কঠিন অধ্যাবসায়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সচিন তেন্ডুলকর

0
sachin tendulkar

বিশ্ববন্দিত ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকরের ৫০তম জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য।

শ্রয়ণ সেন

১৬ নভেম্বর ২০১৩, বেলা ১২টা। কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে তাঁর ২৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কেরিয়ার। অভূতপূর্ব এবং চলন্ত ‘গার্ড অব অনার’ দিয়ে তাঁকে ক্রিকেট পিচ থেকে ড্রেসিং রুমে নিয়ে আসছে গোটা টিম ইন্ডিয়া।

আচমকা সেই বলয় ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি। আবার ছুটলেন মাঠের দিকে। চোখের কোণায় জল। পৌঁছে গেলেন একদম মাঝখানে, প্রণাম করলেন পিচকে।

গোটা ক্রিকেট বিশ্ব দেখল, এত দিন যাঁকে ঈশ্বর বলে অভিহিত করা হয়েছে, সেই ঈশ্বরই আজ অন্য কিছুকে প্রণাম করছেন!

তিনি সচিন তেন্ডুলকর। ক্রিকেট বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের কাছে তিনি ঈশ্বর হতে পারেন, কিন্তু আমি তাঁকে কখনোই ঈশ্বর মনে করিনি। তিনি জ্বলজ্যান্ত একজন মানুষ।

সেই বিশ্ববিখ্যাত গার্ড অব অনার।

কারণ ঈশ্বরই যদি তিনি হতেন, তা হলে তাঁর অফ-ফর্মের কঠিন সময়গুলো আসত না। মাঝেমধ্যে মারাত্মক চোট আঘাতের মুহূর্তগুলো আসত না। এক একটা সময় তো মনে হত এই চোটই না সচিনের কেরিয়ারকে শেষ করে দেয়।

আর ঈশ্বরের যদি এই অফ ফর্ম, চোট আঘাতের পালা চলে, তা হলে তাঁর সঙ্গে জলজ্যান্ত মানুষের আর তফাৎ কী হল!

আমার কাছে সচিন তাই কোনো দিনও ঈশ্বর ছিলেন না। সচিন আমার কাছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটারও নন। দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ। কারণ শ্রেষ্ঠত্বের এই তালিকায় প্রথম জায়গাটা একজনই দখল করে রেখেছেন এবং আজীবন করে রাখবেন। তিনি সুনীল গাওস্কর।

সত্তর-আশির দশকের ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই খুনে পেসারদের মোকাবিলা করে টেস্টে ১৩টা শতরান তাঁর। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৮টা। তাও আবার মাথায় হেলমেট বা কোনো রকম সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই। এটা করতে দম লাগে বস!

সচিন আমার কাছে ঈশ্বর নন, শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটারও নন। তা হলে সচিন আমার কাছে কী?

আমার কাছে সচিন হল কঠিন অধ্যাবসায়ের এক জলন্ত উদাহরণ, যে মুম্বইয়ের খুব সাদামাটা পরিবার থেকে উঠে এসে গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে নিজের বশে এনে ফেলে।

খুব ছোটোবেলায় ক্রিকেট বুঝতাম না। তাই তাঁর ক্রিকেট কেরিয়ারের প্রথম ১০-১১ বছর সে ভাবে খেলা দেখিনি। যখন খেলা দেখা শুরু করলাম তখন ভারতীয় ক্রিকেটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত ধরে।

ক্রিকেট যখন বুঝতে শুরু করলাম, তখন সচিনের ভক্তও হতে পারলাম না। কারণ ওই যে সৌরভ গাঙ্গুলি। সৌরভের ক্রিকেট কেরিয়ার তখন পাঁচ বছরের পুরোনো। বাড়ির ধারা মেনে আমিও সৌরভেরই ভক্ত হয়ে গেলাম।

আমাদের ছোটোবেলাটা স্কুলে ‘সৌরভ ভক্ত বনাম সচিন ভক্ত’ করে করেই কেটে গেল। এখন যেমন ছোটোরা ‘বিরাট কোহলি ভক্ত বনাম রোহিত শর্মা ভক্ত’-এর খেলায় মেতেছে।

এখন ভাবি কী বোকাই না ছিলাম ছোটোবেলায়। বেকার বেকার ঝগড়া করতাম এমন একটা বিষয়ে যেটা ঝগড়ার কোনো টপিকই নয়।

অধিনায়ক সৌরভের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠিই তো ছিলেন ব্যাটসম্যান সচিন। মোক্ষম সময় তাঁর ব্যাট না চললে সৌরভের অধিনায়ক জীবন এতটা সফল হত না।

এই যেমন ২০০৪-এর জানুয়ারির সিডনি টেস্ট। সচিনের সেই মহাকাব্যিক ২৪১ রানের ইনিংসটা না থাকলে ওই টেস্টে ভারতের ফল কী হত বলা কঠিন।

ওই ইনিংসের হাত ধরেই ভারত অস্ট্রেলিয়াকে নাকানিচোবানি খাওয়ালো। সিডনি টেস্ট অল্পের জন্য ভারত জিততে পারল না, ড্র হল। কিন্তু এর ফলে অস্ট্রেলিয়া থেকে বর্ডার-গাওস্কর ট্রফি ছিনিয়ে নিয়ে এল সৌরভের ভারত। তখনকার দিনে অস্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে কোনো বিদেশি দল টেস্ট সিরিজের ট্রফি নিয়ে ফিরছে, এটা ভাবাই যেত না।

সচিনের কঠিন অধ্যাবসায়ের আরও একটা উদাহরণ যদি দিতে হয় তা হলে এই সিডনি টেস্ট। এই টেস্টের আগে সিরিজের বাকি তিনটে টেস্টে একদমই রান পাননি তিনি। ফর্ম হাতড়াচ্ছেন। কিছু একটা করে তাঁকে রানে ফিরতেই হবে।

সচিন খেয়াল করলেন যে ওই টেস্টগুলোতে তিনি আউট হয়েছেন কভার ড্রাইভ মারতে গিয়ে। নিজেকে শুধরোলেন সচিন। ঠিক করলেন সিডনিতে কোনো ভাবেই কভার ড্রাইভ মারবেন না। একজন ক্রিকেটারের কাছে এই প্রতিজ্ঞা পালন করা খুবই কষ্টের।

সিডনির সেই মাঠে সেই মহাকাব্যিক ইনিংস।

কিন্তু সচিন সেটা করে দেখালেন। ৬১৩ মিনিট, ৪৩৬ বলের এই মহাকাব্যিক ইনিংসে একবারের জন্য একটাও কভার ড্রাইভ খেলেননি তিনি। কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কি এই প্রতিজ্ঞা রাখা সম্ভব?

ঈশ্বর কি কখনও দল থেকে বাদ পড়েন? কিন্তু সচিন তো পড়েছেন। ২০০৭ বিশ্বকাপের ঠিক পরে, বাংলাদেশ সফরের সময় একদিনের সিরিজের দল থেকে।

খাতায় কলমে লেখা হল যে ‘বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে সচিন-সৌরভকে’। কিন্তু আদতে দু’ জনকেই বাদ দেওয়া হয়েছিল, তিরিশ বছর বয়সি দীনেশ মোঙ্গিয়া নামক এক ‘তরুণকে’ জায়গা করে দেওয়ার জন্য।

কিন্তু সচিন তো সচিন! ক্রিকেট কেরিয়ারের প্রায় সায়াহ্নে এসেও যাঁর ব্যাট ছেড়ে কথা বলেনি। ২০০৯-২০১০ এই সময়টায় সচিনের কেরিয়ার-গ্রাফ একদম চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে যায়। ক্রিকেট বিশ্ব লক্ষ করে আচমকা যেন জীবনের সেরা ফর্ম খুঁজে পেয়েছেন তিনি।

৩৭-৩৮ বছরের সচিন ওই দু’টো বছরে একদিনের ক্রিকেটে দুর্ধর্ষ কিছু ইনিংস খেললেন, প্রথম ভারতীয় হিসেবে একদিনের ক্রিকেটে দ্বিশতরান করে ফেলার অনন্য রেকর্ড করলেন।

আবার টেস্টেও সেই ফর্ম অব্যাহত রাখলেন। মাত্র চারটে টেস্টের ব্যবধানে দু’টো দ্বিশতরান এল তাঁর ব্যাট থেকে। ২০১০-এ টেস্টে ১৫৬২ রান করেন তিনি, যা সচিনের কেরিয়ারে কোনো একটা বছরে সর্বোচ্চ। কত কঠিন পরিশ্রম করলে আটত্রিশের একজন ‘বুড়ো’ এত কিছু করতে পারেন। ওই বছরই সচিন আইসিসির বিচারে ‘বছরের শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার’-এর সম্মান পান।

কিন্তু সচিন তো ঈশ্বর নন, মানুষ। আচমকা খেয়াল করলেন যে ধীরে ধীরে তাঁর ফর্ম এ বার পড়তির দিকে। ২০১১-এর বিশ্বকাপের পর থেকে পরের আড়াই বছরে তাঁর ব্যাটে সাফল্যের থেকে বেশি ব্যর্থতাই এসেছে। ঠিক সেই এবং সংগত কারণেই ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন সচিন। কারণ তিনি তো ঈশ্বর নন। তাঁকেও তো একটা সময় থামতে হতই।

তা হলে আমার কাছে সচিন মানে কী?

সচিন মানে, আমার ছোটোবেলাগুলোকে স্মরণীয় এবং আকর্ষণীয় করে রাখার এক মুখ্য কারিগর। আমার কাছে সচিন মানে, ‘পেট ব্যথা করছে’ বলে মর্নিং স্কুল ডুব মেরে বাড়িতে বসে খেলার দেখার প্রধান কারণ।

বলতে দ্বিধা নেই যে আমাদের ছোটোবেলাগুলো ছিল সেরা, যেটা আজকালকার ছেলেপুলেরা পায় না। আর সেই ছোটোবেলার বড়ো অংশ জুড়েই রয়েছেন সচিন তেন্ডুলকর। শুভ জন্মদিন সচিন। জীবনের হাফসেঞ্চুরি করার জন্য অনেক শুভেচ্ছা। ব্যাট হাতে যেমন ঝুড়ি ঝুড়ি রান কুড়োতেন, জীবনের ইনিংসেও ঠিক এ ভাবেই রান কুড়িয়ে নিয়ে এগিয়ে যান।

আরও পড়তে পারেন

দিল্লির পর উত্তরপ্রদেশ, এ বার প্রয়াগরাজে তৃণমূলের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম’

প্রায় অপরিবর্তিত করোনা পরিস্থিতি, আড়াই হাজারের উপরেই দৈনিক সংক্রমণ

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন