পার।’

একবার, তাঁর নামে প্রেরিত একটি চিঠিতে ‘শ্রী’ শব্দটি সামান্য ছেড়ে লেখা হয়েছিল। তিনি সেটি দেখেও মুচকি হেসে বলেছিলেন, “এত তাড়াতাড়ি মেরে ফেললে?” নামের সঙ্গে লাগোয়া হয়ে ‘শ্রী’ শব্দের ব্যবহার বিষয়ে বাঙালি এখনও উদাসীন। অনেক বিখ্যাত জীবিত ব্যক্তিও এ ভাবেই মৃতপ্রায় হয়ে ঘুরে বেড়ান। আর, ‘শ্রীযুক্ত’র চল তো প্রায় উঠেই গেছে।

স্বাধীনতাকামী ভারতবর্ষের ক্রান্তিকালে চন্দ্রবিন্দু বসাতে হয়েছিল শঙ্খবাবুকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ নামটির আগে। সকল বাঙালি জাতিকে এখন আরেক স্বাধীনতাকামী ভারতবর্ষের ক্রান্তিকালে চন্দ্রবিন্দু বসাতে হল শঙ্খ ঘোষের নামের আগেও। যদিও তাঁর তর্জনী নিশ্চিত উঁচিয়ে থাকবেই – তাঁর নামের পাশে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার সকলের কাছে এক নতুন দায়বদ্ধতার জন্ম দিয়ে গেল। শঙ্খ ঘোষ সেই দায়বদ্ধতারই আরেক নাম। আর, তাই তো ‘ওরে ও বায়নাবতী’র শেষ কবিতা ‘ভালোবাসা’তে তিনি প্রশ্ন রাখবেন, ‘ওমা, আমাকে ভালোবাসো না মা?’  

আরও পড়ুন: প্রয়াত শঙ্খ ঘোষ, শোক প্রকাশ নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন