Connect with us

প্রবন্ধ

বামেদের সঙ্গে জোটের কারিগর প্রণব ‘চাণক্য’ মুখোপাধ্যায়

যখন ইউপিএ গঠিত হল, এবং দৃশ্যপট থেকে সরে গেলেন সুরজিৎ, তখন ইউপিএ-বাম সমন্বয়ের মূল কাজটি প্রণববাবু করতেন সীতারাম ইয়েচুরিকে ডেকে নিয়ে।

Published

on

এক বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনমোহন সিং ও সীতারাম ইয়েচুরি।

দেবারুণ রায়

সারা দেশে বামেদের সঙ্গে জোট গড়ার ভাবনা মূর্ত হয়েছিল প্রণব ‘চাণক্য’ মুখোপাধ্যায়ের (Pranab Mukhopadhyay) মুনশিয়ানায়। প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি থাকলে নিশ্চয়ই সে দিনের এক জ্বলন্ত সাক্ষীর সাক্ষ্য পাওয়া যেত। সূচনা পর্বের আগাগোড়া, জোটের নীল নকশার সূত্রধর ছিলেন সিপিএমের সেই সময়ের সাধারণ সম্পাদক হরকিষেন সিং সুরজিৎ (Harkishen Singh Surjit)। আর নেপথ্যের মহানায়কের নাম বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং (Vishwanath Pratap Singh)। ১৯৯৬-এর ঐতিহাসিক ভুল ভারতীয় রাজনীতির সমকালীন অনুঘটক বামেদের রণনীতি বদলাতে বাধ্য করেছিল। গঠনতন্ত্রের গোঁড়ামি বহাল রাখলেও কংগ্রেসের (Congress) ব্যাপারে ছুৎমার্গ অনেকটাই কাটিয়ে উঠছিল সিপিএম (CPM)। এবং কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়া করে সাম্প্রদায়িকতাকে রোখার লাইনটিকে মাইলফলক বানিয়ে পাদপ্রদীপের আলো থেকে সরে গিয়েছিলেন সিপিএমের নবরত্নসভার শেষ দুই কমরেড। অনেকটাই অবসৃত জ্যোতি বসুকে (Jyoti Basu) সঙ্গে নিয়ে দলে সংখ্যালঘু  সাধারণ সম্পাদক সুরজিৎ নেমেছিলেন পার্টির লাইন বদলের দিশায় ইনার পার্টি স্ট্রাগলে। বাইরের জমি তৈরি করতে সুরজিৎকে সহারা দিয়েছিলেন ভিপি। আর রাজীবের বন্ধু থেকে শত্রু হওয়া ভিপির অক্লান্ত চেষ্টা আর শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যস্থতায় কংগ্রেসের সভানেত্রী সনিয়া গান্ধীর (Sonia Gandhi) ভুল ভেঙেছিল ভিপির বিষয়ে।

ছিয়ানব্বইয়ে সিপিএমের সরকারে না যাওয়ার জেদ দেখে অকংগ্রেসি ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের মুকুটহীন রাজা বিশ্বনাথপ্রতাপ সবাইকে বলেছিলেন, কংগ্রেসকেই জোটের নেতৃত্বে আনা ছাড়া সরকার গড়া বা তা স্থিতিশীল করা যাবে না। বাংলায়, কেরলে সংগঠন বাঁচাতে ভাবের ঘরে চুরি করার রণনীতি বহাল রেখেই সেকুলার জোট গড়তে হবে। এবং কংগ্রেসের নেতা কে হবেন তা নিয়ে কংগ্রেসই মাথা ঘামাবে। বিশ্বনাথের সঙ্গে সম্পর্ক মধুর ছিল না প্রণবের। তাই প্রণবকে সঙ্গে নিয়ে জমি তৈরির কাজে নামলেন সুরজিৎ। বিশ্বনাথ ব্যক্তিগত ভাবে ভোট-রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নিয়েও সনিয়ার সঙ্গে লাগাতার কথা বলতে শুরু করলেন। কার্যক্ষেত্রে তার ফলোআপ করতেন সুরজিৎ ও তাঁর সঙ্গী সিপিআইয়ের শীর্ষনেতা এবং লালু, মুলায়মের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কমরেড অর্ধেন্দুভূষণ বর্ধন, যিনি এবি বর্ধন নামেই পরিচিত। নাগপুরের বাঙালি বর্ধনদার সঙ্গে খাতিরের সম্পর্ক শরদ পওয়ারের। সনিয়া ও পওয়ারের তিক্ততা মিটিয়ে বোঝাপড়ার কথা হল কংগ্রেস ও এনসিপির। এই আগাগোড়া একের সঙ্গে আরেককে জোড়ার কঠিনতম কাজটি পড়ল প্রণববাবুর ও সুরজিতের ওপর। পরিস্থিতি অনেকটা পরিপক্ব হওয়ার পর আসরে এলেন জ্যোতি বসু।

Loading videos...

