অযোধ্যা মামলা: ভারতীয় অর্থনীতিতে বড়োসড়ো প্রভাব ফেলতে পারে সুপ্রিম কোর্টের রায়

0
ram temple
প্রতীকী ছবি: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সৌজন্যে

পিঁয়াজের দাম আশি! মন্দির-মসজিদ নিয়ে ভারতবাসী আর কত রক্তপাত দেখবে? ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে কিছুটা দম ফেরাতে পারে অযোধ্যাও। কী ভাবে? লিখছেন জয়ন্ত মণ্ডল

কিছুক্ষণের জন্য যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল অযোধ্যা। ঝাঁপ পড়েছিল দোকানপাটের। কড়া নিরাপত্তায় থমকে গিয়েছিল জনজীবন। ফের তা সচল। আশঙ্কা ছিল রাজধানী নিয়েও। কিন্তু স্পর্শকাতর হিসাবে পরিচিত থেকে স্বল্প-পরিচিত এলাকাতেও নেই তেমন কোনো জটলা-জটিলতা। অন্য দিকে রাজনৈতিক দল থেকে বিদ্বজ্জনদের মুখ থেকে শুধুই মেপে পা ফেলা মন্তব্য। সাবধানী বিরোধীপক্ষ। সংযমী শাসকদল। এ ভাবেই কেটে গিয়েছে শনিবারের সকাল থেকে সন্ধে। সুপ্রিম কোর্টে অযোধ্যার বিতর্কিত জমি বিরোধের রায় ঘোষণার পর ঘটেনি তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা। তার মানে কি সুপ্রিম কোর্টের রায় এক মনে মেনে নিয়েছে গোটা দেশ?

মোটেই না! রায় ঘোষণার পর উত্তরপ্রদেশ সুন্নি কেন্দ্রীয় ওয়াকফ বোর্ড সায় জানালেও কিছুক্ষণ পরেই তারাও পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে বলে জানায়। বিকেলে জানায়, রিভিউয়ের আবেদনে তারা নেই। কিন্তু এআইএমআইএম প্রধান তথা সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়েইসি সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে তীব্র বিষোদ্গার করেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমি হিন্দুদের হাতে দিয়ে বিকল্প মসজিদ গড়ার জন্য মুসলমানদের অন্যত্র পাঁচ একর জমি দেওয়ার কথা জানান। ওয়েইসি সরাসরি সেই ‘উপহার’ প্রত্যাহারের আওয়াজ তুলে জানান, মুসলমানদের উচিত ওই জমি না নেওয়া। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের (যে দিন বাবরি মসজিদ ভেঙে দেন করসেবকরা) পর থেকে প্রতি বছর দিনটিকে সম্প্রীতি দিবস হিসাবে পালন করে আসা সিপিএম রায়কে প্রচ্ছন্ন স্বাগত জানালেও তার নেপথ্যে থাকা যুক্তিগুলি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তা হলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দাবি কতটা সত্য?

রায় ঘোষণার দিন প্রধানমন্ত্রী সান্ধ্য ভাষণে বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট সব পক্ষের মতই গুরুত্ব সহকারে শুনেছে। পুরো দেশ জানে রায় সর্বসম্মতিতে এসেছে। পরিবারেও ছোট‌ো ছোটো সমস্যা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ দশকের সমস্যার সমাধান সুপ্রিম কোর্ট সুদক্ষতার মধ্যে দিয়ে করেছে। আমাদের বিচারব্যবস্থা আজ এই বিশেষ কারণেই অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য।”

কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সব পক্ষের মত শুনলেও রায় তো গিয়েছে এক পক্ষের দিকেই? বোকার মতো প্রশ্ন- যে কোনো মামলায় রায় এক পক্ষের দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে, এটাই বাস্তব। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এক দিকে বলছে, এএসআই বলেছে, ফাঁকা জমিতে মসজিদ তৈরি হয়নি। সেখানে আগে থেকেই পুরোনো কাঠামো ছিল। আবার অন্য দিকে এএসআই বলছে, ওই পুরোনো কাঠামো যে মন্দিরেরই ছিল, সে সম্পর্কে নিশ্চিত নয় তারা। তা হলে কী করে ওই জমি হিন্দুদের হাতে দেওয়া হল?

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট নিজেই বলেছে, ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে ওই সেখানে নমাজ পড়া হত। সেই সূত্রেই উঠে এসেছে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের সহযোগী মির বাকির নাম। কিন্ত ১৯৪৯ সালে ওই মসজিদে রামের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৯২ সালে মসজিদ ধ্বংসকে সুপ্রিম কোর্ট বেআইনি আখ্যা দিয়েছে। ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট কোনো মন্তব্য করল না কেন? ভারতের ভূতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র সম্ভবত ১৫২৮-এর পিছনে যেতে পারছে না বা পারেনি। এক দিকে যখন রামায়ণের মতো করে সরযূ নদীর তীরে রামচন্দ্রের জন্মের তত্ত্ব মেনে নেওয়া হচ্ছে, অন্য দিকে মাত্র চারশো বছরের পিছনের ইতিহাস খুঁজতে ব্যর্থতা কেন?

আপাতত প্রশ্নের পালায় দাঁড়ি পড়ুক। রায় ঘোষণার দিন কোচি থেকে আপত্তিকর ফেসবুক পোস্টের জন্য মাত্র দু’ জনকে গ্রেফতার করা হলেও তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটেনি। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের পর থেকে ঘটে চলা রক্তপাত বন্ধ হোক, অযোধ্যার শান্তি চাই, গোটা ভারতের সম্প্রীতি চাই- এমনটাই বলছেন রাজনীতিকদের একটা বড়ো অংশ। আর বাজারে গিয়ে ২৪ টাকা কেজি দরে আলু এবং ৮০ টাকা প্রতি কেজি পিঁয়াজ কেনা ছাপোষা মানুষ বলছে, ভাবার সময় নেই। এমনিতেই কোথাও মাত্রাতিরিক্ত দূষণ অথবা কোথাও ঘূর্ণিঝড় বুলবুল নিয়ে সাময়িক ভাবে চরম আশঙ্কায় দেশের বৃহত্তম অংশের মানুষ। তার উপর মন্দির না মসজিদ – এমন প্রশ্নে চায়ের কাপে তুফান তোলার অবসর নেই অনেকের। অযোধ্যা নিয়ে করে খাওয়া কারবারিরা সামনের দিনগুলোতে হয়তো নিত্যনতুন তত্ত্ব আউড়াবেন। কিন্তু অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং বাজার বিশ্লেষকরা কী বলছেন, এক নজরে দেখে নেওয়া যাক-

  • এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো বিরোধের অবসান ঘটিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের প্রভাব অর্থনীতির জন্য এবং সাধারণ ভাবে বাজারের পক্ষে ভালো হবে। কারণ, এটি দেশের রাজনীতি ও নীতি নিয়ে একটি বড়ো অনিশ্চয়তা দূর করেছে।
  • এই রায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করবে। শেয়ার বাজার অবশ্যই এই রায়কে খুব ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করবে। দেশকে সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার সুবিধার্থে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা আমাদের দেশের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রচুর আস্থা তৈরি করবে।
  • ভারতীয় অর্থনীতিতে বড়োসড়ো ভূমিকা পালন করে উত্তরপ্রদেশ। ভারতকে ৫ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছোতে হলে উত্তরপ্রদেশের সহযোগী অংশীদারিত্ব থাকতে হবে ১ লক্ষ কোটি ডলার।
  • সুপ্রিম কোর্ট মন্দির ও মসজিদ নির্মাণ যখন নিশ্চিত করেছে তখন পর্যটন ব্যবসা নতুন ভোরের জন্য অপেক্ষা করছে। আশা করা যায়, এর পরে ৫০ লক্ষ থেকে এক কোটি বাড়তি পর্যটক ভিড় জমাতে পারেন উত্তরপ্রদেশে। সব মিলিয়ে উত্তরপ্রদেশের পর্যটন ব্যবসার সুদিন আসতে চলেছে।

শেষের মন্তব্যটা কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের। সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার পর বিজয়ন সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, “রায় এমন একটি বিষয়ে দেওয়া হয়েছে, যা অতীতে এ দেশে প্রচুর রক্তপাতের ঘটনা ঘটিয়েছে। আদালত নিশ্চিত করেছে, রাম মূর্তি স্থাপন এবং বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা দু’টোই বেআইনি ছিল। এই রায়ের মাধ্যমে ওই জমির বিবাদ সম্পর্কিত আইনি বিষয়গুলি একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। শীর্ষ আদালতের আদেশের প্রতিক্রিয়াতে সংযম দেখানোর আবেদন জানাচ্ছি।”

বাকিটা আমার-আপনার হাতেই!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.