প্রতিবাদ ব্যর্থ, মিলেছে প্রতিশোধ: হায়দরাবাদ ‘এনকাউন্টার’ উদযাপনের কারণ কি এখানেই?

0

জয়ন্ত মণ্ডল: কতিপয় মুখখোলা লোক ছাড়া হায়দরাবাদ এনকাউন্টার নিয়ে উচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছে গোটা দেশ। কোথাও উচ্ছ্বাস আর উল্লাসের তেমন কোনো তফাতও মেলেনি।

এনকাউন্টারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই অকাল দিওয়ালি

শুক্রবার সকালে মানুষের কাছে পৌঁছে যায় সেই সুসংবাদ। হায়দরাবাদের ২৬ বছরের তরুণী পশুচিকিৎসককে নির্মম ভাবে গণধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ডে চার অভিযুক্তকে খতম করেছে পুলিশ। বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যম অথবা ডিজিট্যাল মিডিয়ায় প্রতিবেদনে ধরা পড়েছে কী ভাবে খুশির আবহে মেতে উঠেছে গোটা দেশ। রাতারাতি পুলিশের প্রতি আস্থা বেড়ে যাওয়ার ছবি। বিচারব্যবস্থা চুলোয় যাক। মানুষের বহুকাঙ্ক্ষিত চাহিদা পূরণের ইতিহাস রচনা হয়েছে পুলিশের সৌজন্যে। তাই ‘হিরো’ পুলিশকে নিয়ে মাতামাতি। যে ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছিল দেশ, প্রতিশোধের স্বাদ পূরণ করে দিয়েছে পুলিশ। এখান থেকেই উঠে এসেছে বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতি মানুষের অগাধ অনাস্থার ছবি।

ভারতে আইনের শাসন চলে। যে কারণে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে আইন দিয়ে শাসনের নমুনা মিললেই প্রতিবাদে নেমে পড়ে আসুমুদ্র হিমাচল ভারতবাসী। কিন্তু অবচেতনে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও খুব একটা কম নয়। সেটার ক্ষেত্র এবং ব্যক্তি বিশেষে তারতম্যও থাকতেই পারে। তা না হলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ফিল্মি ক্যারেক্টারগুলো এত জনপ্রিয় হয়ে উঠত না। আইনের শাসন যা পারে না সেটাকেই নিজের হাতে তুলে নেওয়া চরিত্রগুলো গভীর ভাবে দাগ কাটে দর্শকের মনে। অবচেতনে সেই প্রতিশোধস্পৃহা বাস্তবে প্রতিফলিত হতে পারে না সচেতন মনের সতর্কতায়। কিন্তু আইনের রক্ষক পুলিশ। তারা যদি সেই অবচেতনের প্রতিশোধস্পৃহাকে বাস্তবায়িত করে, তবে বাহবা তাদের দিতেই হয়। কিন্তু প্রতিবাদী মানুষের মনে এই প্রতিশোধস্পৃহার আগমন তো আর এক দিনে ঘটেনি!

এনকাউন্টারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই অকাল রাখীবন্ধন

অর্থাৎ, বছর সাতেক আগের দিল্লিতে ঘটে যাওয়া নির্ভয়া গণধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো মামলাগুলি দিনের দিনের পর দিন হতাশার অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছে ভারতবাসীকে। অভিযুক্ত পাকড়াও হয়, বিচার হয়, রায় হয় ফের রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন হয়, ক্রমশ দীর্ঘায়িত হতে থাকে জঘন্য অপরাধের শাস্তি প্রক্রিয়া। যদি একজন সাধারণ মানুষকে নিশ্চিত করা যেত যে আইন দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে সফল হয়েছে, তা হলে বোধহয় গরিষ্ঠ অংশ হায়দরাবাদের এই এনকাউন্টারকে এ ভাবে উদযাপন করত না।

তেলঙ্গানা পুলিশের এই এনকাউন্টারে এক ধরনের অপ্রতিরোধ্য প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে সাধারণ মানুষ। হায়দরাবাদের ওই চিকিৎসকের সঙ্গে কী ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটেছিল, সে সম্পর্কে সবাই অবহিত ছিল। ম্যাজিস্ট্রের আদালত অভিযুক্তদের ১৪ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়েছিল। অর্থাৎ, এখনও শুরু হয়নি শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ অথবা বিচার। দিন দশেকের মাথায় অভিযুক্তদের নিকেশ করে পুলিশ। হায়দরাবাদ পুলিশের এই কাজে জনসাধারণের উল্লাস এবং উদযাপনের বীজ সেখানেই।

police
এই জায়গাতেই হয়েছিল এনকাউন্টার

অন্য দিকে, পুলিশ আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে যে ধরনের পদক্ষেপ করেছে, তা দেখে মানবাধিকার কর্মী, একাংশের বিদ্বজ্জ্ন এবং আইনি মহলের দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা বিস্তর মানুষ হতবাক হয়েছেন। কেউ কেউ এটিকে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করেছেন। পাশাপাশি কেউ কেউ দাবি করেছেন, এই ঘটনার জন্য দায়ী পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা উচিত। ঘটনাটি নিয়ে জোরালো বিতর্ক ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও ।

বিদ্বজ্জনদের মত শুনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নে়টিজেনরা বলছেন, যখন এই নির্মম ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনা ঘটল তখন কোথায় ছিলেন বুদ্ধিজীবীরা। পালটা মতও উঠে এসেছে, আইনরক্ষক পুলিশই বা তখন কোথায় ছিল, ঘটনার পরে কেন পুলিশ দ্রুত এফআইআর দায়ের করেনি? ভিন্নমতের নেটিজেনরা এমনও বলছেন, এটাও এক ধরনের তালিবানি শাসনের পদধ্বনি। ভারতের আইনের শাসনে তালিবানি অনুপ্রবেশ।

এই আন্ডারপাসেই মিলেছিল দেহ

আসলে ভারতবর্ষ এমন একটি দেশ যেখানে ‘আইনের শাসন’ চলে কিন্তু ‘আইন দিয়ে শাসন’ নয়। আইনের শাসনে সরকার আইন মেনে পরিচালনা করে এমন একটি বিষয়। আর আইন দিয়ে শাসনে সরকার আইনকে শাসন করার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায় হিসাবে ব্যবহার করে। দ্বিতীয়টির মাধ্যমে শাসক ব্যক্তিগত নীতি আরোপ করতে পারে। তবে বিষয়টির সম্ভাব্য সংক্ষিপ্তসার এমনটা হলেও অর্থের দিক থেকে তা আরও বিস্তৃত। কিন্তু সাম্প্রতিক এক‌টি প্রতিবেদনে প্রকাশ, দেশের ২৪টি উচ্চ আদালতে ৩৯৫টি শূন্যপদও ভাবিয়ে তুলেছে সুপ্রিম কোর্টকে। পাশপাশি অধীনস্ত নিম্ন আদালতের ৫৯৮৪টি শূন্যপদের চিন্তাও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ‘আইনের শাসন’ অথবা ‘আইন দিয়ে শাসন’-র ব্যাখ্যা খোঁজাও মুশলিক।

তবে যে পুলিশকে নিয়ে এত মাতামাতি, এই একই ধরনের ক্ষেত্রে পুলিশবাহিনীর দক্ষতা একাধিক বার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এক-একটা দিল্লি, উন্নাও অথবা হায়দরাবাদ আসে, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসে। উন্নাওয়ের ধর্ষিতা থানায় চৌকাঠে কপাল ঠুকেছিলেন, এফআরআই দায়েরের অনুরোধে। মামলা গড়ায় সিবিআইয়ের দরজায়। কামদুনি নিয়ে পুলিশি নাটক ভুলে যেতে হবে?

হায়দরাবাদ গণধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ড

এগুলি এমন কিছু সাধারণ প্রশ্ন যা যখনই এ জাতীয় জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয় তখন পুলিশ বিভাগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশ আরও বেশি দায়িত্ববান হয়ে উঠেছে। বিচারবহির্ভূত ভাবে নিজেই ‘জল্লাদ’ হয়ে গলায় ফুলের মারা পরছে। তা হলে প্রশ্ন, বিচারব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়ে এটাই কি পুলিশের যোগ্যতা প্রমাণের সঠিক উপায়? তেলঙ্গানা পুলিশ যে পদক্ষেপ করেছে, আইন রক্ষার জন্য কি এটাই করা বাকি ছিল? অথবা ভবিষ্যতে আপামর ভারতবাসীকে বন্দুকই দেবে ন্যায়বিচার?

------------------------------------------------
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।
সুস্থ, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার স্বার্থে খবর অনলাইনের পাশে থাকুন।সাবস্ক্রাইব করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.