জীবনের ৫০-এ সেই লড়াকু অধিনায়ককে কুর্নিশ

0
দক্ষিণ আফ্রিকায় সৌরভ। ছবি Twitter থেকে নেওয়া।

শ্রয়ণ সেন

৭ ডিসেম্বর, ২০০৩। রবিবাসরীয় এক শীতের সকাল। ক্লাস সেভেনে পড়া সেই পড়ুয়াটা আজ একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠবে ঠিক করেছে। মর্নিং স্কুল বলে এই শীতেও ওকে ভোর পাঁচটায় উঠতে হয়। আজ রবিবার, সে কোনো মতেই সাড়ে ৮টার আগে উঠবে না।

“এই তাড়াতাড়ি ওঠ, সৌরভ পঞ্চাশ করে ফেলেছে, দুর্দান্ত খেলছে…”

মায়ের কথাটা শুনে ধড়মড় করে ঘুম থেকে উঠে এক নিঃশ্বাসে টিভির সামনে বসে পড়ল সে। টিভির ও-প্রান্তে তখন সেই বাঁ হাতি বাঙালি, অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের শাসন করে চলেছে।

“মা, আমাকে একটু আগে ডাকতে পারলে না!”

কিছুতেই তার আপশোশ যাচ্ছে না। কেন সে আজ এত দেরি করে ঘুম থেকে উঠল!

কিছুটা রাগ, কিছুটা দুঃখ নিয়ে টিভির সামনে বসতেই আর একটা চোখ ধাঁধানো কভার ড্রাইভ বেরিয়ে এল সৌরভের ব্যাট থেকে। বাঁ হাতি পেসার ন্যাথান ব্র্যাকেন ভিরমি খেয়ে গেছে। স্টিভ ওয়া নখ খাচ্ছে।

ছেলেটা বুঝে গেল, আজ অন্য রকম কিছু হতে চলেছে। ওর গুরুদেব আজ অন্য কিছু করতে চলেছে। টিভির সামনে যে বাঙালি অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের ঠেঙিয়ে চলেছে, সে আজ অন্য মেজাজে। অনেক দিন পর এই মেজাজে দেখা যাচ্ছে তাকে। 

বছর তিনেক হল ছেলেটা ক্রিকেট খেলা দেখছে, বুঝছে। তার আগে কিছুই বুঝত না সে। ভারতের খেলার দিন টিভি চলত। বাবা-মা খেলা দেখত। কিন্তু সে থাকত তার নিজের জগতে। এই খেলাটা নিয়ে বাঙালি তথা ভারতীয়দের মধ্যে যে আবেগ, তা কোনো ভাবেই ছুঁতে পারেনি তাকে।

একটু বড়ো হতে যখন হাইস্কুলে উঠে গেল, তখনই খেলা দেখা শুরু ছেলেটার। অবশ্যই বন্ধুদের সৌজন্যে। তত দিনে ভারতীয় ক্রিকেটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে ফেলেছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়।

কার ভক্ত হবে, প্রথম দিকে সে চূড়ান্ত দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। স্কুলের বন্ধুরা তখন ‘সৌরভভক্ত বনাম সচিনভক্ত’-এ বিভাজিত। বাড়ি অবশ্য সৌরভময়। সিদ্ধান্ত নিতে বেশি দেরি করল না ছেলেটা। কিছুটা বাঙালি আঞ্চলিকতা কাজ করল অবশ্যই। সচিনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে, কিন্তু ভক্ত হবে সে সৌরভেরই।

সৌরভ গাঙ্গুলি।
ছবি সৌরভের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া।

সৌরভের স্বপ্নকে সঙ্গী করে তারও বেড়ে ওঠা শুরু। সে দেখেছে মহারাজা কী ভাবে তাঁর বিশ্বস্ত সৈনিকদের সঙ্গে নিয়ে বিপক্ষকে নাকানিচোকানি খাওয়াচ্ছেন। ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনালে সে দেখেছে, কী ভাবে ক্রিকেটের মক্কাতে সাদা চামড়া ব্রিটিশদের সামনে দাঁড়িয়ে দাদাগিরি করা যায়।

ভারতীয় দলের মনোভাব বদলে দিয়েছেন সৌরভ। বিদেশের মাটিতে যাওয়া মানেই ভারতীয় দল কেমন যেন গুটিসুটি মেরে যেত। কিন্তু এখন তারা পরিণত। ইতিমধ্যেই পোর্ট অব স্পেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে দিয়েছে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে হেডিংলির মাঠে অবিশ্বাস্য টেস্ট জয় পেয়েছে।

সেই সঙ্গে বিশ্বকাপ তো আছেই। ১১টা ম্যাচের মধ্যে ন’টায় জয়। টুর্নামেন্টে রানার্স আপ। গোটা বিশ্বের সম্মান আদায় করে নেওয়া। সবই তো হয়েছে সৌরভেরই সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ফলেই। বিশ্বকাপে দলটা হেরেছে শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে, যারা তর্কাতীত ভাবে বিশ্বের সেরা ক্রিকেট দল।

কিন্তু এখন তো এই অস্ট্রেলিয়ার ওপরেই শাসন করে চলেছেন সৌরভ! ছেলেটার মনে পড়ছে গত কয়েক দিন ধরেই সংবাদমাধ্যমে কী রকম খবর প্রকাশিত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়া বলেছে সৌরভ ব্যাট হাতে নামলেই তাঁকে ‘চিন মিউজিক’ শুনতে হবে।

এই ‘চিন মিউজিক’ কী সে জানত না। বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল। বাবা বলে, এটা এক ধরনের শর্ট পিচ্‌ড বল, যেটা অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা করবে সৌরভের থুতনি লক্ষ করে। এটার উদ্দেশ্য, সৌরভের মনোবল ভেঙে দেওয়া।

আসলে ক্যাপ্টেন গাঙ্গুলিকে অস্ট্রেলিয়া ভয় পেয়ে গেছে। আড়াই বছর আগের টেস্ট সিরিজের হার কিছুতেই হজম হয়নি তাদের। তাই এ বার বদলা নেওয়ার জন্য তারা বদ্ধপরিকর। স্টিভ ওয়ার ডেরায় গিয়ে একটা বিদেশি দল দাদাগিরি করে চলে যাবে, এটা কিছুতেই মানতে পারবে না তারা।

তাই এই ‘চিন মিউজিক’-এর উদ্ভাবন, যাতে মাঠে নামার আগেই দলটার মনোবল ভেঙে দেওয়া যায়। কারণ অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়াও জানত, সৌরভের মনোবল ভাঙতে পারলেই বাকিরা আপনা থেকেই চুপসে যাবে।

কিন্তু সৌরভ তো অন্য রকম। তিনি তো তাঁর পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন না। বিপক্ষকে মাঠেই দেখে নেবেন, এই ছিল তাঁর মনোভাব। 

কী অদ্ভুত ব্যাপার না! অস্ট্রেলিয়া চেয়েছিল সৌরভের মনোবল ভেঙে দিতে, কিন্তু এখন তো সৌরভই অজিদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার পালটা খেলায় মেতেছেন।

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ফাইল ছবি

সেভেনের সেই ছেলেটা কিন্তু ভাবতে পারেনি যে সৌরভ পঞ্চাশ করার পরেও সাবলীল ভাবে নিজের ইনিংস এগিয়ে নিয়ে যাবেন। মনের ভেতর সব সময় ভয়, এই বুঝি আউট হয়ে গেল, এই বুঝি আউট হয়ে গেল।

কিন্তু আজ সৌরভ যে অন্য মেজাজে। কিছুতেই তাঁকে আউট করা যাবে না। অফসাইডটা ফিল্ডারদের দিয়ে ঘিরে দিয়েও কিছু সুবিধা করতে পারছেন না স্টিভ ওয়া। ফিল্ডারদের মাঝখান থেকে জায়গা খুঁজে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে সৌরভের মারা বল।

অবশেষে এল এক মাহেন্দ্রক্ষণ। লেগ স্পিনার স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলকে সুইপ করে দু’টি রান নিলেন সৌরভ। তার পরেই শুরু উৎসব।

টিভির ও-পারের ছেলেটা দু’ বার বড়ো লাফ দিয়ে, হেলমেট খুলে ব্যাট উঁচিয়ে ড্রেসিং রুমের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন বলছে, ‘সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া একেই বলে!’ গোটা স্টেডিয়াম তখন দাঁড়িয়ে অভিবাদনন জানাচ্ছে। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে চোখের সামনে এক অসাধারণ মহারাজকীয় ইনিংস দেখে গিয়েছে তারা।

আর টিভির এ-পারের ছেলেটা উৎফুল্ল। মুষ্টিবদ্ধ হাত ঘুঁষির মতো করে উঁচিয়ে বার বার ‘ইয়েস’ ‘ইয়েস’ বলে যাচ্ছে সে। হ্যাঁ, আমরা পেরেছি। বাঙালি পেরেছে অস্ট্রেলিয়াকে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে জবাব দিতে পেরেছে।

গোটা সিরিজটাই যেন এক স্বপ্নের মতো কাটল। শুধুমাত্র একটা টেস্ট ম্যাচ বাদ দিলে বাকি তিনটে টেস্টেই ভারত দেখিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়াকে, লড়েছে সেয়ানে সেয়ানে, এমনকি বারংবার ছাপিয়ে গিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার পরাক্রমী দলকে।

স্টিভ ওয়া এ বারেও পারলেন না। পারলেন না সৌরভের সামনে থেকে সিরিজ ছিনিয়ে নিতে। আড়াই বছর আগে যেমন দেখেছিলেন তাঁর সামনে সিরিজের ট্রফি ছিনিয়ে নিচ্ছেন এক বঙ্গসন্তান, এ বারও সেটাই দেখছেন।

অষ্টাদশ-উনবিংশ শতকের সেই নবজাগরণের পর বিশ্বমঞ্চে আবার বাঙালির দাদাগিরি। 

‘ক্রিকেট যদি ধর্ম হয়, সচিন তা হলে ঈশ্বর!’ ছোটো থেকে ভারতের খেলা দেখতে বসলে এই ধরনের পোস্টারই বার বার চোখে পড়েছে ছেলেটার। কিন্তু সে সেই ঈশ্বরের কাছে বার বার ক্ষমাপ্রার্থনা করেছে। কারণ ঈশ্বর নয়, সে বেশি ভালোবাসে ক্রিকেটার সৌরভকেই।

জীবন পেরিয়ে গিয়েছে অনেক অনেক বছর। সেই ছোট্ট ছেলেটা এখন বছর তিরিশের যুবক। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে চাকরি-ব্যবসায় মজেছে। ক্রিকেটের প্রতি সেই আবেগ এখন আর তার নেই। তার আদর্শ এখন সেই ক্রিকেট বোর্ডেরই মসনদে, তবুও সে সেখানে রাজনীতির গন্ধই বেশি খুঁজে পায়। এই সব এখন খুব একটা ভালোও লাগে না। 

আজ ৮ জুলাই জীবনের অর্ধশতরান অতিক্রম করলেন বিসিসিআই সভাপতি সৌরভ। সেই সৌরভ যে ক্রিকেটার হিসেবে আজও ছেলেটার আদর্শ। কারণ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও কী ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জীবনে ফিরে আসতে হয়, সেটা ওই মানুষটাই তো ছেলেটাকে শিখিয়েছে।

আরও পড়তে পারেন

জাপানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে গুলিবিদ্ধ, অবস্থা গুরুতর

জুলাইয়ের প্রথম ৮ দিনে ৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টি, কলকাতায় ঘাটতি কিছুটা কমে ৪৭ শতাংশ

‘দম থাকলে গ্রেফতার করুক’, তৃণমূলকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন দিলীপ

পঞ্চায়েত সদস্য-সহ ক্যানিংয়ে খুন ৩, রাজনৈতিক চাপানউতোর

জল্পনার অবসান! ‘দায়’ স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি ছাড়লেন বরিস জনসন

‘নিঃশর্তে ক্ষমা চান দিলীপ ঘোষ’, কুরুচিকর মন্তব্যে রাজ্যপালের দ্বারস্থ তৃণমূল

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন