modi and shah
নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ। ছবি সৌজন্যে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
দেবারুণ রায়

সমরমদে মত্ত, ঐ দেখ/প্রমত্ত, ভীষণ রক্ষঃ, বক্ষঃ শিলাসম/কঠিন! অন্যান্য যত কত আর কব?/শত শত হেন যোধ হত এ সমরে,/যথা যবে প্রবেশয়ে গহন বিপিনে/বৈশ্বানর, তুঙ্গতর মহীরূহব্যূহ/পুড়ি ভস্মরাশি সবে ঘোর দাবানলে।”(মেঘনাদ বধ)

সেই যুদ্ধেই শুদ্ধ হবে সব অনাচার?

অচ্ছে দিনের স্বপ্ন বেচে পাঁচ বছর সরকার চালানোর পর সব দোষ বিরোধীদলের  ঘাড়ে চাপিয়ে, সুদিন না আনার কৈফিয়ৎ তো দূরের কথা, ‘১৪-য় দেওয়া প্রতিশ্রুতির উচ্চবাচ্য না করে ২০২২-এ স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষের জন্য আরও ৭৫ দফা অঙ্গীকারের আষাঢ়ে গল্প শোনালেন ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী। জনতার মুক্তিদাতার পোজে, এই গরমে সান্তাক্লজ সেজে বোঝালেন, হে ভারত ভুলিও না আমি গেঁয়ো যোগী। সরি সরি সিএম সাব যোগীজি, ইয়ে কোই নরমাল যোগী কি বাত, আপ নহি। হাঁ। মোদী সে উনকা বড়ি প্রবলেম। ইসলিয়ে মোদী হঠাও কা নারা। মগর, আপকা ইয়ে চওকিদার কিসি কো ছোড়নেবালা নহি, কিসি কো বক্সে গা নহি। জিতনা মিলাবট কর লো।

ব‍্যস। গগনবিদারী ‘মোদী মোদী’ ধ্বনিতে আকাশবাতাস তোলপাড়। এ দিকে খবর আসছে সমানে, সহারনপুরে শেষ মুহূর্তের রোড শোয়ে জনশৈলাব, লোকলহর। শুনেই শাহজি মাথা চুলকে নিলেন কয়েক সেকেন্ড। তার পরই কানে কানে ফোনে ফোনে ছড়িয়ে দিতে থাকলেন দিমাকি দাওয়াই, এক রকম মগজাস্ত্র। আরে পণ্ডিতজি, লালাজি, ঠাকুরসাহাব, কাংগ্রেস সে মদত মিলেগি। আকলিয়ত ভোটের ভাবনা আর নেই। সংখ্যালঘু মুসলমান তো আমাদের ভোট দেবে না। তো সহারনপুর, মোরাদাবাদ, দেওবন্দ, বরেলি, শাহজঁহাবাদ, রামপুর, কানপুরে, দেহাতে, মেরঠ, বাগপতে প্রিয়ঙ্কা ভোট টানলে মুসলমান ভোট ভাগ হবে। সপা-বসপা আর কংগ্রেসে বাঁটোয়ারা হয়ে ফয়দা আমাদের। মোদীজি কা লহর বরকরার। জোট হলেও মোদী, না হলেও মোদী, ইধর ভি মোদী, উধর ভি মোদী। দোনো হাথ মে লাড্ডু। এনডিএ ৩৫০ কা আঁকড়া পেরিয়ে যাবে। দেখে নেবেন।

আরও পড়ুন ভোটের ভয়ে ডাইনে বাঁয়ে যে যেখানে দাঁড়িয়ে – মেরু আর মেরুদণ্ড, গোরু আর গেরুয়া ভারত

কিন্তু একটা বেয়াড়া সওয়াল এসে গেল। মগর, অধ‍্যক্ষজি, আপকা আকলন, মতলব পার্টি কা আঁকড়া কঁহাতক…, মানে মানে আমরা ‘১৪-য় তো ইউপিতে ৮০-তে ৭৩ পাই। লোকসভায় ২৮২ ছিল এ জন্যেই। মাত্র ৭ পেয়েছিল বিরোধীরা। ওরা সব অলগ থলগ ছিল তখন। আর আজ জোট হয়েছে তিন দলের। কাংগ্রেস শুধু অগড়ে ভোট আর কিছু সিটে মুসলিম ভোটও টানবে। ওরা কি এ বারও ৭ মে সীমট জায়েগা? ইয়ে কভি নহি হোগা। ভুলভুলাইয়ায় থেকে কোনো লাভ নেই। আর মুসলমান? যেখানে আমাদের হারানোর মতো তাকত যাদের, তাদের ভোট দেবে। এককাট্টা থাকবে। হরগিস বাঁটবে না। ওতে কোনো বরেলভি, দেওবন্দি নেই। আগে অগড়ে ভোট। পণ্ডিত, ঠাকুর, লালা, তার পর তো মুসলমান। কাংগ্রেস তো আগে অগ্রসর হিন্দু ভোটে হাত বাড়াবে। শুধু শুধু মুসলমান ওদের ভোট দেবে কেন? যেখানে ওরা অন্য ভোট বেশি পাবে সেখানে মুসলমান ওদের নাইয়া পার করাবে। যতই ধ্রুবিকরণের (মেরুকরণ) ডাক দিই আমরা, দুই কৌম একজুট হয়েই ভোট করে। সত্তায় বিজেপি থাকলে আর কোনো রকমের বিরোধী জোট হলে। অখিলেশ মায়াবতী দু’টো সিট ছেড়েছে বলে কাংগ্রেস ওদের সাত সিট ছেড়ে শুক্রিয়া অদা করেছে। অলগ থেকে দু’পক্ষই বিজেপির ভোট আর দু’পক্ষের বিরোধী ভোট টানছে। কাংগ্রেসকে খড়ি খোটি শুনিয়ে দিয়েছেন বহনজি। বহন কুমারি মায়াবতীর চাল হল লোককে দেখানো, যে তারা কাংগ্রেসের খিলাফ। এই চালে আমাদের ভোটার মাৎ হলে? পশ্চিমের মুসলমান যদি এই অঙ্কে চাকা ঘুরিয়ে দেয়, তা হলে তো মুষলপর্ব বিজেপির। আর পশ্চিমেই ওদের সূর্যোদয়, আমাদের অস্ত।

কোনো জবাব দিয়ে এই যুক্তিকে পাকতে দিলেন না শাহজি। ততক্ষণে পাকিস্তান ঘুরে প্রধানমন্ত্রীজি এ স‍্যাটে সটাসট চলে গেছেন। সহারনপুরের খবর নিতে মঞ্চের পেছনে এসে একী বখওয়াস শুনলেন অমিত শাহ? সটান উঠে বললেন, আপকা সওয়াল বহোৎ অহম হ‍্যায়। আগে তো আমার বাঁটোয়ারাবালা লজিক সব লোকাল চ্যানেল মে চলনে দিজিয়ে। উসসে পার্টি কা ফয়দা হোগা।

ভাষণের শেষপাদে পদার্পণ মোদীর। “মোদী এত আহাম্মক নয় যে তোমাদের সঙ্গে ‘১৯-এর ভোট নিয়ে  কথা বলবে। ফির একবার মোদী সরকার এই নারা লোকে লুফে নিয়েছে। বিরোধীদের প্রধানমন্ত্রী কে তা-ই ঠিক ঠিক হয়নি। মমতাদিদি, বহন মায়াবতীজি, চন্দ্রবাবু, সিপিএম কেউ কি নামদার প্রধানমন্ত্রীতে রাজি? নহি। যে যার পাল্লা ঝাড়ছে আর জল মাপছে। আর হম দুবারা সত্তামে কাবিজ।” সুতরাং, “বহনোঁ অর ভাইয়োঁ, সত্তামে হম দুবারা আয়েঙ্গে কি নহি আয়েঙ্গে? আয়েঙ্গে কি নহি আয়েঙ্গে?” হকিকত তো গোলমেলে ঠেকছে। দু’বার করে বলতে হল, আমরা ফিরে আসব কি আসব না? তা-ও যেন মন্ত্রপাঠের মতো মোদী মোদী। কেমন রক্তশূন্য, প্রাণহীন! আর বলছি না। একেই লোকে যেতে শুরু করেছে। ফের প্রশ্ন করলে যদি মাঠ ফাঁকা হয়ে যায়! যদিও লোকে যাবে মনে করলেই যেতে পারে না। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার ঘেরাটোপের অনেক হ‍্যাপা। একবার ঢুকে পড়লে বেরোনো মুশকিল। তবু লোকে মাঠ ফাঁকা করে এনট্রান্সের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তবু বসবে না। প্রধানমন্ত্রীকে দেখা হয়ে গেছে, ব‍্যাস। কথা তো সব একই।

পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের যে কোনো একটি জনপদের অন্যতম নমুনা জনসভার সাধারণ দৃশ্যপট তুলে ধরা গেল। কেন্দ্রের শাসকদলের প্রচারের ঢক্কানিনাদের একটি বাক্যও কিন্তু এক্সটেমপোর নয়। আছে সর্বাধিনায়কের জন্য পিএমও-র অত‍্যাধুনিক টেলিপ্রম্পটার এবং রীতিমতো রিহার্সাল দেওয়া চিত্রনাট্য। পুরোপুরি পেশাদার হাতের ছোঁয়ায়। বিজেপি বিশ্বাস করে মার্কেটিংটা একটা দুরন্ত শৈলী। পচাকেও পঞ্চানন, বেঁকাকেও বঙ্কিমচন্দ্র করে দেওয়া যায় এই ম‍্যাজিকে। জনান্তিকে এক নেতা বলতেন, দেখো, বাজার অর্থনীতির যুগে রাজনীতিটাও একটা প‍্যাকেজ। কারণ এই বৃহত্তর বিষয়টি ভোক্তাস্বার্থের সঙ্গে জড়িত। সুখে থাকার, নানা উত্তরণ ও উন্নয়নের মাধ্যম। কোন প‍্যাকেজ বেছে নিলে আমার ভালো হবে, সেটাই বিবেচ‍্য। সে জন্যই তো ইস্তাহার। সবারটা, বিশেষ করে কংগ্রেসের ইস্তাহার দেখে নিয়ে সব শেষে বিজেপি বের করল সংকল্পপত্র। রাহুল বলেছিলেন, গরিবকে মাসে ছ’হাজার করে মাথাপিছু ভাতা দেবেন। মোদীরা বললেন, বছরে ছ’ হাজার দেবেন। একটু সংযত দেখা গেল আশমানি প্রতিশ্রুতিতে। শ্রুতিমধুর কথা হলেই হয় না। শুনতে যত মিষ্টি, তত অনাসৃষ্টি। কারণ, প্রতিশ্রুতি কখনও এ ভাবে পূরণ করা যায় না। সে জন্য আর অচ্ছে দিনের লাইনে নেই। এ নিয়ে একটা কথা বললেই চার দিক থেকে প্রশ্নবাণ ছুটে আসবে। প্রশ্নবাণ তো নয়, মৃত‍্যুবাণ। যে দুঃখে পাঁচ বছরে একটাও সাংবাদিক বৈঠক করেননি।  অতীতের সমস্ত প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড ভেঙেছেন নেতিবাচক ভাবে। রাষ্ট্রনেতারা  কস্মিনকালেও কেউ বুকের ছাতির মাপ বলেননি। সত্যিও বলেননি, জলও মেশাননি। কিন্তু বুকের পাটা দেখিয়েছেন, এক এক জন এক এক ভাবে। কিছু না কিছু কীর্তি রেখে গেছেন। ক্ষণস্থায়ী প্রধানমন্ত্রীরাও দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ছেড়ে গেছেন জাতীয় রাজনীতিতে। ইন্দিরা এমারজেন্সির মতো কালো দিন এনেছেন ঠিকই। কিন্তু ব‍্যাংক ও কয়লা জাতীয়করণ থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধজয়, পাকমুলুককে দু’টুকরো করা থেকে নির্জোট নেত্রী হিসেবে বিশ্বের দরবারে নিয়ে গেছেন দেশকে। ভারত মহাসাগরে না নেমে, বিনা যুদ্ধেই ফিরিয়ে দিয়েছেন প্রবল প্রতাপশালী আমেরিকার সপ্তম নৌবহর। এ জমানায় এমন হলে কী হত ভাবা যায়? ব্র‍্যান্ডেড দেশভক্তরা এখনই ‘দেশ কা পাপা’ বলছে, তখন কী বলত? গুজরাতে আর গগনচুম্বী পটেলের প্রয়োজন হত না। মার্কেটিংয়ের দিনকাল বিলকুল বদলেছে। সে কালে খালি গা আর হাঁটুর ওপর কৌপিনের মতো ধুতির কদর ছিল সর্বাধিক। এ কালে সেই প‍্যাকেজ বদলেছে। বদলে গেছে দেশনেতার ভাবমূর্তির ভোল। গানহি বাওয়ার বদলে হালের গির-এর সিংহ। পরনের স‍্যুট দশলাখি। লাখ লাখের গল্পে ব‍্যাজার নয় জনতা। দাদরির বিসারা সাক্ষী, আকলাখের জান নিয়েছে উন্মাদ গোরক্ষক দল জনতার বেশে। গোহত্যার পাপ ধুতে নরহত্যার পুণ্য চাই, এমনই দিনের বাণী। অচ্ছে দিনের সেই শুরু।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here