চুরাশির ছায়া, জিম করবেটে নৌকাবিহার ও দেশপ্রেমের ভোট ২০১৯

0
PM in Corbett
করবেট ন্যাশনাল পার্কে ফটো শ্যুটে ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী। ছবি সৌজন্যে ইন্ডিয়া টুডে।
দেবারুণ রায়

দেহরক্ষীর ভেকধারী বিয়ন্ত সিংয়ের একে রাইফেল প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার পর সারা দেশ শিখদের দিকে মেলে ধরেছিল সন্দেহপ্রবণ জোড়া জোড়া চোখ। আগাগোড়া নিরীহ, ধর্মপ্রাণ, আইন ও শাসনে আস্থাশীল এবং নিতান্তই রাজভক্ত নাগরিক হলেও পরিত্রাণ নেই সন্দেহের বেড়াজাল থেকে।

দিল্লিতে মনেপ্রাণে কংগ্রেসি এক সর্দারজি দুঃখের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন। তাঁর একটা মান্ধাতার আমলের নীল অ্যামবাস‍্যাডর ছিল। সেটাই খাটিয়ে সংসার চালাতেন। গাড়ি চালাতেন নিজেই। সর্দারজি বক্সি সিং বলেছিলেন, “সর্দারের ঘরে জন্ম নিয়ে কি পাপ করেছি? আমাদের পূর্বজ দেশ স্বাধীন করতে বুকের রক্ত দিয়েছে। দেশের পুনর্গঠনে আমরা যোগদান করেছি। দেশের সার্বভৌমত্ব বাঁচাতে বলিদান দিয়েছি সব যুদ্ধে ও শান্তির সময়েও। তবু নিজভূমে আজ আমরা পরবাসী। সর্দার বক্সি সিংয়ের এই মনোবেদনার কোনো প্রতিকার করেনি সে দিনের সরকার। উলটে যে কোনো উগ্রপন্থী হানাদারির ঘটনায় শিখ আমজনতাকে লাঞ্ছিত, অপমানিত হতে হয়েছে পদে পদে। যার সূচনা দিল্লিতে ১৯৮৪-র শিখনিধন থেকে। ওই দাঙ্গায় অভিযুক্ত সজ্জন কুমার, জগদীশ টাইটলাররা পরের পর ভোটে জিতেছেন। ওই কলঙ্কের কালো দাগেই হিরো হয়েছেন।

আরও পড়ুন পুলওয়ামা হামলা কী দিল মোদীকে?

প্রায় সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে জম্মু-কাশ্মীরে লাগাতার উগ্রপন্থী হানা ও আক্রমণের ঘটনায়। যার মধ্যে অন্যতম সাম্প্রতিক পুলোয়ামা হামলা। সেখানে জঙ্গি বিস্ফোরণের শিকার হয়েছেন ৪৯ জন নিরীহ জওয়ান। কাশ্মীরের রাজ‍্যবাসীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে গিয়ে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর মতপার্থক্য সরিয়ে রেখে সব দল একজোট হয়ে জঙ্গি আক্রমণ ও পাক-ভূমিকার বিরুদ্ধে সরব হয়। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ঘোষণা করেন, “এই সংকট মুহূর্তে আমরা সরকারের পাশে আছি।”

দৈনন্দিন রাজনীতি যেখানে প্রাণের আরাম, ক্ষুধার অন্ন, তৃষ্ণার জল ও নিঃশ্বাসের বায়ু সেখানেও রাহুল গান্ধীর এই কথাটিতে সব বিরোধী দলের সমর্থন মিলল। এমনকি আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদের মতো নেতাও বললেন, “দেশ এখন একজোট। পুলওয়ামা নিয়ে সরকারের পাশে সবাই।” কিন্তু এতে হাঁফিয়ে উঠেছিলেন যাঁরা তাঁদের মধ্যে প্রথম কাদা ছোড়াছুড়ি ক্লাবের খেরোর খাতায় নাম লেখালেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। তিনি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করলেন। বাদ দিলেন না জওহরলাল নেহরুকেও। অমনি তেতে উঠল রাজনীতি। কংগ্রেস বাজারে ছাড়ল এমন ব্রহ্মাস্ত্র, যাতে আছে পুলওয়ামার রক্তক্ষরণের সময় নরেন্দ্র মোদীর ফটো শ‍্যুটিং ও জিম করবেটে নৌকাবিহারের দৃশ্য। পুরো ভিডিও চাউর করে দিল, ওই ঘটনার পর কত ঘণ্টা প্রধানমন্ত্রী কিছুই জানতে পারেননি। প্রশ্ন উঠল, তা হলে মনমোহনকে দুর্বল প্রধানমন্ত্রী বিশেষণ দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যে যে অভিযোগ এনেছিলেন মোদী, নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে তার চেয়ে ভালো কী কী করলেন?

PM engaged in boating in Corbett
করবেটে প্রধানমন্ত্রীর নৌকাবিহার। ছবি সৌজন্যে দ্য হিন্দু।

বিজেপির সভাপতি থেকে এ টু জেড নানা মাপের নেতা, প্রত‍্যেকেই রাহুলকে দুয়ো দিতে দিতে ঘোলা জলে কানায় কানায় পূর্ণ করে তুলেছেন স্বদেশের রাজনীতির পুষ্কর। চিরাচরিত চেনা আওয়াজে বলতে শুরু করেছেন, পুলওয়ামার ঘটনা ঘটার পর ঠিক সময়েই প্রধানমন্ত্রী জেনেছেন। ঘটনা ঘটার আগে যাঁরা জানার তাঁরা তো জানতেনই। অর্থাৎ প্রচ্ছন্ন  খোঁচা বিরোধী নেতাদের। কেউ কেউ রাখ ঢাক না রেখেই বলছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে বিরোধীদের তো ভাব-ভালোবাসা আছেই। না হলে উপত্যকায় পাত্থরবাজদের দমনে সেনা-সিআরপির গুলি চললে তারা অশ্রুবর্ষণ করেন কেন?

মনের মতো বিতর্কের ইস‍্যু পেয়ে গিয়েছে উগ্র জাতীয়তার প্রবক্তারা। প্রায় পাঁচ বছরের রাজ‍্যপাটে কাশ্মীর নিয়ে তথাকথিত ‘স্থায়ী সমাধান’-এর পথে হেঁটে এবং চোখের বদলে চোখ নেওয়ার নীতি প্রয়োগ করেও কি দেশমাতৃকার সুসন্তান জওয়ানদের জীবন রক্ষা করা যাচ্ছে? ইতিহাস কী বলে? দুর্বল প্রধানমন্ত্রীর দশ বছরে কাশ্মীর সমস্যার প্রার্থিত সমাধান না হলেও উত্তর সীমান্তে কুচক্রী প্রতিবেশী দেশ কতটা সফল ছিল? আর এখন কতটা? জঙ্গি হামলায় নিহত জওয়ানের সংখ‍্যাই বা কত ছিল ইউপিএ আমলে এমনকি প্রথম এনডিএ জমানায় – এই সব সংখ্যা নিয়ে তুলনামূলক বিচারে যাওয়ার দরকার ছিল না। জাতীয় সংকটের মুহূর্তে এই স্কোরবোর্ড ভুলে থাকাটাই গণতান্ত্রিক শোভনতা। এ দিকে তাকিয়ে পরিণত বোধের পরিচয় রেখেছিলেন রাহুল। কারণ, নিজে বহু সংকটের সাক্ষী না হলেও তিনি আছেন একটি প্রাচীন বটবৃক্ষের ছায়ায়। যেখানে মনমোহন বা সনিয়া ছাড়াও আছেন গুলাম নবি, অ্যান্টনি বা আহমদ পটেলের মতো নেতা। সর্বোপরি বিশেষ পরিস্থিতিতে মাথার ওপরে আছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। সুতরাং কংগ্রেস সভাপতির অবস্থান সুচিন্তিত ছিল। দেশ ও দলীয় রাজনীতি দুয়ের পক্ষেই ছিল সুখকর।

আরও পড়ুন পুলওয়ামা হামলা: ভোট নিয়ে গুজরাতি মন্ত্রী যা চান, তা কি মোদীজিরও মনের কথা?

বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী এই অবস্থান উপলব্ধি করেই স্বভাবসিদ্ধ আক্রমণ থেকে নিরাপদ দূরত্ব রাখছিলেন। কিন্তু বাধ সাধলেন তাঁর ডান হাত অমিত শাহ। একাধারে কংগ্রেস ও নেহরুকে দায়ী করলেন কাশ্মীর সমস‍্যার জন্য। এর পর যথারীতি উতোরচাপান শুরু। যেটা চেয়েছিলেন শাহ অ্যান্ড কোং। কারণ এটাই তাঁদের স্বপ্নের দ্বৈরথের মসৃণ ভূমি। সর্ব অর্থে পাঁচ বছরের পারফরম্যান্স বা কাজের ভিত্তিতে নির্বাচনে যাওয়ার ঝুঁকি যথেষ্ঠই। অথচ জাতীয় আবেগের ইস‍্যুকে উগ্র মেরুকরণের যূপকাষ্ঠ বানানো গেলে ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে দিব‍্যি ভোট কুড়োনো যাবে। এই প্রক্রিয়ায় ছায়া খুঁজতে বাধা নেই। গণতান্ত্রিকতার স্বাভাবিক শর্ত জিঙ্গোবাদের সুবাদে শিকেয় তোলা যাক। শাসনের বিচ‍্যুতিরও জয়গান গাইতে হবে। অন‍্যথায় জুটবে ‘দেশদ্রোহী’ খেতাব। এবং কে বা কারা এই ডাইনি বাছাই করে যাবে একেবারে নীচে তৃণমূল স্তরে, ওপরতলা তার খবর নেবে না। কারণ এটা মেরুকরণের প্রয়োজনে। সর্বত্র সব দেশে কালে এমনটাই ঘটেছে। সেই ট্র‍্যাডিশন সমানে চলেছে। কোথাও তার পরিবর্তন হয়নি।

‘৮৪-র শিখবিরোধী বাতাবরণের মতো আপাতত কাশ্মীরিদের নিয়ে জিগির বসন্তবাতাস ভারী করে তুলেছে। কাশ্মীরি মানেই জঙ্গি বা পাকপন্থী প্রচার কাশ্মীরের পাহাড়ি পথের পাকদন্ডী আরও দুর্গম করে তুলেছে। গুটিকতক রাজনীতির কারবারিকে ধ্বজা করে নানা নামের গোষ্ঠী অমুক সেনা তমুক সেনা নামে মদোন্মত্ত প্রচার চালাচ্ছে সোশ‍্যাল মিডিয়ায়। জনপ্রিয় নেতাদের নামধারী সেনার প্রচার হয়তো বা তাঁদেরও দুর্নাম করার কৌশল। কে বা কারা, কীসের উদ্দেশ্যে স্পর্শকাতর জাতীয় স্বার্থের ইস‍্যু নিয়ে এই আগুন আগুন খেলা খেলছে, কেন্দ্রীয় শাসন নিশ্চয় তা নজরে রেখেছে।‍

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here