modi and abhinandan
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অভিনন্দন বর্তমান। ছবি সৌজন্যে টাইমস নাও হিন্দি।
দেবারুণ রায়

শিয়রে শমন না বলে বরং বলা যায় পরীক্ষার দরজায় পৌঁছে পড়ায় মন দেওয়া। আমাদের শাসকদলের ভাবগতিক কতকটা সে রকম। প্রথম চার বছর পর্যন্ত মনে হয়েছে, তিন দশক পর নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতায় অভিষিক্ত হওয়া মানেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। রাজনৈতিক ক্ষমতা যখন হাতের মুঠোয়, তখন মুঠো না খুললেই হল। প্রধানমন্ত্রী আগাগোড়াই মতাদর্শের কথা বলে এসেছেন। পায়ের নীচে মাটি যখন শক্ত, যখন মানুষের মনের মালিক হয়েই গিয়েছেন, তখন ন‍্যায়, নীতি, সংস্কার ইত্যাদির দিকে মন দেওয়া যেতেই পারে। ওঁর প্রিয় অ্যাজেন্ডায় কংগ্রেসমুক্ত ভারত তো আছেই। সুতরাং দৈনন্দিন সমস্যা সব মিটে যাবে একবার নেহরু-পটেল ইস‍্যুটা মিটিয়ে ফেলা গেলে।

বছরে ২ কোটি লোকের চাকরি? ছোঃ। ও সব জাগতিক সামান্য কথা ভাবার জন্য অনেক পাত্র-মিত্র-অমাত্য আছেন। আছেন জেটলি, গয়াল এবং শিল্প, বাণিজ্য, গ্রাম ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী-সান্ত্রীরা‌। এ সব নিয়ে সর্বোচ্চ নেতাকে মাথা ঘামাতে হবে কেন? তিনি দেশ-কাল-ভূত-ভবিষ্যত নিয়ে ভাববেন। তিনি বাছা বাছা শব্দপ্রয়োগে বাছাধন পাপ্পুকে মামাবাড়ি পাঠিয়ে দেবেন। নেতাজির ফাইল তো সবে খুলেছেন। আর পটেলের স্ট‍্যাচু। এর পর একে একে সব ‘কাচ্চা চিট্ঠা’ খুলবেন। শুধু দিল্লির কথা ভাবলে চলবে কী করে! ২৩ রাজ‍্যে বিজেপির জয়টিকা। আর ক ‘খানাও তো চাই। এখনও শ‍্যামাপ্রসাদের দেশ মুক্ত হয়নি। সবে একটা দু’টো মুকুল ধরেছে। তা ছাড়া, এ বার তো দিদির মুলুক থেকেই নিরঙ্কুশের অঙ্ক মেলাতে হবে। সে জন্যই তো মুকুল। যা হোক, এই সব ইষ্টচিন্তা করতে করতেই শিয়রে পরীক্ষা।

আরও পড়ুন বালাকোটেই কি হল বাজিমাত? কারগিলের পরে কুপোকাত হয়েছিল বিজেপি

তার ওপর পাঁচ রাজ‍্যের বিধানসভার ফল এক বালতি দুধে তিন ফোঁটা কেরোসিন ফেলে গেল‌। ব‍্যাস, রব উঠে গেল সারা দেশে। ম‍্যাজিক দেখাল মধ্যপ্রদেশ। এক্কেবারে বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়া হার। তার পর রাতারাতি ভোল পালটে সব শেয়ালের এক রা। মধ‍্যপদেশে নাকি “কমল খিল গয়া”। মানে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে! মজার অঙ্ক নিয়েও আতঙ্ক ছড়াল মিডিয়া। বিজেপির ভোটের হার বেশি। কিন্তু আসন কম। একেই বলে দুঃসময়! অচ্ছে দিনকে খাস্তা করে দিল বিরোধীরা। দু’ চারটে শরিকও সুযোগ বুঝে চিমটি কেটে গেল। যাদের ওপর একটু আশা-ভরসা ছিল তারা সব একে একে বিপাক বুঝে নিজেদের ঘুঁটি সাজাচ্ছে। আরে কোথায় গেল তোদের কংগ্রেস বিরোধিতা? কোথায় গেল সমদূরত্ব? সব ভুলে গিয়ে সেই রাহুলং শরণং! দিদির এ ভাবে জোটে চলে যাওয়া, চন্দ্রবাবুকে টেনে আনা, আবার কৌশল জোটে মায়াবতী-অখিলেশ! সপাতেও আডবাণীর হাল হল মুলায়মের। সপাটে খারিজ কংগ্রেস-বিরোধী লাইন। বেচারা মুলায়ম লোকসভায় দাঁড়িয়ে আশীর্বাদ দিলেন, “ফের প্রধানমন্ত্রী হবেন মোদীজি।” কিন্তু বেরিয়েই ফের পালটি !  আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দি শাহজাহান বলে প্রচার করা যেত। কিন্তু ওরাও আডবাণী, জোশি, যশোবন্ত, শৌরি, শত্রুঘ্ন নিয়ে ‘কচ্চা চিট্ঠা’ খুলে দেবে।

নোটবন্দি মানে ডিমনিটাইজেশনকে ‘ডিমন’ বলছে বিরোধীরা। জিএসটি, বুলেট ট্রেন, চাকরি, গ্রাম, গরিব – এ সব কথা বলাই যাচ্ছে না। তার ওপর কাশ্মীরে ডোভালের সূত্রে কী হচ্ছে সময় বলবে। ভেতরে কেউ কেউ বলতে চেষ্টা করছে, “ডোভাল কি ডোবালেন শেষটা”? না, তেমন কিছু হয়নি। উনিই তো ডিভিসি। ডোবালে ডুবিয়েছেন। ভাসালে উনিই ভাসাবেন। পাথরের পালটা গুলি। হিন্দুস্তানের দুর্বল নীতির দিন শেষ। ডোভাল বলেন, শক্তি চাই। শক্তির সঙ্গে মোকাবিলা করলেই সাফল্য আসতে বাধ্য। নেহরুর নরম নীতিতে দেশদ্রোহীদের পোয়াবারো। দেশদ্রোহী বনাম দেশপ্রেমী। এটাই তো দারুণ মেরুকরণ। এটাই তো ভোটের সব চেয়ে মারকাটারি ইস‍্যু। কেউ এই ইস‍্যু ছোঁবে না। আমরা স্কোর করে যাব। এই ইস‍্যুকেই ধোঁয়া দেবে কাশ্মীরের প্রায় রোজকার জঙ্গিহানা, জম্মু সীমান্তে পাকিস্তানের প্রতি দিনের গোলা, নিরীহ মানুষের মৃত্যু। ২০১৪-য় আডবাণী-সৃষ্ট ‘উইক প্রাইম মিনিস্টারের’ স্লোগান জনগণ খেয়েছিল। পরের পাঁচ বছরে ও দিকে তাকাতে পারা যায়নি। তাকালে আর ‘সব কা সাথ সব কা বিকাশ’ বলা যেত না। লাগাতার গোমাংস নিয়ে নানা ভাবে বিপাকে পড়েছে সরকার। বারবার নানা পাকে বিপাকে বিকাশকে ঢাল করা গিয়েছে। কালো টাকা উদ্ধার, আর্থিক ও সামাজিক স্বচ্ছতা কায়েম হয়নি। ঘর সামলাতে ভারতকে খোঁচাচ্ছে পাকিস্তান। পুলওয়ামা পর্যন্ত পাকিস্তানের জঙ্গি পাচার দুর্বল প্রধানমন্ত্রীর জমানার জওয়ান-মৃত্যুর রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এটা বিজেপি সরকারের বড়োসড়ো বিপাক। পাক-অস্ত্রই এই বিপাক থেকে মুক্ত করবে। একেবারে মোক্ষম ফরমুলা।

আরও পড়ুন পুলওয়ামা হামলা কী দিল মোদীকে?

বিপাকের কি একপদ? নোট, জোট, গরু, গুজরাত দিয়েই হিন্দি বলয়ে ধস। এই গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে আরও পাকে ফেলল রাহুলের প্রিয়াঙ্কা-তাস। সঙ্গে সঙ্গে চলছেই রাফালের ‘চৌকিদার চোর’। যদিও নরেন্দ্র ভাইয়ের শব্দকোষ বিরোধীদের ২০১৪ থেকেই জব্দ করে এসেছে। গোধরা-উত্তর গণহত্যায় ছিল ‘নিউটনের সূত্র’। সঙ্গে এল ‘গুজরাতি অস্মিতা।’ সনিয়ার ‘মওত কা সওদাগর’ হালে পানি পেল না। একই ভাবে, বারবার ‘ইতালিয়ান কানেকশন’-এও কাজ হল না। অমিত বিক্রমশালী বিজেপি সভাপতি ইন্দিরার নাতি, রাজীবের ছেলে রাহুলকেও ইতালির সঙ্গে জড়াতে গিয়ে লাভ পেলেন না। গুজরাত বিধানসভায় কংগ্রেসের আসন বেড়ে গেল অনেকটাই। গাঁয়ে কমল ভাজপা। বিরোধী শিবিরের ত্রিশূল হার্দিক, জিগনেশ, অল্পেশের ঐক্য দেখে ভয় ধরে গেল দু’ দশকের খাসতালুকের কর্তাদের।

আক্রমণের ধারা বদলালেন তাঁরা। এ বার আগেই বলা হল, ‘নামদার বনাম কামদার।’ মোদী নিজেকে ‘প্রধান সেবক’ আর ‘চৌকিদার’ বলেছিলেন। এ বার রাহুল জুমলার শব্দকোষ অনুসরণ করে চৌকিদারটাই ধার এবং মাত করলেন। পাপ্পু ডাকা বন্ধ হয়ে গেল। রাফালের সঙ্গে যুক্ত গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্প্রদায়িকতা-সহ বেকারি, যুক্তরাষ্ট্রীয়তা,  সিবিআই মিলে দুর্দান্ত প‍্যাকেজ আনলেন রাহুল। পালটা মোদীর ব্রহ্মাস্ত্র পাকিস্তান। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকার অভিনন্দন! বালাকোটে ‘৩০০ জইশী জঙ্গি নিকেশ’ বলেই শুরু হয়েছিল ভোটের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। কিন্তু পশ্চিমী মিডিয়া জল ঢেলে দিল সেই খবরে। ফের জইশী মাথা মাসুদ আজহার বধের খবরে হারের পালটা জয়ের স্কোর ভেসে উঠল বোর্ডে। এ দিকে যুদ্ধ যুদ্ধ উত্তেজনা সারা দেশে। শুন্ডির দেব পিন্ডি চটকে/হাল্লা চলেছে যুদ্ধে…।

এ পারের জনসভায় দীর্ঘকাল পরে ‘মোদী মোদী’ রবে শ্রবণ সুখের মৌতাতে মাননীয় মোদী বলেছেন, পাইলট অভিনন্দনের অভিযান ও ফিরে আসাটা ‘পাইলট প্রজেক্ট’ মাত্র। আসল কাজ এ বার।

উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের নামে সদ‍্যোজাত শিশুর নামকরণের হিড়িক পড়েছে। গোঁফ দিয়ে যায় চেনা। এবং গোঁফ কি সত্যিই কারও কেনা? অভিনন্দন এখন গোঁফে গোঁফে বিমান-চিহ্ন রেখে যাচ্ছেন। সৎ, নিষ্ঠাবান বায়ুসেনা অফিসার এবং আপাদমস্তক অরাজনৈতিক রণনীতির অনুসারী একজন যোদ্ধা হিসেবে নিশ্চিত তিনি বিস্মিত নেতাদের কাণ্ডকারখানায়। মানুষের বীরপূজা বোঝা যায়। কিন্তু নেতারা তো নিজেরাই সর্বোচ্চ বীর। তাঁদের বীরত্বের বোড়ে হওয়াই একজন জওয়ানের বিধিলিপি। আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অভিনন্দনের মিগ শত্রুর শিকার হয়। ভিন দেশের মাটিতে অভিযানরত সেনা বৈরি জনতার রোষের শিকার হন এবং পাক ফৌজিরা তাঁকে উদ্ধার ও বন্দি করে। এ অবস্থায় একজন সৈনিকের নৈতিকতা পালন করেছেন তিনি। ‘মওকাপরস্ত’ রাজনীতির লোকেদের মতো জার্সি বদল করেননি এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে মুক্তি পেয়েছেন। ভারতের মতো বৃহৎ, শক্তিশালী ও প্রভাবশালী দেশের চাপ নিশ্চিত বড়ো ফ‍্যাক্টর হয়েছে। কিন্তু তালিবানি মৌলবাদীদের মদতে জয়ী ইমরান খানের এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে এক কালের সফল ক্রিকেটার, কাপ্তানের ছায়া দেখেছেন অনেকে। এতে পাক ফৌজিরা রুষ্ট হলেন কিনা মোশারফ-মুলুকের মালিক তেনারাই জানেন। আর এ পারের জনসভায় দীর্ঘকাল পরে ‘মোদী মোদী’ রবে শ্রবণ সুখের মৌতাতে মাননীয় মোদী বলেছেন, পাইলট অভিনন্দনের অভিযান ও ফিরে আসাটা ‘পাইলট প্রজেক্ট’ মাত্র। আসল কাজ এ বার। এখানেও মোক্ষম শব্দজব্দ খেলা। কিন্তু এ তো খেলা নয়…।

আরও পড়ুন হামলার পরই পালা জোট ঘোষণার!

২ মার্চের খবর, অভিনন্দন ভারতের মাটিতে পা রাখার কয়েক ঘণ্টা পরই পুঞ্চের ঝুলা এলাকায় পরের পর গ্রামে পাক-গোলা পড়তে থাকে। গোলা পড়ে ইউনুস-রুবিনার বাড়িতে। ২৪ বছরের রুবিনা এবং তার ন’ বছরের মেয়ে শবনম ও পাঁচ বছরের ছেলে ফয়জান মারা যায়। আহত ও একা হয়ে যান ইউনুস। এ ভাবেই সীমান্তের গ্রামে গ্রামে একের পর এক সংসার উজাড় হয়ে যাচ্ছে।

দেশপ্রেমের আসন্ন ভোটে রাজনীতির কোনো না কোনো প্রাণপুরুষ প্রধানমন্ত্রী হবেন। এবং সেটাই বাঞ্ছনীয় সাংবিধানিক পথ। কিন্তু কী হবে এই উলুখাগড়াদের? কী হবে মৃত্যুমুখে পড়া ও ফিরে আসা অভিনন্দনের, সব হারানো ইউনুসের এবং পুলওয়ামার কনভয়ে বলিদান হওয়া ৪৯ জন দেশপ্রেমিকের? আপাতত দিল্লিতে কর্মসংস্থান ঘোষণার পর, মোদীর স্যুটবুট-সহ গঙ্গায় কোমরজলে দাঁড়ানো, কুম্ভে গলবস্ত্র হয়ে স্নান, দান, পূজা ও দলিত সাফাইকর্মীদের পা ধোয়ানো এবং তার পরই বালাকোটে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক – এই সব মোক্ষম মোক্ষের উপাদানের খিচুড়ি রেডি। কাশ্মীরি বরফের আগুন এখনও নেভেনি। সুতরাং জনগণ ধীরেসুস্থে চেয়েচিন্তে খিচুড়ি খেয়ে নিন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here