১৪ শাকের রহস্য সন্ধানে

0

পাপিয়া মিত্র

সেবার পূজার পর বর্ষা শেষে কাশফুল ফুটেচে ইছামতীর দুধারে, গাঙের জল বেড়ে মাঠ ছুঁয়েচে, সকালবেলার সূর্যের আলো পড়েচে নাটা-কাঁটা বনের ঝোপে।

ছেলেমেয়েরা নদীর ধারে চোদ্দ শাক তুলতে গিয়েচে কালীপুজোর আগের দিন। একটি ছোট মেয়ে ভবানীর ছেলে টুলুর কাছে এসে বললে–তুই কিছু তুলতে পারচিস নে–দে আমার কাছে–

টুলু বলল–  কি দেব? আমিও তুলবো। কৈ দেখি– 

এই দ্যাখ কত শাক, গাঁদামণি, বৌ-টুনটুনি, সাদানটে, রাঙানটে, গোয়ালনটে, ক্ষুদে ননী, শান্তি শাক, মটরের শাক, কামড়ালাম, কলমি, পুনর্ণবা…

এই পর্যন্ত পড়ে বরেনবাবু ঘড়ির দিকে তাকাতেই হৃদযন্ত্র ঝম্প করে উঠল। ‘আরে সব শেষ হয়ে গেল’ বলে রে রে করে উঠলেন। কী হয়েছে কী হয়েছে বলে বরেনগিন্নি চিৎকার করতে লাগলেন। কোনো রকমে হ্যাঙারে ঝোলানো পাঞ্জাবিটা গায়ে গলিয়েই দরজা হাট করে খুলে পার হলেন চৌকাঠ। তড়িঘড়ি পৌঁছোতে হবে গয়া রায়ের হাটে।

সূর্য সবে ৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে মুখে তাপ দিচ্ছে। আর একটু জোরে পা চালাও বরেন, কে যেন বলে উঠল। তোমার বয়স এখন ৭৩ হলেও আসলে তুমি ৩৭। 

গ্রামীণ হাওয়া জানান দেয় হেমন্তের আগমন। কয়েক দিন ধরে গয়া রায়ের হাট রঙিন হয়ে উঠেছে। শাকের ছড়াছড়ি। সবজির হাসাহাসি। অহংকারে কে কাকে হারায় এই আর কি! 

৩৭-এর যুবক হয়ে বরেনবাবু হারানের কাছে এসে একটু থামে। হারান মনে করিয়ে দিয়েছিল ১৪ শাকের কথা – দাদু এ বার কিন্তু দাম পড়বে বেশি।

কীসের?

আরে ভুললে চলবে? কালীপুজোর আগের দিন ১৪ শাক খাবে না? তোমার চোদ্দো পুরুষের ভূত যে সব নেমে আসবে তাদের তাড়াতে হবে তো? সকালে ভাতের পাতে শাক আর সন্ধেবেলায় চোদ্দো পিদিম জ্বালিয়ে সব ভূত তাড়াতে হবে তো। যত সব বাজে কথা – বলে কয়েকটা কাঁচা টমেটো আর একটা গাছপাকা বেলের লোভ সামলাতে না পেরে বাড়ি ফিরেছিলেন বরেনবাবু।

আমার জন্য রেখেছিস তো? গলা শুনে মাথা তোলে হারান। দাদু এসেছ? এত দেরি কেউ করে? দেখছ তো দিনে দিনে এই ছোট্ট গয়া রায়ের হাটেও শহুরে বাতাস লেগেছে। সব হাঁটাহাঁটি করেই চলে আসে কেনাকাটি করতে। এই নাও বলে নিজের থলির ভেতর থেকে বের করল দু’টো আঁটি। একটা তুলে দিল হাতে। একটা হয়তো বাড়ির জন্য, হয়তো বা অন্য কোনো বরেনবাবুর জন্য। 

শাকের আঁটিখানি থলির ভেতর রেখে হাটের ওপর ওপর চোখ বুলিয়ে নেন বরেনবাবু। না আজ থাক। বিভূতিবাবুর বইখানা টানছে। আর কী কী শাক তোলা বাকি আছে দেখতে হবে। তার পরে কেনা শাকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে কিছু ভেজাল আছে কিনা। থলিটা গিন্নির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বসে পড়লেন ‘ইছামতী’ উপন্যাসটি নিয়ে। 

…বাকি ছিল খানতিনেক শাক। ছোটো মেয়েটি রাঙাআলুর শাক, ছোলার শাক আর পালংশাক তুলে টুলুকে বলল, এই চোদ্দ। তুই ছেলেমানুষ শাকের কি চিনিস? 

সত্যি তো আজ পর্যন্ত কত জন এই চোদ্দো শাক চিনতে পেরেছে? পাতা থেকে চোখ সরিয়ে গিন্নির উদ্দেশে ডাক দিলেন বরেনবাবু। গজ গজ করতে করতে শাকের আঁটি খুলছেন গিন্নি। এত দিন শহরে থেকে কুচোনো শাক পলিপ্যাকে আসত। এখন দেশের বাড়িতে এসে হাড়ে দুব্বোঘাস গজিয়ে ছাড়ছে কর্তা। বাতের ব্যথাটা আবার চাগার দিয়েছে। ঘোর অমাবস্যায় ব্যথাবেদনা বাড়ে যে।

বরেনবাবু ঝুঁকে পড়ে কী যেন খুঁজতে গেলেন। দু’তিনটে শাক ছাড়া কিছুই তেমন চিনতে পারলেন না। এক বার গিন্নিকে বলতেই মুখঝামটা খেয়ে ছিটকে গেলেন। হারানের দেওয়া লকলকে শাকগুলো কেমন নেতিয়ে যাচ্ছে। চেনা হবে না ভূতচতুর্দশীতে খাওয়া চোদ্দো শাককে? আর কবে শেখা হবে? ৭৩ তো হল? বিগড়ে যাওয়া মনটাকে নিয়ে জানলার কাছে যেতেই কোবরেজ মশাইয়ের সঙ্গে দেখা। 

কোথায় চললেন কোবরেজমশাই? মাথার সুয্যিকে দেখে বললেন, সময় একটু আছে। একটু গপ্পো হবে নাকি?

বরেনবাবু অন্ধকারে লুকিয়ে পড়া চাঁদকে হাতে পেলেন। আসুন আসুন, আপনাকে আমার আজ খুব দরকার।

সবে কুচি হতে শুরু হয়েছে শাকের গুচ্ছ। চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে চলে এলেন বরেনবাবু। রাখলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ইছামতী’ বইয়ের পাশে। মেলাবেন, তিনি মেলাবেন এই আশায়। 

কোবরেজমশাই একটু ভেবেচিন্তে উত্থাপন করলেন, “ওলং কেমুকবাস্তুকং সার্ষপঞ্চ নিম্বং জয়াং। শালিঞ্চিং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ুচিন্তথা।। ভন্টাকিং সুনিষন্নকং শিবদিনে যদন্তি তে মানবাঃ। প্রেতত্বং না এ যান্তি কার্তিকদিনে কৃষ্ণ চ ভূতে তিথৌ”।।

বলেই বরেনবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। জানলা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে কোবরেজমশাই বললেল, এই চোদ্দো শাক খাওয়ার কথা ষোড়োশ শতকের স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দনের লেখা কৃত্যতত্ত্ব বইতে পাওয়া যায়। শাস্ত্রে লেখা চোদ্দো শাক হল ওল, কেঁউ, বথুয়া, কালকাসুন্দা, সরষে, নিম, জয়ন্তী, শালিঞ্চে বা শিঞ্চে, গুলঞ্চ, পটল বা পলতা, শেলুকা, হিলমোচিকা বা হেলেঞ্চা, ভাঁট বা ঘেঁটু আর সুনিষন্ন বা শুষনি। এই চোদ্দো শাকের অনেক গুণ। আগাছার মতো জন্মালেও আয়ুর্বেদ মতে এর খাদ্যগুণ বা ভেষজগুণ অপরিসীম। কোনো শাক খিদে বাড়ায় তো কোনো শাক কৃমিনাশক। আবার কোনো শাক হিমোগ্লোবিন বাড়ায়, কোনো শাক অনিদ্রার যম। কোনো শাক প্রসূতিদের জন্য উপকারী আবার কেউ একজিমা, জন্ডিস নির্মূল করে। হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ, মেধা, মানসিক অস্থিরতার অব্যর্থ ওষুধ এই চোদ্দো শাকে পেয়ে যাবেন। 

কিন্তু বাতের ব্যথার জন্য কোন শাকটা একটু দেখিয়ে দেবেন কোবরেজমশাই? 

জানেন কী ভাবে রান্না করতে হয়? বলেই শুরু করলেন কোবরেজমশাই। শুধু শুকনো লঙ্কা পাঁচফোড়ন দিয়ে সামান্য একটু নুন মিষ্টিতে আপনি হাফথালা ভাত খেয়ে ফেলতে পারবেন। কোনো বাড়ি আবার কালো জিরে কাঁচা লঙ্কা, কোনো বাড়ি রসুন শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে ভাজা করে। চমৎকার স্বাদ আর গন্ধ।

অস্থির হয়ে বরেনবাবু আবার বলেন বাতের ব্যথার জন্য কোন শাক যদি একটু দেখিয়ে দেন… আচ্ছা এই যে হাটময় এত মানুষ চোদ্দো শাক কিনছে। বা সেই ছেলেবেলা থেকে কালীপুজোর আগে ভূতচতুর্দশীর দিনে এই নানা পাতানাতা খেয়ে আসছি সেগুলো এক জায়গায় জন্মায় কী করে? জানলাম না কিছুই। ৭৩ বছর, বয়সটাই বাড়ল। 

শুনুন, গ্রামবাংলার মানুষেরা বিশ্বাস করেন চোদ্দো রকম শাক এক সঙ্গে মিশিয়ে খেলে ঋতু পরিবর্তনের সময় নানা রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। যেমন ধরুন বাংলায় ইমরুল, কলমি, কুলেখাড়া, খারকোন বা ঘাটকোল, ব্রাহ্মী, গিমে, থানকুনি, মোরগ ফুল, বাসক, ভেন্ডি, কচু, মালঞ্চ, ঢেঁকি, নানা ধরনের শাক পাওয়া যায়। এগুলো সব অনাবাদী মানে নিজে থেকে এখানে ওখানে জন্মায়। তাই জায়গা বিশেষে শুধু শাকের নাম বদলে যায়। 

মাথা গুলিয়ে যায় বরেনবাবুর। বিভূতিভূষণ, ইছামতীর তীর, চোদ্দো শাক, হারান, গিন্নির বাতের ব্যথা।  

পঞ্জিকায় আছে আশ্বিন মাসের চতুর্দশী তিথিতে কালীপুজোর একদিন আগে চোদ্দো প্রদীপ জ্বালিয়ে চোদ্দো পুরুষের আত্মাকে তুষ্ট করতে হয়। অশুভ শক্তিকে দূর করার প্রথা পালন করতে হয়। 

তাই কি হারান বলেছিল চোদ্দো শাক খেয়ে চোদ্দো পিদিম জ্বালাতে? তা হলে কি ভূতপ্রেত কাছে ঘেঁষতে পারবে না?

মাথার সুয্যি একটু হেলেছে। কোবরেজমশাই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়েছেন। বুঝলেন, দেশের দশের জনগণকে সুস্থ রাখতে হলে শাক লতাপাতা খেতে হবে। আপনি শুধু উপলক্ষ্য বের করুন। তাই তো মুনি ঋষিরা বিধান দিয়েছেন আশ্বিন কার্তিক মাস যমদংষ্ট্রা কাল। এই সব মাসের অমাবস্যা তিথির ভূতচতুর্দশীতে যে কোনো চোদ্দ শাক খেলে ভূতপ্রেত কাছে ঘেঁষতে পারে না।

বলেই হাঁটা লাগালেন কোবরেজমশাই। শাকের গুচ্ছ গিন্নির জিম্মায় দিয়ে বরেনবাবু আবার ‘ইছামতী’তে ডুব দিলেন।

আরও পড়তে পারেন

কালী – সন্তানদের খেলান, আমরা খেলি

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন