নজরুলের ইতিহাস-চেতনায় ছিল সমকালীন এবং দূর ও নিকট অতীতের ইতিহাস

0
ছবি Twitter থেকে নেওয়া।

মৃত্যুঞ্জয় সরদার

আজ ২৯ আগস্ট। আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের এই দিনটিতেই প্রয়াত হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ৩৪ বছর ধরে তিনি ছিলেন মূক। তবু তিনি ছিলেন। ’৭৬-এর এই দিনে বাঙালি জাতিকে শোকসাগরে ভাসিয়ে তিনি বিদায় নেন।

Shyamsundar

পুঁথিগত শিক্ষা বা ডিগ্রিধারী মানুষরা সমাজের শাসনব্যবস্থায় উচ্চতর স্থানে বিরাজমান। কিন্তু তথাকথিত শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই মানুষ প্রকৃত মানুষ হয় না। আদর্শগত শিক্ষার দাম অনেক বেশি, কিন্তু আজকের সমাজে অনেক সময়ে তার মূল্য দেওয়া হয় না। আজও অনেক মানুষ আছে যারা অল্পশিক্ষিত বা নিজের চেষ্টায় কোনো রকম উচ্চশিক্ষার স্থানে স্থান পেয়েছে, কিন্তু সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। তাদের লেখনী, তার গুণগতমান, আদর্শ এবং সত্যবাদিতার মূল্য তো আমরা দিতে পারি না। প্রকৃত মানুষকে যে মর্যাদা দেওয়া উচিত, আজকের সমাজব্যবস্থায় তা অনেক সময়েই দেওয়া হয় না। ফলে আজকের সমাজ আরও জঘন্যতম জায়গায় চলে এসেছে।

নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আজ মানুষের মধ্যে কত রকম বিভেদ তৈরি করা হচ্ছে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান জৈন, বৌদ্ধ – ধর্মভিত্তিক ভাগের পিছনে সমাজের মাথাদের স্বার্থ লুকিয়ে রয়েছে। এ বিষয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন নজরুল। তাই তাঁর সৃষ্টিকর্মে রয়েছে হিন্দু-মুসলিম মিশ্র ঐতিহ্যের পরিচর্যা। এই কারণেই তিনি তাঁর কবিতা ও গানে প্রচলিত বাংলা ছন্দোরীতি ছাড়াও অনেক সংস্কৃত ও আরবি ছন্দ ব্যবহার করেন। নজরুলের ইতিহাস-চেতনায় ছিল সমকালীন এবং দূর ও নিকট অতীতের ইতিহাস, সমভাবে স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব। বাংলা তথা ভারতবর্ষের মানুষ আজ কাজী নজরুল ইসলামের সমমনা নীতি-আদর্শ মেনে চললে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করাটা অন্তত বন্ধ থাকত।

নজরুল ইসলামকে নিয়ে কতগুলো জীবনী লেখা হয়েছে, তার সংখ্যা আমার জানা নেই। তবে আমার বিশ্বাস, অত জীবনী অন্য কোনো বাঙালিকে নিয়ে লেখা হয়নি, এমনকি রবীন্দ্রনাথকে নিয়েও নয়। এর একটা কারণ, নজরুল সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব। বিশেষ করে সৈন্যবাহিনী থেকে তিনি কলকাতায় ফিরে আসার আগের সময়টা আমাদের কাছে একান্ত অস্পষ্ট। শোনা কথা, যে যা কল্পনা করতে পেরেছেন, তিনি তা-ই লিখেছেন।

ছোটোবেলা থেকে এই প্রতিবেদকের একটি নেশা ছিল, অল্পশিক্ষিত নামী মানুষকে নিয়ে গবেষণা করা এবং তার তথ্য পরিবেশন করা। অল্পশিক্ষিত মানুষদের মধ্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাড়িতে বসে লেখাপড়া শিখেছিলেন। অন্য দিকে কাজী নজরুল ইসলাম দশম শ্রেণি পাশ করে গেলেন সেনাবাহিনীতে, সেনাবাহিনী থেকে ফিরে একজন খ্যাতিমান কবি। এই প্রতিবেদকের লেখার বিষয়বস্তু অল্পশিক্ষিত কবি নজরুলের জীবনের ইতিকথা।

‘দুখু মিয়া’র জন্ম

বর্ধমান জেলার আসানসোলের কাছে চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে কাজী নজরুল ইসলাম এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ফকির আহমেদ ও মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। নজরুলের ডাক নাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। নজরুল ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সংগীতজ্ঞ, দার্শনিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ – দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমান ভাবে সমাদৃত। 

বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। কাজী নজরুলের মতন দরিদ্র পরিবারে জন্ম, এমন লেখক আজও আছে। কিন্তু সেই সব লেখককে আমরা মর্যাদা দিতে চাই না বা স্বীকৃতি দিতে রাজি নই। আমরা তাঁদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে দিই অকারণে, অবিচারে। এ কারণেই নজরুলের কথাগুলো আজকের সমাজের কাছে ভীষণ ভাবে প্রাধান্য পাবে। পুথিগত শিক্ষায় শুধু শিক্ষিত হলেই যে প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় এটা ঠিক নয়। সেই জন্যই কি নজরুল তাঁর কবিতায় ব্যতিক্রমী এমন সব বিষয় ও শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা আগে কখনও ব্যবহৃত হয়নি।

নজরুল তাঁর কবিতায় সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক যন্ত্রণাকে ধারণ করায় অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে মানবসভ্যতার কয়েকটি মৌলিক সমস্যাও ছিল তাঁর কবিতার উপজীব্য। এ ছাড়াও নজরুল তাঁর সৃষ্টিকর্মে হিন্দু-মুসলিম মিশ্র ঐতিহ্যের পরিচর্যা করেন। কবিতা ও গানে তিনি এই মিশ্র ঐতিহ্যচেতনাবশত প্রচলিত বাংলা ছন্দরীতি ছাড়াও অনেক সংস্কৃত ও আরবি ছন্দ ব্যবহার করেন।

বাংলা সংগীতের প্রায় সব ক’টি ধারার পরিচর্যা ও পরিপুষ্টি, বাংলা গানকে উত্তর ভারতীয় রাগসংগীতের দৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন এবং লোকসংগীতাশ্রয়ী বাংলা গানকে উপমহাদেশের বৃহত্তর মার্গসংগীতের ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্তি নজরুলের মৌলিক সঙ্গীতপ্রতিভার পরিচায়ক। নজরুল সংগীত বাংলা সংগীতের অণুবিশ্ব, তদুপরি উত্তর ভারতীয় রাগসংগীতের বঙ্গীয় সংস্করণ। বাণী ও সুরের বৈচিত্র্যে নজরুল বাংলা গানকে যথার্থ আধুনিক সংগীতে রূপান্তরিত করেন। এ সব কথা বোঝার আগে নজরুল সম্পর্কে আমাদের জানা খুব প্রয়োজন। তাই নজরুলের ব্যক্তিগত জীবন থেকে কবি হওয়া ওঠার সাফল্য সফলতা তুলে ধরার চেষ্টা করছে এই লেখক। 

শৈশবের সংগ্রাম

নজরুলের যখন দশ বছর বয়স তখন তিনি গ্রামের মকতব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাঁর পিতার মৃত্যু হলে তাঁকে বাধ্য হয়ে উপার্জনের চেষ্টা করতে হয়। গ্রামের মৌলবিদের সাহায্যে মকতবে ছোটোদের পড়া মুখস্থ করানোর জন্য এক পিরের দরগায় কাজের ব্যবস্থা হয়। এখানে দু’ বছর তাঁর অতিবাহিত হয়। শৈশব থেকে তিনি লোকনাট্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এর পর তিনি ভ্রাম্যমাণ ‘লেটো’ গানের দলে যোগ দেন। সেই দলের জন্য তিনি গান গাইতেন, গান ও পালা রচনা করতেন। তিনি পালা গান রচনা করতে গিয়ে হিন্দু দেব-দেবী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারেন। এখানেই শেষ নয়! তিনি বাসুদেবের শখের কবি গানে যোগ দেন। এখানে তিনি গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন ও নিজে গান গেয়েছেন। সেখান থেকে তাঁকে এক বাঙালি খ্রিস্টান গার্ড বাবুর্চির কাজের জন্য নিয়ে যান। সেখানে ভালো না লাগায় তিনি আসানসোলে এক চা-রুটির দোকানে কাজ করতে লাগলেন। দোকানে থাকার জায়গা ছিল না। তাই পাশেই এক তেতলা বাড়ির সিঁড়ির নীচে থাকতেন। সেই বাড়িটি ছিল এক পুলিশ ইন্সপেক্টর কাজী রফিউল্লাহ ও তাঁর স্ত্রী শামসুন্নেসার। তাঁরা নজরুলকে ময়মনসিংহের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। এর পর নজরুল রানিগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।

মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন নজরুল, জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত তিনি ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নিজেকে শনাক্ত করতেন। তার পর তিনি যে আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে কেবল মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন, সেটা রক্ষণশীলরা মেনে নিতে চান না। জীবনের একটা পর্যায়ে তিনি যে কালীর সাধনা করতেন, সে কথা অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবেন না। নজরুল ইসলাম সম্পর্কে নির্মোহ বিচার করা শক্ত।

একজন ‘বড়ো’ মানুষের সব কিছুই সর্বাঙ্গীণ সুন্দর এবং সুগোল হবে, এমন কি কোনো কথা আছে? মাইকেল মদ্যপ ছিলেন, তাই বলে কি মহাকবি হিসেবে তাঁর মূল্য কিছু কমে গেছে? বোদলেয়ারের মৃত্যু হয়েছিল সিফিলিসে ভুগে, তাঁর জন্য কি তাঁর কবিতা মূল্য হারিয়েছে? হারায়নি। বরং দেড়শো বছর পরেও রোমান্টিক কবি হিসেবে তিনি ভাস্বর। তেমনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্রকর রাফায়েলও মারা গিয়েছিলেন সিফিলেসে ভুগে। তার জন্য তাঁর চিত্রের মূল্য কি কিছুমাত্র হ্রাস পেয়েছে? নজরুল-জীবনেও অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল, অন্ধকার দিক ছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্য এবং সংগীত-আকাশের চোখধাঁধানো জ্যোতিষ্ক। তাঁর জীবনের এক সময়ে তিনি ‘খোদার আসন আরশ ছেদিয়া’ বিস্ময়ের মতো আবির্ভাবের ঘোষণা করেছিলেন; ভগবান-বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিতে চেয়েছিলেন —সমকালীন রক্ষণশীল লোকেরা অনেকে এ কথাগুলোকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে তাঁকে নমরুদ, ফেরাউন ও কাফের আখ্যা দিয়েছিলেন। যাক এ সব কথা ছেড়ে ফিরে আসি নজরুল জীবনের কাহিনিতে।

মকতব, মাজার ও মসজিদ-জীবনের পর নজরুল রাঢ়বাংলার (পশ্চিমবাংলার বর্ধমান-বীরভূম অঞ্চল) কবিতা, গান আর নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিকে তৈরি হওয়া লোকনাট্য লেটোর দলে যোগদান করেন। ওই সব লোকনাট্যের দলে বালক নজরুল ছিলেন একাধারে পালাগান রচয়িতা ও অভিনেতা। নজরুলের কবি ও শিল্পীজীবনের শুরু এ লেটোদল থেকেই। হিন্দু পুরাণের সঙ্গে নজরুলের পরিচয়ও লেটোদল থেকেই শুরু হয়েছিল। তাৎক্ষণিক ভাবে কবিতা ও গান রচনার কৌশল নজরুল লেটো বা কবিগানের দলেই রপ্ত করেন। এ সময় লেটোদলের জন্য কিশোর কবি নজরুলের সৃষ্টি চাষার সঙ, শকুনিবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের সঙ, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, মেঘনাদ বধ প্রভৃতি।

করাচি সেনানিবাসে থেকেই সাহিত্যচর্চা

প্রিটেস্ট পরীক্ষার সময় ১৯১৭ সালের শেষ দিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ছাত্রজীবনের শেষ বছরগুলিতে নজরুল সিয়ারসোল স্কুলের চার জন শিক্ষক দ্বারা নানা ভাবে প্রভাবিত হন। তাঁরা হলেন উচ্চাঙ্গসংগীতে সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী ভাবধারায় নিবারণচন্দ্র ঘটক, ফারসি সাহিত্যে হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্যচর্চায় নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। এখানে নজরুলের জীবন থেমে থাকেনি। ১৯১৭ সালের শেষ দিক থেকে ১৯২০ সালের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছর নজরুলের সামরিক জীবনের পরিধি। এ সময়ের মধ্যে তিনি ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্টের একজন সাধারণ সৈনিক থেকে ব্যাটেলিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত হয়েছিলেন। রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি মৌলবির নিকট তিনি ফারসি ভাষা শেখেন, সংগীতানুরাগী সহসৈনিকদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সংগীতচর্চা করেন এবং একই সঙ্গে সমভাবে গদ্যে-পদ্যে সাহিত্যচর্চা করেন। করাচি সেনানিবাসে বসে রচিত এবং কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের রচনাবলির মধ্যে রয়েছে ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ ( সওগাত, মে ১৯১৯) নামক প্রথম গদ্য রচনা। প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘মুক্তি’ (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, জুলাই ১৯১৯) এবং অন্যান্য রচনা: গল্প ‘হেনা’, ‘ব্যথার দান’, ‘মেহের নেগার’, ‘ঘুমের ঘোরে’; কবিতা ‘আশায়’, ‘কবিতা সমাধি’ প্রভৃতি।

উল্লেখযোগ্য যে, করাচি সেনানিবাসে থেকেও নজরুল কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা, যেমন প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী, মর্ম্মবাণী, সবুজপত্র, সওগাত-এর গ্রাহক ছিলেন। তা ছাড়া তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, এমনকি ফারসি কবি হাফিজেরও কিছু গ্রন্থ ছিল। প্রকৃতপক্ষে নজরুলের আনুষ্ঠানিক সাহিত্যচর্চার শুরু করাচির সেনানিবাসে থাকা অবস্থায়ই। ১৯২১ সালে কুমিল্লায় নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় । কিন্তু বিবাহে ঝামেলা হওয়ার জন্য তিনি তাঁর পরিচিত সেনগুপ্তের বাড়ি চলে আসেন। পরে প্রমীলা দেবী ও নজরুল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। 

গোঁড়ামি, রক্ষণশীলতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নজরুলের অবস্থান ছিল কঠোর। কলকাতায় এসে নজরুল ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ, পারস্যের কবি হাফেজ ও খৈয়াম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন নজরুল। এখান থেকেই নজরুলের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ শুরু হয়। এই সময় ভারতীয়রা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়িয়েছিল। তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে ব্রিটিশদের নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদ করেছিলেন। প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন গান, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি। নজরুল এ সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন এবং স্বরচিত স্বদেশি গান পরিবেশন করে পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। ১৩২৬ বঙ্গাব্দে বঙ্গীয় মুসলমান নামক সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ প্রকাশিত হয়। এ সময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। তিনি কুমিল্লা, মেদিনীপুর, হুগলি, ফরিদপুর, বাঁকুড়া এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে যোগ দেন। তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে ভারতীয় যুবকদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে প্রেরণা জোগাতেন। ব্রিটিশ শাসকরা ভয় পেল, তাদের আশঙ্কা হল, নজরুলের লেকজা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্ররোচিত করবে।

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য নজরুল সব চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর কবিতা শুধু ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, সমাজের সমস্ত রকম অসাম্য, অন্যায়, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। তাঁর কবিতার আর একটি বিশেষত্ব হল হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের ঐতিহ্যের সার্থক মেলবন্ধন।

সাংবাদিকতায় নজরুল

১৯২২ সালে নজরুল ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ব্রিটিশরা ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা অফিসে তল্লাশি চালায়, কবিকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এর পর তাঁকে হুগলি জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। তিনি এখানে অনশন শুরু করেন। এক মাসের বেশি তিনি অনশন করেন। ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে নজরুলকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯২৫ সালে তিনি সাপ্তাহিক ‘লাঙ্গল’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর এত কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ আর গান কেউ লেখেননি। ছোটোগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। নজরুলের গানের সংখ্যা চার হাজারের বেশি। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানগুলিকে নজরুলগীতি বলা হয়। তাঁর রচিত বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফণীমনসা, প্রলয় শিখা ইত্যাদি। নাটক – দাতা কর্ণ, কবি কালিদাস, রক্তকমল, মহুয়া, জাহাঙ্গীর, কারাগার, সাবিত্রী, আলেয়া, সর্বহারা, সতী। ১৯৪৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার জগত্তারিণী স্বর্ণপদক নজরুলকে প্রদান করা হয়। ১৯৬০ সালে ভারতীয় তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মভূষণে ভূষিত করা হয় তাঁকে।  

১৯৪০ সালে কবির স্ত্রী প্রমীলার কঠিন পক্ষাঘাত হয়। কবি মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েন, তাঁর মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে। ১৯৪২ সালে তিনি একেবারে মূক হয়ে যান। দেশে বিভিন্ন ভাবে তাঁদের চিকিৎসা করা হয়। এখানে চিকিৎসায় সফল না হওয়ার জন্য বিদেশে লন্ডনে, ভিয়েনায় পাঠানো হয়। কবির স্ত্রীর মৃত্যু হয় ১৯৬২ সালে। ১৯৭১ সালে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ তৈরি হয়। ১৯৭২ সালে নজরুলকে বাংলাদেশের ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদানের সরকারি আদেশ জারি করা হয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। বাংলাদেশে তাঁর মৃত্যু উপলক্ষ্যে দু’ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয় এবং ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

আরও পড়তে পারেন

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় বাংলাদেশ স্মরণ করল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন