এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দক্ষিণবঙ্গ

0
বাঁধ ভেঙে এ ভাবেই জল ঢুকেছে গ্রামে।

ড. সুমন মাইতি  

দক্ষিণবঙ্গের তিনটি জেলা মিলিয়ে প্রায় দুই কোটি মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে ২১০ কিলোমিটার লম্বা উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রায় তিরিশ লক্ষ মানুষ রয়েছেন। এ ছাড়া সুন্দরবন বনাঞ্চলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্ন জড়িত। জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী অভিঘাতের দরুন দক্ষিণবঙ্গের এক বড়ো অংশের মানুষ চূড়ান্ত বিপদের সম্মুখীন। গত বছর আম্ফান, তার আগের বছর ফণী, এ বছর ইয়াস, ২০০৯-এ আয়লা – বাদা এলাকার মানুষজন সাইক্লোনের উপর্যুপরি আক্রমণে বিধ্বস্ত।

Loading videos...

সাইক্লোনের অভিঘাতে বিপর্যস্ত গ্রামের পর গ্রাম। উপকূলসন্নিহিত অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারণের স্তম্ভগুলি নিশ্চিহ্ন। লবণাক্ত জলের তোড়ে বাঁধ ভেঙে বিঘার পর বিঘা জমি প্লাবিত। মাটির অম্লতা বেড়ে শক্ত হয়ে গিয়েছে কর্ষণযোগ্য ভূমি, অম্ল-ক্ষার ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়ে মিষ্টি জলের পুকুর ব্যবহার-অযোগ্য। গবাদি পশু, মাছ, জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের খাদ্যে সুষম প্রোটিনের ঘাটতি, বিশেষ করে মহিলা এবং শিশুদের ক্ষেত্রে, তীব্র প্রভাব ফেলেছে। এখানকার অধিকাংশ মহিলা রক্তাল্পতায় ভোগেন। স্ত্রীরোগ, চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। উপযুক্ত পুষ্টির অভাবে এ অঞ্চলের শিশুদের বৃদ্ধি আশানুরূপ নয় – বিলম্বিত হচ্ছে বৌদ্ধিক বিকাশ, দৈহিক বৃদ্ধিও ব্যাহতপ্রায়। দূষিতজলবাহিত আমাশা, টাইফয়েড,  বিষক্রিয়াজনিত অসুস্থতার প্রকোপ সাইক্লোনের পর ঊর্ধ্বগামী। বছর বছর বন্যায় ইটের রাস্তাগুলো ভেঙে যাওয়ায় পরিবহণব্যবস্থা বিপর্যস্ত। ফলশ্রুতি হিসেবে নষ্ট কর্মদিবস, উৎপাদনশীলতায় ঘাটতি, মানবোন্নয়নের নিরিখে এখানকার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো বহুবিধ সামাজিক সমস্যার শিকার। পরোক্ষ ভাবে গার্হস্থ্য হিংসা, হিউম্যান ট্র্যাফিকিং এখানকার দৈনন্দিন সমস্যা।  

সাইক্লোনের কারণে সামাজিক মূলধনের ক্ষয় সীমাহীন। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলির পুরুষদের এবং অনেক সময় মহিলাদেরও কর্মোপলক্ষ্যে গ্রামের বাইরে যেতে হয়। ফলে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো বা শিশুদের সাহচর্য দেওয়া – একটি সাধারণ পরিবারে যেগুলি স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়, সেগুলি অনুপস্থিত। এ ছাড়া নিরন্তর ভিটে হারানো, উপার্জন হারানোর আশঙ্কা, পারিবারিক ভাঙন – এ ধরনের বহু মানসিক সমস্যায় ভোগেন এখানকার বাসিন্দারা। বিশেষ করে শিশু এবং কিশোরদের মধ্যে এর প্রভাব পড়ে মারাত্বক। 

প্লাবিত গ্রাম।

এ ছাড়া প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের স্কুলগুলোয় পড়াশোনার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার কারণে প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। স্থানীয় নারী এবং শিশুদের অসহায়তার সু্যোগ কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক নারীপাচার চক্র এই অঞ্চলে সক্রিয়। বহু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী অনটনের হাত থেকে বাঁচতে এক রকম আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন অনেকে।

সুন্দরবনের বাদা অঞ্চল অনেকগুলি লট-এ বিভক্ত (স্থানীয়দের উচ্চারণ অপভ্রংশে ‘লাট’)। এগুলির প্রায় অর্ধেকের বেশি ব-দ্বীপ নদীবাঁধ দিয়ে ঘেরা – নেদারল্যান্ডের ডাইকের মতো এখানে পার্শ্ববর্তী নদীখাতের তুলনায় উচ্চতা কম থাকায় জোয়ারের জলে এই অঞ্চলগুলি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা ষোলো আনা।  স্বাধীনতার পর পূর্ববঙ্গের প্রচুর ছিন্নমূল পরিবার এবং মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত শ্রমজীবী দরিদ্র ভূমিহীন পরিবারগুলি লাট অঞ্চলের জঙ্গল সাফ করে বসতিযোগ্য আবাদ গড়ে তোলে। কিন্ত ক্রমবর্ধমান জলস্তর এবং আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা জীবিকার অনিশ্চয়তা বহু গুণে বাড়িয়ে তুলেছে। এখানকার বহু মানুষ জীবিকার সন্ধানে দেশান্তরী হচ্ছেন।

২০০৯-এ আয়লা এবং তার পরে সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়গুলির (ফণী, আম্ফান, ইয়াস) অভিঘাতে মোট আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইতিমধ্যেই দু’ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া বন্যার ফলে বাস্তচ্যুত মানুষের সংখ্যা এবং কোভিডের কারণে কর্মহীন অভিবাসী শ্রমিকদের ধরলে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অভিঘাত আরও মর্মান্তিক হতে চলেছে।

যে দিকে দু’ চোখ যায়, শুধু জল।

আইপিসিসি (IPCC, Intergovernmental Panel on Climate Change) রিপোর্টের তথ্যানুযায়ী, বাংলার বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহ জলস্তর বৃদ্ধি এবং উত্তরোত্তর তীব্র থেকে তীব্রতর সাইক্লোন ঝঞ্ঝাবাতের কবলে পড়বে। এর সঙ্গে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ক্রমহ্রাসমান ঘনত্ব এবং নিরুপায় মানুষের জীবিকার তাগিদ। এই সব কারণ একত্র করলে বলা যায়, বাংলার সামনে তারস্বরে বাজছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদসূচক ঘণ্টা।

জলবায়ুজনিত কারণে ছিন্নমূল মানুষের সমস্যা এমনিতেই বহুবিধ। তার ওপর বিশ্বের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা। এবং কোভিড-উত্তর ভারতবর্ষের অর্থনীতিতে বহু বিধিনিষেধ আরোপিত, ফলে অভিবাসী শ্রমিকদের একটি বড়ো অংশ ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। সামগ্রিক ভাবে অর্থনীতির উন্নয়ন না ঘটলে, এঁদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা আসতে বাধ্য। জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে যে সব মানুষ ভিটেছাড়া হচ্ছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে তাঁদের সহজে আশ্রয় মিলবে না। সিরীয় শরণার্থীদের নিয়ে উন্নত বিশ্বের টানাপোড়েন আমাদের পরোক্ষে বুঝিয়ে দিয়েছে বিশ্ব বহিরাগতদের জন্য দরজা বন্ধ রাখারই পক্ষপাতী। সে ক্ষেত্রে শরণার্থী সমস্যার সমাধান স্থানীয় স্তরেই করতে হবে।

আপাতত এই সাইক্লোন কলকাতাবাসীদের জন্য একটি বাৎসরিক দুর্বিবাক –অধিকাংশ ক্ষেত্রে টানা লোডশেডিং আর কয়েক ঘণ্টার জমা জলে বীতশ্রদ্ধ  নাগরিক সমাজ তীক্ষ শ্লেষ-ক্ষোভ-প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কিন্ত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে নগর কলকাতাও সুরক্ষিত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দক্ষিণবাংলার গ্রামগুলো থেকে হাজার হাজার দেশান্তরী পরিবার উপায়ান্তর না পেয়ে কলকাতা এবং শহরতলিতেই উপনীত হবেন। জলবায়ুর যত পরিবর্তন হবে এই মহানিষ্ক্রমণ ক্রমশ বাড়বে।  সেটা গোটা পশ্চিমবঙ্গের জন্য অশনি সংকেত বয়ে আনছে। এটা কি আমরা বুঝছি?

হয়তো কোনো একদিন এই দুর্যোগ থেকে আমরা শিক্ষা নেব যেখানে স্বজনপোষণ, ধর্মীয় হানাহানি, দলীয় রাজনীতির বাইরে পরিবেশ সংরক্ষণ, বাস্তুতন্ত্রের সমতা, সুষম উন্নয়ন, এ বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে, এগুলো নিয়েও বিতর্ক হবে। অথবা বহু বছর পরে আমাদের নতুন করে লিখতে হবে হারিয়ে যাওয়া বসতভূমির ইতিহাস।

(লেখক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারক্যানস্যাস প্রদেশের রাজধানী লিটল্‌ রকের কলেজ অব পাবলিক হেলথ্‌-এ এপিডেমিওলজিস্ট। আদতে দক্ষিণবঙ্গের বাসিন্দা, পাথরপ্রতিমা এবং সংলগ্ন এলাকায় ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সংযোগ রয়েছে।)

আরও পড়ুন: Cyclone Yaas: সুন্দরবনে মানুষের জীবন বাঁচলেও বাঁচল না জীবিকা      

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন