চল্লিশের দশকে বাংলার এক গণ্ডগ্রামে নারী শিক্ষার আলো দেখিয়েছিলেন তিনি, নারী দিবসে স্মরণ করি সেই বীরাঙ্গনাকে

0

শ্রয়ণ সেন

—- “আমি ভিক্ষে চাইতে এসেছি, দেবে?”

Loading videos...

—- “ভিক্ষে! এবং আপনি! কেন?”

—- “না, যেটা ভাবছ সেটা নয়। টাকাপয়সা ভিক্ষে আমি করছি না। ছাত্রীভিক্ষে। আমার বাড়িতে গড়ে ওঠা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ছাত্রী চাই। আমার স্বপ্ন মেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে শিক্ষিত করে তোলা।”

নিশ্চিত করে জানা যায় না, কিন্তু ননীবালা গুহ এবং এই প্রতিবেদকের প্রপিতামহী এমিলাসুন্দরী সেনের মধ্যে হয়তো এই ধরনের কথোপকথনই হয়েছিল।  

১৯৩৯ সাল। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন তখন মধ্য গগনে। ঠিক তখনই ৫২ বছরের এক প্রৌঢ়া আকুই গ্রামের পশ্চিম পাড়ার দোরে দোরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন শিক্ষার আলোয় মেয়েদের আলোকিত করে তুলবেন বলে।

আকুইয়ের স্কুল মোড়।

বর্ধমান-বাঁকুড়ার সীমানায় আকুই গ্রাম তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতবর্ষে ছিল কৃষিজীবী প্রধান এবং শিক্ষায় অনগ্রসর। গ্রামীণ সমাজও ছিল রক্ষণশীল। এই পরিবেশেই জন্ম হয় ননীবালার, ১২৯৩ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে।

শত প্রতিকূলতায় ভরা তাঁর জীবন। মাত্র ১১ বছর বয়সেই বিধবা হন তিনি, লেখাপড়াও জানতেন না। জানা যায়, অনেক বছর পর নিজের নাম স্বাক্ষর করতে শিখেছিলেন তিনি।

ব্রিটিশ আমল, বাল্যবিধবা, নিরক্ষর এবং রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজ — এই চার প্রতিকূলতাও দমিয়ে রাখতে পারেনি ননীবালাকে, যিনি এখনও ‘ননী পিসিমা’ নামে পরিচিত গ্রামের প্রবীণদের কাছে।

আকুইয়ের প্রবীণরা — এই প্রতিবেদকের জেঠু রমাপ্রসাদ সেন, আকুইয়ের বিশিষ্ট মানুষ দিলীপ কুমার দাঁ-রা কেন ননীবালাকে ‘ননী পিসিমা’ বলতেন?

কারণ এঁদের বাবা-কাকারা তিরিশ-চল্লিশের দশকে ননীবালার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

সালটা ১৯৩০। ননীবালা তখন সদ্য চল্লিশ পেরিয়েছেন। এই বছরই জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পান তিনি। আইন অমান্য আন্দোলনের আহ্বান শুনে দেশসেবার কাজে ব্রতী হন। আকুইয়েরই দত্ত পরিবারের ছেলে জগদ্বন্ধুর নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ননীবালাও স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।   

ননীবালার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে নিজের রক্ষণশীল সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন মতিবালা দত্ত, সুশীলা দে, রাধারানি ঘোষ, করুণাময়ী দলুই প্রমুখ। এঁরা সবাই বাল্যবিধবা।

ব্রিটিশ ভারতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছিল। কিন্তু ননীবালা ছিলেন সাহসিনী। ১৯৩০ সালেই জাতীয় পতাকা উত্তোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা নেন।

এর পরের বছর আকুইয়ের পাশের গ্রাম বামুনিয়ায় ‘চৌকিদারি কর বন্ধ আন্দোলন’ প্রবল আকার ধারণ করে। সার্কেল ক্রোক অফিসার গাড়ি নিয়ে আসার চেষ্টা করলে নারী সত্যাগ্রহীদের প্রবল বাধার মুখে পড়েন। ননীবালার নেতৃত্বে নারী সত্যাগ্রহীরা মাটিয়ে শুয়ে পড়ে তাঁর পথ আটকান।

