মেরুকরণে জুড়ল উঁচু জাত, মোদীর পাশা উলটে দিতে পারে নিচুতলার জোট

0
narendra modi
debarun roy
দেবারুণ রায়

শুধু গো-বলয়ই নয়, সংঘের মূল কর্মভূমি ও বহু শাখা-প্রশাখার আঁতুড়ঘর অবিভক্ত মধ‍্যপ্রদেশ ও রাজস্থান। সেই চারণভূমি থেকে্ নির্বাসনের নোটিস পেয়ে আর ঝুঁকি নিতে চান না দেশ ও দলের মাথারা, এক কথায় শাসক বিজেপির সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম। নতুন রাজ‍্য ছত্তীসগঢ় তো মাওবাদী তাণ্ডবের কাল থেকেই মূল ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ‘ঘর ওয়াপসি’র মতো হিন্দুত্বের তত্ত্ব প্রথম ছেয়ে গিয়েছিল ওখানেই। সেই রাজ‍্যেই সবার আগে নিরঙ্কুশ হয়েছে কংগ্রেস। এ হেন রামধাক্কায় টাল সামলানো কঠিন। ধাক্কার কথা কবুল করেই জীবনদায়ী ওষুধ লিখে দিয়েছেন মোদী। এই  বিপৎকালে রামনাম ছাড়া পথ নেই। পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কথা জেনেও এ দাওয়াই বাঁচার দাওয়াই। সংবিধান, আদালত মেনে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকলে হয়? আমজনতার প্রভাবশালী এক একটা অংশ একে একে বিজেপিকে তালাক দিচ্ছে, এই দৃশ‍্য কি নীরবে হজম করা সম্ভব? তাই জনগণকে বার্তা দেওয়া – সুখে-দুঃখে আমরাই তাদের এক এবং একমাত্র আগমার্কা বন্ধু, আমরা ছাড়া কে দেবে সবর্ণকে সংরক্ষণ। দলিত, অনগ্রসর, সংখ্যালঘু কস্মিনকালেও বিজেপির হবে না। তাই ওদের পেছনে সময় নষ্ট না করে, আসুন, মহারাষ্ট্রের ফড়ণবিশ কিংবা উত্তরপ্রদেশের যোগীর উচ্চবর্ণ-জাত-গণ, সরকার এ বার আপনাদের সংরক্ষণ দেবে। চিরকাল সংরক্ষণ পেয়েছে শুধু ওরা। অগ্রসর সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বার থেকে তারাও ১০ শতাংশ পাবে।

কিন্তু পাবেটা কী করে? আদৌ পাবে? ক্রমশ প্রকাশ্য। আসলে পাওয়া-পাওয়ির আগেই তো ভোট। ঋষিমশাই এক বার পূজায় বসলেই কেল্লা ফতে। তার পর ‘লি’-কার ‍ডিগবাজি খেলে খাবে। স্বরবর্ণের জ্ঞানটুকু ভারতবাসীর হয়েছে, সেই রামধাক্কা খেয়েই। সুতরাং বিজেপির প্রধানমন্ত্রী লোকসভায় তরতরিয়ে উচ্চবর্ণের সংরক্ষণ সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়ায় বাহ্যিক গদগদ হয়ে বলেছেন, একটা আদর্শ পরিস্থিতি। যদিও নিশ্চিত, মনে মনে ভেবেছেন, ভূতগুলোও তা হলে রামনাম নিল। মানে ঠ‍্যালার নাম বাবাজি। এক চালে সব মাত। মোদী রাগ করবেন, না হলে সরকারের সেবক কাগজগুলো  কিন্তু লিখত, এটা মাস্টার স্ট্রোক। যেমন দেখেছিলাম এক সহকর্মীকে ২০১৬-র ৮ নভেম্বর রাতের নাটকীয় ঘোষণার সময় ‘গুরু গুরু’ বলে কপালে হাত ঠেকাতে।

আরও পড়ুন আইনের শাসন বজায় রাখার ভার যাঁর, তাঁরই আস্থা নেই আইনে!

আসলে খামোখা উচ্চবর্ণের গুচ্ছ গুচ্ছ গরিবের বিরাগভাজন হতে যাবে কেন বিরোধী দলগুলো? ওদের ভোট কি ভোট নয়? কিন্তু এই দু’ পক্ষের কেউ-ই কম যায় না। ক্ষমতাসীন নেতারা যেমন চাল চালেন, তেমনি বিরোধীরা তাকে বেচাল বানিয়ে সারা দেশে ভূচাল বাধিয়ে দিতে পারেন। এই ১০ শতাংশ সংরক্ষণের সঙ সেই পথেই চলেছে। সরকার সব জেনেশুনেই হাত পোড়াতে চায়। লোকসভা থেকেই শুরু হয়েছিল এই আশা। যদি অন্যরা বিরোধিতা করে বিলটিকে নাকচ করে দিত, রাস্তায় নেমে বিজেপি বলত, এরা সব উচ্চবর্ণের গরিব-বিরোধী। কিন্তু সেই সুযোগ থেকে শাসকদলকে বঞ্চিত করেছে বিরোধীরা। এর পরের ধাপ হল আদালত। অতীতে প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিংহ রাও একই সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট রাজি হয়নি। মোট সংরক্ষণ ৫০%-এ বেঁধে দিয়েছিল। সুতরাং এ বারও একই ঘটনা ঘটার কথা। কারণ সুপ্রিম কোর্টের রায় আইনের সমগোত্রীয়। এই পরিস্থিতিকে অতিক্রম করতে হলে সরকারকে সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইন সংশোধন বা প্রণয়ন করতে হবে। এই পরবর্তী ধাপগুলোর নিস্পত্তি নির্বাচনের আগেই হবে এমন ধারণা করা যায় না। তাই দু’ পক্ষকেই পরের চাল ভাবতে হচ্ছে।

এ দিকে, ২০১৪-র লোকসভায় বিজেপির নিরঙ্কুশ হওয়ার মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছিল ‘মেরুকরণ’ নামে যে ব্রহ্মাস্ত্রটি, তাতে হিন্দুত্বের তাস ছিল সক্রিয়। বিরোধীরা বলেছিল, বিজেপি বিকাশের স্লোগানের আড়ালে ধর্মের রাজনীতি করছে। কিন্তু ধর্ম নিয়ে কথা উঠলেও কেউ জাতপাতের মেরুকরণের কথা তোলেনি। প্রকৃতপক্ষে সংঘ ধর্মীয় বিভাজনের কথা বললেও জাতপাতের কথা তোলে না। কারণ তারা পুরো হিন্দুসমাজের ঐক্য চায়। যা কার্যকর হলে হিন্দু ভোটে কোনো ভাগাভাগি হবে না। এবং বিজেপি লাভবান হবে। এ দিকে তাকিয়েই দলিত অনগ্রসরদের কাছে টানার সূত্র খুঁজতে তৎপর সংঘ।

মোদীর উঁচুজাতের অঙ্ক নিচুতলার জোট দিয়ে অনায়াসেই ভেস্তে দিতে পারে বিরোধীরা। সংরক্ষণের নয়া সঙ কাছে টানতে পারে মায়াবতী-অখিলেশকে। এই সমীকরণ অনিবার্য করে তোলাই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির পরীক্ষা।

কিন্তু আঁতুড়ঘরের অ্যালার্ম ঘুম কেড়েছে শাসকদের। তারা এখন তত্ত্ব ছেড়ে উচ্চবর্ণের ভোটে ধস রুখতে ব‍্যস্ত। ২০১৪-য় নিজেকে পিছড়ে বর্গের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে চায়ওয়ালার তকমায় আম-আদমির সমর্থন পেয়েছিলেন মোদী। কিন্তু গত সাড়ে চার বছরে দলিত ও সংখ্যালঘু নিগ্রহের ঘটনাবলি ‘পিছড়ে’ তাসের বারোটা বাজিয়েছে। সমাজের নিচুতলার মানুষের পরিস্থিতি স্বভাবতই অনগ্রসর শ্রেণিকেও সমব‍্যথী করেছে। এবং সংখ্যালঘুদের সঙ্গে নিচুতলার মানুষের আত্মিক যোগাযোগ চিরকালীন। সুতরাং বিচক্ষণ, পদাধিকারে ‘ফার্স্ট অ্যামং ইকুয়ালস’ এবং কুশলী রাজনীতিজ্ঞ মোদীজি উচ্চবর্ণের ভোট অটুট রাখার ন‍্যায‍্য চেষ্টা করেছেন। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়ের বিধানসভা ভোট এবং খোদ উত্তরপ্রদেশের তিনটি লোকসভা উপনির্বাচন, বিশেষ করে হিন্দুত্বের দুর্গ গোরখপুরের ধস, উচ্চবর্ণের মধ্যেও নিম্নবিত্তদের সরে যাওয়ার সংকেত হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম-তাসের অসারতা এখানে স্পষ্ট। বাবরি ভাঙার পরেও শুধু রামে হবে না বুঝে, সর্ব ভারতীয় বিজেপির উত্তরপ্রদেশীয় কট্টর ব্রাহ্মণ সভাপতি রুটিরুজিকে ইস‍্যু করতে চেয়ে ‘রাম রোটি’ স্লোগান দিয়েছিলেন। দিল্লিতে তখন কংগ্রেস সরকার।

আরও পড়ুন রাহুলই নেতা, পাশে মায়াবতী, উনিশে ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত

সেই সংকটই মালুম হয়েছে মোদীর। ভাসানো হয়েছে, তিনি এ বার পুরীতে দাঁড়াবেন। উৎসাহী সম্প্রদায় বাংলাতেও তাঁর জন্য আসন রেখেছে। একটা যুক্তি গ্রহণযোগ্য, যে নতুন এলাকা থেকে এ বার আসন আনতে হবে গরিষ্ঠতার খাতিরে। সে ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত দুর্বল সংগঠনের রাজ‍্যে কর্মীদের মনোবল বাড়াতে বা জনসমর্থন টানতে প্রধানমন্ত্রী একাধিক কেন্দ্রে দাঁড়াতেই পারেন। কিন্তু সে জন্য কাশীকে বিসর্জন দেবেন, এমন কল্পনা বোধহয় অরাজনৈতিক। নরেন্দ্র মোদী ভারতের উৎকৃষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের অন‍্যতম। সুতরাং সংঘ-কথিত উত্তরপ্রদেশের তিন তীর্থ, অযোধ্যা, কাশী, মথুরার মধ্যে সব চেয়ে কৌশলগত কেন্দ্র ছাড়বেন কেন? বিশেষ করে মেরুকরণের যে মর্মবাণীকে বিজেপির ব‍্যাখ‍্যা অনুযায়ী মিডিয়া ‘মোদীত্ব’ নাম দিয়েছে, তার প্রাককথায় ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হল জাতপাত। হিন্দি বলয়ে কংগ্রেসের উচ্চবর্ণের সমর্থনভূমিতেই সিঁদ কেটেছে বিজেপি। এ বার সেই সত্ব বহাল রাখতেই ভোটের মুখে সবর্ণকে সংরক্ষণ দেওয়ার কৌশলগত সিদ্ধান্ত। মেরুকরণের লক্ষ্যে নিজের অবস্থানটি গোড়াতেই স্পষ্ট করে দেওয়া। স্বীকার করে নেওয়া যে, অনগ্রসর, দলিত নয়, আমি নিজের অস্তিত্ব বিপন্ন করেও উচ্চবর্ণের পক্ষে। এই হোক শেষ পরিচয়। হাতের তাস বুকের কাছে লুকিয়ে না রেখে প্রতিপক্ষের সামনে মেলে ধরা। এতে মোদীর শর্তেই রাজনীতি করতে হবে সবাইকে। এবং কেউ আমূল বিরোধিতা করতে পারবে না। যদিও এই শর্তের শরজালেই বিরোধীরা মাত করে দিতে পারে। জাতধর্মের মেরুকরণকে ধনী-দরিদ্রের মেরুতে বদলে দিয়ে। অবশ্যই মধ্য ও নিম্নবিত্ত জুড়ে যাবে দরিদ্রের মেরুতে। এ ভাবেই বিজেপির মেরুকরণের পাশা ওদের দিকেই উলটে দিয়েছেন বিহারের লালু। কারণ, লক্ষণীয় শ্রেণিবিন‍্যাস করেছেন মোদী। ৮ লাখ টাকার নীচে পর্যন্ত বার্ষিক পারিবারিক আয়কে গরিবের শ্রেণিতে রেখেছেন। এই কৌশলেই মোদীত্বের সৃষ্টি।  প্রয়োজন বুঝে স্থিতিস্থাপক ও রাখঢাকহীন রাজনীতিই মোদীর ইউএসপি। মতাদর্শের রাজনীতিতে বাজপেয়ীর মতো মুখোশ পছন্দ নয় তাঁর। সব মতাদর্শই যে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাদর্শ, সে কথা বোঝাতে  ক্লান্তিহীন। উনিশের খাতিরে উচ্চবর্ণকে কুর্নিশ করলেন তিনি। আদালত ফেরত দিলেও কাঠগড়ায় তোলা হবে বিরোধীদের। বলা হবে কংগ্রেস ও বামেরা উকিল দিয়ে ‘আরক্ষণ’ রুখেছে। তার পর আছে সরকারি চাকরির অভাব। অধিকাংশ পদেই নিয়োগ বন্ধ। কর্মী সংকোচন। ‘পে-রোল’-এর পাট চুকিয়ে কনট্রাকচুয়াল। সুতরাং সংরক্ষণ থাকলেই বা চাকরি হবে কোত্থেকে? সর্বোপরি বেসরকারিকরণের ধমকে সরকারি চাকরি তো অবলুপ্তির পথে। সেটাই তো অর্থনৈতিক সংস্কারের মোদ্দা কথা। আর এই সুযোগে মোদীর উঁচুজাতের অঙ্ক নিচুতলার জোট দিয়ে অনায়াসেই ভেস্তে দিতে পারে বিরোধীরা। সংরক্ষণের নয়া সঙ কাছে টানতে পারে মায়াবতী-অখিলেশকে। এই সমীকরণ অনিবার্য করে তোলাই ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির পরীক্ষা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here