রবিবারের পড়া: আঁধারে ফেরা

0
total darkness
নিকষ আঁধার।
বিদ্যুৎ দে

আঁধার ভয়ের আধার। জেনে এসেছি সেই বাল্যকাল থেকে। কিন্তু নিকষ কালো যে এত ভালো লাগতে পারে, তা অনুভব হল এই ভ্রমণে। ভ্রমণ প্যাকেজের বিজ্ঞাপনে ছিল একটা অশ্রুতপূর্ব আহ্বান। সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মন বলছিল এ বুঝি-বা বিজ্ঞাপনী ফাঁদ। নেটের দৌলতে আর মিডিয়ার কাণ্ডকারখানায় অভ্যস্ত অন্তর আজকাল আর বিস্মিত হয় না সহজে। বিশ্বাসও দুর্লভ হয়ে উঠছে। তবুও ধরা দিয়েই দেখি।

প্যাকেজের শেষ সন্ধে। রাতের আহারপর্ব শুরু হতে ঘণ্টা দুই বাকি। এই আড়াই দিনে ঝরনা পলাশ পাহাড় হ্রদ হস্তশিল্প সাঁওতালিগ্রাম, এ সব অনেক ঘুরেছি। মন চাঙ্গা, কিন্তু দেহ ক্লান্ত। সাদা বিছানায় উঁচু বালিশে মাথা তুলে প্লাজমা মনিটরে চ্যানেল হাতড়াচ্ছি। ভয়েস সিস্টেমে ভেসে এল ভাষ্য – “অন্ধকারের সঙ্গ পেতে প্রস্তুত থাকুন”। টিকটিক শব্দ ক্ষীণতর হতে হতে থেমে গেল। এক এক করে নিভে যেতে থাকল সমস্ত আলো। ভাষ্যের নির্দেশে ঘর থেকে বাইরে। বাউন্ডারির আলো নিভে যেতেই অরণ্য আর এই অতিথিআবাস মিলে মিশে একাকার। বাগানের ফ্লোরলাইট নিভে যেতেই কালচে ঘন নীলাকাশে জ্বলে উঠল কোটি কোটি নক্ষত্র গ্রহ, মুহূর্তে ইহজগত থেকে আমি যেন মহাজাগতিক যাত্রী।

অমাবস্যার রাতে এই বিশেষ প্যাকেজ যে শুধু ক্রেতা ধরার কৌশল নয়, এই বিশ্বাসটা দানা বাঁধছে। মনের ডানাটাও রানওয়ে ধরে দৌড়োতে প্রস্তুত। দেখি অরণ্যমুখী ছোটো গেটে দুলছে একটি লন্ঠন। চারকোনা কাঁচে ঘেরা কেরোসিনের সলতে দেওয়া কুপি। যেন গুম্ফার মিনিয়েচার। এক টানে যেন পঞ্চাশ বছর পিছনে। ছোট্ট আলোর বৃত্তে খেটো ধুতির প্রান্তে দুটি তেল চকচকে কালো পা আর একটি বাঁশের লাঠি। সেই পদক্ষেপের অনুসারী এই কালহান অরণ্যনিবাসের প্রায় সবাই। পাথুরে পথ বেয়ে শীর্ণ নালা পেরিয়ে মাটি রঙের আলোটা অরণ্যে হারিয়ে গেল। নিকষ অন্ধকারে ডুবে গেল চরাচর। পাথুরে চাট্টান আর তিরতিরে জলধারা তারার আলোটুকু শুষে নিয়ে ফ্লুরোসেন্টের মতো স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে। অবাক লাগে, দিনের প্রখরতায় যে ভূপ্রকৃতিকে রুক্ষ বলে অবহেলা করেছিলাম সেটাই এত সুন্দর হয়ে উঠল? আঁধারের জাদুখেলা। আশ্চর্য হতে ভুলে যাওয়া অন্তরাত্মাটা যেন জেগে উঠছে আবার।  

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: মকবরা… সাদত আলী খান এবং মুশিরজাদী মকবরা / শেষ পর্ব

চারপাশে শালপ্রাংশু স্তম্ভেরা দঁড়িয়ে, যেন অতিকায় আদিম মানবমানবীর উন্মুক্ত জঙ্ঘা। তার অন্তরালে আরও কত লতাপাতা শাখাপ্রশাখা জীবজন্তু। এ সব চোখে না ভেসে এলেও মনে ভেসে ওঠে সঞ্জীবচন্দ্রর ‘পালামৌ’ বর্ণনার কথা – “আমি পাত্র দেখিয়া ভুলি না, দেহ দেখিয়া ভুলি না, ভুলি কেমন রূপে। সে লতার থাক বা যুবতীর থাক, আমার মানবচক্ষে তাহার কোনো প্রভেদ দেখি না”।

পথ ভুল না হওয়ার জন্যে পাথরের গায়ের সাদা তীরচিহ্নই চলার দিশা। পথের ওপর ঝরাপাতা। প্রতি পদক্ষেপে মৃতের আর্তনাদ। কোলাহলে অভ্যস্ত উৎসবমুখর এতগুলো মানুষ এখন নৈঃশব্দ্যের উৎসবে শামিল। নিজ নিশ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ কি শুনেছি কোনো দিন? আজ মনে হচ্ছে এই নীরব মিছিল যেন এক কনসার্ট পার্টি। এই অর্কেস্ট্রা যেন পালকের মতো নরম। শিহরণ বিস্ময় মিলেমিশে এক অনাস্বাদিত অনুভব।

এমন অন্ধকারে নিজের হাতের তালুটাও দেখা যাচ্ছে না। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের যেতে যেতে কবিতার ‘আমি থেকেও নেই আবার না থেকেও আছি’ -র মতো।

আমরা জানি না যে দিন থাকব না, মানে এ প্রাণের দীপ নিভে গেলে কী হবে আমাদের? কেউ বলে আত্মা ভেসে বেড়ায়। কেউ বলে চিতার ধোঁয়ার সাথে মিশে যাই মহাশূন্যে। কেউ বলে পাড়ি দিই অনন্তের পথে। ব্রহ্মজ্ঞানীরা বলেন, ‘ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা’। এমন নিকষের গভীরে অবগাহন করতে করতে মনে হচ্ছে পৃথিবীটা স্বপ্নের মতো মিথ্যে। কল্পনা দিয়ে সাজানো তাসের প্রাসাদের মতো।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া: মকবরা… সাদত আলী খান এবং মুশিরজাদী মকবরা / প্রথম পর্ব

মরুভূমির মধ্যে যেমন মরূদ্যান? তেমনই অরণ্যের মধ্যে এক মুক্ত উদ্যান। সুবিধেমতো পাথরের ঢিবিতে থিতু হলাম। পাতার ব্যথাতুর কন্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে এল। অর্থাৎ আর সবাই থিতু হয়েছেন। শ্রবণ আরও প্রখর হয়ে উঠল। কোথায় কত দূরে কটা পাতা খসে ভূমিতে থিতু হল, ফাগুনের হাওয়া কোন চোরাস্রোতে বয়ে গেল, যেন সব দেখতে পাচ্ছি। দৃষ্টিহীনেরাও যে দেখতে পান কেমন করে জানা হয়ে যাচ্ছে।

আলোতে যা দেখি তার এক সীমাবদ্ধতা আছে। তার দৌড় যদ্দুর, তদ্দুরই দেখার সীমানা। কিন্তু অন্ধকারের তো কোনো সীমানা নেই। এই আমা হতে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তার বিস্তৃতি। যদিও ব্রহ্মাণ্ড অনন্তে বিলীন। অনন্তের কি সীমানা হয় নাকি? তাই মনে হচ্ছে  আঁধারই প্রকৃত মুক্তির ঠিকানা। স্বাধীনতার হদিশ।  

হঠাৎ একটা সড়সড় আওয়াজ। যেন কোনো সরীসৃপের চলন। এ দিকেই এগিয়ে আসছে যে। সেফটি ইন্সটিংক্ট থেকে পা তুলে বসি। হাসি পায়। প্রাণটা অনন্তে মেশার যোগ্য হয়নি যে, এ তারই প্রমাণ। তো সে সরীসৃপটা যে এই পাথরেই এসে মাথা ঠুকছে এখন। ভয় নাকি বিস্ময়! বিস্ময় নাকি কৌতূহল? নিরসনের জন্য আলো যন্ত্রটি তো সঙ্গে নেই। আনা বারণ ছিল কর্তৃপক্ষের। তাদের আশ্বাসে বিশ্বাস রেখে সর্বনাশের কিছু ঘটল না। আসলে ওটা ছিল চোঙাকৃতি শুকনো পাতার সরণ।

কিন্তু একটি সর্বনাশ ঘটে গেল। এতক্ষণ যে ছায়াসঙ্গী-সময়টা আমায় ছেড়ে ছুটি নিয়েছিল, সে ফিরে এসে ক্যাক করে গলায় টাইয়ের ফাঁস ধরে দিল টান। কখন? যখন ওই লন্ঠনটা জ্বলে উঠল আবার। আর হাতে হাতে এল কফির মগ আর চিকেন পকৌড়া। অরণ্যে জ্বলে উঠল ক্যাম্পফায়ার। এতে আবার সর্বনাশের কী আছে ভায়া?

এ আলো যে অসহনীয় লাগছে আমার। মনের রসায়নে কী এক বিক্রিয়া ঘটে গেল যে। মহাজাগতিক অনুভব থেকে ভোগের ধরায় যেন আছড়ে পড়ছি কক্ষচ্যুত নক্ষত্রের মতো। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার মানেটাই যেন উলটে গেছে এই এক ঘণ্টার অন্ধকারের অভিঘাতে।

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here