nilanjan-duttaনীলাঞ্জন দত্ত

যেমন তেমন পুরস্কার নয়, একেবারে নোবেল পাওয়ার পরেও টানা এক সপ্তাহ কেউ চুপ করে বসে থাকতে পারেন? আবার ঠিক বসে থাকা নয়, অসুখ বা বয়সের ভারে শুয়ে থাকাও নয়, ৭৫ বছরের তরতাজা মানুষটা দিব্যি দুনিয়া ঘুরে গান গেয়ে বেড়ালেন, কিন্তু আদৌ খবরটা তাঁর কানে পৌঁছেছে কিনা, তাঁকে দেখে বোঝা গেল না। শুধু তাই নয়, নিজের ওয়েবসাইটে ‘নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত’ কথাটি লেখার পর, সেই লেখা মুছে দিয়েছেন বলে খবর।

অবিশ্বাস্য, কিন্তু অসম্ভব নয়, যেহেতু লোকটার নাম বব ডিলান। ব্যতিক্রমই তাঁর নিয়ম। তাঁর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়াটাই তো একটা ব্যতিক্রম। গান লিখিয়েরা তো আগে সাহিত্যের সম্মান পাননি। রবীন্দ্রনাথের ‘সং অফারিংস’ গানের বই হিসাবে নোবেল পায়নি, পেয়েছিল কবিতার বই হিসাবে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসকেও তাঁর বাড়িতে বসে আক্ষেপ করতে শুনেছি, “শঙ্খচিলের মত একটা গান লিখলেও তোমরা তাকে সাহিত্য বল না!” এবারের নোবেল এক দিক থেকে সেই বৃত্তটা পূর্ণ করেছে, যার শুরু হয়েছিল ‘গীতাঞ্জলি’কে নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে, আবার সেই বৃত্ত কাটিয়ে আরও এক ধাপ উঠে গেছে গান হিসাবেই গানের সাহিত্যমূল্য বিচার করে, তাকে কবিতা বা গীতিকবিতার ওড়না না পরিয়ে।

আর এক ব্যতিক্রম, ডিলান নোবেল পেলেন ২০১৬তে, কিন্তু এই ঘটনাকে উপলক্ষ্য করে যে কথাগুলো ফিরে ফিরে আসছে তার পটভূমি হল ১৯৬০-৭০-এর দশক। যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, সমানাধিকার আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন – আমাদের তো বোঝানো হয় এসব অতীতের ব্যাপার। কিন্তু ডিলান মানেই এই সব। এবং তিনি ভীষণভাবে বর্তমান।

bob-dylan-concert

অথচ ডিলানের গান রক সঙ্গীতের পরিভাষায় যে পর্যায়ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল, তা হল ‘ড্যাড রক’। আক্ষরিক অর্থে, “বাবাদের যুগের গান”, যা এখন তার আবেদন হারিয়ে ফেলেছে। বার্লিনে বব ডিলানের একটা কনসার্ট শুনতে যাওয়ার আগে আমারও তাই ধারণা ছিল: এখন আর ক’জন বা এই সব গান শোনে? কিন্তু টিকিট পেতেই বেশ কষ্ট হল। তারপর দেখলাম, রীতিমত জনস্রোত চলেছে কংগ্রেসহালে (কংগ্রেস হল)-এর দিকে। বিশাল হলের উপচে পড়া ভিড়ে এই প্রজন্মের প্রতিনিধি কম নেই। গানের সঙ্গে সঙ্গে তারা নেচেও উঠল স্বচ্ছন্দে, আজকে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে অর্ণব বা ইন্ডিয়ান ওশান গান গাইতে এলে যেমন হয়। আর সব শেষের চমক, অনুষ্ঠান শেষ করে উইংসে বিদায় নেবার পর তাদের সম্মিলিত কলরবে নাজেহাল হয়ে মঞ্চে ফিরে এসে আবার “ব্লোয়িন’ ইন দা উইন্ড” গাইতে বাধ্য হলেন বব। ড্যাড রক? হয়তো। কিন্তু ডেড রক নয়।

ডিলানের গানগুলোর আবেদন ফুরোবে কেন? সত্যিই কি সবকিছু পালটে গেছে? যুদ্ধ নেই? বৈষম্য নেই? সাম্রাজ্যবাদের আস্ফালন নেই? সবই আছে, আবার কিছুটা বদলেছে তো বটেই। যুদ্ধ আজ নাকি আর সাম্রাজ্যবিস্তারের জন্য হয় না, হয় সন্ত্রাসীদের হাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য। বর্ণবৈষম্যও নাকি আর নেই। হোয়াইট হাউসে বহুদিন ধরে বিরাজ করছেন এক ব্ল্যাক প্রেসিডেন্ট। সেখানেই তিনি ষাটের দশকের সমানাধিকার আন্দোলনের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করেন। তাতে গান গাইতে ডাকেন ডিলানকেও।

ডিলান আসেন, গান করেন, কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলতো করে একবার হাত মেলান। তাঁর সঙ্গে একটা ছবি ওঠার জন্যেও অপেক্ষা করেন না। চলে যান। প্রেসিডেন্ট নিজেই লক্ষ করেন, ভাল করে তো হাসলেনও না। তাঁর মনে হয়, এই সব ‘পরিবর্তন’কে ডিলান একটু তেরছা নজরে দেখছেন যেন।

যে সময়ে ডিলান নোবেল পেলেন, তখন আমেরিকা আর একটা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। দুই প্রার্থীর প্রচারের পারদ যত চড়ছে, তার সাজানো গোছানো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা ততই বেনাকাব হয়ে পড়ছে। এসব দেখতে দেখতে ডিলান তো আজও সহজেই গেয়ে উঠতে পারেন, “বাট ইভেন দা প্রেসিডেন্ট অভ দা ইউনাইটেড স্টেটস /  সামটাইমস মাস্ট হ্যাভ টু স্ট্যান্ড নেকেড…”

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন