ফেসবুক লাইভ করে বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়

0
rajib banerjee election campaign
[ভোটের প্রচারে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক থেকে]

৩০ জানুয়ারি প্রথম বার অমিত শাহের বাড়িতে গিয়েছিলেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। শেষ কয়েক দিন ধরে একাধিক তৃণমূল নেতার বাড়িতে যাচ্ছেন। তবে ফল এখনও মেলেনি। লিখছেন জয়ন্ত মণ্ডল।

শনিবার তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ, রবিবার তৃণমূল নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়, তার ক’ দিন আগে সদ্য তৃণমূলে যোগ দেওয়া মুকুল রায়ের বাড়িতে গিয়ে ফের খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন বিজেপি নেতা রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে একটি বারের জন্যেও সরাসরি এখনও তিনি বলেননি, “তৃণমূলে যোগ দিতে চাই”। ঠিক যেমনটা বলেছেন ভোটের আগে বিজেপিতে যোগ দেওয়া একাধিক নেতা-নেত্রী। তা হলে কি এখনও পর্যন্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না রাজীব? এ ক্ষেত্রে একটা ফেসবুক লাইভ করে বড়ো সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন তিনি। ঠিক যেমনটা করেছিলেন ঘাসফুল ছেড়ে পদ্মফুল আঁকড়ে ধরার সময়।

Loading videos...

বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে ফেসবুক লাইভ

[ফেসবুক লাইভে রাজীব]

দিনটা ছিল চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি। করোনাভাইরাস মহামারির আবহে সারা দেশে সে দিন কিছুটা স্বস্তি আর অনেকটা সমালোচনার ঝড়। ওই দিনই সারা দেশ জুড়ে কোভিড টিকাকরণ কর্মসূচির শুরু। যদিও সর্বত্র ডোজের জোগান না দিয়েই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়ে যায় সে দিন। আর ওই দিনই ফেসবুক লাইভে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়

তখনও তিনি তৃণমূলে। তবে এখন ঠিক যেমন ভাবে বিজেপিতে রয়েছেন, তেমনটাই। রাজনৈতিক মহল তো বটেই, সাধারণ মানুষের চোখ সেই শনিবারে রাজীবের ফেসবুকে। লাইভ করলেন, প্রচুর মানুষ দেখলেন। অনেকেই রাজীবের ভূয়সী প্রশংসা করে তাঁকে ‘চোরেদের দল’ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ, প্রস্তাব, আহ্বান ইত্যাদিও জানালেন। সে সব দেখে আপ্লুত রাজীব বললেন, “লাইভ শেষ হওয়ার পর আমি আপনাদের মন্তব্যগুলো ভালো করে পড়ব, তার পরে সিদ্ধান্ত নেব”।

ডোমজুড় বিধানসভার দু’ বারের বিধায়ক, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী রাজীব। নিজের এলাকার মানুষের চাওয়া-পাওয়া, মতিগতি বোঝেন না। ফেসবুক লাইভে কমেন্টস দেখে ভবিষ্যতের কর্মসূচি তৈরি করলেন। ওই লাইভ শুধু যে তাঁর এলাকার ভোটার নন, সারা বিশ্বের লোক দেখেছেন, আর নিজের নিজের মতো করে মন্তব্য করেছেন, সেটাকে পাত্তাই দিলেন না।

ওই ফেসবুক লাইভের দু’ সপ্তাহের মধ্যেই অমিত শাহের বাড়িতে গিয়ে বিজেপিতে যোগ দিলেন রাজীব। কথায় রয়েছে, মহম্মদ যদি পর্বতের কাছে আসতে না পারেন, তা হলে পর্বতকেই মহম্মদের দুয়ারে যেতে হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বঙ্গ সফরে রাজীবদের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দিল্লিতে বিস্ফোরণের জন্য অমিতের সফর বাতিল হয়। ‘চার্টার্ড বিমানে’ দিল্লি গিয়ে শাহী দরবারে হাজির হন তাঁরা। দলবদলের দিন রাজীব বলেন, “অমিত শাহর হাত ধরে বিজেপিতে যোগ দিলাম। এ বার বিজেপির হয়ে পাখির চোখ বাংলা”।

হারের পরেই ফেসবুকে বিপক্ষকে কৃতজ্ঞতা

[ভোটের সময় রাজীবের এলাকায় পোস্টার]

বিজেপির চোখ যেখানেই থাকুক না কেন, তাতে যে ডোমজুড়ের বৃহত্তর অংশের মানুষের বিশেষ কিছু আসে-যায় না, সেটা ভোটের প্রচারে বেরিয়ে টের পেয়েছিলেন রাজীব। গত ২৪ মার্চ প্রতিবেদক ফোন করে প্রাক্তন মন্ত্রীর কাছে জানতে চান, পরের দিন তিনি কোন এলাকায় প্রচারে থাকবেন। বলেন, নারনা এলাকায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে রাজীব দূরস্ত, বিজেপি অনুগামীদের খোঁজ মেলেনি। এক ডজনের বেশি বার রাজীবকে ফোন করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। স্থানীয় বিজেপি কর্মী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তিকে এ বিষয়ে বলতে গেলে তিনিও বিরক্ত হন।

এলাকার মানুষ জানান, সেখানে বিজেপির একটা মিছিল হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হবে কি না বলা যাচ্ছে না। লোক হচ্ছে না। আবার অনেক জায়গায় স্থানীয় মানুষ রাজীবকে দেখলেই বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। যেখানে রাজীবের মিছিল শুরুর কথা, কিছুটা দূরে লাইট পোস্টে ‘গদ্দার হঠাও, ডোমজুড় বাঁচাও‘-এর হাতে লেখা পোস্টার। পরে অবশ্য রাজীবের ফেসবুকে পোস্টেই দেখা গেল, পরে তিনি না কি সেখানে মিছিল করেছেন।

বিজেপির অন্য প্রার্থীদের হয়েও প্রচারে গিয়েছিলেন রাজীব। কিন্তু নিজের এলাকায় বিক্ষোভের মুখে পড়ার খবর উঠে এসেছিল একাধিক বার। হয়তো ৪২ হাজারেরও বেশি ব্যবধানে তৃণমূল প্রার্থীর কাছে হারের কারণ সেখানেই লুকিয়ে ছিল। ২ মে ফলাফল ঘোষণার দিন ফেসবুকেই বলেছিলেন রাজীব, “যাঁরা আমাকে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, আর যাঁরা আমাকে ভোট দেননি, তাঁদের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। সতীর্থ রাজনৈতিক সহকর্মীদের জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও বিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীদের জানাই অনেক ধন্যবাদ”।

হারের স্বাদ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন রাজীব। হারতেই বুঝে গিয়েছেন, কেন হেরেছেন। তাই নিজের দলের মতোই বিপক্ষ দলের ভোটার, কর্মীদের নাগাল পেতে চেয়েছেন তিনি। জবাব মিলেছে তিক্ত- “এ বার নাকে তেল দিয়ে ঘুমোন। বেইমানির ফল হাতেনাতে দিয়ে দিল ডোমজুড়ের মানুষ”।

ফেসবুক তো আছেই, একটা লাইভ হয়ে যাক

[ভোটের প্রচারে রাজীব]

ফলাফল বেরোনোর পর সত্যিই ফেসবুকের ওই পরামর্শ মেনেই আড়ালে চলে গেলেন প্রাক্তন মন্ত্রী। নাকে তেল দিয়ে ঘুমোলেন কি না, তা বলা যায় না। তবে গত সপ্তাহে যে তিনি রীতিমতো গায়ে তেল মেখে আসরে নেমেছেন, সেটা সংবাদ মাধ্যমের শিরোনামগুলো দেখলেই স্পষ্ট হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা বন্ধ করার পরামর্শ দিয়ে রাজীব এখন বলছেন, “এই বিপুল জনসমর্থন নিয়ে আসা একটা সরকারের একমাস হয়েছে। সেখানে যদি কেউ রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে চায় বা গোঁড়া সাম্প্রদায়িকতা দেখাতে চায় বা যদি সত্যিকারের ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করতে চায় তবে আমি সেই দলে থেকেও বিরোধিতা করব। আগামী দিনেও বিরোধী থাকব”।

বিধায়ক না হতে পারলেও তিনি এখন বিরোধী দলের নেতা। তাঁর বিরোধিতা করার কথা রাজ্যের শাসক দলের। কিন্তু তিনি চাইছেন রাজ্যের বিরোধী দলের বদলে শাসক দলের পাশে থেকে কেন্দ্রের বিরোধিতা করতে। সব থেকে মজার বিষয়, ‘রাষ্ট্রপতি শাসন’, ‘গোঁড়া সাম্প্রদায়িকতা’, ‘ধর্মীয় বিভাজন’ কোনো ইস্যুই রাজীবের রাজনৈতিক বুলিতে নতুন নয়। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগেও তো তিনি এবং তাঁর দল তৃণমূল একই কথা বলে এসেছেন। তা হলে কি ধরে নিতে হবে, বিজেপিতে যোগ দিয়ে প্রার্থী হলেও রাজীব কখনোই বিজেপি হতে পারেননি। ভিতরে ভিতরে তিনি তৃণমূলই রয়ে গিয়েছেন। অথবা বিজেপির ক্ষমতায় না আসাটা রাজীবের রাজনৈতিক কেরিয়ার ধসিয়ে দিতেই নতুন করে শুরু করতে চাইছেন তিনি। অথবা নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে তদন্তের হুঁশিয়ারি তাঁকে বিজেপির সঙ্গে বিচ্ছেদের পথে ঠেলে দিচ্ছে? কিন্তু বিজেপির জামাটা খুলে ফেলতে চাইলেও তৃণমূলেরটা মিলবে কি না, সে বিষয়ে খটকা হয়তো রয়েছে। তাতে কী, বড়ো সিদ্ধান্ত নিতে ফেসবুক তো আছেই, আবার একটা লাইভ হয়ে যাক!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.