এ দিকে সীতারাম ইয়েচুরি ও প্রকাশ কারাটের সঙ্গে নিত্যই দিল্লিতে পার্টি সেন্টারে হাজির পিবি সদস্যদের বৈঠকে কথা বলতেন সুরজিৎ। জ্যোতি বসুর মতামত তো নিতেনই। এই সময়ে তালকাটৌরা রোডের ১৩ নম্বর বাড়িতে সন্ধ্যার পর আসতেন সুরজিৎ। ওঁর সঙ্গে অতীতে রাজ্যসভা থেকেই ঘনিষ্ঠতা ছিল প্রণববাবুর। দিনের পর দিন প্রণববাবুর কাছে গিয়ে দেখা হয়েছে কমরেড সুরজিৎয়ের সঙ্গে। দীর্ঘ পরিচয়ের সূত্রে ওঁর কাছেও সস্নেহ প্রশ্রয়ের অভাব ছিল না। সুরজিৎয়ের মজা ছিল, কী কথা হল, কার সঙ্গে হল, এ সব বলতেন না। বলতেন, সময় হলে সব জানতে পারবে। শুধু জেনে রাখো সব কিছু সঠিক ভাবে এগোচ্ছে।

সুরজিৎয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর একদিন প্রণববাবুর কাছে গিয়ে জানতে চাইছি। ‘দাদা’ রাজনীতিবিদ হিসেবে উৎকর্ষের শিখরে থেকে স্বভাবতই ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতায় আস্থা রাখতেন। স্নেহের সম্পর্ক এক দিনে গড়ে  উঠত না বা ভেঙেও যেত না। ইতিহাস বা রাজনীতির অজ্ঞতা যদি কারও প্রশ্নে ধরা পড়ত তা হলে তার ধমক খাওয়া অনিবার্য ছিল।  সুরজিৎয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর সে দিন ‘দাদা’র মেজাজ বেশ ফুরফুরে। বললেন, সুরজিৎ একদম ভাইস চ্যান্সেলর। দারুণ রাজনীতির লোক। ওর দলের ছেলেগুলো ওর কাছ থেকে কিছু শিখল না। সিরিয়স কথা, কিন্তু বললেন হাসির ছলে। প্রকাশ কারাটের সঙ্গেও কথা বলতেন ‘দাদা’। কিন্তু সুরজিৎয়ের সঙ্গে বৈঠকের সুবাদে সীতারাম অনেক বেশি যেতেন। এবং সীতারামকে একটু বেশিই স্নেহ করতেন অর্থনীতির ভালো ছাত্র বলে। পরে যখন ইউপিএ গঠিত হল, এবং দৃশ্যপট থেকে সরে গেলেন সুরজিৎ, তখন ইউপিএ-বাম সমন্বয়ের মূল কাজটি প্রণববাবু করতেন সীতারাম ইয়েচুরিকে ডেকে নিয়ে। বৈঠকের পর ব্রিফিংয়ে শুধু সীতারামকেই বলতে বলতেন। নিজে  বলতেন দু’টো-একটা কথা।

এই ভাবেই ২০০৪-এর সরকারের মুশকিল আসান প্রণববাবু চার বছর নিরুপদ্রবেই চালিয়ে নিয়েছিলেন। মাঝেমধ্যে জ্যোতিবাবুর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন কলকাতায় গেলে। দু’ জনের কথাবার্তার পর প্রেস মিডিয়া ছেঁকে ধরেছে দু’ জনকেই। প্রণববাবুর সৌজন্য এত প্রখর ছিল, যা শেখার মতো। হাসিমুখে ক্যামেরাকে বলেছেন জ্যোতিবাবুকে দেখিয়ে, ওঁর কাছে আগে যান। এবং জ্যোতিবাবুর মস্তিষ্ক  মিডিয়ার সামনে শেষ দিনেও ছিল প্রখর। প্রণবকে দেখিয়ে বলেছেন, “জিজ্ঞাসার কিছু নেই। ও আছে তো। সব ঠিকমতোই করছে। ও আমাদের পার্টিকে জানে। আমরা কী চাই সেটা খুব ভালো করে জানে। তাই কোনো সমস্যা নেই।” সে দিন অভিভূত হাসিমুখ ছাড়া প্রণববাবু মিডিয়াকে আর কিছুই দেননি।

সেই সরকার থেকে বামদের সমর্থন তুলে নেওয়ার ঘটনাটি রোখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন ‘দাদা’। পরমাণু চুক্তির কিছু প্রস্তাবিত ধারার বয়ান বদলানোর চেষ্টা তিনি কী ভাবে করেছিলেন তা জানতেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, প্রকাশ কারাট ও সীতারাম ইয়েচুরি। সনিয়াকেও রাজি করিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু আমেরিকার তৎকালীন বুশ প্রশাসন ছিল অনমনীয়। তখন একমাত্র প্রধানমন্ত্রী মনমোহনই পারতেন ‘হয়’ কে ‘নয়’ করতে। কিন্তু যাঁরা তাকে দুর্বল প্রধানমন্ত্রী বলে প্রচারে নেমেছিলেন তাঁদের নেতা আডবাণীও বিলক্ষণ জানতেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী কখনও দুর্বল হন না। এই সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ঈশ্বরের মতোই সর্বশক্তিমান। তা ছাড়া কংগ্রেস সভানেত্রী বহু জনমুখী কর্মসূচিতে বামেদের কথামতো চাপ দিলেও চাননি প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্ব কোনো ভাবে খর্ব হোক আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে।

যাঁরা প্রণববাবুর সম্পর্কে কিছুই না জেনে অনর্গল প্রচারে বলেন, উনি সাধারণ মানুষের জন্যে, রাজ্যের জন্যে কিছু করেননি, তাঁদের জেনে রাখা ভালো, একশো দিনের কাজ থেকে রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়ন ও সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা-সহ বাজেটে এমন বহু জনমুখী কর্মসূচি নিতে প্রধানমন্ত্রীকে চাপ দিয়েছেন যেগুলো কোনো দিন আলোর মুখ দেখত না। চিদম্বরম অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন সব জনমুখী প্রকল্প রুখতেন টাকা নেই বলে। এবং মনমোহন তাতে সায় দিতেন। প্রণববাবু নীরবে এই ‘না’গুলোকে ‘হ্যাঁ’ করিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে। সনিয়াকেও সঙ্গে পেয়েছেন।

কিন্তু শেষ যে দিন মনমোহন দেখলেন প্রণববাবুর সমঝোতার সূত্রে বামেরা রাজি এবং চুক্তির মূল বয়ানের কিছুটা বদলাতে হবে, সে দিন তিনি তাঁর শান্ত এবং বরফশীতল কণ্ঠ শোনালেন দলনেত্রীকে। ৭, রেসকোর্স রোডে সনিয়াজি যখন এলেন মনমোহন তাঁকে ঠান্ডা গলায় জানিয়ে দিলেন, “পরমাণু চুক্তির বয়ান বদল করতে হলে আমি এখনই পদত্যাগ করব। এটাই আমার অপরিবর্তনীয়  স্থির সিদ্ধান্ত”। এর পরই রীতিমতো হতবাক সনিয়া প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, তাঁর কর্তৃত্ব কখনোই খর্ব হবে না। তিনি যা বলবেন সেটা অবশ্যই শেষ কথা।  রাতেই চূড়ান্ত হল চুক্তির বয়ান। বামেদের বিসর্জন দিয়েও স্পিকারকে পাশে নিয়ে মনমোহন যে চুক্তি করলেন তা দিল্লির মসনদকে ধাক্কা দিয়ে গেল। প্রণবকে সব বিষয়ে শেষ কথা বলার অধিকার দিলেও এই পরমাণু চুক্তির বিষয়ে তিনি পুরোপুরি অনমনীয়  থাকলেন। শেষে বার্তা চলে গেছে যখন বুশের দফতরে তখনও প্রণববাবুর কাছে কোনো বিস্তারিত বয়ান নেই। কিন্তু মনমোহনের সঙ্গে সম্পর্কের রসায়ন চমৎকার থাকায় প্রণববাবু নিষ্ঠ সহযোগীর দায়িত্বও চালিয়ে গেলেন। বামেদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার ক্ষোভ চেপে সরকার বাঁচাতে নতুন বন্ধু খুঁজতে নামলেন। বাম বিকল্প বাংলাতেই বেড়ে উঠছিল। সনিয়ার নয়া অবস্থান তীব্র বাম বিরোধিতা মমতাকে যে জলপাই পাতা দেখাল তার আসমানি আয়োজন আর জেমিনি জোটের ছবি আঁকা ছিল প্রণববাবুরই ক্যানভাসে।

খবরঅনলাইনে আরও পড়তে পারেন

কংগ্রেসের সব প্রধানমন্ত্রীই সংঘের সঙ্গ করেছেন, হঠাৎ প্রণবকে নিয়ে দু’ বছর আগে কেন প্রশ্ন উঠেছিল

প্রবন্ধ

সামনে ভোট, বরাদ্দ-ব্যবসা তো জমবেই!

কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় এক নম্বরে পশ্চিমবঙ্গ! তা না হলে ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের কাছে ‘হিসেব’ চাইবেন কী ভাবে?

Published

on

নরেন্দ্র মোদী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

গরিবের হয়ে গলা ফাটাচ্ছে সরকার! গরিবের ঘরে ঢুকে হাঁড়ির খবর নিচ্ছে সরকার! একের পর এক প্রকল্প-তহবিলের খবর দিচ্ছে সরকার! তা হলে কি ভোট এসে গেল?

করোনা-কোভিড করে চিৎকার চলুক, তারই মাঝে কড়া নেড়ে দিয়েছে ২০২১-এর বিধানসভা ভোট। সংবাদ মাধ্যমের ভাষায় ‘একুশের মহারণ’। মহারথীরা ময়দানে নেমে পড়েছেন। রঙ-বেরঙের পতাকা, সারি সারি মাথা আর সময়-সুযোগ পেলেই গরিবের জন্য দু’-চার কথা। এখন অবশ্য শুধু কথায় চিঁড়ে ভেজে না। ‘মাল’ খসাতে হয়। সেটা মোক্ষম বোঝেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। বিজেপি-বিরোধী রাজ্য সরকার সাড়ে চার বছর কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে আসবে, আর তার পর ভোটের মুখে কেন্দ্রের হাত উপুড়। কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যান তো তেমনটাই বলছে।

১-এ পশ্চিমবঙ্গ!

করোনাভাইরাস মহামারি রুখতে ২০২০-র মার্চে দেশব্যাপী লকডাউন জারি করেছিল কেন্দ্র। ওই লকডাউন কার্যকর হওয়ার পর থেকে গ্রামোন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। গ্রামীণ পরিকাঠামো এবং কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে এই মেয়াদে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে যে তহবিল বরাদ্দ করেছে, তা থেকে সব থেকে বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জন্য। ভালো কথা! কিন্তু করোনা প্রভাবিত রাজ্যগুলির মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যগুলির তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ তো প্রথম স্থানে নেই! তা হলে বরাদ্দের তালিকায় কেন পশ্চিমবঙ্গ?

Loading videos...

আবার এমনও নয়, দেশের অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় সব থেকে পিছিয়ে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। তা হলে কেন?

প্রথমত, বছর ঘুরলেই পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোট। এবং দ্বিতীয় ও শেষ কারণ, সারা দেশ জুড়ে অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটালেও এখনও রাজ্যটিতে ক্ষমতা কায়েম করতে পারেনি কেন্দ্রের শাসক দল। হিসেবটা কী করে এতটা সহজ হল?

কারণ, এই মেয়াদে রাজ্যগুলির জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বিহার। যেখানে অক্টোবর-নভেম্বর (২০২০)-এর বিধানসভা ভোট হয়ে গেল। ১০ নভেম্বর এগিয়ে যাওয়া আর পিছিয়ে থাকার টানটান উত্তেজনা শেষে কুর্সি দখলে রেখেছে বিজেপি এবং মিত্রশক্তি।

কে কত পেল?

গ্রামোন্নয়নমন্ত্রকের পরিসংখ্যান বলছে, মার্চ-নভেম্বর (২০২০) মেয়াদে সব মিলিয়ে ছ’টি প্রকল্পে ৪৯ হাজার ২৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্যে জুটেছে ৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। বিহারের জন্য বরাদ্দ ৫ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা। এর পরে যথাক্রমে রয়েছে মধ্যপ্রদেশ (৪ হাজার ৯৭৪ কোটি), উত্তরপ্রদেশ (৪ হাজার ৬৩৬ কোটি) এবং ওড়িশা (৪ হাজার ৫৩৫ কোটি)।

বিহার ভোটের পাট চুকেছে। মধ্যপ্রদেশেও বিজেপি সরকারের ভাগ্য নির্ধারণে ২৫টি আসনে উপ-নির্বাচনে বিজেপি সরকারের স্থায়িত্ব মজবুত হয়েছে। অন্য রাজ্যগুলির বরাদ্দ-বণ্টনে ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক কারণও হেলাফেলার নয়। তবে এই বরাদ্দের তালিকায় একেবারে শেষ জায়গায় রয়েছে গোয়া। তাদের জন্য এই মেয়াদে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২.১ কোটি টাকা। এখানেও যেমন কাজ করেছে জনসংখ্যার অঙ্ক।

খাতের পরিচয়

মূলত ছ’টি খাতেই এই তহবিল বরাদ্দ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যেগুলির মধ্যে রয়েছে মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাসিস্ট্যান্টস (এমএনআরইজিএ), প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা (পিএমজিএসওয়াই), শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি রুর্বন মিশন, ন্যাশনাল সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম, ন্যাশনাল রুরাল লাইভলিহুড মিশন (এনআরএলএম) এবং প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (পিএমএওয়াই)।

পশ্চিমবঙ্গের মতোই বছর ঘুরলেই ভোট অসমেও। পিএমজিএসওয়াই প্রকল্পে সেখানে বরাদ্দের পরিমাণ সব থেকে বেশি (১ হাজার ২৮৫ কোটি)। আবার পিএমএওয়াই প্রকল্পে সব থেকে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ (৩ হাজার ৭৫১ কোটি)। ছিটেফোঁটা ব্যতিক্রম যে নেই, তাও নয়। ২০২১-এ বিধানসভা ভোট তামিলনাড়ুতেও। কিন্তু পিএমএওয়াই প্রকল্পে কোনো বরাদ্দ মেলেনি এই মেয়াদে। আবার গোয়া, গুজরাত, হরিয়ানা অথবা তেলঙ্গনাও এই প্রকল্পে কোনো তহবিল পায়নি।

অন্য দিকে ন্যাশনাল সোশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম-এর অধীনে সব থেকে বেশি বরাদ্দ জুটেছে বিহারের ভাগ্যে। উত্তরপ্রদেশ পেয়েছে ১ হাজার ২১৮ কোটি, কিন্তু জনসংখ্যা অনেক কম হলেও বিহার পেয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। উত্তরপ্রদেশের পরে তৃতীয় স্থানেই পশ্চিমবঙ্গ (৬৫৩ কোটি)।

আরও যে ভাবে

ঘূর্ণিঝড়, বন্য, ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিমবঙ্গ-সহ ছয় রাজ্যের জন্য জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিল থেকে মোট ৪ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় উম্পুনের ক্ষতিপূরণবাবদ পশ্চিমবঙ্গকে আরও ২ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ওই খাতে। ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শনে এসে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ফলে সব মিলিয়ে হল ৩ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। কিন্তু এটা কি যথেষ্ট?

রাজ্যের শাসক দল বলছে, মোটেই নয়। গত ১৩ নভেম্বর কেন্দ্রের তরফে এই ঘোষণার পর তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় স্পষ্টতই জানিয়ে দেন, উম্পুন বিধ্বস্ত অঞ্চল পরিদর্শনে এসে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার ধারেকাছে পৌঁছোয়নি এই বরাদ্দ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, উম্পুনের তাণ্ডবে রাজ্যে ১ লক্ষ ২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বকেয়া এবং বঞ্চনা

লকডাউনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের ৫৩ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।

তৃণমূলের জাতীয় মুখপাত্র ডেরেক ও ব্রায়েন জানান, গত এক বছরে কেন্দ্রের সাহায্যে চলা প্রকল্পগুলিতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া। রাজ্যের রাজস্ব আদায় বাবদ প্রাপ্য, খাদ্য ভরতুকি এবং জিএসটি বাবদ বকেয়ার তালিকাও দীর্ঘ। যা নিয়েই বঞ্চনার অভিযোগ তুলছে রাজ্য সরকার।

এ দিকে ভোট এসে গেল!

বিহারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে যে ভাবে বিহারের মানুষ করোনাকে এড়িয়ে ভোট দিয়েছেন (বিজেপিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছেন), তাতে তাঁদের ধন্যবাদই প্রাপ্য। পশ্চিমবঙ্গেও ভোট আসছে। মনে হয় না করোনা এখনই ‘টাটা বাইবাই’ করবে। তারই মধ্যে ভোটপ্রচারে নেমে পড়েছে শাসক-বিরোধী সকলেই। বরাদ্দ-ব্যবসাও সমানে চলবে। তা না হলে বাংলায় ভোটপ্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের কাছে ‘হিসেব’ চাইবেন কী ভাবে?

আরও পড়তে পারেন: শহর ছেড়ে তুমি কি চলে যেতে পারো তিন ভুবনের পারে

Continue Reading

প্রবন্ধ

সৌমিত্র, কবে যে চলে এলে গৃহস্থের রান্নাঘর থেকে বৈঠকখানা হয়ে শীতের ছাদে আলোচনায়

সবাই চাইছিল, তুমি এক টানে সব খুলে বেরিয়ে আসবে, যেমন করে টান দিয়েছিলে হীরকরাজার মূর্তিতে। কিন্তু না, সব মায়া কাটিয়ে চলে গেলে তুমি।

Published

on

পাপিয়া মিত্র

ক্লাসের প্রথম হওয়া ছাত্রীটিকে ঘিরে সহপাঠীদের জটলা। কী হল… তার পরে… বল বল। মানে ওই যে দেবদাস যখন গাছের তলায় শুয়ে রয়েছে আর ওই যে পাতাগুলো, মানে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে… পাশ থেকে একজন বলল, ঝুরঝুর করে। হ‍্যাঁরে, গাছতলায় শুয়ে রয়েছে পারুর দেবদা। উফ্ জাস্ট ভাবতে পারছি না। হয়তো অষ্টম শ্রেণি। ও দেখে ফেলেছে আর…।

অনেকেই শুরু করে দিয়েছে শরৎচন্দ্র পড়তে। যাদের উপায় আছে তারা লুকিয়ে পড়ছে আর যাদের সেটুকু নেই তাদের থেকে জেনে নেওয়ার জন্য স্কুল কামাই নেই।

Loading videos...
‘দেবদাস’।

সাধারণ প্রেক্ষাগৃহে রমরমিয়ে চলছে দেবদাস। সৌমিত্র-উত্তম অভিনীত। সুপ্রিয়া-সুমিত্রা অভিনীত। কেমন হল রে? কেউ বলছে, আহা উত্তমের কী গাওয়া – শাওন রাতে যদি…। তখন পাড়ার জলসা থেকে মঞ্চের অনুষ্ঠানেও। আর প্রেমে ব‍্যর্থ হওয়া ছেলের দল তো চিহ্নিত হয়ে গিয়েছিল, মদ খাই সব ভুলতে। কী নিরহঙ্কার সরল প্রেমে আপ্লুত দুই যুবক-যুবতী, যেন আমার আপনার ঘরের দেওর ননদটি। সেই কিশোরীবেলার প্রেমিকটিকে অজান্তেই নিজের করে নেওয়া। নানা হলের সিনেমার বিজ্ঞাপন দেখা খবরের কাগজে, সেটাও খানিক লুকিয়েচুরিয়ে।

একটা বুদ্ধিদীপ্ত, ছিপছিপে, লম্বা, মাথাভর্তি চুল আর সব আভিজাত‍্য এসে শেষ হয়েছে খোদাই করা নাসিকায়। এমন এক নায়কের কী কী সিনেমা চলছে, কোন কোন হলে, কান খাড়া থাকত বাড়ির বড়োদের কথায়। সেটা তো মোবাইলের যুগ নয় যে গুগল আন্টিকে জিজ্ঞেস করে নেওয়া যাবে। জানার ইচ্ছে, দেখার তাগিদ, শোনার আগ্রহ, খবর পেলেই হল, বই খাতা নোটস আনার অছিলায় গল্প গিলে আসা।

‘তিন ভুবনের পারে’।

আসলে সব সংসার তখন খুব একটা স্বাধীনচেতা ছিল না। সৌমিত্র চট্টোপধ‍্যায়ের বই দেখার থেকে গৃহস্থ বেশি পছন্দ করত উত্তমকুমারের সিনেমা দেখতে। কিন্তু এ-ও ঠিক কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী আর এক শ্রেণির মানুষের কাছে সৌমিত্র হয়ে উঠেছিলেন এক আদর্শ নাগরিক।

কিন্তু রোগের কাছে কেন হারিয়ে গেল খিদদার ‘ফাইট কোনি, ফাইট’ চিৎকার? কেন বসন্তবিলাপের শ‍্যামের আগুন লাগার উত্তপ্ত গান নিভে গেল? ওই তো যেন শোনা যাচ্ছে চারুবৌঠানকে নিয়ে গাইছে ‘আমি চিনিগো চিনি তোমারে’। ওই তো দেখছি, উদ্ধত সন্দীপ দাঁড়িয়ে আছে বিমলার কাছে। ময়ূরবাহন আর সাড়া দেবে না। তোমার ঘোড়া যে ছটফট করছিল ঝিন্দের পাহাড়িপথে তোমাকে নিয়ে ঘুরবে বলে। তোমার কাজল, তোমার মুকুল, তোমার ক‍্যাপটেন স্পার্ক, তোমার পোস্ত, তোমার তোপসে আর তোমার ফেলুদার কাহিনি লেখার অপেক্ষায় ছিলেন লালমোহনবাবু কিন্তু তুমি চলে গেলে। তোমার মাথার কাছে শ্বাস ফেলছিল হীরকরাজা। তুমি তো তাকে ছেড়ে দাওনি।

