সে দিনের স্মৃতি: ফিল গুডে হাজারিকার হাহাকারের গান, হাসিমুখে সহনশীল সুষমার প্রস্থান

রাজনীতিই যে যুগে কলঙ্কভাগী, সে যুগে নিজস্ব বিভায় বিরাজমান এখনও যাঁরা জনপ্রিয়, তাঁদের সারিতে উজ্জ্বল আসন সুষমার।

0
sushma swaraj
debarun roy
দেবারুণ রায়

যে দিন ৩৭০ বদলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেন, সেদিন এবং সেদিনই ছিল জনজীবনের কাজে তাঁর শেষ অংশীদারী। মধ্যপন্থী আর উদার গান্ধীবাদী সমাজতন্ত্র থেকে দক্ষিণ মেরুর রাজনীতির তীব্র তিরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার যে পরীক্ষা সুষমা স্বরাজ দিয়ে এসেছেন তরুণী থেকে প্রবীণা হওয়া অবধি, এটা যে সেই পর্বের অন্তিম ধাপ সে কথা কি উনিই ভেবেছিলেন?

অগ্নিপরীক্ষা কি একটা? ঘোর দুঃসময় থেকে ‘ফিল গুড’ আর ‘ভারত উদয়’-এর পর্যায়গুলো পেরিয়ে নরেন্দ্র মোদীর ফেজটুপি পরা ও পরানো পর্যন্ত, অলীক অচ্ছে দিনে চৌকিদার হওয়া ও হওয়ানো পর্যন্ত, অনেক বার আগুনের লেলিহান শিখার ভিতর দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটেছেন। কিন্তু আমৃত্যু সে আগুনে পোড়েনি তাঁর অভিজাত আঁচলের একটা সুতোও।

রাজনীতিতে পোড় খাওয়া জীবনের শুরু থেকেই। চরণ সিং, দেবীলাল থেকে শুরু করে জনতা পার্টির সভাপতি চন্দ্রশেখরের ছত্রছায়ায় জাতীয় রাজনীতির বর্ণপরিচয়ের দ্বিতীয় ভাগ পড়া। তার পরই বাজপেয়ী, আডবাণীর মতো হিন্দি বলয়ের ধুরন্ধর তিরন্দাজদের সঙ্গে সংগতের গুণে তূণীর ভরে নেন বাছা বাছা স্বোপার্জিত তির। যার মধ্যে ছিল পাশুপতের মতো মৃত্যুবাণও। পেশাদারিত্ব ছিল সহজাত। রাজনীতিই যে যুগে কলঙ্কভাগী, সে যুগে নিজস্ব বিভায় বিরাজমান এখনও যাঁরা জনপ্রিয়, তাঁদের সারিতে উজ্জ্বল আসন সুষমার। কূটনীতি তাঁকে কখনও অনুশীলন করতে হয়নি। আয়ত্ত ছিল এতটাই। যে জন‍্যে সুষমাকে বিদেশমন্ত্রী করে ইস্তক স্বস্তি ছিল না নেতৃত্বের।কারণ আন্তর্জাতিক পরিসরে তিনি ছিলেন অনায়াস-দক্ষ।

বিদেশনীতির জট ছাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হত না। এই দক্ষতাই অবশ্য তাঁর কাল হয়েছিল। অনেক পিগমি শ্রেণির নেতা তাঁর শত্রু হয়ে উঠেছিলেন। বিদেশমন্ত্রী একা সফরে গেলেন বিদেশে। ফিরে এলেন অভাবনীয় সাফল্য মুঠোয় নিয়ে, দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা প্রশমন করে। উচ্চাশায় ভরপুর সহকর্মীরা ঈর্ষা করতেন, যোগ্যতা এমনই স্তরের ছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের তরফে বিশেষ অধিবেশনে প্রতিনিধিত্ব করতে উঠে পাকিস্তান-সহ আন্তর্জাতিক মঞ্চকে যে দ্ব‍্যর্থহীন বার্তা দিলেন, তা কূটনৈতিক কৌশল ও দৃঢ়তায় নিরাপত্তা পরিষদের গৃহীত দলিলের অনুকূল হওয়ায় পাকিস্তানের ফোঁসফোঁসানিতে কোনো কাজ হল না। কূটনীতি দুরস্ত অথচ নাটকীয় ভাষণে মার্জিত অথচ ‘আক্রামক’ সুষমা সাধারণ সভার আপামর সদস্যরাষ্ট্র তো বটেই আমেরিকার সমর্থন ও স্বতস্ফূর্ত ভাবে পেয়ে গেলেন।

বিদেশমন্ত্রী হিসেবে সুষমা তাঁর সুষম মনোভাব রাখতেন ক্ষমতার ভারসাম্য ও মতাদর্শের তত্ত্বগত মেলবন্ধন ঘটিয়ে। কিন্তু হয়তো সমস্ত বিষয়ের ক্ষেত্রেই যা ঘটে, পেশাদারি উৎকর্ষ, যোগ্যতা ও দক্ষ স্বনির্ভরতা সব সময়ই বিপদ ডেকে আনে ঘরে-বাইরে। চেনা মহলের মানুষ অচেনা হয়ে যায়। দক্ষ কুশলী কাজের পাশাপাশি ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলা সহকর্মী ও ওই ধরনের ষড়রিপু দমনের নিদানও দিতে হয়। প্রতিভা ও জনপ্রিয়তার সুবাদে সুষমাজিকেও সারা জীবন এই কাজ করে যেতে হয়েছে। কিন্তু জীবন-সায়াহ্নে চারি দিকে নিঃশ্বাসের বাতাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছিল দেখে সময়োচিত সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেননি। কূটনীতির সর্বোচ্চ তখতে বসে কূটনৈতিক ভাবেই সরে দাঁড়ান। প্রথমে আসন্ন ভোট-রাজনীতি থেকে স্বেচ্ছায় বিদায় নিয়ে এবং তার দরুনসরকার ও্মন্ত্রিসভা থেকে নিষ্ক্রমণের পথ সুগম করতে। এমন নিখুঁত সিদ্ধান্ত ছিল যে, সরকার ও দলকে প্রকাশ‍্যে বিব্রত না করেও ঘরের ভেতর যাঁকে যতটা বার্তা দেওয়া  দরকার তা দিয়েছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও।

swaraj kaushal and sushma on their wedding day
স্বরাজ কৌশল ও সুষমা। বিয়ের দিনে।

মন্ত্রী থাকাকালীন কিছু ক্ষেত্রে হেনস্তার সংকেতকে তুচ্ছ করে সঠিক সময়ের প্রতীক্ষায় থেকেছেন। সেই সঠিক সময়টা বড্ড কঠিন হয়ে গেল সুষমাজি। কোন্ অভিমান চেপে বিনা নোটিসেই সঠিক সময় বেছে নিলেন? মধ্যপ্রদেশের সাংসদপদ আর সাউথ ব্লকে প্রধানমন্ত্রীর পাশের অলিন্দ থেকে প্রস্থান ও পৃথিবীর পরিক্রমা শেষ করার মধ্যে সময়ের ব্যবধান যে এতটা কম তা কাউকে জানতে দেননি। রাজনীতির নয়া জমানার চাণক্যরাও আঁচ করে উঠতে পারেননি, সুষমাজি ঠিক কী বার্তা দি্লেন। সর্ব অর্থেই লালকৃষ্ণ আডবাণীর মানসপুত্র নরেন্দ্র মোদী তাঁর নেতার মতোই আবেগের অশ্রুবর্ষণে কার্পণ্য করেননি। এবং রাজনীতির শ্রেষ্ঠীদের চিরাচরিত দুর্ভাগ্য, তাঁদের কোনো কীর্তিই স্বচ্ছতা যাচাইয়ের হাজার বাতির আলোকপাতের বাইরে নয়।অত আলোয় কোনো কালোই লুকিয়ে রাখা যায় না। বাজপেয়ীজির মরদেহের সামনেও একই ভাবে  দেখা গিয়েছিল শোকাতুর মোদী-শাহ জুটির পদক্ষেপ।প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শেষযাত্রায়।

স্বদেশের নানা ক্ষেত্রে সতত বিচরণশীল সুষমা সমাজবাদী ধারা থেকে হিন্দুত্বের ঘাটে এসে নোঙর ফেললেও সংঘের স্বয়ংক্রিয় স্বয়ংসেবক না থাকায় কোথাও একটা খটকা থেকেই গিয়েছিল কার্যত নারীভূমিকা-বর্জিত সংগঠনের চালকদের মনে। এবং এঁরাই বিজেপির ভূত ও ভবিষ্যৎ। প্রতি বছর ‘কড়ওয়া চৌথ’ ব্রত করতেন ঘটা করে। স্বরাজ কৌশল ও সুষমা স্বরাজের দাম্পত্য যৌথ জীবনে স্বতোৎসারিত ধারার অনর্গল সিঞ্চন ছিল। কিন্তু তাঁর জীবনের সূত্রে, উৎসে, অববাহিকায় কোথাও স্বাধ্বী প্রজ্ঞা, জ‍্যোতি, ঋতম্ভরা এমনকি উমা ভারতীর ছিটেফোঁটাও ছিল না। সংঘ পরিবারভুক্ত সুষমা রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে হিন্দুত্বকে আপাদমস্তক আয়ত্ত করলেও এবং অটলবিহারী বাজপেয়ী নন, লালকৃষ্ণ আডবাণীর মন্ত্রশিষ‍্য হয়েও শেষ পর্যন্ত বিবেকবর্জনে রাজি হয়ে দাসখত লিখে দেননি। দলীয় শৃংখলার পরাকাষ্ঠা প্রকাশ‍্যে তাঁর মুখে কুলুপ এঁটে দিলেও সতীর্থ অরুণ জেটলি, বেঙ্কাইয়া নাইডু প্রমুখ বিজেপির দ্বিতীয় প্রজন্মের সম স্তরের নেতাদের জন্য তৈরি চিত্রনাট্য মেনে নেননি।

এই নেতাদের পরে ছিল নরেন্দ্র মোদীর স্থান। কিন্তু গুজরাত গরিমায় মোদীর আত্মপ্রকাশ তাঁর প্রজন্মের জাতীয় নেতাদের অনেকখানি আবডাল করে দিলেও দু’জন ছিলেন ব‍্যতিক্রম, প্রমোদ মহাজন ও সুষমা। সংসদমাতানো বক্তৃতায় ও রাজনৈতিক কূটনৈতিক কুশলতায় এঁরা বাগ্মী বাজপেয়ীর উত্তরসুরি।এবং তীব্র আডবাণীপন্থী হওয়ার দরুণ সুষমা ছিলেন প্রমোদের চেয়ে বেশি পার্টিজান ও রেজিমেন্টেড। সেই সঙ্গে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পক্ষপাতী ও নারীদের সমানাধিকারের স্বার্থে লড়াকু। মেয়েদের স্বার্থরক্ষার ইস‍্যুগুলোকে দলমতের ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টাও করতেন। মনে পড়ে একই ভাবে এই নীতিতে বিশ্বাসী কমিউনিস্ট সাংসদ ও নারী আন্দোলনের নেত্রী গীতা মুখোপাধ্যায় ‘৯৬ সালে যুক্তফ্রন্টের আমলে মহিলা সংরক্ষণ বিল আনা নিয়ে অগ্রণী হন। এ নিয়ে গঠিত কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। লোকসভায় এ নিয়ে সমন্বয়ের  উদ্যোগে গীতা মুখোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়ান সর্বাগ্রে সুষমা। আসেন গীতাদির ডাকে তখনকার কংগ্রেসের সাসদ ও যুবনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।

সুষমাই টেনে আনেন বিজেপির সাংসদ ও যুবনেত্রী উমা ভারতীকে। কট্টর কংগ্রেস ও নেহরুগান্ধী পরিবারের বিরোধী হিসেবে পরিচিত সুষমাকে ছেড়ে কথা বলেননি সংরক্ষণপন্থী সনিয়াকেও। বল্লারিতে গিয়ে হার নিশ্চিত জেনেও সনিয়ার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন সুষমা। সনিয়ার প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হওয়ার তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি। বলেন, “সনিয়া প্রধানমন্ত্রী হলে আমি মাথা মুড়িয়ে ফেলব।” অটলের ১৩ দিনের সরকারের আস্থাভোট বিতর্কে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তার নাম সুষমা স্বরাজ। আরেক জন প্রমোদ মহাজন।

