Connect with us

ইতিহাস

চল্লিশের দশকে বাংলার এক গণ্ডগ্রামে নারী শিক্ষার আলো দেখিয়েছিলেন তিনি, নারী দিবসে স্মরণ করি সেই বীরাঙ্গনাকে

বর্ধমান-বাঁকুড়ার সীমানায় আকুই গ্রাম তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতবর্ষে ছিল কৃষিজীবী প্রধান এবং শিক্ষায় অনগ্রসর। গ্রামীণ সমাজও ছিল রক্ষণশীল। এই পরিবেশেই জন্ম হয় ননীবালার, ১২৯৩ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে।

Published

on

ননীবালা গুহ এবং তাঁর নামাঙ্কিত গার্লস হাইস্কুল।

শ্রয়ণ সেন

—- “আমি ভিক্ষে চাইতে এসেছি, দেবে?”

Loading videos...

—- “ভিক্ষে! এবং আপনি! কেন?”

—- “না, যেটা ভাবছ সেটা নয়। টাকাপয়সা ভিক্ষে আমি করছি না। ছাত্রীভিক্ষে। আমার বাড়িতে গড়ে ওঠা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ছাত্রী চাই। আমার স্বপ্ন মেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে শিক্ষিত করে তোলা।”

নিশ্চিত করে জানা যায় না, কিন্তু ননীবালা গুহ এবং এই প্রতিবেদকের প্রপিতামহী এমিলাসুন্দরী সেনের মধ্যে হয়তো এই ধরনের কথোপকথনই হয়েছিল।  

১৯৩৯ সাল। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন তখন মধ্য গগনে। ঠিক তখনই ৫২ বছরের এক প্রৌঢ়া আকুই গ্রামের পশ্চিম পাড়ার দোরে দোরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন শিক্ষার আলোয় মেয়েদের আলোকিত করে তুলবেন বলে।

আকুইয়ের স্কুল মোড়।

বর্ধমান-বাঁকুড়ার সীমানায় আকুই গ্রাম তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতবর্ষে ছিল কৃষিজীবী প্রধান এবং শিক্ষায় অনগ্রসর। গ্রামীণ সমাজও ছিল রক্ষণশীল। এই পরিবেশেই জন্ম হয় ননীবালার, ১২৯৩ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে।

শত প্রতিকূলতায় ভরা তাঁর জীবন। মাত্র ১১ বছর বয়সেই বিধবা হন তিনি, লেখাপড়াও জানতেন না। জানা যায়, অনেক বছর পর নিজের নাম স্বাক্ষর করতে শিখেছিলেন তিনি।

ব্রিটিশ আমল, বাল্যবিধবা, নিরক্ষর এবং রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজ — এই চার প্রতিকূলতাও দমিয়ে রাখতে পারেনি ননীবালাকে, যিনি এখনও ‘ননী পিসিমা’ নামে পরিচিত গ্রামের প্রবীণদের কাছে।

আকুইয়ের প্রবীণরা — এই প্রতিবেদকের জেঠু রমাপ্রসাদ সেন, আকুইয়ের বিশিষ্ট মানুষ দিলীপ কুমার দাঁ-রা কেন ননীবালাকে ‘ননী পিসিমা’ বলতেন?

কারণ এঁদের বাবা-কাকারা তিরিশ-চল্লিশের দশকে ননীবালার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

সালটা ১৯৩০। ননীবালা তখন সদ্য চল্লিশ পেরিয়েছেন। এই বছরই জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পান তিনি। আইন অমান্য আন্দোলনের আহ্বান শুনে দেশসেবার কাজে ব্রতী হন। আকুইয়েরই দত্ত পরিবারের ছেলে জগদ্বন্ধুর নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ননীবালাও স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।   

ননীবালার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে নিজের রক্ষণশীল সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন মতিবালা দত্ত, সুশীলা দে, রাধারানি ঘোষ, করুণাময়ী দলুই প্রমুখ। এঁরা সবাই বাল্যবিধবা।

ব্রিটিশ ভারতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছিল। কিন্তু ননীবালা ছিলেন সাহসিনী। ১৯৩০ সালেই জাতীয় পতাকা উত্তোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নেন।

এর পরের বছর আকুইয়ের পাশের গ্রাম বামুনিয়ায় ‘চৌকিদারি কর বন্ধ আন্দোলন’ প্রবল আকার ধারণ করে। সার্কেল ক্রোক অফিসার গাড়ি নিয়ে আসার চেষ্টা করলে নারী সত্যাগ্রহীদের প্রবল বাধার মুখে পড়েন। ননীবালার নেতৃত্বে নারী সত্যাগ্রহীরা মাটিয়ে শুয়ে পড়ে তাঁর পথ আটকান।

শোনা যায়, তিন দিন ধরে মাটিতে শুয়ে এ ভাবেই পথ আটকে রেখেছিলেন তাঁরা। এর পর বিষ্ণুপুরের মহকুমাশাসক ও পদস্থ পুলিশ অফিসারদের নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের ওপরে ব্যাপক লাঠি চালায় পুলিশ। ননীবালা-সহ অনেকেই আহত হন। তাঁকে এবং অন্যান্য সত্যাগ্রহীকে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৩১ সালে ফের একবার গ্রেফতার হন ননীবালা। তিন মাস কারাদণ্ড ভোগের পর মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে তিনি মুক্তি পান ১৯৩২ সালের ১১ মার্চ।

শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, গঠনকর্মীও ছিলেন ননীবালা। আকুই গ্রামে চরকা কেন্দ্র স্থাপন, সুতোকাটা, খদ্দর ব্যবহারের জন্য গ্রামের নারীপুরুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল তাঁর।

এর পাশাপাশি ননীবালা ছিলেন বাঁকুড়া জেলার নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ। নিজে নিরক্ষর হয়েও মহিলাদের পড়াশোনার গুরুত্ব তিনি বুঝেছিলেন এবং গ্রামের মানুষদের বুঝিয়েছিলেন।

ননীবালার জন্মস্থান আকুই গ্রামের পুবপাড়ায়। ১৯৩৯ সালে নিজের বাড়িতেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলেন তিনি। এই কর্মসূচিতে তাঁকে সাহায্য করেন জগদ্বন্ধু দত্ত এবং আকুই ইউনিয়ন বোর্ডের তৎকালীন সম্পাদক কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত। তাঁর লক্ষ্য ছিল, মেয়েদের তিনি পড়াশোনায় উদ্বুদ্ধ করবেনই এবং সেই কারণেই গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ‘ছাত্রীভিক্ষা’ করতেন।

কিন্তু সেখানেও ছিল বাধা। পুবপাড়াটি ছিল সে অর্থে অনগ্রসর। সামাজিক রক্ষণশীলতা অনেক বেশি ছিল এই পাড়ায়। ছোটো বয়সে ‘বিধবা’ ননীবালাকে অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে এখানে। বিভিন্ন বাড়িতে তাঁর প্রবেশের ওপরে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এই পাড়ার বাসিন্দারা যে তাঁদের মেয়েদের বাড়ি থেকে বেরোতে দেবেন না, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হয়ে যান।

অন্য দিকে, তৎকালীন পশ্চিমপাড়া ছিল সে অর্থে তুলনামূলক ভাবে উদার। তাই পশ্চিমপাড়াতেই যান তিনি। প্রথমেই আসেন এই প্রতিবেদকের প্রপিতামহীর কাছে। ননীবালাদেবীর কথায় রাজি হয়ে যান এমিলাসুন্দরী সেন এবং এক কথায় তাঁর ছোটো মেয়ে মমতাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়ে দেন। পশ্চিমপাড়ার আরও চারটি বাড়ি তাঁদের মেয়েদের পাঠায় এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

আকুই ননীবালা গার্লস হাইস্কুল।

অর্থাৎ, গ্রামের যে পাঁচ মহিলা প্রথম বার বাড়ির ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে পড়াশোনার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই প্রতিবেদকেরই পিসি-ঠাকুমা।

১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে যোগ দিয়ে ফের একবার গ্রেফতার হন ননীবালা। মেদিনীপুর জেলে বন্দি থাকেন তিনি। কারাবাসের মধ্যেও ননীবালার মন পড়ে থাকত তাঁর তৈরি প্রাথমিক বিদ্যালয়তেই। জেলে বসেই কৃষ্ণচন্দ্র দত্তকে চিঠি পাঠান ননীবালা। বয়ান ছিল, “আমি যে বিদ্যালয়টি তৈরি করেছি, সেখানে পশ্চিমপাড়া থেকে মেয়েরা আসছে তো?”

বিনা বিচারে আট মাস বন্দি থাকার পর অবশেষে ছাড়া পান এবং আকুই ফিরে আসেন ননীবালা।

দেশ স্বাধীন হতেই গ্রামবাসীদের কাছে ‘মাতঙ্গিনী হাজরা’ হয়ে ওঠেন ননীবালা। গ্রামের বাসিন্দারা তাঁকে এই নামেই ডাকতেন। যদিও এই ডাক শুনেই অসম্ভব লজ্জায় পড়তেন। প্রতিবাদ করতেন। বলতেন, “ধুর, কার সঙ্গে কার তুলনা করছিস তোরা!”

পশ্চিমপাড়ার প্রমোদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে গ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আড্ডা বসত। সেই আড্ডায় প্রতি দিন সন্ধ্যায় যোগ দিতেন ননীবালাও। দেশ তখন পরাধীনতার অন্ধকার থেকে মুক্ত।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী ননীবালার এক কালের সহকর্মীরাই এ বার ঠিক করলেন তাঁর নামে হাইস্কুল তৈরি করবেন।

প্রস্তাব দেওয়া হল ননীবালাকে। তাতেও প্রতিবাদ এই বীরাঙ্গনার। হাইস্কুলে তৈরিতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু নিজের নামে কিছুতেই সেই স্কুলের নামকরণ করতে দেবেন না। কিন্তু সেই আপত্তি আর টিকল না।

স্কুল তো হবে, কিন্তু তার জমি দেবে কে? সেই দায়িত্ব নিলেন প্রমোদবাবুই। একটি জমি চিহ্নিত হল। জমিটি পশ্চিমপাড়ারই বাসিন্দা দেব এবং রায়দের।

প্রমোদবাবু ছিলেন দেব এবং রায়দের দীক্ষাগুরু। মেয়েদের জন্য হাইস্কুল হবে, তাই জমি দরকার—এই আবেদন নিয়ে সটান দেব এবং রায়দের কাছে আবেদন করে বসেন তিনি। তাঁরাও এক কথায় রাজি হয়ে যান। মেয়েদের স্কুল তৈরির জন্য জমি দিয়ে দেন তাঁরা।

যাঁদের জন্য গড়ে উঠল ননীবালা গার্লস হাইস্কুল।

বলতে কিঞ্চিৎ গর্ব হয়, এই প্রতিবেদকের ঠাকুমা শিবানী সেন পশ্চিমপাড়ার এই দেব পরিবারেরই মেয়ে। 

জেলবন্দি থাকাকালীন অনেক প্রভাবশালী স্বাধীনতা সংগ্রামীর সংস্পর্শে আসেন ননীবালাদেবীরা। পরবর্তীকালে এঁরাই সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন, কেউ কেউ মন্ত্রীও হন। কিন্তু ননীবালাদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ।