‘চারুলতা’।

‘তিন ভুবনের পারে’, ‘জীবন সৈকতে’, ‘স্ত্রী’, ‘প্রথম কদম ফুল’, ‘পরিণীতা’, ‘বাঘিনী’, ‘বাক্স বদল’, ‘মাল‍্যদান’, ‘মণিহার’-সহ অনেক ছবি একে একে গৃহস্থের রান্নাঘর থেকে বৈঠকখানা হয়ে শীতের ছাদে আলোচনায় চলে এল। কোথাও মনকাড়া গান, কোথাও টানটান গল্প। কোথাও তুমি অধ‍্যাপক, কোথাও তুমি গাড়ির ড্রাইভার। কোথাও তুমি বেকার ইঞ্জিনিয়ার, কোথাও তুমি ডাক্তার। গৃহস্থের কাছে তুমি বোকা বোকা হাসির নায়ক হলেও তোমাকে কেউ কোনো দিন গাছের ডালপালা ধরে নাচতে দেখেনি। এখানেই তোমার চরিত্রের বিশেষত্ব। তোমার বুদ্ধিদীপ্ত মুখের অভিব‍্যক্তি সামনে এনে দিল অন্য ধরনের চলচ্চিত্র। ভেঙে মুচকে দিল ‘অশনি সংকেত’, ‘গণদেবতা’, ‘গণশত্রু’, ‘অরণ‍্যের দিনরাত্রি’, ‘শাখাপ্রশাখা’, ‘হুইল চেয়ার’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘একটি জীবন’, ‘আবার অরণ্যে’, ‘পাতালঘর’, ‘সংসার সীমান্তে’র মতো কিছু উদাহরণ। গৃহস্থের অন্য নায়কের সঙ্গে তুলনা টানায় ছেদ পড়ল। তুলনাহীন ফেলুদাকে চিনতে শুরু করে দিল ‘সোনার কেল্লা’ আর ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ দিয়ে। প্রদোষ মিত্র, তুমি অবশেষে চির ঘুমের দেশে চলে গেলে।

তোমাকে দেখে শিখতে হয়েছে নিজের জন্য জায়গা রাখা। তুমি বুঝতে শিখিয়েছ পূর্ণ সংসার করেও একা থাকার দরকার, অন্তত নিজেকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। শব্দহীন চোরা স্রোতে ভেসে ওঠে ফেলে আসা প্রেমবেলা। ‘বেলাশেষে’ দেখে অনেকেই ভেবেছে এ-ও হয়। হয়তো হতে পারে ভেবে অনেকের কপালে ভাঁজ পড়েছে। কেননা সেখানে জীবনের প্রান্তে এসে স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার বাসনা। এক ছেলে চার কন‍্যা নাতি-নাতনির ভরা সংসারে অনাবিল আনন্দের পাশাপাশি পেয়েছি ‘পোস্ত’কে। যেখানে একা দাদুঠাকুমা থাকতে চাইছে পোস্তকে নিয়ে।

তুমি যত এগিয়ে এসেছ, তুমি ততটাই গৃহস্থের ঘরের বাবা, জেঠু, শ্বশুর, দাদু, ঠাকুরদা হয়ে উঠেছ। এই করোনা-আবহে এখনকার প্রযুক্তির দৌলতে তোমার কত সিনেমা দেখেছি জান? তোমার ফিরে আসার পথের বাঁকে নন্দিনীরা অপেক্ষা করছিল। তুমি ফিরলে না।

‘জয় বাবা ফেলুনাথ’।

তোমার প্রতিদিন পড়ার অভ্যাস যে গীতবিতান, তার পাতা উড়ছে হেমন্তের মৃদু হাওয়ায়। তোমার সঞ্চয়িতা অপেক্ষা করছিল কোন কবিতা আবার রেলগাড়ির কামরায় আবৃত্তি করতে করতে যাবে। সকলের আকুল প্রার্থনা ছিল, উঠে পড় উদয়ন পণ্ডিত। তুমি যে মুক্তির স্বাদ দিয়েছিলে পাঠশালার ছেলেদের। ওরা তোমার জন্য বই খুলে বসেছিল। সবাই চাইছিল, তুমি এক টানে সব খুলে বেরিয়ে আসবে, যেমন করে টান দিয়েছিলে হীরকরাজার মূর্তিতে। কিন্তু না, সব মায়া কাটিয়ে চলে গেলে তুমি।

খবরঅনলাইনে আরও পড়ুন

প্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, থামল ৪০ দিনের ‘ফাইট’!

Continue Reading

প্রবন্ধ

পরমাণু চুক্তি, মনমোহন সরকারের উপর থেকে বামেদের সমর্থন প্রত্যাহার এবং জো বাইডেন

২০০৮ সালে মার্কিন সেনেটের মার্কিন-ভারত অসামরিক পরমাণু চুক্তির অনুমোদনের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন জো বাইডেন!

Published

on

২০১৩-য় ভারত সফরে বাইডেন। ফাইল ছবি
Jayanta Mondal
জয়ন্ত মণ্ডল

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হোক বা বিহারের বিধানসভা ভোট, অন্তর্জালের বিশ্বে সব কিছু নিয়েই আগ্রহ তুঙ্গে! তবে আমেরিকার সদ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত জো বাইডেনকে (Joe Biden) নিয়ে বাঙালির মাত্রাহীন উৎসাহে (অথবা আদিখ্যেতায়) আবার চোখ টাটাচ্ছে একাংশের। ব্যঙ্গ করে কেউ তাঁকে বলছেন ‘যতীন বৈদ্য’, কেউ আবার নাম দিয়েছেন ‘জয় ব্যানার্জি’। কিন্তু ভারতের সঙ্গে মার্কিন রাজনীতির তুখোড় ব্যক্তিত্ব বাইডেনের সম্পর্কও খুব একটা খাটো নয়।

১৯৭৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সেনেটর ছিলেন বাইডেন। তার পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন দেশের ৪৭তম ভাইস-প্রেসিডেন্টের। অর্থাৎ, ভুঁইফোঁড় রাজনীতিক তিনি নন। তার উপর সেনেটর থাকাকালীন তিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান। এই সময়ে মার্কিন-ভারত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্তের অংশীদার বাইডেন। বিশেষত, ২০০৮ সালে মার্কিন-ভারত অসামারিক পরমাণু চুক্তির প্রসঙ্গ না টানলেই নয়!

সেনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে বাইডেন ২০০৮ সালে মার্কিন সেনেটে মার্কিন-ভারত অসামরিক পরমাণু চুক্তি (US-India Civil Nuclear Agreement) অনুমোদনের পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বেশ কয়েকটি আইন প্রণয়নের ব্যাপারেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির প্রবক্তা।

Loading videos...

ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন এই পরমাণু চুক্তি সম্পাদনের জন্য তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ (George W. Bush) এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের (Manmohan Singh) অধীনে আলোচনা শুরু করেছিল, তখন সেনেটে বাইডেন ছিলেন ভারতের পক্ষে সমালোচক।

২০০৮-এর প্রথম দিকে মার্কিন কংগ্রেস ভারতের সঙ্গে এই চুক্তি অনুমোদনের আগে বাইডেন আরও দুই সেনেটর চক হেগেল এবং জন কেরির সঙ্গে ভারত সফরে এসেছিলেন। বাইডেন ছিলেন এই চুক্তির ধারাবাহিক প্রবক্তা এবং অবশ্যই এটির সাফল্যের নেপথ্যেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

একই সঙ্গে তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে রীতিমতো ঝড় তুলেছিল এই ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যেন, কেন্দ্রের সরকার হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়। ২০০৪ সালের লোকসভা ভোটে ক্ষমতায় আসে ইউপিএ। ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে বামপন্থীদের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী হন ডা. মনমোহন সিং। কিন্তু বছর চারেক নরমে-গরমে কাটলেও আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তিকে কেন্দ্র করে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করে বামপন্থী দলগুলি। চুক্তি থেকে পিছু না হঠলে তাঁরা সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

রাজ্য, শহর-গ্রামে বামপন্থীরা ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির কুফল তুলে ধরে ব্যাপক প্রচারে নামেন। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার নিজের অবস্থানে অনড়। এর পর ২০০৮ সালের ৯ জুলাই, চার বাম নেতা প্রকাশ কারাত, এবি বর্ধন, দেবব্রত বিশ্বাস এবং চন্দ্রচূড়নের স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিবৃতিতে ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি সম্পাদনের প্রতিবাদে ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করা হয়।

তা হলে কি সরকার পড়ে গেল? না! সে যাত্রায় সরকার শুধু টিকে গেল তেমনটা নয়, ২০০৯ সালে ফের লোকসভা ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন মনমোহন। আর পশ্চিমবঙ্গের মতো আঁতুড়ঘরে ক্ষয় শুরু হল বামপন্থীদের। ২০০৯-এর সেমিফাইনালে গুটিয়ে অর্ধেক হয়ে যাওয়া বামফ্রন্ট ২০১১-র বিধানসভায় রাইটার্স বিল্ডিং থেকেই ‘ভ্যানিশ’!

হয়তো একেই বলে, ধান ভানতে শিবের গীত! তবে ভারত-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্কে বাইডেনের ভূমিকা মোটেই ফেলনার নয়। আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের আকাঙ্ক্ষার ঘোর সমর্থক বাইডেন। এশিয়ার সমস্ত বড়ো অর্থনীতির দেশগুলিকে নিয়ে নতুন একটি কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান আগেই জানিয়েছিলেন বাইডেন। যেখানে ভারতের জন্যও নির্দিষ্ট আসনের দাবি ছিল তাঁর।

ভাইস-প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০১৩ সালের ২২ জুলাই আবার এক বার ভারত সফরে আসেন স্ত্রী জিল বাইডেনকে নিয়ে। চার দিনের ওই সফরে একাধিক কর্মসূচিতে যোগ দেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দিল্লিতে গান্ধী স্মৃতি মিউজিয়াম ঘুরে দেখেন। শুধু তা-ই নয়, মুম্বইয়ে দেশের প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতিদের সঙ্গে একটি গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন। উল্লেখযোগ্য ভাবে, বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে সে বার তিনি ভাষণও দেন।

আমেরিকার ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান – উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার নজির রয়েছে ভারতীয় রাষ্ট্রনেতাদের। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) গভীর বন্ধুত্ব প্রায়শই আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। তবে বাইডেনের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক মোটের উপর মন্দ নয়।

২০১৪ সালে আমেরিকা সফরে গেলে মোদীর জন্য মধাহ্নভোজনের আয়োজন করেন বাইডেন। বছর দুয়েক বাদে ফের সফরে মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেন মোদী, নেতৃত্ব দেন বাইডেন। আসলে ওবামা-বাইডেন প্রশাসনের হাত ধরে ভারতের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্ক মসৃণ পথে এগিয়ে যাওয়ার যে অভীপ্সা, সেটাই ট্রাম্পের লম্বা ছায়ার নীচেই লালিত-পালিত হচ্ছে বাইডেনকে আঁকড়ে ধরে।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল, বাইডেন হোয়াইট হাউসের দখল নেওয়ার পর এইচ-১বি সহ সমস্ত উচ্চ দক্ষতাযুক্ত ভিসায় রাষ্ট্র অনুমোদনের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিতে চলেছেন। আবার এমনটাও শোনা গিয়েছে, অন্তত পাঁচ লক্ষ প্রবাসী ভারতীয়কে স্থায়ী ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব দিতে পারেন নতুন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। ভারতের জন্য সুখকর হতে পারে এমনই কিছু খবর উড়ে বেড়াচ্ছে। তবে বাপু, না আঁচালে বিশ্বাস নেই!

আরও পড়তে পারেন: ‘এক সঙ্গে কাজের অপেক্ষায়’, জো বাইডেনকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন নরেন্দ্র মোদী

Continue Reading
Advertisement
ফুটবল17 mins ago

দিয়েগো মারাদোনা প্রয়াত

রাজ্য1 hour ago

টেস্টের সংখ্যা না কমলেও রাজ্যে নতুন সংক্রমণ আরও কিছুটা কমল, সক্রিয় রোগী মাত্র ৫.৩ শতাংশ

Jallikattu
বিনোদন2 hours ago

ভারত থেকে অস্কারের দৌড়ে মালায়ালি ছবি ‘জাল্লিকাট্টু’

দঃ ২৪ পরগনা3 hours ago

ফের বাঘের পায়ের ছাপ কুলতলিতে, তৎপর বন দফতর

রাজ্য3 hours ago

দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটে শামিল হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারি কর্মচারী ইউনিয়ন

রাজ্য4 hours ago

শুভেন্দু-জট কাটাতে ফের বৈঠকের আগেই ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বার্তা মমতার

ফুটবল4 hours ago

শতবর্ষে কলকাতা ডার্বি: জেনে নিন ডার্বি সম্পর্কিত দশটা চমকপ্রদ তথ্য

শিল্প-বাণিজ্য4 hours ago

এসবিআই গ্রাহকদের জন্য উপহার! এসবিআই কার্ড অ্যাপে চালু নতুন পরিষেবা

দেশ13 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ৪৪৩৭৬, সুস্থ ৩৭৮১৬

বিনোদন2 days ago

মাদক মামলায় জামিন পেলেন ভারতী সিংহ ও হর্ষ লিম্বাচিয়া

ফুটবল2 days ago

সুসাইরাজকে বাদ দিয়েই ডার্বি জয়ের ছক আবাসের

ফুটবল2 days ago

পেনাল্টি কাজে লাগিয়ে প্রথম ম্যাচে ৩ পয়েন্ট ঘরে তুলল হায়দরাবাদ

ফুটবল1 day ago

পিকে-চুণী স্মরণে ডার্বি শুরুর আগে নীরবতা পালন হোক, আইএসএল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাল ইস্টবেঙ্গল

দেশ1 day ago

দুর্ভাগ্য! ভ্যাকসিন নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে, বৈঠকে বললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

Allahabad High Court
দেশ1 day ago

‘প্রিয়ঙ্কা-সালামাতকে আমরা হিন্দু-মুসলিম হিসেবে দেখি না,” ঐতিহাসিক রায় এলাহাবাদ হাইকোর্টের

দেশ2 days ago

অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ প্রয়াত

কেনাকাটা

কেনাকাটা21 hours ago

ঘর সাজানোর জন্য সস্তার নজরকাড়া আইটেম

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরকে একঘেয়ে দেখতে অনেকেরই ভালো লাগে না। তাই আসবারপত্র ঘুরিয়ে ফিরে রেখে ঘরের ভোলবদলের চেষ্টা অনেকেই করেন।...

কেনাকাটা4 days ago

লিভিংরুমকে নতুন করে দেবে এই দ্রব্যগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক: ঘরের একঘেয়েমি কাটাতে ও সৌন্দর্য বাড়াতে ডিজাইনার আলোর জুড়ি মেলা ভার। অ্যামাজন থেকে তেমনই কয়েকটি হাল ফ্যাশনের...

কেনাকাটা1 week ago

কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস, দাম একদম নাগালের মধ্যে

খবর অনলাইন ডেস্ক: কাজের সময় হাতের কাছে এই জিনিসগুলি থাকলে অনেক খাটুনি কমে যায়। কাজও অনেক কম সময়ের মধ্যে করে...

কেনাকাটা3 weeks ago

দীপাবলি-ভাইফোঁটাতে উপহার কী দেবেন? দেখতে পারেন এই নতুন আইটেমগুলি

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই কালীপুজো, ভাইফোঁটা। প্রিয় জন বা ভাইবোনকে উপহার দিতে হবে। কিন্তু কী দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন...

কেনাকাটা4 weeks ago

দীপাবলিতে ঘর সাজাতে লাইট কিনবেন? রইল ১০টি নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আসছে আলোর উৎসব। কালীপুজো। প্রত্যেকেই নিজের বাড়িকে সুন্দর করে সাজায় নানান রকমের আলো দিয়ে। চাহিদার কথা মাথায় রেখে...

কেনাকাটা2 months ago

মেয়েদের কুর্তার নতুন কালেকশন, দাম ২৯৯ থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক: পুজো উপলক্ষ্যে নতুন নতুন কুর্তির কালেকশন রয়েছে অ্যামাজনে। দাম মোটামুটি নাগালের মধ্যে। তেমনই কয়েকটি রইল এখানে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র আরও ১০টি শাড়ি, পুজো কালেকশন

খবর অনলাইন ডেস্ক : সামনেই পুজো আর পুজোর জন্য নতুন নতুন শাড়ির সম্ভার নিয়ে হাজর রয়েছে এরশা। এরসার শাড়ি পাওয়া...

কেনাকাটা2 months ago

‘এরশা’-র পুজো কালেকশনের ১০টি সেরা শাড়ি

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজো কালেকশনে হ্যান্ডলুম শাড়ির সম্ভার রয়েছে ‘এরশা’-র। রইল তাদের বেশ কয়েকটি শাড়ির কালেকশন অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন...

কেনাকাটা2 months ago

পুজো কালেকশনের ৮টি ব্যাগ, দাম ২১৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : এই বছরের পুজো মানে শুধুই পুজো নয়। এ হল নিউ নর্মাল পুজো। অর্থাৎ খালি আনন্দ করলে...

কেনাকাটা2 months ago

পছন্দসই নতুন ধরনের গয়নার কালেকশন, দাম ১৪৯ টাকা থেকে শুরু

খবর অনলাইন ডেস্ক : পুজোর সময় পোশাকের সঙ্গে মানানসই গয়না পরতে কার না মন চায়। তার জন্য নতুন গয়না কেনার...

নজরে