শোনা যায়, তিন দিন ধরে মাটিতে শুয়ে এ ভাবেই পথ আটকে রেখেছিলেন তাঁরা। এর পর বিষ্ণুপুরের মহকুমাশাসক ও পদস্থ পুলিশ অফিসারদের নেতৃত্বে আন্দোলনকারীদের ওপরে ব্যাপক লাঠি চালায় পুলিশ। ননীবালা-সহ অনেকেই আহত হন। তাঁকে এবং অন্যান্য সত্যাগ্রহীকে গ্রেফতার করা হয়।

১৯৩১ সালে ফের একবার গ্রেফতার হন ননীবালা। তিন মাস কারাদণ্ড ভোগের পর মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে তিনি মুক্তি পান ১৯৩২ সালের ১১ মার্চ।

শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, গঠনকর্মীও ছিলেন ননীবালা। আকুই গ্রামে চরকা কেন্দ্র স্থাপন, সুতোকাটা, খদ্দর ব্যবহারের জন্য গ্রামের নারীপুরুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল তাঁর।

এর পাশাপাশি ননীবালা ছিলেন বাঁকুড়া জেলার নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ। নিজে নিরক্ষর হয়েও মহিলাদের পড়াশোনার গুরুত্ব তিনি বুঝেছিলেন এবং গ্রামের মানুষদের বুঝিয়েছিলেন।

ননীবালার জন্মস্থান আকুই গ্রামের পুবপাড়ায়। ১৯৩৯ সালে নিজের বাড়িতেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলেন তিনি। এই কর্মসূচিতে তাঁকে সাহায্য করেন জগদ্বন্ধু দত্ত এবং আকুই ইউনিয়ন বোর্ডের তৎকালীন সম্পাদক কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত। তাঁর লক্ষ্য ছিল, মেয়েদের তিনি পড়াশোনায় উদ্বুদ্ধ করবেনই এবং সেই কারণেই গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ‘ছাত্রীভিক্ষা’ করতেন।

কিন্তু সেখানেও ছিল বাধা। পুবপাড়াটি ছিল সে অর্থে অনগ্রসর। সামাজিক রক্ষণশীলতা অনেক বেশি ছিল এই পাড়ায়। ছোটো বয়সে ‘বিধবা’ ননীবালাকে অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে এখানে। বিভিন্ন বাড়িতে তাঁর প্রবেশের ওপরে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এই পাড়ার বাসিন্দারা যে তাঁদের মেয়েদের বাড়ি থেকে বেরোতে দেবেন না, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হয়ে যান।

অন্য দিকে, তৎকালীন পশ্চিমপাড়া ছিল সে অর্থে তুলনামূলক ভাবে উদার। তাই পশ্চিমপাড়াতেই যান তিনি। প্রথমেই আসেন এই প্রতিবেদকের প্রপিতামহীর কাছে। ননীবালাদেবীর কথায় রাজি হয়ে যান এমিলাসুন্দরী সেন এবং এক কথায় তাঁর ছোটো মেয়ে মমতাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়ে দেন। পশ্চিমপাড়ার আরও চারটি বাড়ি তাঁদের মেয়েদের পাঠায় এই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।

আকুই ননীবালা গার্লস হাইস্কুল।

অর্থাৎ, গ্রামের যে পাঁচ মহিলা প্রথম বার বাড়ির ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে পড়াশোনার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই প্রতিবেদকেরই পিসি-ঠাকুমা।

১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে যোগ দিয়ে ফের একবার গ্রেফতার হন ননীবালা। মেদিনীপুর জেলে বন্দি থাকেন তিনি। কারাবাসের মধ্যেও ননীবালার মন পড়ে থাকত তাঁর তৈরি প্রাথমিক বিদ্যালয়তেই। জেলে বসেই কৃষ্ণচন্দ্র দত্তকে চিঠি পাঠান ননীবালা। বয়ান ছিল, “আমি যে বিদ্যালয়টি তৈরি করেছি, সেখানে পশ্চিমপাড়া থেকে মেয়েরা আসছে তো?”

বিনা বিচারে আট মাস বন্দি থাকার পর অবশেষে ছাড়া পান এবং আকুই ফিরে আসেন ননীবালা।

দেশ স্বাধীন হতেই গ্রামবাসীদের কাছে ‘মাতঙ্গিনী হাজরা’ হয়ে ওঠেন ননীবালা। গ্রামের বাসিন্দারা তাঁকে এই নামেই ডাকতেন। যদিও এই ডাক শুনেই অসম্ভব লজ্জায় পড়তেন। প্রতিবাদ করতেন। বলতেন, “ধুর, কার সঙ্গে কার তুলনা করছিস তোরা!”

পশ্চিমপাড়ার প্রমোদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে গ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আড্ডা বসত। সেই আড্ডায় প্রতি দিন সন্ধ্যায় যোগ দিতেন ননীবালাও। দেশ তখন পরাধীনতার অন্ধকার থেকে মুক্ত।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী ননীবালার এক কালের সহকর্মীরাই এ বার ঠিক করলেন তাঁর নামে হাইস্কুল তৈরি করবেন।

প্রস্তাব দেওয়া হল ননীবালাকে। তাতেও প্রতিবাদ এই বীরাঙ্গনার। হাইস্কুলে তৈরিতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু নিজের নামে কিছুতেই সেই স্কুলের নামকরণ করতে দেবেন না। কিন্তু সেই আপত্তি আর টিকল না।

স্কুল তো হবে, কিন্তু তার জমি দেবে কে? সেই দায়িত্ব নিলেন প্রমোদবাবুই। একটি জমি চিহ্নিত হল। জমিটি পশ্চিমপাড়ারই বাসিন্দা দেব এবং রায়দের।

প্রমোদবাবু ছিলেন দেব এবং রায়দের দীক্ষাগুরু। মেয়েদের জন্য হাইস্কুল হবে, তাই জমি দরকার—এই আবেদন নিয়ে সটান দেব এবং রায়দের কাছে আবেদন করে বসেন তিনি। তাঁরাও এক কথায় রাজি হয়ে যান। মেয়েদের স্কুল তৈরির জন্য জমি দিয়ে দেন তাঁরা।

যাঁদের জন্য গড়ে উঠল ননীবালা গার্লস হাইস্কুল।

বলতে কিঞ্চিৎ গর্ব হয়, এই প্রতিবেদকের ঠাকুমা শিবানী সেন পশ্চিমপাড়ার এই দেব পরিবারেরই মেয়ে। 

জেলবন্দি থাকাকালীন অনেক প্রভাবশালী স্বাধীনতা সংগ্রামীর সংস্পর্শে আসেন ননীবালাদেবীরা। পরবর্তীকালে এঁরাই সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন, কেউ কেউ মন্ত্রীও হন। কিন্তু ননীবালাদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ।

ননীবালাদেবীর আবেদনেই আকুই গ্রামে আসেন এমনই কয়েক জন মানুষ। তাঁদের হাত ধরেই ‘আকুই ননীবালা গার্লস হাইস্কুল’-এর প্রাথমিক ভিত তৈরি হয়। মাটির ঘরে তৈরি হওয়া এই হাইস্কুল ধীরে ধীরে বড়ো হতে থাকে।

এখন এই গার্লস হাইস্কুলটি শুধুমাত্র আকুই নয়, বাঁকুড়া জেলায় অন্যতম জনপ্রিয় স্কুল। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে এখানকার ছাত্রীরা দুরন্ত ফলাফল করে তাক লাগিয়ে দেয়।

১০৪ বছর বেঁচে ছিলেন ননীবালা। পরমায়ুর দিক দিয়ে এ রাজ্যের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে তাঁর স্থান দ্বিতীয়। শেষ বয়স পর্যন্তও নারীশিক্ষা নিয়ে সচেষ্ট ছিলেন তিনি। মেয়েদের পড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সরব হয়েছেন তিনি।

দেশের গ্রামাঞ্চলে যখনও সে ভাবে নারীশিক্ষার আলো ফোটেনি, তখনই এই ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন ননীবালা। কিছু বাধাবিপত্তি থাকলেও আকুই গ্রামকে পাশে পেয়েছিলেন তিনি। আকুই গ্রাম তাই আজও ননীবালাময়। গ্রামের স্কুল মোড়ে তৈরি হয়েছে তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তিও।

আকুইয়ের স্কুল মোড়ে ননীবালার আবক্ষ মূর্তি।

বছরের ৩৬৫টা দিনই নারীদের দিন হওয়া উচিত। কিন্তু একটা বিশেষ দিন যখন রয়েছেই, সেই দিনে এমন এক বীরাঙ্গনার পায়ে শতকোটি প্রণাম জানাই।   

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.