২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচন আগাম আহ্বান করেছেন বাজপেয়ী।তাঁর ডেপুটি আডবাণীর পরামর্শে। আডবাণীর যুক্তি, অটল সরকারের শাসনে সারা দেশে খুশির হাওয়া বইছে – “ফিল গুড ফ্যাক্টর”। নতুন ভারতেরউদয় হয়েছে। এই হাওয়া থাকতে থাকতে লোকসভা ভোট হোক। বাজপেয়ী একমত ছিলেন না। কিন্তু চাপে পড়ে রাজি। ভোটের হাওয়া শুরু হতেই মরশুমি পাখি দের ওড়াউড়িও  শুরু। প্রতিদিনই কোনো না কোনো রথি মহারথি আলো করছেন বিজেপি দফতর ১১, অশোক রোডে। এ দিন এসেছেন ভূপেন হাজারিকা। স্বনামধন্য সুরকার, গায়ক, সংগীত পরিচালক। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তাঁকে পরিচয় করালেন। স্বাগত বরণপর্ব মিটল। সুষমা হাসিমুখে মাইক দিলেন ভূপেনবাবুকে। আইপিটিএ-র উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রার এক জন কেন বিজেপির মতো মহান নেতাদের মহত্তর দলে যোগ দিচ্ছেন, তা ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন। ব‍্যাখ‍্যার প্রায় সবটাই বাজপেয়ী সরকারের প্রশস্তি। থামলে সুষমা বললেন, মিত্রোঁ, এ বার আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন।

সুযোগপ্রার্থীদের প্রথমেই ছিলাম আমি। পাশাপাশি অসমের কিছু রিপোর্টার, এবং টিভি সাংবাদিক চিত্রিতা সান‍্যাল। আর সব জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিককুল। যাদের ভূপেনবাবুর ব‍্যাপারে তেমন আগ্রহ নেই। সুতরাং দৃষ্টি আকর্ষণ আর আবেগ সঞ্চারিত করার উদ্দেশ্যে হাত তুলে বিপুল চেঁচিয়ে বললাম, “ভূপেনদা, আপনি গানের মানুষ। গান দিয়েই বলুন না আপনার মনের কথা”। রাজনৈতিক কথা না হয় সুষমাজি বলবেন। তা ছাড়া এই সুযোগে আপনার গানও শোনা হবে। টিভিদের সোনায় সোহাগা। ক্যামেরা গোটাতে গোটাতে ফের ঝপাঝপ খুলে ফেললেন চিত্রীরা। এবং চিত্রিতাও উৎসাহিত হয়ে একই প্রশ্ন করল। এ বার ভূপেনদা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন পাশে দাঁড়ানো সচিবের দিকে। বুঝলাম, উনি তৈরিই আছেন। সচিব একটা স্ক্রিপ্ট দিলেন, বোর্ডে লেখা। হাতে নিয়েই অসম তথা আসমুদ্রহিমাচল  ভারতের পল রোবসন শুরু করলেন ওঁর জলদগম্ভীর মেঠো সুরে: বিস্তীর্ণ দুপারে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনে নিঃশব্দে নীরবে ও গঙ্গা তুমি ও গঙ্গা বইছ কেন? মাত হয়ে গেল সাংবাদিক সম্মেলন।ভূপেনবাবু থামলেন। এবং আমি সবিনয় প্রশ্ন করলাম, ফিল গুড দেশে আপনি হাহাকার-এর গান গাইলেন ভূপেনবাবু? তা হলে আপনার যোগদানের কারণ কী? বুদ্ধিমতী সুষমা আগেই আপত্তি করতে গিয়েছিলেন।কিন্তু কে রুখবে ভূপেনবাবুর গান। উনি মনের মতো প্রশ্ন পেয়েছেন। এই প্রশ্ন শুনে সুষমা হাসিমুখেই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, দোস্তোঁ, প্রেস কনফারেন্স ইজ ওভার। অন্তত তিরিশ জন রিপোর্টার তখন অ্যাঙ্গেলের প্রশ্ন নিয়ে ঘিরে ধরেছেন ভূপেন হাজারিকাকে। সুষমা ডায়াসে নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.