অম্বেডকর আর বাবরি মসজিদ: শেষের সে দিন কী ভয়ংকর

0

দেবারুণ রায়

৬ ডিসেম্বর। বিরানব্বইয়ের এই অভিশপ্ত দিনে ভারতের যে শিশু মাতৃগর্ভের অন্ধকার পেরিয়ে মায়ের মুখ দেখেছে, সে দেখেছে তার আনন্দময়ী ভারতমায়ের মুখ শঙ্কায় কালো, আঁতুড়ঘরে অদ্ভুত আঁধার। সেই শিশু আজ সাতাশের যুবক। দগ্ধ দু’ দশক তার উন্মেষকাল।

নামেই একটা ‘ইবাদতগাহ’, মানে আরাধনাস্থল। বহু দিন সেখানে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ হয়নি তাই রহিমের ওপর রহম করেনি রাজনীতি। ‘৪৯-এর কোনো কালরাত্রিতে লখনউয়ের তখত তাউসের খিদমতগারদের দিয়ে মাত্র দু’ বছরের শিশু রাষ্ট্রের বৃহত্তম প্রদেশের শাঁসালো হুকুমত রামলালাকে পোড়ো মসজিদের দখলদার বানিয়েছে। পরিকল্পনামাফিক মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থ এমন পন্থা নিলেন যার দরুন মর্যাদা-পুরুষের মর্যাদা নস্যাৎ করে তাঁকে রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হল মসজিদের বন্ধ ফটকের ভেতরে। ক্ষমতার রাজনীতির রং তখন তেরঙা। কিন্তু জাতের নামে বজ্জাতির রং মগজে। লোকদেখানো রাজনীতির রং তিরঙ্গা, দুরঙ্গা, ভগওয়া – যা-ই হোক না কেন।

আরও পড়ুন: রায়ে রাম, তবু বিধি বাম, রামরথ আর আডবাণীকে ঢেকে রাখলেন মোদী

সেই কালো রাতটাই ছিল বাবরি ধ্বংসের বীজ বোনার মুহূর্ত। এবং ৫৩ বছর ধরে বিতর্কের পর সেই মসজিদ-মন্দিরের অস্তিত্বকে রামধাক্কায় ধ্বংস করা হল। যাকে অশ্রদ্ধাভরে ধাঁচা বলা হত, সেই না-মন্দিরে, অনাদরে অবহেলায় পড়েছিলেন রামলালা। কেউ পুজো করেনি, কেউ প্রদীপ জ্বালেনি। যে আসনে দেবতাকে বসিয়েছে তারই গম্বুজ, মিনার কিংবা খিলানের মাথায় উঠে দলে দলে রামভক্ত তকমাধারী করসেবক ছেনি-হাতুড়ি-বাঁশ-দড়ি নিয়ে নৃত্য করেছে চারশো বছরের ইতিহাস আর অগণিত পৌরাণিক আলোকবর্ষের নানা আস্থা ও উপকথার গর্ভগৃহের ওপর। ওই কালাপাহাড়েরা যাঁর নামে সংবিধানের পিণ্ডদানের তাণ্ডব চালিয়েছে, তাঁরই মাথার ওপরের চূড়া, আচ্ছাদন, চার দেওয়াল, মেঝে এবং ভিত গুঁড়িয়েছে, উপড়েছে, তালিবানি তালিমে। জাতির ঐতিহ্য আর ভারতের ইতিহাস ধূলিসাৎ ইমারতের ভেতরে মুখ লুকোনোর জায়গাটুকুও পায়নি।

অঘটন এমনই এক ঘটনার দিনকে বেছে নিয়েছে যা এক কথায় অমোঘ অভিশাপ। সংবিধানের প্রণেতা, দেশের সুসন্তান বাবাসাহেব ভীমরাও অম্বেডকরের মহাপরিনির্বাণ দিবসও ৬ ডিসেম্বর। শুধু উপমহাদেশের কেন, বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসও এই দিনটিকে ৯/১১-র মতোই কালো দিনের তালিকায় তকমা দিয়েছে। এবং এই ২৬ বছর ধরে অক্টোপাসের অসংখ্য মুখ রামনামকে বদনাম করতে চেয়ে শৌর্য দিবস পালন করেছে এই ইমারত ধ্বংসের ফি বার্ষিকীতে। এই প্রক্রিয়ায় এই বীর সুগ্রীব-পুঙ্গবেরা কী প্রমাণ করেছে? মন্দির বা ধাঁচা হলে তা ভাঙার দিনকে কি শৌর্য দিবস বলা যায়? না ভাঙার ঘটনাকে গৌরবের নজির বলা চলে? এত দিনে আদালত যখন রামলালাকেই জমি সঁপে দিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি করেছেন তখন চটকা ভেঙেছে শাবল-গাঁইতি-ছেনি-হাতুড়ি আর বাঁশ-দড়ি হাতে ধর্মোন্মাদদের। এ বার আর শৌর্য দিবস হয়নি।

মনে পড়ছে ‘৯২-এর এই দিনটির স্মৃতি। অযোধ্যার রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদের ইমারত রক্ষার প্রতিশ্রুতি আদালত ও প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং। ৬ ডিসেম্বর সকাল থেকেই অকুস্থলে পিএসসি, সিআরপি, গোয়েন্দা বাহিনী ও দূরদর্শনের সব ক’টি চোখ সতর্ক। তখন রাও সরকারের তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রী ছিলেন বাংলার অজিত পাঁজা। দূরদর্শনের ক্যামেরা মারফত শাস্ত্রী ভবনের দফতরে বসেই তিনি দেখছিলেন অযোধ্যার দৃশ্য সরাসরি। দেখছিলেন করসেবকদের তাণ্ডবের সামনে অসহায় দর্শক পুলিশ ও কেন্দ্র-রাজ্যের সশস্ত্র বাহিনী। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নির্দেশ না থাকায় তারা অমোঘ ভাঙনের নীরব সাক্ষী। অজিতবাবু আতঙ্কিত হয়ে পিএমওকে হট লাইনে জানাচ্ছিলেন আঁখো দেখা হাল। একই ভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শংকররাও চহবাণকে ফোন করে শুনছিলেন, সাব পূজা মে হ্যাঁয়। পূজা হোনে সে বতায়েঙ্গে। অধীর আতঙ্ক নিয়ে অজিত ছুটলেন আশ্রমে। নিরাপত্তা কোডে যা ছিল সেভেন আরসিআর বা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের নাম। নিজের কামরায় চার দিকে নানা রকম ফোনের ঘেরাটোপে বসে প্রধানমন্ত্রী পিভি ছিলেন নীরব। তাঁর সচিবদের সঙ্গেও কোনো সংলাপ নেই। সেন্টারে পাঁজা সেখানে ঢোকার ছাড়পত্র পেলেন। গিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, স্যার সর্বনাশের আর বাকি নেই। বাবরি মসজিদ ধংস করছে হিন্দুত্ববাদী করসেবকরা। নীরবে মাথা নেড়ে রাও সাহেব বললেন, ধীরজ রখ্খো। শান্তি বরকরার রখনা চাহিয়ে। দেখো ক্যা হোতা হ্যায়। অবুঝ অজিত, রাওয়ের মতো গভীর কূটনীতির কুশীলব ছিলেন না। বললেন, স্যার, আডবাণীরা প্রচণ্ড উত্তেজক বক্তৃতা দিচ্ছেন। নারা উঠেছে, এক ধাক্কা আর দো/বাবরি মসজিদ তোড় দো। চহবাণসাহেবকে পাচ্ছি না। তাই আপনাকেই জানিয়ে গেলাম। নরসিংহ রাও আশ্বাস-মুদ্রায় ঈশ্বরের মতো হাত তুললেন। প্রতিমন্ত্রীকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন না যে, ওঁর কাছে প্রতি পলে খবর পাঠাচ্ছেন গোয়েন্দারা।

আরও পড়ুন: করসেবকদের ঘিরে সশস্ত্র পুলিশদের নাচ, ৩০ বছর আগের সেই ছবি আজও অম্লান

এবং শেষমেশ বাবরি মসজিদের শেষ ইটটাও খসে পড়ল ইতিহাসের কাছে বর্বরতার নজির রেখে। সতীর্থ ভক্ত রিপোর্টার অযোধ্যা থেকে খবর পাঠাচ্ছিলেন, কণ্ঠে উচ্চকিত আবেগ। এক ইংরেজি কাগজের বাঙালি রিপোর্টার – “ব্লাডি স্ট্রাকচার ইজ ডিমলিশড অ্যাট লাস্ট।” আডবাণীর ভক্তমণ্ডলীতে ছিলেন। অটল-জমানায় পিএমওর কর্তা হন। এমবেডেড জার্নালিজম-এর সে বড় সুদিন ।

