ভোলা থেকে ওড়িশা: গত ৫০ বছরে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া কিছু ভয়াল ঘূর্ণিঝড়

0
শ্রয়ণ সেন

ক্রমশ এগিয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ফণী। আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, শুক্রবার দুপুরে ওড়িশা উপকূলে আছড়ে পড়ার পর এটি এগিয়ে আসবে বাংলার দিকে। রাজ্যে আছড়ে পড়ার সময়ে এটির গতিবেগ থাকতে পারে ঘণ্টায় ১৫০ কিমির মতো।

এখন আগাম পূর্বাভাস পাওয়া যায়, প্রশাসনও তৎপর। তাই ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহ কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়তো এড়ানো সম্ভব। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের ইতিহাসে এমন অনেক ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল, যেখানে বিপুল প্রাণহানি হয়েছিল। গত ৫০ বছরের এমন কিছু ঘূর্ণিঝড়ের ইতিহাস আমরা জেনে নিই।

১৯৭০ ভোলা ঘূর্ণিঝড় – প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল এই ঘূর্ণিঝড়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম লাগোয়া ভোলা দ্বীপ অঞ্চলে আঘাত হানার সময়ে এই ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৪৪ কিলোমিটার। সমুদ্রে থাকাকালীন এর সর্বোচ্চ গতিবেগ উঠেছিল ১৮৫ কিলোমিটারে। বাংলাদেশের অভিযোগ, এই ঝড়ের ব্যাপারে আগাম কোনো সতর্কতাই দেয়নি পাকিস্তান সরকার। আর এই ঝড় চলে যাওয়ার পরও ত্রাণকাজেও সে ভাবে উদ্যোগ নেয়নি পাকিস্তান। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এই বঞ্চনাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আরও ইন্ধন জুগিয়েছিল। বিশ্বের সব থেকে ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড় হিসেবে প্রথম স্থানে রয়েছে এই ভোলা ঘূর্ণিঝড়।

১৯৭৭ অন্ধ্রপ্রদেশ ঘূর্ণিঝড় – বঙ্গোপসাগরের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াল এই ঘূর্ণিঝড়ে তছনছ হয়ে গিয়েছিল অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূল। প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত দশ হাজার মানুষ। ঘণ্টায় ১৯৫ কিলোমিটারের গতিবেগ নিয়ে উপকূলে আছড়ে পড়লেও সাগরে থাকাকালীন এই ঝড়ের গতিবেগ পৌঁছে গিয়েছিল ২৫৫ কিলোমিটারে। অর্থাৎ এই ঘূর্ণিঝড়কেও অনায়াসে সুপার সাইক্লোনের তকমা দেওয়া যেতে পারে।

১৯৯১ বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়– আরও এক ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়। এ বারও ফল ভুগল বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে এই ঝড় আছড়ে পড়ার সময়ে তার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় আড়াইশো কিলোমিটার। ফলে এটাও এক সুপার সাইক্লোন। প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন এই ঘূর্ণিঝড়ের ফলে। এই ঘূর্ণিঝড় কিন্তু আঘাত হেনেছিল এপ্রিলের শেষে।

আরও পড়ুন ফণীর ‘ছোবল’ থেকে হয়তো রক্ষা পাবে সুন্দরবন

১৯৯৯ ওড়িশা সুপার সাইক্লোন– সুপার সাইক্লোন সাম্প্রতিক ইতিহাসে ভারতে আঘাত হানা সব থেকে ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড় এই সুপার সাইক্লোন। আগাম পূর্বাভাসের ব্যবস্থা এখনকার মতো এত ভালো না হওয়ায় কিছু বুঝে উঠতে পারেননি সাধারণ মানুষ। ঝড়ের কবলে পড়ে মৃত্যু হয় ১০,৪০৫ জনের। পারাদ্বীপ উপকূলে আছড়ে পড়ার সময়ে এই ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৬০ কিমি। এই ঝড়ের পরেই আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে ওড়িশা প্রশাসন। এখন বড়ো ঘূর্ণিঝড় এলেই মানুষদের দ্রুত সরিয়ে ফেলা হচ্ছে, ফলে মানুষের মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

২০০৭ ঘূর্ণিঝড় সিডর– পশ্চিমবঙ্গেও এই ঝড়ের প্রভাব পড়েছিল, কিন্তু কার্যত তছনছ হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের একটা বড়ো অংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ ডেকে আনে এই ঘূর্ণিঝড়। হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ২৬০ কিমি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ এবং বাংলাদেশের বরিশালের মাঝখান দিয়ে উপকূল অতিক্রম করেই বাংলাদেশের মধ্যে ঢুকে যায় এই ঝড়। আগাম সতর্কতা থাকলেও, বহু মানুষের মৃত্যু হয় এই ঘূর্ণিঝড়ে। বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ এই ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হন।

২০০৮ সাইক্লোন নার্গিস- ঘটনাক্রমে বৃহস্পতিবারই ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের একাদশ বর্ষপূর্তি। এগারো বছর আগে এই দিনেই মায়ানমারে আছড়ে পড়েছিল মারাত্মক প্রবল ঘূর্ণিঝড় নার্গিস। রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসেবে এই ঘূর্ণিঝড়ের ফলে মায়ানমারে মৃত্যু হয়েছিল ৮৪ হাজার মানুষের। পাশাপাশি ৫৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন বলে খবর।

(ফণীর গতিবিধি জানার জন্য ক্লিক করুন এখানে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.