পুনর্বিবেচনা নয়, আইন বাতিলই একমাত্র সমাধান

0

রঞ্জিত শূর

দীর্ঘদিন ধরেই আমরা রাষ্ট্রদ্রোহ আইন বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছি। সুপ্রিম কোর্টে এই মর্মে দায়ের হয়েছে অনেক আবেদন। সেই জায়গায় এই আইনের প্রয়োগ স্থগিত রাখার নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। পক্ষান্তরে আইন পুনর্বিবেচনার জন্য একটা সুযোগ পেল কেন্দ্রীয় সরকার। ঝাড়াই-বাছাইয়ের পর তারা ফের সুপ্রিম কোর্টে যাবে। বিচারপতি তা খতিয়ে দেখবেন, ইত্যাদি। ফলে সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশে আমরা খুশি হলেও সম্পূর্ণ আশ্বস্ত নই। তারও নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।

কেন্দ্রের উদ্দেশে সুপ্রিম কোর্টের গাইডলাইনে বলা হয়েছে, যতদিন না পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হচ্ছে, ততদিন এই আইন প্রয়োগ স্থগিত থাকবে। অর্থাৎ, এই আইনে নতুন করে কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। যে মামলাগুলি চলছে, সে সব মুলতুবি থাকবে। যাঁরা ইতিমধ্যেই এই আইনে বন্দিদশা কাটাচ্ছেন, তাঁরা জামিনের আবেদন করতে পারবেন। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, আইনের পুনর্বিবেচনা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে।

কিন্তু যে দিকটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে গোটা বিশ্ব জুড়ে নিন্দিত হচ্ছিল ভারত রাষ্ট্র। রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কাউন্সিলের তরফে বেশ কিছু ঘটনায় নিন্দা করা হয়েছে। সে কারণেই হয়তো কিছুটা ভোলবদলের চেষ্টা। কিন্তু ভারত রাষ্ট্রে রয়েছে আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট বা বেআইনি কার্যকলাপ নিরোধক আইন (UAPA) এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের (NSA)-র মতো আইন। রাষ্ট্রদ্রোহ আইন যতই পুনর্বিবেচনা করা হোক না কেন, তর্কের খাতিয়ে যদি ধরে নিই, ধারা বাতিল করা হোক না কেন, ওই আইনগুলো যতদিন থাকছে, ততদিন কোনো সুরাহা মিলবে না। কারণ, রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ইউএপিএ অথবা এনএসএ।

ভয়ংকর আইন এনএসএ। কাউকে কোনো কারণ দেখাতে হয় না, গ্রেফতার করে জেলে পুরে দেওয়া যায়। কোর্টে না তুলেও বন্দি রাখা যায়। ফলে এ ধরনের আইন যতদিন থাকবে, ততদিন রাষ্ট্রদ্রোহ আইন পুনর্বিবেচনা করেও কোনো সুফল মিলবে না।

মূল যে বিষয়টা তা হল, ভারত রাষ্ট্র আসলে আপতত নিজের গায়ে একটা গণতান্ত্রিক প্রলেপ লাগাতে চাইছে। দীর্ঘদিনের দাবি আইন বাতিলের। এখন কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে বলছে রাষ্ট্রদ্রোহ আইন পুনর্বিবেচনা করতে ইচ্ছুক। পুনর্বিবেচনার পর নতুন কোন রূপে আসতে চলেছে, সেটাও যথেষ্ট সংশয়ের, উদ্বেগের।

সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, সরকারের সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে প্রত্যেক নাগরিকের। এটা সাংবিধানিক অধিকার। সেই জায়গায় রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের বলেই স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মহাত্মা গান্ধী, বাল গঙ্গাধর তিলকের মতো নেতাদের যে আইনে গ্রেফতার করা হতো, আজও একই আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে।

বাস্তবে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক। সরকারের সমালোচনা করার জন্য ইউএপিএ, এনএসএ প্রয়োগ করা হচ্ছে। সেটা হচ্ছে সরাসরি। অখিল গগৈ থেকে কাফিল খানকে এনএসএ দিয়ে বন্দি করা হয়েছিল। আবার ভারাভারা, গৌতম নওলাখা অথবা সোমা সেনের মতো সমাজকর্মী, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের ইউএপিএ-তে আটক করা হয়েছে। সরকারের সমালোচনা করার জন্য ঠিক যে ভাবে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেওয়া হয় একইভাবে এদের ইউএপিএ তে বন্দি করা হয়েছে। ইউএপিএ-তে অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হয় তিনি নির্দোষ। অন্য কোনো বিকল্প নেই। ফলে যতই গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বা মতপ্রকাশের অধিকারের কথা বলা হোক না কেন, স্বাধীনতা কোথায়?

সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের অপব্যবহার হচ্ছে বলে বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বলতেই হয়, আইনের অপপ্রয়োগ/ অপব্যবহার আবার কী! আইনটাই তো একটা অপপ্রয়োগ। ফলে এ দিনের নির্দেশ থেকে একটা কথা বলা চলে, মাঝ পথে থমকে গিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। শুধু যা এক পা এগনো গেল! আরও বহুদূর যেতে হবে।

একটা পরিসংখ্যান থেকেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যাবে। বিজেপি-র শাসনকালে যত না রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে মামলা হয়েছে, তুলনামূলক ভাবে আরও বেশি প্রয়োগ হয়েছে ইউএপিএ। ফলে সরকার যতই নিমরাজি হোক, আইন খতিয়ে দেখার প্রত্যাশী হোক নরেন্দ্র মোদী সরকার, যতদিন ইউএপিএ, এনএসএ থাকছে, ততদিন অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়

সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, রাষ্ট্রদ্রোহের বন্দিরা জামিনের আবেদন জানাতে পারবেন। তাতে কি সব বন্দিরা মুক্তি পেয়ে যাবেন? তেমনটা মোটেই নয়। অধিকাংশই পাবেন না। সমাজকর্মী হোন বা এনআরসি, সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব, অনেকের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রদ্রোহের পাশাপাশি ইউএপিএ দেওয়া হয়েছে। ফলে একটা ধারা থেকে জামিন মিললেও অন্যটা থেকে পাওয়া কঠিন। তা ছাড়া জামিন মঞ্জুরের পুরোটাই নির্ভর করছে বিচারপতির সন্তুষ্টির উপর। তিনি বন্দির নিরপরাধ হওয়ার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট হলে তবেই জামিন মঞ্জুরের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। কিন্তু সেই দায়িত্ব ক’জন বিচারপতি নেবেন!

বিচারব্যবস্থাও রাষ্ট্রব্যবস্থার অঙ্গ। কেন্দ্র-রাজ্য, যে সরকার-ই হোক না কেন, রাষ্ট্রদ্রোহ, ইউএপিএ ব্যবহার করছে। স্বাভাবিক ভাবেই গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী যাবতীয় আইন বাতিল না করলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কোনো মতেই সম্ভব নয়। রাষ্ট্রদ্রোহ আইন পুনর্বিবেচনা করলেই সব মিটে যাবে, তেমনটা নয়। প্রশ্নটা সদিচ্ছার। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকার কর্মীদেরও দায়িত্ব বেড়ে গেল। সুপ্রিম কোর্টে যেখানে থমকে গেল, সেখান থেকে আইন বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হতে হবে আরও বেশি করে। কারণ, পুনর্বিবেচনা নয়, সমস্ত কালাকানুন বাতিলই একমাত্র সমাধান।

*লেখক মানবাধিকার কর্মী। মতামত লেখকের নিজস্ব

এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন পড়ুন এখানে: পুনর্বিবেচনা চলাকালীন স্থগিত রাষ্ট্রদ্রোহ আইন, ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন