রায়ে রাম, তবু বিধি বাম, রামরথ আর আডবাণীকে ঢেকে রাখলেন মোদী

0
রথে সওয়ার আডবাণী।

দেবারুণ রায়

হরিয়ানা আর মহারাষ্ট্রের ভোটের ফলের পর মোদী ও শাহ আলাদা আলাদা ভাবে যে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন তাতে ওই দুই রাজ্যের মানুষ তো বটেই, তাঁদের দলের রাজ্যনেতারাও হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ দুই রাজ্যেই বেশ কিছু আসন কমে যাওয়াকে আর যা-ই হোক নিশ্চয়ই ‘অভূতপূর্ব জয়’ বলা যায় না। কিন্তু দলের লোকেরা বা জনসাধারণ জানেন না, বাণিজ্যে, মানে বিক্রিবাটায় এই বুদ্ধিটা জরুরি। মার্কেটিংয়ের তত্ত্বে প্রকাশ্যে হার স্বীকার করতে নেই।

আরও পড়ুন: করসেবকদের ঘিরে সশস্ত্র পুলিশদের নাচ, ৩০ বছর আগের সেই ছবি আজও অম্লান

এ তত্ত্ব রাজনীতিতেও লাগে। কিন্তু যেখানে সেখানে প্রয়োগ করলে হিতে বিপরীত হয়। শেষ পর্যন্ত মহারাষ্ট্রে তা-ই হল। অভূতপূর্ব জয়ের ধমকে সরকার গড়তেই বিজেপির ঘাম ছুটে যাচ্ছে। ভুল একটা থেকে আরেকটা ঘটে চলেছে। সব চেয়ে পুরোনো বন্ধু শিবসেনাও চোখ রাঙাচ্ছে। যার-তার কিল খেয়েও কিল হজম করতে হচ্ছে। বিজেপির এই দশা অনেক দিন হয়নি। তাই এ বার একটু বুঝে শুনে পা ফেলার পালা। এই কাহনটুকু না শোনালে আসল কাহিনির  অর্থ বোধগম্য হবে না। আর সেই কাহিনি যখন রামকাহিনি।

“সৌগন্ধ রাম কা খাতে হেঁ/মন্দির ওঁহি বনায়েঙ্গে” – আডবাণী, গোবিন্দাচার্য প্রণীত এবং কল্যাণ সিং অভিনীত অযোধ্যা-পালার মঞ্চায়ন সেই ‘৮৯-তে। প্রথম অঙ্কেই যে সব ডায়লগ লোক টানছিল তার মধ্যে এটাই প্রথম বাজারে ছেড়েছিলেন অযোধ্যা আন্দোলনের মূল মহন্ত পালমপুর প্রস্তাবের পুরোধা মাননীয় লালকৃষ্ণ আডবাণী। সোমনাথ থেকে অযোধ্যাগামী রামরথের চাকা হিন্দি বলয় স্পর্শ করতেই তিনি রথে দাঁড়িয়ে তরুণ তুর্কি রথসারথী প্রমোদ মহাজনকে তাক লাগিয়ে নব্য যুবার মতো স্লোগান দিতে থাকেন। এটাই ছিল সেই স্লোগান গুচ্ছের প্রথম তির। টেম্পো তুলছিলেন তিনি। আর দোয়ার ধরছিল দঙ্গল। পালটা আসছিল আওয়াজ: বাচ্চা বাচ্চা রাম কা/জন্মভূমি কা কাম কা। এটাও তোতাকাহিনি। কিন্তু নেতার ডায়লগ নয়।

সুতরাং আজ আইনের এত ঘাট ঘুরে মহাভারতের মূল মহাকাব্যের মহানায়কের জন্ম যখন সিদ্ধ হল মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ে, তখন হারজিতের হিসেব করলে অবশ্যই হিরো হলেন হিন্দুত্ববাদীদের পয়লা কূলতিলক আডবাণী। তখন, সেই আশি নব্বইয়ের দশকে তো মোদীশাহীর নাম-নিশান ছিল না। গুজরাতের যে কত্তারা দলের পুরোভাগে ছিলেন তাঁরাও তখন আদার ব্যাপারী। জাহাজের খবরই পাননি। সুতরাং বেল পাকলে কাকের কী? আদালতের রায়ে রামমন্দিরের যুক্তি স্বীকৃতি পেলে বিজেপির আডবাণী-বিরোধীদের কী? তাই উদার হতে অসুবিধে কোথায়? সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোনোর পর আডবাণীর প্রতিক্রিয়া যতক্ষণে এল ততক্ষণে ভক্ত চ্যানেলে মোদীর বাণী উচ্চকিত। মোদী বলছেন, ভাইয়োঁ আর বহনোঁ, ইয়ে হারজিত কি সওয়াল নহি। কে হারল কে জিতল সেটা প্রশ্ন নয়। রামভক্তি বা রহিমভক্তির চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হল ভারতভক্তি। সেটাই এই মুহূর্তে সব চাইতে দরকার। সর্বোচ্চ আদালত যে নিষ্পত্তিতে পৌঁছেছেন, আপামর ভারতবাসীর তাকে সম্মান জানানো উচিত।

পাশে রয়েছেন মোদী।

বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই সিদ্ধান্ত হয়েছে সর্বসম্মতিক্রমে। কোনো মাননীয় বিচারপতি ভিন্নমত পোষণ করেননি। এবং বিজেপির মহানায়ক মোদী যা বললেন কার্যত তার মাধ্যমেই টেনে দেওয়া অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখার মধ্যে আটকে থাকলেন পারিষদরা। ওঁর চেয়ে অবশ্যই বেশি জোরালো বক্তব্য পেশ করার অধিকারী হয়েও কোনো চ্যানেলে দেখা গেল না লালকৃষ্ণ আডবাণীকে। ছোট্ট একটা বিবৃতি দিয়েই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হল তাঁকে। তাঁর দলের নেতৃত্বও স্বীকার করল না দলের দ্বিতীয় পুরুষ ও সংগঠনে প্রথম পুরুষ আডবাণীর দূরদৃষ্টির কথা। উচ্চারিত হল না মুরলীমনোহর যোশী ও উমা ভারতীর নাম। অথচ কে বলবে, বাবরি ধ্বংসের পরেও বিজেপির ভক্তদের স্লোগান ছিল, বিজেপি কা তিন ধরোহর/অটল, আডবাণী, মুরলীমনোহর।

অটল ছিলেন রামরাজনীতিতে উদাসীন, কিন্তু যথা সময়ে সরকারের সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন। সংঘের স্বয়ংসেবক এবং গুরুদক্ষিণায় দায়বদ্ধ হয়েও তিনি রামরথের প্রস্তাবিত রথী হতে আপত্তি করেছিলেন। কঠোর বক্রোক্তির সঙ্গে প্রশ্ন ছুড়েছিলেন, পলিটিক্যাল পার্টি হ্যায় ইয়া নৌটংকি? বাধ্য হয়ে নেতা পালটাতে হয় সংঘকে। রথের কথা শুনেই একপায়ে খাড়া হয়ে যান আডবাণী। এবং স্বপ্নেও এ কথা ভাবেন না যে এই রামমন্দিরই হবে তাঁর নষ্টনীড়। কিন্তু নিজের এপিটাফ আর কে স্বেচ্ছায় লেখে? তবু সব জেনে বুঝেও অটলের মতো উদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে পাকিস্তানে কায়দে আজম জিন্নাহর মাজারে নিয়ে গিয়ে আনত করেছিল। দল ও সংঘকে এ জন্য দেওয়া ব্যাখ্যাও কার্যত গিলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন আডবাণী। বিজেপির কট্টরপন্থী লাইনের প্রবক্তা ও মন্দির-মসজিদ বিতর্ককে সম্মুখসমরের ইস্যুতে পরিণত করার পথপ্রদর্শককে অবশেষে ডাম্প করাই হল।

আডবাণী বিজেপিতে সনাতনী অ্যাজেন্ডা হাতে নিয়ে বাঘের পিঠে উঠেছিলেন একচ্ছত্র হওয়ার নেশায়। এ বার যখন ইতিহাসের পাতায় বাঁচার আকাঙ্ক্ষায় বাঘের পিঠ থেকে নামতে চাইলেন, তখনই বাঘ তাঁকে গপ করে গিলে নিল। গান্ধীনগর ছেড়ে নির্বাচনে ইতি টেনে রাজনৈতিক সন্ন্যাস নিতে হল লৌহপুরুষ ও একদা ছোটে সর্দার আডবাণীকে, যিনি বিজেপির ও আজকের প্রধানমন্ত্রীর মেন্টর।

আরও পড়ুন: অযোধ্যা মামলা: ভারতীয় অর্থনীতিতে বড়োসড়ো প্রভাব ফেলতে পারে সুপ্রিম কোর্টের রায়

এ দিকে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আতসকাচ রাখতেই ভেসে উঠল এএসআই রিপোর্টের মোদ্দা প্রশ্নটি। ২০০৩-এ অটল-জমানায় আডবাণী যখন উপ-প্রধানমন্ত্রী সেই সময়েই রিপোর্টটি আলোয় এসেছিল, যাতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মূল আস্থায় সায় রয়েছে। কিন্তু অনেক দূর টেনে এনেও ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ হাল ছেড়ে দিয়েছে। ৪৭০ বছর আগে মীর বাকির গড়া মসজিদটি ফাঁকা জমিতে গড়ে ওঠেনি। কারণ মন্দিরের নীচে রাম চবুতরার চৌহদ্দির পর দশ ফুট ছেড়ে জমি খুঁড়ে যে ইমারত পাওয়া গিয়েছে তার নির্মাণশৈলী ইসলামী নয়। এটুকু পর্যন্ত এএসআই যা বলছে তা সংঘ-বিজেপির দাবির সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু প্রশ্ন ছেড়ে যায় এএসআই তার পরের কথাটিতেই। বলে না ওই ইমারতটিকে কি নির্দিষ্ট ভাবে হিন্দুমন্দির বলা যায়? না এএসআই তা খোলসা করেনি। বুঝিয়ে দিয়েছে, ও কথা বলার মতো তথ্যপ্রমাণ‌ তাদের হাতে নেই।

তাই যথেষ্ট ঝুঁকি নিয়ে সত্যানুসন্ধানে ব্রতী প্রধান বিচারপতির  বেঞ্চ বিপরীতপক্ষ অর্থাৎ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের পালটা দাবির সারবত্তা বিবেচনা করেন। দেখা যায় তারা বিতর্কিত ইমারতকে মসজিদ বলে দাবি করলেও হিন্দুমন্দির দাবির যুক্তিগুলি খারিজ করার মতো জোরালো তথ্য পেশ করতে পারেনি। এবং আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয় জোরালো ভাবে উঠে এলেও আদালত কিন্তু সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ও ভবিষ্যতের জন্য নজির রাখার ক্ষেত্রে সতর্ক থেকেছে। বিগ্রহের আইনি সত্তার জমির অধিকার স্বীকার করলেও কোনো হিন্দু সংগঠনকে জমি দেওয়ার কথা বলেনি। বরং ইমারত ধ্বংসকে ফৌজদারি অপরাধ বলে চিহ্নিত করার দাবি নস্যাৎ করেনি। বলেছে, ১৯৯২-এর ডিসেম্বরে ইমারত ভাঙা এবং ১৯৪৯-এর ডিসেম্বরে মসজিদে বিগ্রহ রাখা বেআইনি।

স্বভাবতই জমির মালিকানা মামলার নিষ্পত্তির পর বাবরি ধ্বংসের মামলারও কিনারা হবে শিগগিরই। এবং সে দিন আডবাণী, জোশী, উমা ভারতীকে কোনো মতেই পাদপ্রদীপের আলোকবৃত্ত থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে না। সব শেষে বলতেই হয়, রামায়ণ যতই শাখাপ্রশাখা ছড়াক ভারতের পাকায়ন (Pakistanization) যে কখনোই সম্ভব নয় তা আরও একবার প্রমাণিত অযোধ্যার রামধাক্কার শেষ পর্বে। ৭২ বছর ধরে যে রিপাবলিকের আত্মায় জাতির জনকের রামরাজ্যের স্বপ্ন লালিত, যার বুকে বেঁধা উগ্র সাম্প্রদায়িক গুলি ভারতের সংবিধানের বিধি ও বিধানকে পথ দেখিয়েছে, পতাকায় গৈরিক সবুজের মাঝে শান্তির বুকে এঁকে রেখেছে ন্যায়চক্র, প্রয়াগতীর্থে গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতির সঙ্গমের ভাষা হিন্দুস্তানিকে হৃদয়ে রেখেছে যে দেশ, তাকে গজনী বা গডসের পদানত করা যাবে না।

(মন্তব্য লেখকের ব্যক্তিগত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.