priyanka gandhi
debarun roy
দেবারুণ রায়

সেই রাজীবোত্তর রাজনীতির কাল থেকে প্রিয়ংকাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল কংগ্রেসকর্মী বিশেষত ছাত্র-যুবদের। উত্তরপ্রদেশের শেষ কংগ্রেসি মুখ‍্যমন্ত্রীর নাম নারায়ণ দত্ত তিওয়ারি। রাজীব গান্ধীর জীবনকালেই ‘হাত’-এর বাইরে যেতে শুরু করেছে হিন্দি বলয়। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ। কারণ প্রথমত রাজ‍্যে রাজ‍্যে কংগ্রেসের বিকল্প শক্তির উত্থান। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্তরে বা ভারতের সব রাজ‍্যে প্রভাবশালী কোনো অ-কংগ্রেসি ধর্মনিরপেক্ষ দল না থাকায় মতাদর্শে বিপরীত মেরুর দল বিজেপি কংগ্রেসবিরোধী লহরের সুযোগ নিয়ে নিজেদের ঘর গুছিয়ে নেয়। এবং কালক্রমে কংগ্রেস-বিরোধিতার ইস‍্যু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেলে অকংগ্রেসি ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো বুঝতে পারে সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়েই গিয়েছে। এখন এত দিনের অনুসৃত পথ অবিলম্বে বাতিল করে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে সাম্প্রদায়িক, সংবিধানবিরোধী, নিও-নাজিদের বিরুদ্ধে সমস্ত অ-কংগ্রেসি ও অ-বিজেপি দলকে এক ছাতার তলায় আনতে। ঐতিহাসিক এই দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানোর পাশাপাশি ত‍্যাগের মানসিকতাও চাই। না হলে স্বাধীনতা আন্দোলনের সমস্ত প্রাপ্তিই অর্থহীন হয়ে যাবে।

১৯৮৭-৮৮-র চরম কংগ্রেস-বিরোধিতার দিনেও বফর্সকেন্দ্রিক জনআলোড়নের নেতা বিশ্বনাথপ্রতাপ সিং কিন্তু বিজেপিকে সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেস-বিরোধিতার বিপদের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু সে সময় প্রবল প্রতাপশালী কংগ্রেস সরকারকে গদিচ‍্যুত করার আন্দোলনে সবাইকে শরিক করা ছাড়া পথ ছিল না। তবু ‘৮৮-৮৯-র নির্বাচনে সর্বত্র, মাঠে ময়দানে ভিপির নির্দেশ ছিল, কোনো জনসভার মঞ্চে যেন বিজেপির দলীয় ঝান্ডা না ওড়ানো হয়। বিজেপির বা সংঘের ঝান্ডা থাকলে সে জনসভায় তিনি থাকবেন না। এ ভাবেই বিজেপির ফ্ল‍্যাগ দেখে জনসভায় না ঢুকে তাঁকে চলে যেতে দেখেছি। রাষ্ট্রীয় মোর্চার সরকার গঠনের পর তৈরি সমন্বয় কমিটিতে বিজেপির স্থান হয়নি। বামেরা ও বিজেপি ওই সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছিল। তাই সরকার বাঁচাতে তাদের মধ্যে সমন্বয়ের বন্দোবস্ত ছিল অলিখিত। মাধ‍্যম ছিলেন বসু, বাজপেয়ী ও আডবাণী। বীরেন জে শাহের বাড়িতে তাঁরা কখনও কখনও বসতেন।

আরও পড়ুন মমতার ব্রিগেড মোদীর কালবেলা, কংগ্রেসের সঙ্কেত – মন মিলুক না মিলুক হাত তো মেলান

কিন্তু কোনো কৌশলই বিজেপির বৃদ্ধি রুখতে পারেনি। আডবাণীর পালানপুর প্রস্তাব অনুযায়ী অযোধ্যা আন্দোলন তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে। জনতাদলকে ভর করে বিজেপি শাখা-প্রশাখা ছড়িয়েছে উত্তরপ্রদেশ-সহ হিন্দি বলয়ে। ‘৯২-র বাবরি-ধংস উচ্চবর্ণের পার্টি হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসের তকমা ছিনতাই করে। সেই সঙ্গে আডবাণীরই চালে গোবিন্দাচার্য যে সোশ্যাল ই্ঞ্জিনিয়ারিং চালু করেন তাতেও নিম্নবর্ণের ভোটের একাংশের ওপর থাবা বসায় বিজেপি। এই সব ভোট আগে পেত কংগ্রেস। নয়ের শেষ থেকে বিজেপি, সপা, বসপা কংগ্রেসের সব ক’টি সনাতনী পকেটই একে একে কেটে তাকে সর্বহারা করে দেয়।

এর পর ইউপিএ জমানায় কংগ্রেসের ভষ্ম থেকে উঠে আসার চেষ্টা কিছুটা সার্থক হয়। ফিনিক্সের মতো তার অভ‍্যুদয়। হাতে ২২টি লোকসভা আসন। শেষ ভোটে ফের ধস। এবং সপা, বসপার নতুন জোটে কংগ্রেস ব্রাত্য। তবু জোটকে স্বাগত জানান রাহুল এবং ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। এর পরই প্রিয়ঙ্কার রাজনীতিতে পদার্পণ নিয়ে ঘোষণা। অন্তত দু’ দশকের প্রতীক্ষা কংগ্রেসকর্মীদের। কংগ্রেসের উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে ভগীরথের গঙ্গা আনার মতো। প্রিয়ংকার লক্ষ‍্য আপাতত লখনউয়ের তখত্। কিন্তু মূল লক্ষ্য যে দিল্লির মসনদ তা ক্রমশ প্রকাশ‍্য। একটা রহস্য আর নাটকীয়তা রেখেই চলবেন রাহুল। উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির এমনটাই নকশিকাঁথা।

indira and priyanka
ইন্দিরা গান্ধী ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধী। ছবি সৌজন্যে বিজনেস টুডে।

“সবাই বলে আমি ঠাম্মার মতো। আমার তো মনে হয় আমি বেশিটাই আমার বাবার মতো। বাবা যে বড্ডো নরম মনের মানুষ ছিলেন। আর সবাই বলে আমার নাকটা নাকি অবিকল ঠাম্মার নাক। আমার কিন্তু নিজের নাকটা একদম অপছন্দ।”

প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরার আদরের নাতনি শৈশব থেকেই ভারতীয় রাজনীতির মিথ্ হয়ে আছেন। ওঁকে নিয়ে যত গল্পগাথা রাহুলকে নিয়ে তত নয়। রাহুলকে যেমন নিজের ক‍্যারিশমা প্রমাণ করতে হচ্ছে পদে পদে। প্রিয়ঙ্কার ক্ষেত্রে তার উলটো। প্রিয়ঙ্কা যেন অনেক আগে থেকেই প্রমাণিত। বাবা, মা, দাদার কেন্দ্রে ভালোবাসার সিঞ্চনে স্বয়ংসিদ্ধা। এবং এত দিন পর্যন্ত পরিবারের ও পার্টির নিঃস্বার্থ কর্মী হয়ে। নেহরু-গান্ধী পরিবারের মেয়ে হয়েও তো ক্যাডার এত কাল।

আরও পড়ুন ভু্লের পর ভুল পদক্ষেপ বিজেপির, অমৃতের ভাগ চান রাহুল

না, রাজীব-সনিয়া-রাহুলের মতো ডায়রেক্ট লিডার তো নন। হয়ে ওঠাটা অনেকটা ঠাকুমার মতো। আবার ঠাকুমাসুলভ কাঠিন্যও নেই। মায়ের শুশ্রূয়ায় হাজির যেমন, তেমনি দাদার প্রতি দায়বদ্ধতা স্পষ্ট। সংসদে প্রথম বক্তব‍্য শুনতে একাই হাজির গ‍্যালারিতে। এবং নিজের সংসারে দয়িতা ও মাতৃমূর্তি। সন্তানদের জন্যই রাজনৈতিক পদ নিতে এতটা দেরি।

‘৮৮-র ভোট প্রচারের সময় প্রধানমন্ত্রী রাজীব এসেছেন, সস্ত্রীক ভোটারদের বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন। মেয়ে কিন্তু কিছুক্ষণ পর থেকেই গাঁয়ের চৌপালে। অ্যাফ্রোডিটির মতো দেখা দিলেন প্রিয়ংকা, অমেঠির সব চেয়ে প্রাচীন ঝুরিনামা বটের নীচে, সহেলির সঙ্গে। মাটিতেই প্রতিমাসনে।

ওঁকে নিয়ে যে গল্পের অন্ত নেই তা তো জানেন। নিজের জন্যে গল্প বলাতেও কোনো গৌরবগাথা নেই। একবার ঠাম্মার কথা নিয়ে বলেছিলেন। “সবাই বলে আমি ঠাম্মার মতো। আমার তো মনে হয় আমি বেশিটাই আমার বাবার মতো। বাবা যে বড্ডো নরম মনের মানুষ ছিলেন। আর সবাই বলে আমার নাকটা নাকি অবিকল ঠাম্মার নাক। আমার কিন্তু নিজের নাকটা একদম অপছন্দ।”

এই মেয়েই আবার যখন রোমিলা থাপারের সদ‍্য প্রকাশিত বই নিয়ে কথা বলেন, তাঁর প্রিয় বিদূষী সম্পর্কে শ্রদ্ধার সঞ্চয় মিলিয়ে দেন ভারতাত্মার অণ্বেষণে, কিংবা উইটি উত্তরের স্পিনে প্রতিপক্ষের উইকেট নেন, তখন অহংকারের লংকাদহনের সঙ্গে প্রিয়ঙ্কার নামে মেলানো স্লোগান কিন্তু জম্পেশ। মনে হয়, বিজেপির বুনো ওল আর কংগ্রেসের বাঘা তেঁতুল।

 

 

 

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here