শিক্ষক দিবসে ওঁদের কথা

0

teachersday2

শিক্ষাগুরুদের কথা বলেছেন গণেশ হালুই, মাধবী মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ ঘোষ, কল্যাণ সেনবরাট ও অলকানন্দা রায়

ভুলতে পারব না আঁকার শিক্ষক গফুর মিয়াঁকে

ganesh-halui

গণেশ হালুই (চিত্রশিল্পী)

পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর সাবডিভিশনের একটি সরকারি স্কুল। সেই স্কুলের আঁকার ক্লাস নিচ্ছেন গফুর মিয়াঁ। প্রথমেই ব্ল্যাকবোর্ডে আঁকলেন একটি ক্রস। উনি দেখাতেন ওই ক্রস থেকে হাত-পা-শরীর সব আঁকা যায়। উল্লম্ব রেখাটি মানবশরীরের মেরুদণ্ড। আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, সেই তখনকার কথা বলছি। এই মাস্টারমশাইয়ের কথা আমি কোনও দিন ভুলতে পারব না। আমার জন্ম ১৯৩৬ সালে। আজও মনে মনে দেখতে পাই, আঁকার সঙ্গে আমাদের রঙিন চক দেওয়া হত। আর চালিয়ে দেওয়া হত গান কিংবা কবিতা। মিউজিক থেমে গেলে আমাদের আঁকা থামাতে হত। পরেও আমি এ রকম কোথাও দেখিনি। ওই স্কুলের আরও দুই শিক্ষকের কথা মনে আছে। ইতিহাস পড়াতেন খলিমুদ্দিন ভুঁইয়া। পুরোনো স্কুলবাড়ির সিঁড়ি ধরে উঠে আসতেন ইতিহাসের কোনও ঘটনা বলতে বলতে। আর ইংরেজি পড়াতেন নায়েব আলি স্যার। এত সুন্দর টেন্‌স পড়িয়েছিলেন যে আমার মনে হয় সেই থেকে আমি ইংরেজি লিখতে শিখেছি। ১৯৫০-এ কলকাতা চলে আসি। কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হলাম। অনেক শিক্ষককেই কাছে পেয়েছি। অজিত গুপ্তর কথা খুব মনে পড়ে। সেই দিনগুলোই ভালো ছিল। ওই মাস্টারমশাইরা কোনও দিন নিজেদের আদর্শ থেকে সরে আসেননি।

 

পথ দেখিয়েছিলেন শিশিরকুমার ভাদুড়িমশাই

madhabiমাধবী মুখোপাধ্যায় (অভিনেত্রী)

যাঁর কাছে যা কিছু শিখি তিনিই আমার কাছে গুরু। এই যে আমার বিস্তৃতি, আমি প্রতিষ্ঠিত হলাম, মঞ্চ চিনলাম, সে সবের পিছনে যিনি ছিলেন তিনি শিশিরকুমার ভাদুড়িমশাই। একেবারে হাত ধরে, ক’পা ফেলতে হবে এ সব গুণে গুনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তিনি দেখিয়েছিলেন। আমার তখন ৫ কি ৬ বছর বয়স। ভাদুড়িমশাইয়ের হাত ধরে মঞ্চ দেখলাম। ওনার হাত ধরে আমি মিনার্ভা থিয়েটারে এসেছিলাম। মঞ্চের আলো আমাকে অভিভূত করেছিল। সেই অর্থে অভিনয়জগতের আমার গুরু শিশির ভাদুড়ি। এর পরে যাকে পেলাম তিনি ছবি বিশ্বাস। অভিনয় জীবনে যথার্থ শিক্ষা যে কত প্রয়োজন তা আমি ওই ভাদুড়িমশাই আর ছবি বিশ্বাস না থাকলে শিখতে পারতাম না। মঞ্চশিক্ষা শিল্পী তৈরি করে। সে ব্যবস্থা আর নেই। সেই অর্থে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক আর নেই। আমার হাতেখড়ি তাঁদের হাতে। মঞ্চ আমার কাছ মন্দির আর দেবতা সেই সব গুরু। এ ছাড়াও অহিন্দ্র চৌধুরী, নির্মলেন্দু  লাহিড়ী, মহেন্দ্র গুপ্ত – আমার কাছে পরম শ্রদ্ধেয়। আমি জানি না শিক্ষক দিবসে গুরুর কথা জানতে চাইলে কত জন কী কথা জানাবেন। হরনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেই সব দিদিমণির কথা খুব মনে পড়ে। আমি নাটক করতাম বলে ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারতাম না। দিদিমণিরা আমাকে ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতেন। স্কুলের বাচ্চাদের দেখলে সে সব কথা বড়ো মনে পড়ে।

 

কানুদা শিখিয়েছিলেন সূর্যোদয়ের আগে অরুণোদয় হয়

pradip-ghosh

প্রদীপ ঘোষ(আবৃত্তিকার)

আমার জীবনে প্রথাগত যে শিক্ষাব্যবস্থা যেমন বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়- তা ছিল বাড়ি থেকে নির্ধারিত করে দেওয়া। কিন্তু আমার পছন্দের জায়গা ছিল গোটা বিশ্ব। ম্যাক্সিম গোর্কির ওই পৃথিবীর পাঠশালা বইগুলি পড়ে আমি নতুন করে বিদ্যালয়কে আবিষ্কার করি, যেখানে পুথিগত বিদ্যা থেকে প্রত্যক্ষ অনুভূত এবং অভিজ্ঞতালব্ধ বিদ্যায়তন যা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। যাঁরা আমাকে ওই বিষয়ে শিক্ষালাভ করতে শিখিয়েছিলেন, সেই সব গুরুজনকে আজ শিক্ষক দিবসে প্রণাম জানাই। খড়গপুর সিলভার জুবিলি হাইস্কুল – আমার জীবনের প্রথম স্কুল। এক বছর পড়েছিলাম। ওই সময়ে আমার জীবনে এক জন মানুষের প্রভাব কোনও দিন ভোলার নয়। কানুদা, গান্ধী আশ্রমে থাকতেন। আমাদের বাড়িতে দুধ দিতে আসতেন। তিনি আমাকে প্রকৃতি চিনিয়েছিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন সূর্যোদয়ের আগে অরুণোদয় হয়। তখনও সূর্য ওঠে না, ওঠার প্রস্তাবনা বা আভাসমাত্র। উনি আমাকে সেটা না দেখালে আমি তা কোনও দিন জানতে পারতাম না। আমরা যেখানে থাকতাম, সেখানে শাল-মহুয়ার বন ছিল। সেই বনে নানা রঙের পাখি ছিল, ছোটো ছোটো প্রাণী যেমন খরগোশ, ইঁদুর, সাপ, বেজি তিনি ধরে ধরে চিনিয়েছিলেন। এখন ৭৪ বছর বয়সেও আমি শিক্ষার উপাদান পৃথিবীর বুক থেকে আহরণ করি।

একটু বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার চোখের পাওয়ার বেড়ে চলেছিল খুব দ্রুত। সাড়ে এগারো পাওয়ার হওয়ায় ডাক্তার বই পড়া বন্ধ করে দিলেন। স্কুল ফাইনালের আগেই এই অবস্থা হওয়ায় বাবা এক প্রাজ্ঞ মানুষকে বাড়িতে আনলেন। তিনি আমাকে সব বিষয় পড়ে শোনাতেন। এটাই আমার পরীক্ষা দেওয়ার রীতি হল। তিনি শচীন্দ্রচন্দ্র মজুমদারমশাই, যিনি রবীন্দ্রনাথ ও স্বামী অভেদানন্দ মহারাজের সান্নিধ্য পেয়েছেন। স্কুল থেকে ফিরে আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। আমি ঘুম থেকে উঠে দেখতাম তিনি আমার মুখের দিকে স্নেহশীল চোখে তাকিয়ে আছেন। আমাকে পড়া শোনানো শুরু করতেন। এঁদের আজও ভুলতে পারিনি। আরও একজনকে পেয়েছিলাম। তিনি প্রাথমিক বিভাগে লাইব্রেরি ও বাগান দেখাশোনা করতেন। তাঁর নাম জগবন্ধু সীট। আমার চোখের অবস্থা খারাপ বলে আমাকে বাগান করানো শিখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন বাগান তো করেন মালী, তুমি কী করবে? তুমি আমার সঙ্গে ১-২টি গাছ সৃষ্টি করবে। বীজ মাটিতে পোঁতা হল, জল দিলে, সার দিলে আর দেখবে যখন অঙ্কুরিত হবে তখন একে রক্ষণাবেক্ষণ করবে। যখন এটাতে ফুল আসবে তখন জানবে এ গাছ তোমার সৃষ্টি। তুমি ভালোবাসা দিয়ে একে সৃষ্টি করলে। ওই সব শিক্ষকের কথা আজ অনুরণিত হয়, মনে মনে কথা বলি। প্রণাম জানাই।

শেখার আলো জ্বালিয়ে তুললেন সলিলদাই

kalyan-sen-barat

কল্যাণ সেনবরাট (সংগীত পরিচালক)

শিশুকালে শিক্ষা যেহেতু বাড়িতেই হয়, সেই অর্থে বাবা-মাই প্রথম শিক্ষাগুরু। বাবা-মায়ে্র উৎসাহ ছাড়া কিছুই হয়ে উঠত না। তার পরে তো সুর শুনে শুনে গান শেখা। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কাছে লোকসঙ্গীত শেখা। সেই দিক দিয়ে ভাবলে সলিল চৌধুরীর কাছে গিয়ে খুবই উপকৃত হয়েছিলাম। আজকের এই শিক্ষক দিবসে কাকে ছেড়ে কার নাম করব ভেবে পাচ্ছি না। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য আমার সম্পর্কে জামাইবাবু। ওঁর সান্নিধ্য আমাকে খুব উৎসাহিত করত। একলব্য হিসেবে আমি ভীষণ ভাবে একনিষ্ঠ ছিলাম। ওনাকে অনুসরণ করতাম বলে আমার বহু গানে ওঁর প্রভাব পড়েছে। তবে আমাদের প্রধান গুরু হল কান। শ্রবণ একটা বড় মাধ্যম। সলিলদার কথায় ফিরে আসি। তখন গানবাজনা শুরু করেছি। নিজেকে মনে করছি অনেক কিছু শিখে ফেলেছি। প্রথম ধাক্কাটা খেলাম সলিল চৌধুরীর কাছে গিয়ে। ছিলাম কুয়োর ব্যাঙ, গিয়ে পড়লাম সাগরে। শিক্ষা প্রচুর বাকি। একটা জিনিস জানতে গিয়ে বহু অজানা জিনিসের মুখ এসে পড়ছি। শেখার আলো জ্বালিয়ে তুললেন সলিলদাই। এ কৃতিত্ব সলিলদার। তবে হেমাঙ্গদার কাছে সবথেকে বড় শিক্ষা হল কী ভাবে একজন শিল্পী-সংগঠক হওয়া যায়। হেমাঙ্গদা ধরে ধরে শিখিয়েছিলেন। তা না হলে ৩৭-৩৮ বছর ধরে “ক্যালকাটা কয়্যার” চালাচ্ছি কেমন করে। মনে পড়ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুধাদিদিমণির কথা। বিদ্যালয়ের সেই সব মাস্টারমশাইয়ের কথা যাঁরা সত্যিকারের মানুষ করার চেষ্টায় ছিলেন। তাঁদের স্মরণ না করে উপায় নেই। খুব ছেলেবেলার একটা কথা মনে পড়ছে। তখন বয়স পাঁচ কি ছয়। আমাদের দুই ভাইকে বাড়িতে পড়াতে আসতেন সুন্দর চেহারার এক মাস্টারমশাই। তিনি তখন সবে কলেজে পড়েন। আমাদের মাঠে ক্রিকেট খেলাতে নিয়ে যেতেন। পরে পড়াতে বসাতেন। এইসব মানুষ চিরকাল সম্মানের আসন আলো করে রাখেন। এঁদের ভুলি কেমন করে?  

 

রবিঠাকুর আমায় সাহস দিয়েছেন, ওঁর কাছ থেকে পরিণতিবোধ শিখেছি

alakananda-roy

অলকানন্দা রায় (নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী)

শিক্ষকতার জায়গাতে আমি এত বেশি করে জড়িয়ে আছি যে সে জন্য আমার গুরুদের কথা সব সময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। আমি স্বা্ধীনচেতা মানুষ। নাচে আমার মুক্তি। তাই নাচের কথাই বলব। নাচের যাত্রাপথ আমার দীর্ঘ। একেবারে ছোটবেলায় আমি সিএলটি-র শিক্ষার্থী ছিলাম। আমার অজান্তেই নাচ, মঞ্চসজ্জা, কোরিওগ্রাফ, সাজপোশাক, আলো – সব ব্যাপারে আমি আগ্রহী হয়ে উঠছিলাম। একটু বড় হতে আমার মঞ্জুলিকা দাশের কাছে লোকনৃত্য ও ভারতনাট্যমের হাতেখড়ি। লোকনৃত্যের জন্য আমার নৃত্যধারায় স্বতঃস্ফূর্ততা বেশি। মারুথাপ্পা পিল্লাইয়ের কাছে আমার ভারতনাট্যম শেখা। পরে সংযুক্তা পাণিগ্রাহীর কাছে ওডিশি নৃত্য। এই দিদির সঙ্গে আমার বয়সের ফারাক বেশি ছিল না। কিন্তু দিদি আমার কাছে ছিলেন মাতৃস্থানীয়া। আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন দিদি। তাই আমার সৃষ্টি নানা ধারায় সম্পৃক্ত। আমি এগিয়ে যেতে পেরেছি। আমি যে স্বাধীনতা পেয়েছি সেটা সবাইকে দিতে চাই। তবে আমার কাছে বড় গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁকে পড়তে পড়তে, শুনতে শুনতে, জানতে জানতে আমি উপলব্ধি করেছি তিনি কত বড় গুরু। আমি বর্ণ পরিচয় পড়ে বাংলা শিখিনি, আমি সহজপাঠ পড়ে বাংলা শিখেছি। রবিঠাকুর আমায় সাহস দিয়েছেন। ওনার কাছ থেকে আমি পরিণতিবোধ শিখেছি। প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নতুন কিছু গড়ার যে সাহস উনি দেখিয়েছিলেন সেই পথে পা ফেলে আমি নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পেরেছি বলে মনে হয়। মডার্ন হাইস্কুলের টিচারদের কাছে আমি ঋণী। বিশেষ করে বাংলার শিক্ষিকা নীলিমা সেন গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। আমাদের শিক্ষা পুথিগত হয়নি। ওনার পড়ানোর জন্যই মনে হয় আমি বাংলাকে বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। ওই সব শিক্ষাগুরু অনেক দিয়েছেন। আর এই বৃত্তি থেকেই মনে হয় সব চেয়ে বড় সম্মান পাওয়া যায়।

অনুলিখন : পাপিয়া মিত্র  

1 COMMENT

  1. pratiti leka khub akarshonio hochhe.vromon er leka khub valo hochhe bises kore.teachers day upalokshe lekha pore valo laglo.kaboronline ei vabe chalie jak.

  2. pratiti leka khub akarshonio hochhe.vromon er leka khub valo hochhe bises kore.teachers day upalokshe lekha pore valo laglo.kaboronline ei vabe chalie jak.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.