চারা-ঘোটালায় হয়তো মৃত্যুদণ্ডকেই বেছে নিতে সুপারিশ করবেন ভক্তজন। আর যারা ভক্তিহীন তাঁরা ফুট কেটে বলবেন ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে বাবরি ধংসের বরেণ্য অভিযুক্তরা কী করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী-সহ শ্যাডো পিএম এবং মানবসম্পদ জলসম্পদের মতো মন্ত্রী থাকেন। সংসদে চাপের মুখে পদত্যাগ করলে সংসদেই চার্জশিটেড মন্ত্রীদের ইস্তফার চিঠি  ছিঁড়ে ফেলে দেন বাজপেয়ীর মতো প্রধানমন্ত্রী, যিনি গুজরাতে মোদীকে রাজধর্ম পালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন যুধিষ্ঠিরের অশ্বত্থামা হত’র স্টাইলে। ওতে সংসদীয় বা রাজনৈতিক শোভনতার কোনো হানি হয়নি। কারণ বিজেপির সম্মান রক্ষা হয়েছিল।

২৭ বছর আগের সেই দুপুরে উড়ো খবর যখন কনফার্ম করছে না দিল্লির দরবার, সিপিএম সাংসদ হান্নান মোল্লা ফোন করে বললেন, বাবরি মসজিদের শেষ ইটটাও ধংস। মেকশিফট মন্দির হচ্ছে। পুলিশ সিআরপি মূক দর্শক। এ বার প্রতিক্রিয়া নেওয়ার পালা। প্রথমেই মনে পড়ল সিকন্দরজির কথা। বিজেপির সহ-সভাপতি, বড়ো মাপের মুসলমান নেতা এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদেরও পদাধিকারী। ফোনের সামনেই বসেছিলেন। বাড়িতে। ঘটনা কানে এসেছে। এবং তীব্র আত্মগ্লানি আর ধর্মসংকটে মুহ্যমান। খবর জানাতেই আধ মিনিটের নীরবতা। তার পর বললেন, মুঝসে কুছ না পুছে তো আচ্ছা। আমাকে কিছু জিজ্ঞেস না করাই ভালো। নিজের অপারগতার ও আপসের করুণ আর্জি আর্তির মতো শোনাল। দল টের পেয়েছিল ওঁর ক্ষোভ। এবং সংঘের নিদান অনুযায়ী হীরকের রাজা ভগবান বলতে বিশ্বের বড়ো বড়ো দেশ সফরে পাঠানো হয়েছিল সিকন্দর বখতকেই। জাদুকরের পাচন সেবনের নানা পথ। মগজ ধোলাই করতে মসনদি মেডিসিন নানা প্রকারের। মনে পড়ছে, ৭ ডিসেম্বর লোকসভায় মাথা ঝাঁকিয়ে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত অটল বললেন, বাবরি ধাঁচা ধংসের ঘটনায় মাথা হেঁট হয়ে গেছে আমাদের। হয়েছে দেশ ও জাতির। বলেই লোকসভা ছেড়ে চলে গেলেন। গেরুয়া ব্রিগেডকে তুলোধোনা করতে বিরোধীরা অস্ত্র করলেন অটলকে। কংগ্রেসকেও দুরমুশ করা হল।

পর দিন ফের এলেন অটলজি। যিনি বলতেন, ম্যায়ঁ অটল ভি হুঁ, বিহারী ভি হুঁ। আমি অনড় ও নমনীয় দুই-ই। প্রমাণ দিলেন হাতে নাতে। বললেন, অযোধ্যার ঘটনা অভিপ্রেত নয়। তবে এ জন্য আমাদের লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। আজীবন এই বিবেকের ইলাস্টিক ব্যবহার করেছেন বাজপেয়ী। কট্টর ও নরম পন্থার মধ্যেও যে একটা পন্থা আছে যা তিনি ছাড়া আর কে জানত?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.