ননীবালাদেবীর আবেদনেই আকুই গ্রামে আসেন এমনই কয়েক জন মানুষ। তাঁদের হাত ধরেই ‘আকুই ননীবালা গার্লস হাইস্কুল’-এর প্রাথমিক ভিত তৈরি হয়। মাটির ঘরে তৈরি হওয়া এই হাইস্কুল ধীরে ধীরে বড়ো হতে থাকে।

এখন এই গার্লস হাইস্কুলটি শুধুমাত্র আকুই নয়, বাঁকুড়া জেলায় অন্যতম জনপ্রিয় স্কুল। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে এখানকার ছাত্রীরা দুরন্ত ফলাফল করে তাক লাগিয়ে দেয়।

১০৪ বছর বেঁচে ছিলেন ননীবালা। পরমায়ুর দিক দিয়ে এ রাজ্যের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে তাঁর স্থান দ্বিতীয়। শেষ বয়স পর্যন্তও নারীশিক্ষা নিয়ে সচেষ্ট ছিলেন তিনি। মেয়েদের পড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সরব হয়েছেন তিনি।

দেশের গ্রামাঞ্চলে যখনও সে ভাবে নারীশিক্ষার আলো ফোটেনি, তখনই এই ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন ননীবালা। কিছু বাধাবিপত্তি থাকলেও আকুই গ্রামকে পাশে পেয়েছিলেন তিনি। আকুই গ্রাম তাই আজও ননীবালাময়। গ্রামের স্কুল মোড়ে তৈরি হয়েছে তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তিও।

আকুইয়ের স্কুল মোড়ে ননীবালার আবক্ষ মূর্তি।

বছরের ৩৬৫টা দিনই নারীদের দিন হওয়া উচিত। কিন্তু একটা বিশেষ দিন যখন রয়েছেই, সেই দিনে এমন এক বীরাঙ্গনার পায়ে শতকোটি প্রণাম জানাই।   

ইতিহাস

বরানগরের জয় মিত্র কালীবাড়িতে পশুবলি বন্ধ হয়েছিল বালানন্দ ব্রহ্মচারীর বিধানে

শোনা যায়, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এই মন্দিরে আসতেন।

Published

on

জয় মিত্র কালীবাড়ি। ছবি উইকিপিডিয়া থেকে।

স্মিতা দাস

কলকাতার লাগোয়া বরানগর। দেদীপ্যমান মহানগরের পাশে উত্তরের নগন্য শহরতলি। কিন্তু বয়স-মাহাত্ম্যে কলকাতার তুলনায় বরানগর নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য।

Loading videos...

বরানগরের বয়স কত? জোয়াও ডি বারোস-এর (Joao De Barros) নকশায় বরানগরের উল্লেখ রয়েছে। এই নকশার সময়কাল ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দ। এর থেকে প্রমাণ, ১৫৫০-এ বরানগরের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু এর আগেও বরানগর নামক জনপদের উল্লেখ আছে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে।

বরানগরের শ্রীশ্রীপাটবাড়ির তথ্য থেকে জানা যায়, শ্রীচৈতন্যদেব ১৫১২ খ্রিস্টাব্দে নৌকাযোগে বরানগরে এসেছিলেন। শ্রীচৈতন্যের সমকালীন বাংলা সাহিত্যে বরানগরের স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। শ্রীবৃন্দাবন দাস তাঁর ‘শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত’-এর শেষ খণ্ডে লিখেছেন – হেন মতে পাণিহাটি গ্রাম ধন্য করি।/ আছিলেন কথোদিন শ্রীগৌরাঙ্গ হরি।।/ তবে প্রভু আইলেন বরাহনগরে।/ মহাভাগ্যবন্ত এক ব্রাহ্মণের ঘরে।। শ্রীবৃন্দাবন দাসের জন্ম ১৫০৭ খ্রিস্টাব্দে এবং শ্রীচৈতন্যের জন্ম ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে। সুতরাং তাঁরা দু’ জনে মোটামুটি সমসাময়িক ছিলেন। অর্থাৎ ষোড়শ শতকের গোড়ার দিকে চৈতন্য মহাপ্রভুর সময়কালে বরানগর জনপদটির অস্তিত্ব ছিল। তখন এই স্থানটির নাম ছিল বরাহনগর।

এই বরানগরকে এক কথায় ‘মন্দিরনগরী’ বললে অত্যুক্তি হয় না। এই শহরের অলিতে-গলিতে কত যে মন্দির ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তার ইয়ত্তা নেই। এই সব মন্দিরের অধিকাংশই প্রাচীন। এর মধ্যে কিছু মন্দির অত্যন্ত জীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে।            

কৃপাময়ী কালী। ছবি জয় মিত্র কালীবাড়ি ট্রাস্ট ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া।

এ হেন বরানগরের একটি উল্লেখযোগ্য মন্দির হল জয় মিত্র কালীবাড়ি। কে এই জয় মিত্র? প্রাণকৃষ্ণ দত্ত তাঁর ‘কলিকাতার ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে লিখেছেন, “…শোভাবাজারের কালীপ্রসাদ দত্তের স্ট্রীট যাহাকে জয় মিত্রের গলি বলে, সেই রাস্তায় জয় মিত্রের বাড়ি, আমরা তাঁহার দুর্গোৎসবে নবমীর দিন অসংখ্য মহিষ, মেষ ও ছাগ বলি দেখিয়াছি…।” জয়নারায়ণ মিত্র তথা জয় মিত্রের বাবা রামচন্দ্র মিত্র কলকাতায় জনৈক জাহাজ-ক্যাপ্টেনের বেনিয়ান হিসাবে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। সেই বিপুল সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী জয় মিত্র সহজাত বুদ্ধির জোরে ধনসম্পদ আরও বাড়িয়ে তোলেন। দানধ্যান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। শোভাবাজার অঞ্চলে তাঁর নামে একটি রাস্তাও আছে – জয় মিত্র ঘাট লেন।      

সেই জয় মিত্র বরানগরে জনৈক জেমস্‌ সাহেবের কাছ থেকে প্রায় ৩ বিঘা জমি কিনে কালীমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। শোনা যায়, শ্যামনগরের মূলাজোড়ের ব্রহ্মময়ী কালীমন্দির দেখে বরানগরে মন্দির তৈরির সিদ্ধান্ত নেন জয় মিত্র। অবশেষে ১২৫৭ বঙ্গাব্দের চৈত্র সংক্রান্তিতে অর্থাৎ ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দের মাঝ-এপ্রিলে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। দক্ষিণাকালী এখানে কৃপাময়ী কালী হিসাবে পূজিতা।

বরানগরের কুঠিঘাট থেকে গঙ্গার ধার ধরে অল্প একটু হাঁটলে পৌঁছে যাবেন জয় মিত্তিরের কালীবাড়িতে। ১৭১ বছর বয়সি এই মন্দিরটি হরকুমার ঠাকুর স্ট্র্যান্ডের ধারে অবস্থিত।

কালীবাড়ির প্রবেশফটক। ছবি ইউটিউব থেকে।

এটি নবরত্ন মন্দির। কিন্তু প্রথাগত ঢালু চালের নবরত্ন মন্দির নয়। দোতলা দালান মন্দির। একতলার সমতল ছাদের চার কোণে চারটি চূড়া বা রত্ন বসানো। দোতলার সমতল ছাদের চার কোণে চারটি এবং মাঝে একটি রত্ন বসানো।          

শোনা যায়, এই মন্দিরটির আদলে তৈরি হয় দক্ষিণেশ্বর মন্দির। দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠার চার বছর আগেই প্রতিষ্ঠা হয় কৃপাময়ী কালী মন্দির। মন্দিরের বিগ্রহও তৈরি করেন দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী মূর্তির ভাস্কর দাঁইহাটের নবীনচন্দ্র পাল। রানি রাসমণি এই মন্দির দেখে মুগ্ধ হয়েই তারই আদলে তৈরি করেন দক্ষিণেশ্বর মন্দির ও বিগ্রহ।

মন্দিরের প্রবেশপথেই রয়েছে সিংহদুয়ার। বিশাল প্রাঙ্গণের দু’ ধারে রয়েছে ছয়টি করে মোট বারোটি শিবমন্দির। বাংলার আটচালা স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এই শিবমন্দিরগুলি। শিবমন্দিরগুলির অবস্থান লক্ষণীয়। প্রধান ফটক দিয়েই ঢুকে বাঁ দিকে ও ডান দিকে ইংরেজির ‘এল’-এর আকারে সারি দিয়ে ছ’টি করে শিবমন্দির। সোজাসুজি সারি দিয়ে তুলসীমঞ্চ। প্রাঙ্গণের মাঝে প্রশস্ত নাটমন্দির। নতুন করে সংস্কার হয়েছে। নাটমন্দিরের উত্তর দিকে মায়ের মূল মন্দির। মন্দিরগাত্রে চুনপঙ্খের দৃষ্টিনন্দন কাজ। এক সময় ছিল নহবতখানাও।

মন্দিরগাত্রে প্রতিষ্ঠার সন-তারিখ লেখা। ছবি জয় মিত্র কালীবাড়ি ট্রাস্ট ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া।

এই প্রাচীন মন্দিরটি নিয়ে অনেক কাহিনিই লোকমুখে চলে আসছে। শোনা যায় মূর্তি তৈরির পাথরটি ভেসে এসেছিল গঙ্গার জলে।  কৃপাময়ী কালীর বিগ্রহ কষ্টিপাথরের। বিগ্রহটি পাথরের বেদির উপর স্থাপিত। 

শোনা যায়, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এই মন্দিরে আসতেন। আসতেন বরানগরের প্রামাণিক ঘাট রোডের ব্রহ্মময়ী মন্দিরেও। দাঁইহাটের নবীনচন্দ্র পাল ব্রহ্মময়ীরও মূর্তি গড়েন। তাই ভবতারিণী, কৃপাময়ী এবং ব্রহ্মময়ী মূর্তির মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। তাই ঠাকুর ভবতারিণীকে মা এবং কৃপাময়ী ও ব্রহ্মময়ীকে মাসি বলে ডাকতেন।

আগে এই মন্দিরে বলিদান প্রথা প্রচলিত ছিল। কিন্তু ১৩০৭ সালে বালানন্দ ব্রহ্মচারীর নির্দেশে তা বন্ধ হয়ে যায়। তার প্রমাণ মন্দিরের বাঁ দিকে দেওয়ালে গাঁথা একটি শ্বেতপাথরের ফলক। তাতে লেখা – ‘সিন্ধু বিন্দু নেত্র চন্দ্র পরিমিত সনে, / পূর্ণানন্দে সাথে করি এক শুভক্ষণে, / বালানন্দ ইষ্টদেব আসিয়া হেথায়, / হেরিলেন জীব বলি আর্ত্ত বেদনায় / “ক্ষান্ত কর রক্ত স্রোত” দিলেন বিধান। / সে বিধান মেনে নিলেন ভক্ত পুণ্যবান।’

সিন্ধু = ৭ (সিন্ধু মানে সমুদ্র, ৭-এ সমুদ্র), বিন্দু = ০, নেত্র = ৩ (৩-এ নেত্র), চন্দ্র = ১ (১-এ চন্দ্র)। অঙ্কের বামাগতি সূত্র অনুসারে ১৩০৭ সনে বালানন্দ ব্রহ্মচারী এখানে এসেছিলেন, সঙ্গে ছিলেন পূর্ণানন্দ। বালানন্দ বলিপ্রদত্ত জীবের আর্তনাদে ব্যথিত হয়ে বলি বন্ধের বিধান দেন। তখন থেকে বলি বন্ধ হয়।    

কৃপাময়ী কালীর পুজোয় কোনো বাহুল্য নেই। নিষ্ঠা ও শুদ্ধাচারের বিষয়টিতেই গুরুত্ব দেওয়া হয়।

Continue Reading

ইতিহাস

৪৩৯ বছর আগে নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করে দুর্গাপুজো করেছিলেন রাজা কংসনারায়ণ

Published

on

durga

ওয়েবডেস্ক: অনেক সময়ই দুর্গাপুজোর সঙ্গে বারো ভুঁইয়ার এক ভুঁইয়া রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণের নাম উঠে আসে। কংসনারায়ণের বহু কাল আগে থেকেই বঙ্গদেশে দুর্গাপুজোর প্রচলন থাকলেও, কংসনারায়ণ বিপুল অর্থ ব্যয়ে বঙ্গদেশে যে দুর্গোৎসবের সূচনা করেন, তা বাঙালি সমাজে কিংবদন্তি তৈরি করেছিল। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে রাজা কংসনারায়ণ প্রায় নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করে দুর্গাপূজা করেছিলেন।

আরও পড়ুন: রেষারেষি কলহের আবহে বাবুবাগানের এই বছরের থিম ‘শান্তি রূপেণ সংস্থিতা’

Loading videos...

তার পর থেকেই কংসনারায়ণ রীতি সমগ্র বঙ্গদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই রীতির প্রধান বৈশিষ্ট হল এক চালার দুর্গাপ্রতিমা। এই চালির উপরের দিকে লক্ষ্মী ও সরস্বতী এবং নীচে গণেশ ও কার্তিকের প্রতিমা রাখা থাকে। প্রতিমার পেছনে অর্ধ চন্দ্রাকার চালচিত্র। এই চালচিত্রে মূলত দশমহাবিদ্যা ও মহাদেবের অবস্থান। এই ধরনের চালিকে বাংলা চালি বলা হয়। এই রীতির প্রতিমার মুখের আদল অন্য রকম। দেবী প্রতিমার টানাটানা চোখ ও টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো নাক হয়। দেবীর দুই গাল সামান্য চাপা থাকে। এই ধরনের মুখের আদলকে বলা হয় বাংলা মুখ। দেবী প্রতিমার বর্ণ গাঢ় হলুদ।

তবে কংসনারায়ণের কুলে অষ্টধাতুর দুর্গাবিগ্রহ ছিল। তৎকালীন রাজশাহীর রাজা কংসনারায়ণ রায়ের সেই বিগ্রহই বর্তমানে রয়েছে জলপাইগুড়ির পাণ্ডাপাড়া কালীবাড়ি এলাকার চক্রবর্তী পরিবারে। বিগ্রহের ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিচারে রাজ্যের সব চেয়ে প্রাচীন পুজো তাঁদেরই। বাদশাহ হুসেন শাহের আমল থেকেই এই অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি পূজিত হয়ে আসছে বলে তাঁরা দাবি করেন।

বাংলাদেশের হরিপুরের পাবনায় এই পুজোর সূচনা করেন কংসনারায়ণের ছেলে মুকুন্দরাম রায়। সেই সময় হুসেন শাহের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পরে বিগ্রহ নিয়ে টাঙ্গাইলে আসেন মুকুন্দরাম। রাজা শ্রীহট্ট সেনের বাড়িতে রাজচক্রবর্তী উপাধি নিয়ে বসত শুরু করেন। শোনা যায় এই বিগ্রহটি বাঁচানোর জন্য তিনি তার উপাধি পরিবর্তন করেন। মুকুন্দরাম রায় থেকে চক্রবর্তী হন। তার পরে প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়িয়ে ফের যুদ্ধ করেন। তাতে জয় লাভও করেন।

ঐতিহাসিক এই দুর্গামূর্তিতে লক্ষ্মী-সরস্বতী নেই। আছেন কার্তিক ও গণেশ। নিত্যপুজোয় নয় রকমের ভাজা দিয়ে ভোগ দেওয়া হয় দুর্গামাকে। দুর্গাপুজোর সময় অষ্টধাতুর এই মূর্তির পাশে মাটির মূর্তি পুজো করা হয়।

Continue Reading

ইতিহাস

স্বাধীনতা দিবসে স্মরণ করি বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কেকে

Published

on

basudev balwant phadke

পার্থ গুহ

মুম্বইয়ের ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাস থেকে হারবার লাইনের ট্রেন ধরেছি। গন্তব্য শিরধন গ্রাম। এই লাইনে প্রান্তিক স্টেশন পানভেল, দূরত্ব ৪৯ কিমি, সোয়া ঘণ্টার পথ। পানভেল থেকে আরও ১০ কিমি গেলে পৌঁছে যাওয়া যায় শিরধনে। বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কের জন্মস্থান শিরধন।

Loading videos...

পাঠক আসুন, ট্রেনে যেতে যেতে আপনাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই স্বাধীনতা সংগ্রামী বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কের সঙ্গে। এই মানুষটির সঙ্গে আমি প্রচুর মিল খুঁজে পাই বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামী যতীন দাসের। যে দিন জানতে পেরেছিলাম যতীন দাসের মতোই বাসুদেব ব্রিটিশরাজের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে বন্দি অবস্থায় আমরণ অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন, সে দিনই ঠিক করেছিলাম, এক বার রায়গড় জেলার শিরধনে গিয়ে ভারত মায়ের এই অমূল্য ধনটিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসব। সেই সুযোগ এসে গেল।

আরও পড়ুন সে দিনের স্মৃতি: ফিল গুডে হাজারিকার হাহাকারের গান, হাসিমুখে সহনশীল সুষমার প্রস্থান

ট্রেনে চলেছি আর ভাবছি বাসুদেবের কথা। বাবা-মা নাম রেখেছিলেন বাসুদেব, আর পারিবারিক পদবি ফাড়কে। মরাঠি রীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম ও পদবির মাঝে বাবার নামটাও রাখতে হয়। বাবা বলবন্ত। তাই বাসুদেবের পুরো নাম বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কে। চিতপবন ব্রাহ্মণ পরিবারে বাসুদেবের জন্ম। অথচ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে নিজের কাছে টেনে নিয়েছিলেন সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদের। মৎস্যজীবীরা ছাড়াও তাঁর লড়াইয়ে শামিল হয়েছিলেন কোল, ভিল সম্প্রদায়ের মানুষজন, এমনকি অচ্ছুত ধাঙড় শ্রেণির লোকেরাও।

বাসুদেব জন্মেছিলেন উনিশ শতকের মাঝামাঝি, ১৮৪৫ সালের ৪ নভেম্বর। ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে জনরোষ তখনও তত দানা বাঁধেনি। কিন্তু দেশগ্রামের পরিস্থিতি ফাড়কে-কে বিরূপ করে তুলছিল। কৃষকদের দুর্দশায় তিনি ব্যথিত হতেন। ছোটোবেলাতেই শিখেছিলেন কুস্তি, শিখেছিলেন ঘোড়ায় চড়া। এই করতে গিয়ে শৈশবেই স্কুলছুট হয়ে যান তিনি। যা-ই হোক, কুস্তির তালিম নিতে থাকেন অস্পৃশ্য মাং শ্রেণির ক্রান্তিবীর লাহুজি বাস্তব সালভের কাছে। এই লাহুজিই বাসুদেবকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছিলেন। বাসুদেবকে বুঝিয়েছিলেন, সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির মানুষদের মূল ধারার স্বাধীনতা আন্দোলনে শামিল করতে না পারলে আন্দোলন সফল হবে না।

বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কে।

পুনেতে চলে এসেছিলেন বাসুদেব। সরকারের মিলিটারি অ্যাকাউন্টস দফতরে কেরানির পদে চাকরি নেন। এর পর মহাদেও গোবিন্দ রানাডের লেকচার ক্লাসগুলো নিয়মিত শুনতে যেতেন বাসুদেব। ব্রিটিশরাজের নীতি কী ভাবে ভারতীয় অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে, সে কথাই বলতেন রানাডে। রানাডের বক্তব্যের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নিতেন বাসুদেব। নিজের চোখেই দেখেছেন, নিজের গ্রামের কৃষকদের দুর্দশা। তিনি বুঝতেন, ব্রিটিশরাজের কাছ থেকে স্বরাজ না পেলে অবস্থার পরিবর্তন হবে না।

ট্রেন কখন পানভেল পৌঁছে গিয়েছে, খেয়াল করিনি। স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাস ধরে নিলাম। শিরধন গ্রামটা মুম্বই-গোয়া সড়কের ধারে। বাসে চলেছি, জানলা দিয়ে দেখছি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার দৃশ্য – এ পথের সৌন্দর্য এখনও অনেকটাই অটুট। দেখছি আর ভাবছি সে সময়ের কথা – ১৮৪৫ – তখন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ন-দশ বছরের বালক, সারদা মায়ের তখন জন্মই হয়নি। সে সময় এই জায়গা কী ছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। তখন এই সব রাস্তাঘাট প্রায় কিছুই ছিল না। চার দিকে দুর্গম পাহাড় আর জঙ্গল, যার ভিতরে থাকে হিংস্র শ্বাপদ। যানবাহন বলতে শুধুই গোরুর গাড়ি আর কদাচিৎ পালকি। সেই অজ পাড়াগাঁয় জন্ম বাসুদেবের।

বাসুদেব তখন মিলিটারি অ্যাকাউন্টসে চাকরি করেন। প্রতি পদে পদে লালমুখো সাহেবদের কাছে লাঞ্ছিত আর অপমানিত হন। তাই স্বাধীনতার স্পৃহা তাঁর বেড়েই চলে। ইতিমধ্যে জনগণের নানা চাহিদা মেটানোর দাবিতে পুনেতে আন্দোলনে শামিল হন ফাড়কে। ১৮৭০ সালে পুনেতে গড়ে তোলেন ‘ঐক্য বর্ধনী সভা’। এই সভার উদ্দেশ্য ছিল, যুবকদের শিক্ষিত করা।

বাসুদেবের মা তখন মৃত্যুশয্যায়। ছুটির দরখাস্ত করলেন। ছুটি মঞ্জুরে সাহেবদের গড়িমসি বাসুদেবকে ক্রমশই ক্ষিপ্ত করে তুলল। ছুটি পেয়ে যখন বাড়ি এলেন, মা আর জীবিত নেই। ক্ষুব্ধ বাসুদেব চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করলেন। সশস্ত্র বিপ্লবই মুক্তির একমাত্র পথ, এ কথা ঘোষণা করে গড়ে তুললেন তাঁর বিপ্লবী সংগঠন ‘রামোশি’।

ফাড়কের বাড়ি। ছবি লেখক।

সময়টা ছিল ১৮৭৫। বডোদরার (বরোদা) গায়কোয়াড়কে অপসারণ করল ব্রিটিশ। ফাড়কে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদসভার আয়োজন করতে লাগলেন বিভিন্ন জায়গায়। দেশের রাজনৈতিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক অবস্থা। দুর্ভিক্ষে সাধারণ মানুষের জেরবার অবস্থা। ব্রিটিশ প্রশাসনের হেলদোল নেই। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে ওঠার জন্য আবেদন করলেন ফাড়কে। শিক্ষিত মানুষজনের কাছ থেকে তেমন সাড়া পেলেন না। কিন্তু এগিয়ে এলেন ‘রামোশি’ সম্প্রদায়ের লোকেরা। তাদের সঙ্গে যোগ দিল কোল, ভিল, এমনকি ধাঙড় শ্রেণির মানুষজন। ৩০০ সদস্যের ‘রামোশি’ সংগঠন করলেন ফাড়কে। ইচ্ছে ছিল দেশকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করার জন্য একটা সেনাবাহিনী গড়বেন। কিন্তু টাকা কোথায়? সিদ্ধান্ত হল ব্রিটিশ অনুগত ব্যবসায়ীদের এবং সরকারি কোষাগার লুঠ করার। এই ভাবে চলছিল। বাসুদেবের নেতৃত্বে তাঁর বিপ্লবী দল ইংরেজ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা লুঠ করে দুর্ভিক্ষ-আক্রান্ত কৃষকদের সাহায্য করত। এ রকমই এক অভিযানে ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে খুন হলেন বাসুদেবের বিশ্বস্ত অনুচর দৌলতরব নায়েক। বাসুদেব পালিয়ে গেলেন দক্ষিণ ভারতের শ্রীশৈলমে। তার পর হায়দরাবাদে।

হায়দরাবাদের ৫০০ রোহিলা ও আরবদের নিয়ে সংগঠন গড়ে আবার নিজের জায়গায় ফিরে এলেন বাসুদেব। এর পর থেকেই উনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের রাতের ঘুম কেড়ে নেন এবং তাদের নাস্তানাবুদ করতে থাকেন অহরহ। এক বার তো ব্রিটিশ সেনাদের উপর অতর্কিতে হামলা করে এবং তাদের পরাজিত করে কিছু দিনের জন্য পুনে শহরের দখল নিয়েছিল বাসুদেবের বাহিনী।

বাস থেকে নেমে চলেছি বাসুদেবের বাড়ির পথে। মাথায় ঘুরছে তাঁরই কথা। বাসুদেবকে ধরতে কালঘাম ছুটে গিয়েছিল ব্রিটিশ সরকারের। নিজের বাহিনীরই কেউ বিশ্বাসঘাতকতা না করলে সহজে ধরা যায় না নেতাকে। এ রকম অজস্র উদাহরণ আছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে। বাসুদেবের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এক ‘মীরজাফর’-এর বিশ্বাসঘাতকতায় পান্ধারপুর যাওয়ার পথে কলডগির কাছে ১৮৭৯ সালের ২০ জুলাই ব্রিটিশের হাতে ধরা পড়ে যান বাসুদেব। বিচারের জন্য তাঁকে পুনে নিয়ে যাওয়া হয়। বিচারে তাঁর যাবজ্জীবন কারাবাস হয়। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সুদূর লোহিত সাগরের ধারে বন্দর-শহর অ্যাডেনে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু বন্দি থাকার পাত্র নন বাসুদেব। ১৮৮৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জেল থেকে পালান তিনি। কিন্তু বেশি ক্ষণ পালিয়ে থাকতে পারেননি তিনি। ফের ধরা পড়ে যান। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসাবে শুরু করেন আমরণ অনশন। চার দিন পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কে ইহলোক ত্যাগ করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৭ বছর।      

ফাড়কে স্মৃতিমন্দির। ছবি লেখক।

শিরধনে বাসুদেবের বাড়িটা এখন পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণর অধীনে। দেখলাম বাড়িটার সংস্কার করা হয়েছে। এখানকার মানুষজন তাঁর নামে একটা স্মৃতিমন্দিরও গড়েছেন। বিলাসরাও দেশমুখ যখন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী তখন ওঁর বাড়ির কাছে ওঁর নামে একটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল গড়া হয়। বিলাসরাওজিই তার উদ্বোধন করেন। ১৯৮৪ সালে বাসুদেবের স্মৃতিতে ভারতীয় ডাক বিভাগ ৫০ পয়সার ডাকটিকিটও চালু করেছিল।

নিজের প্রথাগত শিক্ষা তেমন ছিল না। কিন্তু এটুকু বুঝতেন শিক্ষাই সব কিছুর চাবিকাঠি। তাই ১৮৬০ সালে আরও কিছু মানুষকে নিয়ে শুরু করেন পুনা নেটিভ ইনস্টিটিউশন (পিএনআই) যা পরবর্তীকালে মহারাষ্ট্র এডুকেশন সোসাইটি (এমইএস) নামে পরিচিত হয়। এবং বর্তমানে এই সংগঠনের ৭৭টি শাখা আছে সারা মহারাষ্ট্র জুড়ে।

৭৩তম স্বাধীনতা দিবসে ভারতের এই বীর মরাঠি সন্তানকে সহস্র প্রণাম।              

Continue Reading
Advertisement
Advertisement
বাংলাদেশ2 hours ago

Bangladesh: বাংলা একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুর প্রয়াণ

বাংলাদেশ2 hours ago

Bangladesh Lockdown: দেশ জুড়ে কঠোর লকডাউন, পথে পথে তল্লাশি চৌকি, মুভমেন্ট পাশ ছাড়া চলাচল বন্ধ

ক্রিকেট2 hours ago

IPL 2021: আরসিবির হয়ে জ্বলে উঠলেন বাংলার শাহবাজ, তীরে এসে তরী ডোবাল হায়দরাবাদ

রাজ্য4 hours ago

Bengal Polls 2021: পঞ্চম দফায় ভোটগ্রহণ শনিবার, দেখে নিন ৪৫ কেন্দ্রে কোন দলের প্রার্থী কে

AstraZeneca-twiter
বিদেশ5 hours ago

অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোভিড ভ্যাকসিনের ব্যবহার স্থায়ী ভাবে বন্ধ করল ডেনমার্ক

রাজ্য5 hours ago

নজরে কোভিড পরিস্থিতি, ভোটের প্রচারে বড়ো জমায়েত নিয়ে বামফ্রন্টের নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত

রাজ্য6 hours ago

Bengal Corona: ভয়াবহ পরিস্থিতি! একদিনেই আক্রান্ত প্রায় ছ’হাজার

দেশ6 hours ago

ফের লকডাউনের আশঙ্কায় ভীত-সন্ত্রস্ত অভিবাসী শ্রমিকরা, কন্ট্রোল রুমে ফোনের পর ফোন ঝাড়খণ্ডে

ক্রিকেট2 days ago

IPL 2021: কাজে এল না সঞ্জু স্যামসনের মহাকাব্যিক শতরান, পঞ্জাবের কাছে হারল রাজস্থান

প্রবন্ধ2 days ago

First Man In Space: ইউরি গাগারিনের মহাকাশ বিজয়ের ৬০ বছর আজ, জেনে নিন কিছু আকর্ষণীয় তথ্য

দেশ3 days ago

Kumbh Mela 2021: করোনাবিধিকে শিকেয় তুলে এক লক্ষ মানুষের সমাগম, আজ কুম্ভের প্রথম শাহি স্নান হরিদ্বারে

ক্রিকেট3 days ago

IPL 2021: সাড়ে ৭টায় খেলা শুরু হওয়া নিয়ে তীব্র অসন্তুষ্ট মহেন্দ্র সিংহ ধোনি

দেশ2 days ago

Vaccination Drive: এসে গেল তৃতীয় টিকা, স্পুটনিক ফাইভে অনুমোদন দিয়ে দিল কেন্দ্র

দেশ3 days ago

Corona Update: এক ধাক্কায় সক্রিয় রোগীর সংখ্যায় প্রায় ১ লক্ষের বৃদ্ধি, তবে দৈনিক মৃত্যুহার ০.৫৩ শতাংশ

দেশ2 days ago

Election Commission of India: নতুন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুশীল চন্দ্র, মঙ্গলবার থেকে দায়িত্ব নিচ্ছেন

দেশ2 days ago

Sputnik V: এপ্রিলের শেষে ভারতের বাজারে চলে আসবে টিকা, জানাল রাশিয়া

ভোটকাহন

কেনাকাটা

কেনাকাটা4 weeks ago

বাজেট কম? তা হলে ৮ হাজার টাকার নীচে এই ৫টি স্মার্টফোন দেখতে পারেন

আট হাজার টাকার মধ্যেই দেখে নিতে পারেন দুর্দান্ত কিছু ফিচারের স্মার্টফোনগুলি।

কেনাকাটা2 months ago

সরস্বতী পুজোর পোশাক, ছোটোদের জন্য কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সরস্বতী পুজোয় প্রায় সব ছোটো ছেলেমেয়েই হলুদ লাল ও অন্যান্য রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবিতে সেজে ওঠে। তাই ছোটোদের জন্য...

কেনাকাটা2 months ago

সরস্বতী পুজো স্পেশাল হলুদ শাড়ির নতুন কালেকশন

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই সরস্বতী পুজো। এই দিন বয়স নির্বিশেষে সবাই হলুদ রঙের পোশাকের প্রতি বেশি আকর্ষিত হয়। তাই হলুদ রঙের...

কেনাকাটা3 months ago

বাসন্তী রঙের পোশাক খুঁজছেন?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: সামনেই আসছে সরস্বতী পুজো। সেই দিন হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরার একটা চল রয়েছে অনেকের মধ্যেই। ওই...

কেনাকাটা3 months ago

ঘরদোরের মেকওভার করতে চান? এগুলি খুবই উপযুক্ত

খবরঅনলাইন ডেস্ক: ঘরদোর সব একঘেয়ে লাগছে? মেকওভার করুন সাধ্যের মধ্যে। নাগালের মধ্যে থাকা কয়েকটি আইটেম রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার...

কেনাকাটা3 months ago

সিলিকন প্রোডাক্ট রোজের ব্যবহারের জন্য খুবই সুবিধেজনক

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী এখন সিলিকনের। এগুলির ব্যবহার যেমন সুবিধের তেমনই পরিষ্কার করাও সহজ। তেমনই কয়েকটি কাজের সামগ্রীর খোঁজ...

কেনাকাটা3 months ago

আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: আজ রইল আরও কয়েকটি ব্র্যান্ডেড মেকআপ সামগ্রী ৯৯ টাকার মধ্যে অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদন লেখার সময় যে দাম ছিল...

কেনাকাটা3 months ago

রান্নাঘরের এই সামগ্রীগুলি কি আপনার সংগ্রহে আছে?

খবরঅনলাইন ডেস্ক: রান্নাঘরে বাসনপত্রের এমন অনেক সুবিধেজনক কালেকশন আছে যেগুলি থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যেতে পারে। এমনকি দেখতেও সুন্দর।...

কেনাকাটা3 months ago

৫০% পর্যন্ত ছাড় রয়েছে এই প্যান্ট্রি আইটেমগুলিতে

খবরঅনলাইন ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলির মধ্যে বেশ কিছু এখন পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫০% বা তার বেশি ছাড়ে। তার মধ্যে...

কেনাকাটা3 months ago

ঘরের জন্য কয়েকটি খুবই প্রয়োজনীয় সামগ্রী

খবরঅনলাইন ডেস্ক: নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় ও সুবিধাজনক বেশ কয়েকটি সামগ্রীর খোঁজ রইল অ্যামাজন থেকে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় যে দাম ছিল তা-ই...

নজরে