রামরাজ্যের রায় : গুজরাত থেকে গোরখপুর, গোমুখেই নবজাগরণ

0

অরুণ রায়

দুর্গটা নড়ে উঠেছে। কচ্ছ থেকে কাশ্মীর, অসম থেকে অন্ধ্র যখন মোদীশাহির পদানত, ঠিক সেই মুহূর্তেই। সেটাই প্রাচীন সভ্যতা সংস্কৃতির দেশ ভারতবর্ষের নবজাগরণের ব্রাহ্মমুহূর্ত। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের বিরুদ্ধে, তথাকথিত হিন্দুত্ববাদী নয়া-নাজি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উন্মেষকাল। ধারাবাহিক ভাবে এই অন্তঃসলিলা ফল্গুধারা বহমানা গুজরাতের গুহা থেকে। ওই গো-মুখ থেকে উদ্গত ছিল ২০০২। গণহত্যায় কলঙ্কিত সে দিনের গুজরাতের বেনিফিশিয়ারি কে বা কারা? তার পরই তিন বারের তখ্‌ত লাগাতার। এখনও তার রেশ রয়ে গিয়েছে। এই তিন বারের ‘রাজ’ দিয়েই কংগ্রেসকে তিন তালাক দেওয়া শুরু গুজরাত থেকেই। অম্বাদেবীর মন্দিরে অসংখ্য প্রদক্ষিণের পরেও সনিয়া গান্ধী মোদী-মোহ থেকে গুজরাতকে মুক্ত করতে পারেননি। আসলে বিসমিল্লাতেই গলদ রয়ে গিয়েছিল। গান্ধীর রাজ্যে গডসের মন্ত্রমুগ্ধরা প্যাটেল-তীরে পালটে দিল রাজনীতির মেরুকরণ, কংগ্রেসি-দুর্নামের অস্ত্রেই পর্যুদস্ত করে দিল শতাব্দী-প্রাচীন দলকে, এ সবই প্রাক্তন শাসকদলের প্রাজ্ঞ নেতাদের কৃতিত্ব। ছাপান্ন বছরের ভারত শাসকদল ছাপান্ন ইঞ্চির ছাতি দেখে চুয়াল্লিশেই কুঁকড়ে গেল। লোকসভায় এত কম সংখ্যা এর আগে কংগ্রেসের কখনও হয়নি।

২০১৪ থেকে ২০১৮ ভারতের মূষলপর্ব। এর পরই এই মহান দেশের সুমহান জনতার উত্থানপর্বের শুরু। পঁচাত্তরের পর জরুরি অবস্থার সর্বগ্রাসী স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জয়প্রকাশ নারায়ণ তাঁর জাগরণের বীজটি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন গুজরাত থেকেই। সেই গুজরাত এ বারের বিধানসভায় খুব ভয়ে ভয়ে তার মনের কথাটি জানিয়ে দিল জিগনেশ আর হার্দিকের হাত ধরে। যেখানে দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসকদলের সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো যোগ্য দল নেই, যেখানে বস্তুতই দ্বিদলীয় ব্যবস্থা। তৃতীয় শক্তির কোনো ঠাঁই নেই এবং শাসকের আগ্রাসনের মুখে কোমরভাঙা বিরোধীদল ক্রমাগত দলত্যাগে শক্তিহীন, সেখানে নিচুতলার মানুষই বেছে নিল পরিবর্তনের নেতা। প্রধানমন্ত্রীর কংগ্রেসমুক্ত ভারতের স্বপ্ন সফল করতে অমিতবিক্রম নিয়ে বিজেপির সভাপতি শাহ যখন ঝাঁপিয়ে পড়লেন আহমেদ প্যাটেলকে রাজ্যসভায় হারাতে, তখনই তাঁর নিজের রাজ্যে ক্ষমতার উত্তুঙ্গ শিখরে দাঁড়িয়ে মুখ পুড়ল মোদীর। দল ভাঙানো ও বিপুল অর্থবল প্রয়োগ করেও বিজেপি রুখতে পারল না আহমেদ প্যাটেলের জয়।

alpesh thakor, jignesh mevani and hardik patel
অল্পেশ ঠাকোর, জিগনেস মেবানি ও হার্দিক প্যাটেল

মোড় ঘোরার এই মাহেন্দ্রক্ষণে কংগ্রেসের অস্তিত্বরক্ষা বিজেপি-বিরোধী শিবিরের মনোবল বাড়াল। যদিও বাস্তবতার বিশেষত্ব এটাই যে সবাই সদলবলে কংগ্রেসে শামিল হয়ে গেল না। সোমনাথ থেকে শুরু করে তাবৎ মন্দিরে ঘুরে রাহুল গান্ধী যখন অমিত শাহকেও প্রত্যেক মন্দিরে ঘুরপাক খাওয়াচ্ছেন, তখন গ্রামে গ্রামে জনজোয়ারের পুরোভাগে পাতিদার নেতা হার্দিক আর দলিত নেতা জিগনেশ। মোদীজমানা গুজরাতে চলছে এই শতকের গোড়া থেকেই। তাই কর্পোরেটের কল্পকথার পুরোটাই শোনা হয়ে গিয়েছে গুজরাতবাসীর। শহর সেজেছে মাল্টিপ্লেক্সে, মলে। এবং বিজেপির ভোটারও ঘাঁটি গেড়েছে সেখানেই। সেচ ও পানীয় জল থেকে কর্মসংস্থান ইত্যাদি যাবতীয় সমস্যায় জর্জরিত গ্রামের মানুষ আর মোদী-মোদী রব তোলেনি সভায়। পরের পর সমাবেশে শূন্য চেয়ারের সারি আর অর্ধেক ফাঁকা মাঠ দেখে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা সি-প্লেন নিয়ে শেষ মুহূর্তে সাবরমতীতে নামেন। কারণ ‘হিন্দুত্ব’ অচল করে দিয়ে, অনগ্রসর নির্ণায়ক প্যাটেল-ভোট কেড়ে নিয়েছেন হার্দিক প্যাটেল। বাকি ওবিসি ভোট নিয়ে কংগ্রেসে মিশেছেন অল্পেশ ঠাকোর আর দলিতদের নবজাগরণে নতুন দিনের নেতা জিগনেশ মেবানি টেনে নিয়েছেন সব দলিত আর বাদবাকি সংখ্যালঘু ভোট। এ ছাড়া কংগ্রেসের কাছে সংখ্যালঘু ও উচ্চবর্ণের কিছু ভোট তো গিয়েছেই। সুতরাং কচ্ছের ভূকম্পনের ছায়া পড়ল গুজরাত বিধানসভায় — ‘দুর্গে বিজেপি অপরাজেয়’, এই মিথটা মুছে দিল ভোটের ফলাফল। সরকার বাঁচিয়েও মোদীকে শিক্ষা দিল গুজরাত। যে বলে বলীয়ান হয়ে তিনি দল ও দেশ কাঁপিয়ে লৌহপুরাণ আডবাণীকে অর্থহীন করেছেন, সেই ঘাঁটিতেই ধস।

বেখাপ্পা হাওয়াটা উঠল এবং পরের পর ঝাপটা এল একের পর এক গেরুয়া রাজ্যে। এগুলো উপনির্বাচন। লিটমাস টেস্ট বিজেপির। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারে। মধ্যে আছে পঞ্জাব, ওড়িশা ও বাঙলার মতো অগৈরিক রাজ্য। উত্তর-পূর্বের স্বপ্ন সফল হতে বাকি আর মিজোরাম। অসমের পর বড়ো জয় ত্রিপুরায়। বাকি সব মোদীশাহির চমৎকার। জনতার মন ভোলাতে ভোলাতে বিজেপির শাহেনশাহরা নিজেরাও ভুলতে বসেছেন যে গোটা উত্তরপূর্বাঞ্চলে লোকসভার আসন সাকুল্যে মাত্র ২৫। ২৭২-এর ম্যাজিক সংখ্যার মধ্যে ২৫-এর জোর কতটা? ২০১৪-য় প্রথম নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনেছিলেন মোদী। তিরিশ বছর পর। ছিল ২৮২। ১০টা আসন বেশি। তাই নিয়েই মোদীমাহাত্ম্য প্রচারে মেতেছিল সারা দেশ। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ও ২০১৪-র দৃষ্টান্ত দেখিয়ে কোয়ালিশনকে নস্যাৎ করেছেন। সেই অঙ্কেই জোটকে ‘ভুলপথ’ আখ্যা দিয়ে যোগীরাজ্যে একলা চলার রাস্তা নিল কংগ্রেস। এবং সমাজবাদী পার্টির নয়া জমানার নেতা অখিলেশ শেষ পর্যন্ত সফল হলেন মায়াবতীর মন গলাতে।

mayawati and akhilesh
মায়াবতী, অখিলেশ।

জোট মোটেই হয়নি গোরখপুর গড়ে বা ফুলপুরের উপনির্বাচনে। শুধু সপা প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রার্থী দেয়নি বসপা। উপনির্বাচনে না লড়াটা মায়াবতীর দস্তুর। কিন্তু দলিত-সংখ্যালঘুর মনের কথা বুঝে এই অবস্থানকেই রাজনীতির সাবলীল রঙে রাঙিয়ে দিলেন। বিনিময়ে রাজ্যসভায় মায়াবতীকে সমর্থনের সংকেত দিলেন অখিলেশ, অনগ্রসর জনতার ইচ্ছায়। পুরোপুরি হাত ধরাধরি নয়, শুধু কাছে আসার সংকেত। এটুকুতেই নিচুতলার মানুষের ঢেউ আছড়ে পড়ল গড়ে। জওহরলাল নেহরুর ফুলপুরে বিজপির সঙ্গে সঙ্গে উড়ে গেল কংগ্রেসও। কারণ তারা ছিল অনগ্রসর-দলিত-সংখ্যালঘু মানুষের স্বাভাবিক জোটের বাইরে। পাঁচ বারের সাংসদ যোগী ও তার আগে তাঁর পূর্বসুরিদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সমাপ্ত হল মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের মাত্র এক বছরের শাসনে। এই প্রথম মন্ত্রী হয়েছেন যোগী। সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী। তাই ভাই-ভাতিজা নিয়ে কলঙ্কিত হওয়ার প্রশ্ন নেই। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতিরও অভিযোগ নেই। কিন্তু যা আছে তা হল প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও ধর্মীয় মেরুকরণের অ্যাজেন্ডা। সেই সঙ্গে উচ্চবর্ণের তোষণ। রামমন্দির আর গোরক্ষাকে সামনে রেখে সংঘ ও বিজেপি যে মত আর পথকে তুলে ধরতে চায় তার প্রাথমিক ল্যাবরেটরি গুজরাত হলেও চূড়ান্ত প্রয়োগশালা উত্তরপ্রদেশ। আর তারই পরিণাম গোরখপুরের দুর্গপতন। এখানে মুখ্যমন্ত্রী আর ফুলপুরে উপমুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি জনাদেশ এই উপনির্বাচনে। ভারতবর্ষের প্রাণভোমরাটি যে রাখা আছে এই ৮০টি আসনের বৃহত্তম প্রদেশের নিচুতলার মানুষ আর সংখ্যালঘুদের হাতে, তার প্রমাণ পেতে ২০১৯ পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হল না। প্রমাণ হয়ে গেল এটা ভারতবর্ষ। ধর্মরাষ্ট্র বা থিওক্র্যাটিক স্টেটের বিষবৃক্ষ এ মাটিতে পল্লবিত হবে না। পাকিস্তানের চেয়ে বেশি সংখ্যক ইসলাম ধর্মাবলম্বী এ মাটির আদি বাসিন্দা। এই মাতৃভূমিকে ভালোবেসেই তাঁরা পূর্বপুরুষের ভিটে আঁকড়ে আছেন। দেশ গড়ায় তিলে তিলে আত্মনিয়োগ করেছেন। মজবুত করেছেন সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত। কোনো ধর্মীয় মৌলবাদী দলের পতাকাতলে সমবেত হননি সংখ্যালঘুরা। এখানেই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে মৌলিক তফাত বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ ভারতবর্ষের।

laluprasad and nitish kumar
লালুপ্রসাদ ও নীতীশ কুমার।

এই মৌলিক তফাতের মূলেই কুঠারাঘাতকে মানতে নারাজ উত্তরপ্রদেশের পাশাপাশি হিন্দি বলয়ের সচেতন রাজ্য বিহার। ভাগলপুরের দাঙ্গার পর থেকে বিহার আজও পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে শ্রেষ্ঠত্বের দরজা দেয়নি। লালুপ্রসাদের দুর্নীতি আর পরিবারতন্ত্রকে খারিজ করলেও নীতীশকুমারকে সুযোগ দিয়েছে। বিজেপি একক শক্তিতে বা কোনো মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকারে আসতে পারেনি। আর শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রে ও রাজ্যে রাজ্যে বিজেপিকে বার বারই দুর্নীতির সঙ্গে আপস করতে দেখে লালুবিরোধী ব্রহ্মাস্ত্রকে চিনে ফেলেছে বিহার। তাই নীতীশের ভোলবদলের পর লালুর অনগ্রসর-সংখ্যালঘু সমর্থনের ভিত আরও শক্ত। জেলে বসেও জেহানাবাদে, অরারিয়ায় জিতেছেন তিনি। দুই রাজ্যেই রাষ্ট্রশক্তি জনাদেশে অঙ্কুশ দিতে ব্যর্থ।

ত্রিপুরার লেনিন থেকে উত্তরপ্রদেশের অম্বেডকর এবং দক্ষিণের দুই রাজ্যে গান্ধী ও পেরিয়ার যখন ক্ষমতার দম্ভে অপমানিত, তখনই গোবলয়ের রামরাজ্যে তাঁদেরই প্রিয় নিচুতলার মানুষের ঘরে কে জ্বেলে দিল ‘চিরাগ’? ২২টি রাজ্যজয়ের মুকুট পরে মোদী ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে আছেন তাঁরই হাতে গড়া অমিতবিক্রমশালী শাহ-র দিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.