Connect with us

প্রবন্ধ

রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় ইয়েচুরি ও রাহুল, জল মাপছেন মমতা

mamata at jantar mantar

প্রশান্ত ভট্টাচার্য

ক্রিকেটীয় পরিভাষায় নিখুঁত টাইমিং নয়, রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই এক মঞ্চে থেকেও থাকলেন না সীতারাম ইয়েচুরি, ডি রাজা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৩ ফেব্রুয়ারি দিল্লির যন্তরমন্তরে নিজেদের বক্তব্য রেখে ইয়েচুরি ও রাজা মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরই আবির্ভাব হল মমতার। রাজনৈতিক নিন্দুকরা বলছেন, এটাও ‘সেটিং’। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনেকেই তা মনে করেন না। তাঁদের বিশ্লেষণ, একই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যন্তরমন্তর মঞ্চ থেকে ঘোষণা করেন, “বাংলায় সিপিএম, কংগ্রেসের সঙ্গে আমাদের লড়াই কিন্তু জাতীয় স্তরে আমরা এক সঙ্গে।”

ঠিক একই রকম রাজনৈতিক কমিটমেন্ট থেকে এসইউসিআই (কমিউনিস্ট) দল বামদের ৩ ফেব্রুয়ারির ব্রিগেড থেকে দূরে থাকে। এটাকে কমিউনিস্ট পার্টির দিক থেকে রণনীতি ও রণকৌশলগত সমীকরণ বলা যেতে পারে। রণকৌশলগত ভাবে বিজেপি ও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে যত বেশি সংখ্যক দলের ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব, সে দিকে নজর রেখেই রাজা ও ইয়েচুরি যন্তরমন্তরের ধরনামঞ্চে হাজিরা দেন। ভবিষ্যতেও দেবেন। আবার বাংলার সংগঠনের কথা বিচার করে মমতার মেট্রো চ্যানেলের ধরনাকে সমর্থন তো করবেনই না পরন্তু ‘দিদি-মোদী সেটিং’ বলে কটাক্ষ করবেন। ভুলে যাবেন নিজেদের অতীতকে!

আরও পড়ুন পুলওয়ামা হামলা: ভোট নিয়ে গুজরাতি মন্ত্রী যা চান, তা কি মোদীজিরও মনের কথা?

আবার এই রাজনৈতিক বোঝাপড়া থেকেই রাজ্য সরকার বনাম সিবিআই টক্করে মমতার পাশে থাকে সিপিআই (এমএল)। দলের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, “সামনে লোকসভা নির্বাচন। ঠিক সেই সময় সিবিআইকে কাজে লাগিয়ে তদন্তের নামে রাজ্য সরকারের ওপর হামলা করছে কেন্দ্র। আমরা এর তীব্র নিন্দা করছি। বিজেপি নেতারা রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন চাপিয়ে দেওয়ার রব তুলছেন। দেশের সংবিধান ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে মোদী সরকারের চক্রান্ত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।” কেন্দ্রের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে রাজ্যবাসীকে সরব হওয়ার ডাক দিয়েছেন দীপঙ্কর।

আলিমুদ্দিন নিয়ন্ত্রিত বামদলগুলো বলতেই পারে, বাংলায় সিপিআই (এমএল)-এর কোনো দায় নেই, ওদের তাই অনেক কিছু মানায়! হবেও বা। কিন্তু এ প্রসঙ্গে সিপিএম পলিটব্যুরোর পক্ষ থেকে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি দেওয়া একটি বিবৃতি উল্লেখ করা যেতে পারে – “The use of central investigating agencies by the ruling party for political purposes should be a matter of serious public concern।” এই বিবৃতির পিছনের কারণ, লাভলিন কেলেঙ্কারিতে তখন অন্যতম অভিযুক্ত কেরল সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক পিনারাই বিজয়ন। সিপিএম পলিটব্যুরো লিখেছিল, ‘”কেরলের সিপিআই (এম)-এর রাজ্য সম্পাদক বিজয়নের বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা। এখন লোকসভা ভোটের আগে ফের এই মামলায় তৎপরতা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করা গুরুতর চিন্তার বিষয়, এই রাজনৈতিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে সিপিআই(এম) জনগণের কাছে যাবে।”

আরও পড়ুন ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত বঙ্গের দুই ‘মার্কস’ প্রায় ‘অকেজো’, অপেক্ষায় রয়েছে সময়!

আর এখানেই উঠছে প্রশ্ন, ছোট আঙারিয়া থেকে লাভলিন, দুর্নীতি মামলায় যে সিবিআইকে কেন্দ্রের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার বলে দিস্তা-দিস্তা খসড়া লিখেছেন মুজফফর আহমেদ ভবন বা এ কে গোপালন ভবনের কর্তারা, সেই সিপিএম বা বামরা এখন ইষ্টমন্ত্র জপের মতো সিবিআই জপছে। তারাই আজ বাংলায় সেই কেন্দ্রীয় সংস্থার তৎপরতা দাবি করে মিটিং-মিছিল করছে! এ-ও কি রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা!

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলো ঠিক কী কারণে কখন তদন্তে গতি এনে তৎপরতা দেখায় বা কখন প্রকারান্তরে ‘ঘুমিয়ে’ পড়ে, তা নিয়ে বামপন্থীদের বরাবরই একটা  পরিষ্কার অবস্থান ছিল, ব্যাখ্যা ছিল ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাগুলোর উদ্দেশ্য ও ভূমিকা সম্পর্কে। এখন কেমন ঘেঁটে গিয়েছে। একটা সুবিধাবাদী চর্চা এসে গিয়েছে। অথচ মতাদর্শভিত্তিক রাজনীতির কারবারিদের কাছে গুরুত্বের দিক থেকে রণনীতি এবং রণকৌশল সমান জরুরি। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কখনও রণনীতি অগ্রাধিকার পায় আবার কখনও উলটোটা।

আরও পড়ুন পৌনে পাঁচ বছর পর অন্তিমকালে কেন সিবিআই : মেরুকরণের অঙ্কে ফায়দা দিল্লি-কলকাতার

জানি না, যখন বিজেপিকে ঠেকানোটা ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে হিতকর বলে মনে করা হচ্ছে, তখন কি কে এক ছটাক, কে এক পোয়া, কে দেড় সুতো চোর, তা বিচার করাটা রণনীতি না রণকৌশল! যে চিটফান্ড নিয়ে এত রোল উঠেছে, বাম আমল তো তার আঁতুড়ঘর। এমনকি, এই সংস্থাগুলোর মধ্যে বহুচর্চিত সারদা, রোজভ্যালি এবং অ্যালকেমিস্ট-এর জন্ম ও বৃদ্ধি তো বৌদ্ধ শাসনে! পরে সেই চিটফান্ডগুলোর রমরমা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনে। তাই সময়ের দাবি মেনেই বিজেপিকে প্রধান শত্রু চিহ্নিত করেও তৃণমূলকে অস্পৃশ্য রাখাটাই বাংলার সিপিএম ও কংগ্রেসের ঐতিহাসিক নিয়তি। আর সাংগঠনিক ক্ষেত্রে এক দিকে যেমন বিজেপি আগ্রাসন চালাচ্ছে, অন্য দিকে তেমন তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্যে ঘর রক্ষা কঠিন হয়ে গিয়েছে। অতএব রণকৌশলকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া আর কী-ই বা করতে পারেন সূর্যকান্ত মিশ্র-সোমেন মিত্ররা? ফলে এই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে মান্যতা দিয়েই দলের প্রধান হিসাবে সীতারাম ইয়েচুরি বা রাহুল গান্ধীকে বলতেই হবে, বেঙ্গল লাইন জিন্দাবাদ।

 

প্রবন্ধ

স্বাস্থ্যসাহিত্য: আত্মহত্যা থেকে বাঁচা

দীপঙ্কর ঘোষ

সত‍্যকাম ভরা সন্ধ্যায় আমগাছটার তলায় বাদুড়ে ঠোকরানো আমগুলোর সঙ্গেই অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিল। পচা আম, বৃষ্টিতে পচা পাতা আর দেশি মদের গন্ধে চারপাশ ম ম করছে। না, এই সত‍্যকাম জবালপুত্র নয়, অতিরিক্ত মদ‍্যপানে চাকরি থেকে বিতাড়িত এক স্কুলমাস্টার। সামনের পথ দিয়ে বহু লোক গেছে। মাস্কের ওপরে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে। হেরে যাওয়া মাতালের গন্ধ সহ‍্য করা খুব মুশকিল।

ব‍্যাঙ্কের চাকরি শেষ করে কৃষ্ণা একটু গভীর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছিল। ওই রাস্তা দিয়েই। আগে সত‍্যকামের সঙ্গে প্রতি দিন বাসে দেখা হত। সত‍্যকাম একটা সাদামাটা আটপৌরে সংসারি মানুষ। বাসস্টপেজে হয়তো দু’টো কথাও হত। ও জানে সত‍্যকামের বৌ গরিমা। কৃষ্ণা একলাবাসী, অবিবাহিতা। পড়ে থাকা অচেতন একটা মানুষ দেখে কৃষ্ণা এগিয়ে গেল। পচা পাতা পায়ে দলে, আধখাওয়া আমে হোঁচট খেয়ে। আরে, এ তো চেনা লোক! অসাড়ে পড়ে আছে। কৃষ্ণা দ্বিধা করল। ভাবল। তার পর রাস্তায় ফিরে এসে একটা রিকশা ডাকল।

লকডাউনে রাস্তা অন্ধকার। চমৎকার ঝকঝকে আকাশে বৃহস্পতি জ্বলজ্বল করছে। বাড়িতে বাড়িতে টিভি – প্রতিটি বাড়িতে একপাল সম্মোহিত বিচ্ছিন্ন মানুষ বহু বার দেখা সিনেমায় নিবদ্ধদৃষ্টি বসে আছে।

“দিদি, ইনি তো ইস্কুলের ম‍্যাস্টর ছিলেন। মাল খাউয়ার জন‍্যি চাকরি গেছে…।”

রিকশাওয়ালা বকতে বকতে চলে। কৃষ্ণা ঘামতেল-মাখা কপালে আঁচল বোলায়। লকডাউনের মৃদু হাওয়ায় ওর ঝুরো চুল উড়ে যায়।

“আসলে কী হল জানো দিদি?” মধ‍্যবয়সিনী কৃষ্ণা এ পাড়ার বহু দিনের বাসিন্দা – কার‌ও দিদি, কার‌ও বা মাসি।

“ম‍্যাস্টরের বউ বহু কাল হল ছেড়ে চলে গেছে। শুনেছি ম‍্যাস্টরের নাকি ক্ষ‍্যামতা কম…”, রিকশাওয়ালা দম নেয়। দু’ জনে মিলে সত‍্যকামের এলিয়ে পড়া দেহটা বিছানায় শুইয়ে দেয়। রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে কৃষ্ণা একটুখানি বসে, এক গেলাস জল খায়, তার পর পাশের পাড়ার ওর এক বান্ধবীকে ফোন করে। সুজাতা। সে ডাক্তার। সুজাতা আধ ঘণ্টা পরে এসে পৌঁছোয়।

“শোন কৃষ্ণা, এটা শুধু মদের ওভারডোজ নয়, খুব সম্ভব ভদ্রলোক অন‍্য কোনো কিছুও খেয়েছেন। বাই দ‍্য ওয়ে ইনি সেই স্কুলটিচার না?”

মফস্‌সল শহরে সবাই মোটামুটি সবাইকে চেনে। সকলের কুৎসা সবাই খুব উপভোগ করে। আসলে হেরে যাওয়া আর স্বপ্ন-অসম্পূর্ণ একদল মানুষ অন‍্যের পতনে একটা অনৈসর্গিক আনন্দ পায়। এই লকডাউনের বাজারে একটু রাত হলেই কোনো যানবাহন পাওয়া দুষ্কর। তাই আরেকটা ভ‍্যানগাড়ি ডেকে সত‍্যকামকে বন্ধ হয়ে থাকা দোকান-বাজার পার করে নিয়ে যাওয়া হল কাছের একটা নার্সিংহোমে। পুলিশ কেস। বন্ড স‌ই। একটুও দ্বিধা না করে সুতোয় বাঁধা কলম দিয়ে কৃষ্ণা স‌ই করে দিল। তার পর স্টম‍্যাকওয়াশ, আরও কত কী সব চলল।

রবিবার ডাক্তারবাবু বাড়ির লোককে দেখা করতে বলেছেন। সত‍্যকামের বাড়ির ঠিকানায় কৃষ্ণা এর মধ্যে দু’ বার গেছে। কিন্তু একটা জং পড়া তালা আর শ‍্যাওলা ধরা দেওয়াল ছাড়া কিছুই দেখতে পায়নি। সত‍্যকাম ওর বউয়ের যে ফোন নম্বরটা দিয়েছে তাতে কেউ সাড়া দিচ্ছে না। বাকি নম্বরগুলোয় সবাই ব‍্যস্ত, সময় নেই। একজন বলল, “টাকার প্রয়োজন হলে হসপিটাল বিল কত হয়েছে জানালে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।” শুধুমাত্র টাকা নিয়ে কি মানুষ বাঁচে?

এই সব ভাবতে ভাবতে কৃষ্ণা তিনতলার কোনার রুমে সত‍্যকামের বিছানার পাশে একটা টুল নিয়ে বসল। পাশের জানলা দিয়ে দূরের সবুজ দেখা যাচ্ছে। নারকেল, কলাগাছের ভিড়। মধ‍্য আষাঢ়ে আকাশে এক কোনায় ঘন কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছে। সত‍্যকাম অন‍্য মনে জানলায় চোখ মেলে বসে আছে। আজ অনেক ফিটফাট। দাড়ি কামানো। গায়ে পাউডারের গন্ধ। মা যখন হাসপাতালে ছিল তখনও কৃষ্ণা এই গন্ধটা পেত। নার্সদিদি একটা হুইলচেয়ার নিয়ে এসে সত‍্যকামকে বসাল। শূন্য প্রাণ সত‍্যকাম একটা কথাও না বলে সেটায় বসল।

নার্সদিদি বললেন, “আসুন দিদি, ডাক্তারবাবুর চেম্বারে যাই।”

এক তীক্ষ্ণ নাসা ডাক্তার। কাঁচাপাকা চুল তাঁর। একটা বড়ো বিদ‍্যাসাগরী টাক‌ও আছে। সরু লম্বা লম্বা আঙুলগুলো টেবিলে দাগ কাটছে।

“বসুন।”

জড়ভরতের মতো সত‍্যকাম ওঁর সামনের চেয়ারে বসল। কৃষ্ণা পাশেরটায়।

“বাড়ির কাউকে পাওয়া গেল?”

কৃষ্ণার ম্লান হাসি দেখে বৃদ্ধ ডাক্তার উত্তরটা বুঝে নিলেন।

“এই যে স‍্যোশাল মিডিয়ায় সবাই বলছে পাশে থাকুন, হাত বাড়িয়ে দিন – এর পাশে এখন দরকার একজন একান্ত আপনার জন। যে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে পারবে – আমি আছি, তুমি নিশ্চয়ই ভালো হবে, হবেই।”

কৃষ্ণা আনমনে আঙুলে শাড়ির আঁচলটা পাকায়। তার পর সোজা চোখে জানতে চায়, “এ রকম কেন হয় ডাক্তারবাবু? কেন কেউ কেউ জীবনের এই সব ওঠা-পড়া মেনে নিতে পারে না…হেরে যায়…পালিয়ে যেতে চায়?”

বুড়ো ডাক্তার উত্তর না দিয়ে সত‍্যকামকে প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা সত‍্যকামবাবু, আপনি মরে যেতে চাইছেন কেন?”

সত‍্যকাম টেবিলে চোখ নিবদ্ধ রেখে বলে ওঠে, “ডাক্তারবাবু, আপনি জানেন তো? ইয়োর ডেজ আর নাম্বারড, আমারও। প্রতিটা দিন গোনা আছে – যে দিন নম্বরটা লেগে যাবে আপনাকে যেতে হবেই।”

সত্যকাম একটু ক্ষণ ভাবে। একটু যেন দ্বিধা করে, “তা হলে জীবনযাপনের এই অসহ্য কষ্টটা বেশি দিন কেন ভোগ করব? আমার যাওয়ার দিনটা আমিই ঠিক করে নিলে ক্ষতি কীসের? ইচ্ছামৃত‍্যু – ভীষ্মের মতো?”

সত‍্যকামের মুখে একটা ক্লান্ত হাসি ফুটে ওঠে।

কৃষ্ণা শিউরে ওঠে। প্রতিটি কথা কী ভয়ানক বাস্তব। কী অসম্ভব যন্ত্রণাসঞ্জাত এই বাক্যবন্ধ। এ মানুষকে কে বাঁচাবে?

“আপনি কত দিন ধরে এই সব ঘুমের ওষুধ খাচ্ছেন?”

“বহু দিন…অনেক দিন ধরে…যখন মাথার মধ্যে অসম্ভব কষ্ট হয়…রাতে বিছানায় থাকতে পারি না…পাগলের মতোন…মনে হয় রাস্তায় গিয়ে গাড়ির সামনে…বিশ্বাস করুন আমি ওই ঘুমের বড়ি না খেলে ঠান্ডা মাথায় ক্লাস‌ও নিতে পারতাম না… তবু ঘুম হতো না…একটা থেকে দু’টো…তার পর আর‌ও বেশি…অনেক অনেক ওষুধ খেতাম। তবুও ওই কষ্টটা আমাকে… ওই অস্থিরতা…রাত হলেই মনে হত চিৎকার করে কাঁদি…দেওয়ালে মাথা ঠুকি…সঙ্গে ছিল মদ…মদ কেনার অত পয়সা কোথায় পাব…কী হবে এ ভাবে বেঁচে থেকে? প্রতি দিনের এই একঘেয়ে বমি করার মতো করে কাজ উগরে দেওয়া? তার পর এক রাত অস্থিরতা…কষ্ট…।”

সত‍্যকাম টেবিলে মাথা রাখে, “আমি একজন স্পোর্টসম‍্যান – হার স্বীকার করে নিচ্ছি ডাক্তারবাবু। ব্রাজিল যেমন জার্মানির কাছে সাত গোলে হেরে গেছিল, তেমনি আমি একটা হেরো মানুষ – জীবনের খেলায় গোহারা হেরে গেছি। আমি তা হলে এ বার আসি ডাক্তারবাবু?”

সত‍্যকাম কুঁজো শরীর আর কালি পড়া চোখ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কাঁপা কাঁপা হাতদু’টো জোড় করে নমস্কার করে।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যসাহিত্য: বাড়ির পুজো আর সেই গোপন কথাটি

ডাক্তার মুখ থেকে মাস্ক নামিয়ে হাসেন, “যেতে তো হবেই সত‍্যকাম – ছুটি হয়ে গেছে – ওই যে কার একটা গান আছে না? পেয়েছি ছুটি বিদায় দেহ ভাই? যাবার বেলায় এক কাপ চা তো খেয়ে যান। আর আপনার এই আত্মীয়টি একটা প্রশ্ন করেছিল, কেন এ রকম হয়? ওটার উত্তর দেওয়া বাকি আছে তো। চা পান করতে করতে আমরা একটু কথা বলি?”

ডাক্তারের বিষণ্ণ চোখ দু’টিতে কৌতুক খেলা করে। এই করোনাকালে একমাত্র এই ডাক্তারবাবুই আসছেন, রোগী দেখছেন। সে ক্ষেত্রে এঁর কথা ফেলাও যায় না।

“উষা, তিনটে চা দিবি মা?”, ডাক্তার সহকারীকে হাঁক পাড়েন, “আমাদের এখানে কিন্তু সব‌ই গুঁড়ো চা, দুধ-চিনি সহ।”

কৃষ্ণা বলে ওঠে, “এ মা! তাতে কী? আমাদের সব চলে।” ‘আমাদের’ কথাটা বলে কৃষ্ণা নিজেই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।

চায়ে চুমুক দিয়ে বৃদ্ধ বলতে আরম্ভ করেন, “আমাদের মানুষদের মধ্যে অনেক রকম মানসিকতা দেখা যায় – রগচটা, বদরাগী, নরমসরম, স্নেহপ্রবণ প্রভৃতি। এগুলোর অনেকগুলোই হর্মোন রিলেটেড। অক্সিটোসিন বেশি বেরোলে স্নেহপ্রবণ, আবার ভ্যাসোপ্রেসিন বেশি বেরোলে বদরাগী। আবার অনেক ক্ষেত্রে মাথার ঘিলুর কোনো কোনো জায়গা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। ও সব কথা থাক – এ কি সত‍্যকাম চা তো জুড়িয়ে গেল। নাও নাও শুরু করো, এখানে তো আমরা আর দারুর বোতল দিতে পারব না…।” সত‍্যকাম হেসে চায়ে চুমুক দেয়।

“আমাদের ভালো লাগা, আনন্দে থাকা, এগুলো সেরোটোনিন নামে আমাদের নার্ভের একটা রাসায়নিক যার ডাক্তারি নাম নিউরো ট্রান্সমিটার তার ওপরে নির্ভর করে। এটা যদি একেবারে টইটুম্বুর হয়ে থাকে তা হলে ঘুম থেকে উঠে সূর্য উঠলেই মনে হবে, আঃ কী চমৎকার সকাল… সমস্ত দুঃখ সহ‍্য করাটা সহজ হয়ে যাবে।” সত‍্যকাম কৃষ্ণা দু’জনেই ঘাড় নাড়ে।

“যত আমরা চাপের মধ্যে থাকব, ততই আমাদের ভালো রাখার জন্য নার্ভগুলো সেরোটোনিন খরচ করবে। হ‍্যাঁ আবার তৈরিও হবে” – বৃদ্ধের চোখ সত‍্যকাম আর কৃষ্ণার মুখে ঘুরতে থাকে।

“যতটা খরচ হয় আবার সেটা তৈরিও হয়ে যায়। আমি কিন্তু খুব সহজ করে বলছি। এখন বয়স যত বাড়বে ততই নানা চাপে চিন্তায় সেরোটোনিন বেশি বেশি খরচ হবে। আবার যারা ভয়ানক চাপের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটায় তাদের সেরোটোনিন যেমন তাড়াতাড়ি খরচ হয় তেমনই উৎপাদন‌ও কমে আসে।”

বৃদ্ধ একটা সিগারেট বার করে বলেন, “উইথ ইয়োর কাইন্ড পারমিশন।”

তার পর অনুমতির তোয়াক্কা না করেই খচখচ করে দেশলাই জ্বেলে হুশ হুশ করে ধোঁয়া ছাড়েন।

কৃষ্ণা বলে, “ইস কী বাজে নেশা…এটা ছেড়ে দেবেন আপনি। কিন্তু সেরোটোনিন কমে গেলে কী হয়?”

বুড়ো ডাক্তার চায়ের গেলাসে ছাই ঝাড়েন।

“হুম গ‍্যুড ক‍্যোয়েশ্চন। প্রথমত, ঘুম কমে আসবে…ভোররাতে ঘুম ভেঙে যাবে এটাকে বলে লেট ইনসমনিয়া। বুক ধড়ফড় করবে, ঘাম হবে…সেক্সুয়াল ইচ্ছে টিচ্ছে একদম চলে যাবে। পরের দিকে অসম্ভব দুশ্চিন্তা আসবে, শুয়েও ঘুম আসবে না – অস্থিরতা আসবে – শুলেই সারা দিনের বা সারা জীবনের কথাবার্তা, কাজকর্ম – স‌অঅব মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকবে অর্থাৎ আর্লি ইনসমনিয়াও হবে এবং ফলে যেটা ভীষণ স্বাভাবিক সেই বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা আস্তে আস্তে চলে যাবে।”

সত‍্যকাম ঘাড় নাড়ে। সে সহমত।

কৃষ্ণা অস্ফুটে বলে, “বাঁচার ইচ্ছে চলে যাবে? বুঝলাম না।”

ডাক্তার আরেকটা সুখটান দিয়ে বলেন, “প্রথম প্রথম নিজের মৃত্যু-দৃশ‍্য কল্পনা করে নিজেই চোখের জল ফেলবে। তার পর মৃত‍্যুর পদ্ধতি কল্পনা করবে – এবং সেটাকে বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করবে এবং শেষকালে…।”

ডাক্তার সিগারেটে আরেকটা টান দেন। সত‍্যকাম এখন আর ওঠার চেষ্টা করছে না দেখে ডাক্তার বলেন, “সত‍্যকাম বেঁচে থাকা বড়ো কষ্টের – তাই না? যেমন ক‍্যানসার ছড়িয়ে পড়লে যন্ত্রণায় রোগী মরতে চায় ঠিক তেমনই?”

সত‍্যকাম নিরুত্তর।

“আর যদি এই যন্ত্রণা কমে যায়? তা হলে? তা হলে যে প্রাণ তোমার মা-বাবা দান করেছেন, ভালোবাসায় যত্নে বড়ো করেছেন, তাঁদের সেই দান নষ্ট করার কোনো অধিকার কি তোমার থাকবে? যাও, বাড়ি যাও, তোমার সব কষ্ট আমি নিয়ে নিলাম। ঠিক সাত দিনের মধ‍্যে তোমার সকাল আবার ছোটোবেলার মতো বর্ণময় হয়ে উঠবে – শুধু ওষুধটা ঠিক মতো খাবে…যাও ফিরে যাও।”

ওরা একটু এগোতেই বুড়ো পিছু ডাকেন, “এই যে মামণি, এক বার একটা কথা শুনে যাও।”

কৃষ্ণা ফিরে আসে।

“আর দ‍্যাখো মা, ও যেন আর একা না থাকে।”

টাকাপয়সা মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গভীর। কৃষ্ণার বাড়িতে একটা ঘুপচি কামরা আছে। যত রাজ‍্যের সব অকেজো জিনিসে বোঝাই। ফিরেই সত‍্যকাম সেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে ছিল। দু’জনে এ ভাবে থাকা সমাজ তো মানবে না। ওকে ফিরে যেতে হবে…নিজের একলা ঘরে।

একটু পরে কৃষ্ণা দরজা ঠকঠক করে ডাক দিল, “চা করেছি, খেতে আসুন।”

সত‍্যকাম ধীরে ধীরে দরজা খুলে বারান্দায় চেয়ারে এসে বসে। ম‍্যাক্সি পরা কৃষ্ণার শরীর শিল‍্যুয়েটে থাকে। জোনাকিরা ঝাড়বাতি জ্বালে। ব‍্যাঙ আর ঝিঁঝিঁপোকার কলতানের মধ্যেই সত‍্যকাম চায়ের কাপে ঠোঁট ঠেকায়। সত‍্যকাম বেঁচে ওঠো।

চিত্রাঙ্কন: লেখক

(লেখক একজন চিকিৎসক)

Continue Reading

প্রবন্ধ

রথযাত্রায় কাঠামোপুজো, বনেদিবাড়ির পুজোর সূচনা

শুভদীপ রায় চৌধুরী

আজ আষাঢ় ১৪২৭, মঙ্গলবার। রথযাত্রার পুণ্যতিথিতে আজ বিভিন্ন বনেদিবাড়ির এ বছরের শারদীয়া দুর্গাপুজোর সূচনা হবে। এই রথযাত্রা থেকে উলটোরথ অবধি বঙ্গের বহু প্রাচীন বনেদিবাড়িতে কাঠামোপুজো অনুষ্ঠিত হবে নিষ্ঠার সঙ্গে, যা এত বছর ধরে হয়ে আসছে। দেবী কাত্যায়নীর আরাধনা এই সমস্ত পরিবারে বহু বছর ধরে হয়ে আসছে এবং বর্তমান সদস্যরা সেই ধারাবাহিকতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে চলেছেন। তাই আমি আজ কয়েকটি পরিবারের কাঠামোপুজোর কথাই তুলে ধরলাম।

দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ি

এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনা হয় রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ি বলতেই সবাই এক ডাকে চেনেন নীলমণি মিত্রের বাড়িকে। নীলমণি মিত্রের নাতি রাধাকৃষ্ণ মিত্র এই দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন। এই বাড়ির পুজো হয় বৃহৎনান্দীকেশ্বর পুরাণ মতে। ঠাকুরের চালচিত্র হয় মটচৌরির আদলে। ষষ্ঠীর দিন কুলদেবতা শ্রীশ্রীরাজরাজেশ্বরকে সাক্ষী রেখে পুজো শুরু হয়। বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই বাড়ির সন্ধিপূজায় ১০৮ পদ্মের পরিবর্তে ১০৮ অপরাজিতা নিবেদন করা হয়।

জোড়াসাঁকোর দাঁ পরিবার

এই বাড়ির দুর্গাপুজোর সূচনাও হয় রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে। এমন প্রবাদ রয়েছে, দেবী এই দাঁ বাড়িতেই আসেন গয়না পরতে। এই বাড়ির পুজোর প্রতিষ্ঠাতা গোকুলচন্দ্র দাঁ। ১৮৪০সালে পুজো শুরু হয়। পরিবারের বংশধর শিবকৃষ্ণ দাঁ জার্মানি আর প্যারিস থেকে হিরে, এমারেল্ড জুয়েলারি আর একচালার চালচিত্র সাজানোর জন্য তবক নিয়ে এসেছিলেন। দেবী আকারে প্রায় ১২ ফুট লম্বা ও ১০ ফুট চওড়া। দেবী এখানে পূজিত হন বৈষ্ণবমতে, তাই বলিপ্রথা নেই এই পরিবারে। এই পরিবারের বৈশিষ্ট্য অষ্টমীর দিন সন্ধিপূজার নৈবেদ্য সাজান বাড়ির ছেলেরা।

জোড়াসাঁকো দাঁ বাড়ির পুজো।

চোরবাগান শীল পরিবার

রামচাঁদ শীল ১৮৫৬ সালে এই পরিবারে দুর্গাপুজো শুরু করেন। শীল পরিবারেও রথের দিন কাঠামোপুজো অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টমীর দিন সকলে হয় ধুনো পোড়ানো আর দুপুরে হয় গাভীপুজো। নবমীতে কুমারীপুজোর সঙ্গে সঙ্গে সধবা পুজোও। এই পরিবারে সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে দেবীর আরাধনা হয়, ভোগে থাকে লুচি, ভাজা, তরকারি, শিঙাড়া, কচুরি ইত্যাদি। এই পরিবারের বৈশিষ্ট্য হল দেবীর দুর্গার হাতে খাঁড়ার পরিবর্তে থাকে তলোয়ার।

খড়দহের গোস্বামী পরিবার

এই পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু আনুমানিক ১৪৫২ শকাব্দে (১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ)। এই বাড়ির পুজো শুরু হয় উলটোরথের দিন একটি চার হাত সমান বাঁশ কিনে গোপীনাথের মন্দিরে কাত্যায়নীর পুজো করে। মেজোবাড়ির দুর্গাপুজো কৃষ্ণানবমী তিথিতেই শুরু হয়, অর্থাৎ ১৫ দিন ধরে চলে দেবীর আরাধনা। এই পরিবারে দুর্গার পাশে লক্ষ্মী-সরস্বতীর স্থানে জয়া-বিজয়া বিরাজমান। কারণ প্রভু নিত্যানন্দ বিশ্বাস করতেন কাত্যায়নী পুজো করলে গৌরকে পাওয়া যায়। এই বাড়ির পুজো হয় বৈষ্ণবমতে, তাই কোনো পশু বলিদান হয় না। তবে এখানে মন্ত্রের সাহায্যে মাসকলাই বলিদান করার প্রথা আছে।

জানবাজারের রাসমণির বাড়ি

জানবাজারের রানি রাসমণিদেবীর শ্বশুরবাড়িতে প্রীতিরাম দাস (শ্বশুরমশাই) এই বাড়ির পুজো শুরু করেন। পরবর্তীকালে রানীর পুজো বলেই বেশি পরিচিত এই পুজো। জানবাজারের এই বাড়ির পুজোও শুরু হয় রথের দিন কাঠামোপুজো করে। মায়ের গায়ের রঙ শিউলি ফুলের বোঁটার মতন অর্থাৎ তপ্ত কাঞ্চনবর্ণ। প্রায় ১৪ ফুট লম্বা এই প্রতিমার গায়ে সোনার নথ, টিপ, পায়ে  রুপোর মল, মাথায় রুপোর মুকুট। এই বাড়ির পুজো বৃহৎনান্দীকেশ্বর পুরাণ মতে হয়। ২০০৩ সাল অবধি ছাগবলি হয়েছে কিন্তু তার পর থেকে চালকুমড়ো, মাসকলাই ইত্যাদি প্রতীকী বলিদান হয়। এই বাড়ির বৈশিষ্ট্য পঞ্চাঙ্গ স্বস্তয়ন অর্থাৎ চণ্ডীপাঠ, মধুসূদন মন্ত্র জপ, মাটির শিবলিঙ্গ পূজা, দুর্গানাম জপ – প্রতিপদ থেকে নবমী অবধি হয়ে থাকে।

কাশিমবাজার ছোটো রাজবাড়ি

বিখ্যাত রেশম ব্যবসায়ী দীনবন্ধু রায় রেশম ব্যবসার জন্য কাশিমবাজারে এসেছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের আনুকূল্যে ফুলে ফেঁপে ওঠে তাঁর ব্যবসা। ১৭৯৩ সালে তাঁকে জমিদারির স্বত্ব দেয় ব্রিটিশ সরকার। রথের দিন এই বাড়িতেও কাঠামোপুজো হয় দেবীর। পরিবারের সদস্যরা এই পুজোর ক’টা দিন রাজবাড়িতেই কাটান। ষষ্ঠীর দিন দেবীর অধিবাস, বোধন হয়। দশমীর দিন এই পরিবারে অপরাজিতা পুজোর প্রচলন রয়েছে। অতীতে পুজোয় বলিদান প্রথা থাকলেও এখন আর বলিদান হয় না। রাজবাড়িতে আগে বিসর্জনের সময় নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর প্রথা ছিল কিন্তু সেই প্রথাও আজ বন্ধ।

হাটখোলা দত্ত পরিবার

হাটখোলা দত্তবাড়ি, ছবি সৌজন্যে: এডি ফটোগ্রাফি

১৭৯৪ সালে হাটখোলায় ভদ্রাসন পত্তন করেছিলেন জগৎরাম দত্ত। তাঁর হাত ধরেই পরিবারের দুর্গাপুজো শুরু। উলটোরথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে শুরু হয় দত্তবাড়ির দেবী আরাধনা। এই পরিবারে দুর্গাপুজো হয় সম্পূর্ণ বৈষ্ণবমতে, তাই পশু বলিদান সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। বলি দেওয়া হয় ক্ষীরের পুতুল। এই বলিদানও আড়ালে হয় কারণ পরিবারের কোনো সদস্যের বলি দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পরিবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এই দত্ত পরিবারে দশমীর দিন নয় অষ্টমীর দিন সিঁদুরখেলা হয়। এ এক বহু প্রাচীন রীতি যা আজও অব্যাহত রয়েছে দত্ত পরিবারে।

কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি

এই পরিবারের দুর্গাপুজোও বহু দিনের। এই বাড়ির দেবী রাজরাজেশ্বরী নামেই পরিচিত, দেবীর সিংহ ঘোটকাকৃতি, দেবীর পরনে লাল শাড়ি, গায়ে বর্ম। রথের দিন কাঠামোপুজোর মাধ্যমে এই বাড়ির পুজোর সূচনা হয়। মহালয়া থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজো। সে দিন ভোরে জ্বালানো হয় হোমকুণ্ড, নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চলে হোম নবমী অবধি। আগে রাজবাড়ি থেকে বিসর্জনের সময় নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হত। সেই প্রথা আজ বন্ধ। তবু ধারাবাহিকতা ও ঐতিহ্য আজও অব্যহত রাজবাড়ির অন্দরে।

Continue Reading

প্রবন্ধ

মুখ থুবড়ে পড়েছে ফুটপাথকেন্দ্রিক সমান্তরাল অর্থনীতি, অভূতপূর্ব সংকটে হকাররা

অর্ণব দত্ত

২০০৮-২০০৯ সালে বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ মন্দার স্মৃতি এখনও আতঙ্কিত করে। তৎকালীন মন্দা পরিস্থিতি থেকে ভারতের অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিল। এর অন্যতম প্রধান কারণ এ দেশের নিম্নবিত্ত মানুষের চাহিদা মেটাতে সচল ছিল বিকল্প অর্থনীতি। 

বিকল্প এই অর্থনীতি ফুটপাথকেন্দ্রিক। ভারতের আশি কোটি মানুষ ফুটপাথ থেকে নানা দ্রব্যাদি কিনে প্রতি দিনের প্রয়োজন পূরণ করেন। পোশাকআশাক থেকে শাকসবজি – এক কথায় ফুটপাথের হকারদের কাছে মিলবে আলপিন টু এলিফ্যান্ট। 

২০০৮ সালে গঠিত অর্জুন সেনগুপ্ত কমিটির পেশ করা রিপোর্ট অনুসারে, এ দেশের অন্তত পক্ষে ৭৭ শতাংশ মানুষ ফুটপাথ থেকে দৈনিক কুড়ি টাকার জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন। সে হিসেবে দৈনিক বিক্রিবাট্টার পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকা।

এটা সমগ্র ভারতের খতিয়ান। করোনার প্রাদুর্ভাবে সারা দেশেই হকারদের মাধ্যমে পরিচালিত বিকল্প অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ দেশের অন্তত পাঁচ কোটি হকার-পরিবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। করোনা বিদায় নেওয়ার পরেও সরকারি আর্থিক সহায়তা ছাড়া হকারদের মাথা তুলে দাঁড়ানো যে সম্ভব নয়, ইতিমধ্যেই সে ব্যাপারে সতর্ক করেছেন হকার সংগঠনগুলির নেতারা।

কলকাতা শহরের ফুটপাথে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন ২ লক্ষ ৭৫ হাজার হকার। মহানগরীর যে কোনো প্রান্তে ফুটপাথ জুড়ে অসংখ্য দোকান। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষের চাহিদা মেটায় ফুটপাথে সাজানো হরেক রকম পসরা।

দু’ একজন চেষ্টা করছেন দোকান খোলার। ছবি: রাজীব বসু।

লকডাউন পর্বে বাঙালির পয়লা বৈশাখ পেরিয়েছে। দেখতে দেখতে কেটে গেল ইদও। আর কয়েক মাস পরে দুর্গোৎসব। লকডাউনে চৈত্র সেলের বাজার পুরোপুরি মার খেয়েছে। কোটি কোটি টাকার বেচাকেনা বন্ধ। ইদেও সেই একই পরিস্থিতি। হকার সংগঠনগুলির আশঙ্কা, আসন্ন পুজোতেও ব্যবসাপত্র ব্যাপক মার খেতে পারে।

লকডাউন কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিল হচ্ছে। এর ফলে নির্দিষ্ট সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কলকাতার হকাররা ফের ফুটে পসরা সাজিয়ে বসলেও ব্যবসা আদৌ জমবে কিনা, এই আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। হকার সংগঠনগুলির নেতাদের মতে, এর অন্যতম কারণ মানুষের হাতে পয়সা নেই। লকডাউনে ইতিমধ্যে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন। ফলে বাজার করার মতো আর্থিক সামর্থ্য বহু মানুষের থাকবে না। ধরে নেওয়া যায়, অনেকেই এ বছর পূজোয় নতুন জামাকাপড় কিনবেন না।

কলকাতার ফুটে বসে যে হকাররা ব্যবসা করেন তাঁদের ৬০ শতাংশই কলকাতার বাসিন্দা। বাকিদের অধিকাংশই মহানগরীতে ব্যবসা করতে আসেন আশপাশের জেলাগুলি থেকে। এ ছাড়া কলকাতার ফুটে যাঁরা হকারি করেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন উত্তরপ্রদেশ, বিহারের বাসিন্দারাও। তাঁরাও সংখ্যায় বেশ উল্লেখযোগ্য। লকডাউনে তাঁদেরও এখন না-চলার দশা। এ দিকে ঘরে ফেরার রাস্তা বন্ধ। দিন চলছে কোনো মতে। যদিও কলকাতার ৮০ শতাংশ বাসিন্দাই হকারদের উপর নির্ভরশীল। 

হকার সংগ্রাম কমিটি সূত্রে জানা গেল, কলকাতা শহরের ২ লক্ষ ৭৫ হাজার হকারের মধ্যে ৪০ শতাংশ মহিলা। দৈনিক যে পরিমাণ সামগ্রী হকাররা বিক্রি করেন, তাতে লভ্যাংশ থাকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ।

এ-ও জানা গেল, কলকাতার হকারদের একটা বড়ো অংশ কেবলমাত্র খাবার বিক্রি করেন। এঁরা মোট হকার সংখ্যার ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া একটা বড়ো অংশ সবজি ও ফলমূল বেচেন। অন্যরা বেচেন পোশাকআশাক কিংবা অন্য নানা ধরনের সামগ্রী। লকডাউনের পর থেকে মহানগরীর ফুটপাত শুনশান। শহরের সর্বত্র একই ছবি।

হকার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক শক্তিমান ঘোষ বললেন, কলকাতা-সহ সারা ভারতে হকাররা লকডাউন পর্যায়ে যে মার খেলেন তাতে ওদের ঘুরে দাঁড়ানো মুশকিল – যদি না সরকারি সহায়তা মেলে। লক্ষ লক্ষ হকারের হাতে এখন পুঁজি নেই। লকডাউনে পুঁজি ভাঙিয়ে সংসার প্রতিপালন করছেন ওঁরা। এ দিকে পুঁজি নেই উৎপাদকের কাছেও। ফলে পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ।

হকার সংগ্রাম কমিটির তরফে সরকারের কাছে ইতিমধ্যে কয়েক দফা দাবি পেশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়েছে, অবিলম্বে আগামী তিন মাস প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে হকারদের নগদ সহায়তা করা হোক। কলকাতা-সহ সারা বাংলার ১৬ লক্ষ হকারকে এই আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য দাবি জানানো হলেও এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে সাড়া মেলেনি।

লকডাউন কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিল হয়েছে। নির্দিষ্ট সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে হকারদের ফুটপাতে বসার অনুমতি মিলেছে। তাতেও পুজোর বাজার জমবে বলে আশা করছে না হকার সংগঠনগুলির নেতৃত্ব। এ ব্যাপারে হকার সংগ্রাম কমিটির বক্তব্য, লকডাউনে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন। এখন সংসার টানতেই তারা হিমশিম খাচ্ছেন। পুজোর বাজার করার মতো উদ্বৃত্ত টাকা বেশির ভাগ মানুষের হাতেই থাকবে না।

দুর্গাপুজোর সময় হকাররা ফি বছর যে পরিমাণ ব্যবসা করেন তাতে দুর্গাপুজোর পরের ৬ মাস চলার মতো পুঁজি তাঁদের হাতে জমে। এ বছর সে আশাতেও জল। এ দিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে হকার সম্প্রদায়ের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা তলানিতে ঠেকেছে।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পসরা নিয়ে বসে জীবন ধারণের চেষ্টা। ছবি: রাজীব বসু।

শহরের নানা প্রান্তে ডালা নিয়ে বসতেন যে হকাররা তাঁদের অনেকেরই এখন খাবারটুকু জোগাড় করারও সংস্থান নেই। মহাজনের কাছে হাত পাতলেও মিলছে না কিছুই।

তা হলে কি লকডাউন উঠে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে? হকার সংগ্রাম কমিটির বক্তব্য, তেমন আশা নেই। লকডাউনে হকাররা যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন তার মোকাবিলা করতে হলে বিশেষত কেন্দ্রীয় সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করে রূপায়িত করতে হবে।

হকার সংগঠনগুলির নেতাদের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত হকারদের ৪ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ মঞ্জুর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়িত করতে হবে কেন্দ্রকে। এ ছাড়া জিডিপির খরচের অনুপাত বাড়াতে হবে। তাঁদের অভিযোগ, দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হল, এ পর্যন্ত হকারদের টিকিয়ে রাখতে কোনো ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি কেন্দ্র।

দরিদ্র মানুষের রোজনামচায় অভিনবত্ব কিছু নেই। দু’ বেলা দু’ মুঠো অন্নের সংস্থানের উপায়ের সন্ধানে তাঁদের দিনগুজরান করতে হয়। এ ছাড়াও আছে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, পরিবারের সদস্যদের অসুখ-বিসুখবাবদ আনুষঙ্গিক খরচ।সে সব কী ভাবে জুটবে তা ভেবে পাচ্ছেন না হকাররা।

হকার সংগ্রাম কমিটির নেতারা জানালেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক। আপাতত হকার পরিবারগুলিকে দু’ মুঠো খাবার জোগাতে মহানগরীতে চালু করা হয়েছে তিনটি কমিউনিটি কিচেন। সেক্টর ফাইভ, বউবাজার এবং অভিষিক্তাতে আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত চলবে কমিউনিটি কিচেনগুলি।

কিন্তু সংকট এতই গভীর যে এ ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সিন্ধুতে বিন্দুসম। লকডাউন পর্বে ভারতের হকারদের দৈনিক ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতির যোগফল চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতোই।

Continue Reading
Advertisement
দেশ16 seconds ago

জেলবন্দি কবি-সমাজকর্মী ভারাভারা রাও করোনা পজিটিভ

রাজ্য2 mins ago

রেকর্ড সংখ্যক নমুনা পরীক্ষার দিন রাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যাতেও রেকর্ড, কমল মৃত্যুহার

বিদেশ1 hour ago

আবুধাবিতে শুরু চিনের করোনা ভ্যাকসিনের চূড়ান্ত পর্যায়ের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ

দেশ2 hours ago

নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে ফের আন্তর্জাতিক উড়ান পরিষেবা চালু করছে কেন্দ্র

বিনোদন3 hours ago

অবশেষে নতুন এপিসোড নিয়ে সাব টিভির পর্দায় ফিরছে ‘তারক মেহকা উলটা চশমা’ও, জেনে নিন কবে থেকে

দেশ3 hours ago

অসমে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ, বিপন্ন কাজিরাঙার বন্যপ্রাণও

রাজ্য3 hours ago

আরও চার হাজার বেড বাড়ছে রাজ্যে, ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

ক্রিকেট3 hours ago

করোনা-নিয়ম লঙ্ঘন, দ্বিতীয় টেস্ট থেকে বাদ ইংল্যান্ডের জোফরা আর্চার

কেনাকাটা

laptop laptop
কেনাকাটা1 day ago

ল্যাপটপ কিনবেন? দেখে নিন ২৫ হাজার টাকার মধ্যে এই ৫টি ল্যাপটপ

খবরঅনলাইন ডেস্ক : কোভিভ ১৯ অতিমারির প্রকোপে বিশ্ব জুড়ে চলছে লকডাউন ও ওয়ার্ক ফ্রম হোম। অনেকেই অফিস থেকে ল্যাপটপ পেয়েছেন।...

কেনাকাটা4 days ago

হ্যান্ডওয়াশ কিনবেন? নামী ব্র্যান্ডগুলিতে ৩৮% ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

খবরঅনলাইন ডেস্ক : করোনাভাইরাস বা কোভিড ১৯ এর সঙ্গে লড়াই এখনও জারি আছে। তাই অবশ্যই চাই মাস্ক, স্যানিটাইজার ও হ্যান্ডওয়াশ।...

কেনাকাটা7 days ago

ঘরের একঘেয়েমি আর ভালো লাগছে না? ঘরে বসেই ঘরের দেওয়ালকে বানান অন্য রকম

খবরঅনলাইন ডেস্ক : একে লকডাউন তার ওপর ঘরে থাকার একঘেয়েমি। মনটাকে বিষাদে ভরিয়ে দিচ্ছে। ঘরের রদবদল করুন। জিনিসপত্র এ-দিক থেকে...

কেনাকাটা1 week ago

বাচ্চার জন্য মাস্ক খুঁজছেন? এগুলোর মধ্যে একটা আপনার পছন্দ হবেই

খবরঅনলাইন ডেস্ক : নিউ নর্মালে মাস্ক পরাটাই দস্তুর। তা সে ছোটো হোক বা বড়ো। বিরক্ত লাগলেও বড়োরা নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝায়।...

নজরে