সত্যজিতের চলচ্চিত্র না দেখা আর পৃথিবীতে বাস করে চন্দ্র-সূর্য না দেখা একই কথা, বলেছিলেন আকিরা কুরোসাওয়া

0

অরুণাভ গুপ্ত

সত্যজিৎ রায়ের আবার একটা জন্মদিন। তার উপর শতবর্ষ। ফলে বাঙালির গা-হাত-পা ঝেড়ে লেগে পড়ার পালা। তার পর অবশ্য যে কে সেই। এত সময় কোথায়? ঘর-সংসার সামলে বড়ো সংখ্যার মানুষ ব্যস্ত থাকেন গুচ্ছের অন্তহীন টিভি সিরিয়াল, নিউজ আপডেটে। আর এখন তো বাড়তি অভিজ্ঞতা করোনা। আছে, নেই-এর টাগ অব ওয়ার। তবুও এরই মধ্যে হয়তো গুছিয়ে সত্যজিৎ নস্টালজিয়া হতে পারত কিন্তু সেখানেও হল্ট হেঁকেছে বাংলার নির্বাচন। সুতরাং নমো নমো করে সারো!

Loading videos...

করোনার জন্য শারীরিক দূরত্ব। সংগঠনগত ভাবে সত্যাজিৎ-স্মরণের পথে হয়তো মূল অন্তরায়। তবে ভার্চুয়াল যুগে অনেক কিছুই সম্ভব। কিন্তু বাংলার চোখ এ দিনটায় ভোটের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে। স্বাভাবিক ভাবেই সরকারি ভাবে হোক বা অন্য কোনো ভাবে সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠানের প্রচার ততটা নেই। শুনছি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক না কি কী সব অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সে সবের প্রচার বেশ ঝাপসা।

এক দিকে করোনা অন্য দিকে ভোটের বহুপ্রতীক্ষিত ফলাফল। এই দুইয়ের মাঝেও সত্যজিৎ-স্মরণে যেটুকু হচ্ছে তার মূলে সংবাদ মাধ্যম। ওরা স্মরণে রাখে, স্মরণ করে। প্রায় জোর করে আমজনতার কানে নামটা শুধিয়ে দিচ্ছেন, সেটা সংক্ষিপ্ত ভাবে হলেও। সত্যজিৎ রায়ের কর্মজীবন ১৯৫০-১৯৯২। টুকটাক তথ্য না দিলে ন্যাড়া ন্যাড়া লাগবে। তা ছাড়া ভারী হলে মনে রাখা দায়। এটা শুধু আমাদের স্বভাব নয়, তাবড় রাজনীতির কুশীলবরা বেমালুম সন-তারিখ ভুলে গিয়ে বিশিষ্ট চরিত্রদের যেখানে সেখানে জন্মস্থান বলে ফেলে বিজ্ঞের হাসি হাসছেন।

যা হোক সত্যজিতের জন্ম ২ মে, ১৯২১, আর মৃত্যু ২৩ এপ্রিল ১৯৯২। অনস্বীকার্য বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অন্যতম তিনি। কলকাতার বুকে জন্ম হলেও পূর্বপুরুষের ভিটে ছিল কিশোরগঞ্জ (বর্তমানে বাংলাদেশে)। লেখাপড়া কলকাতার প্রেসিডেন্সি ও শান্তিনিকেতনে। সত্যজিৎ রায়ের কর্মজীবন শুরু হয় বিজ্ঞাপন সংস্থায় চিত্রকরের ভূমিকায়। তবে প্রতিভা যেখানে স্ফুরিত হওয়ার সেখানে হবেই। কলকাতায় ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা জঁ রেনোয়ার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হওয়া এবং পরে লন্ডনে সফরকালীন ইতালির নব্যবাস্তববাদী চলচ্চিত্র ‘লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে’ (বাইসাইকেল চোর) দেখার পর সত্যজিতের মাথায় চেপে বসে ছবি তৈরির ভূত। সর্বপ্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫)। এর পর আর রোখে কার সাধ্য! তাঁর ছবি সংখ্যার থেকে ক্রমশ লম্বা হয়ে গিয়েছে প্রাপ্ত পুরস্কারের তালিকা। যে তালিকার চূড়োয় রয়েছে অস্কার।

আকিরা কুরোসাওয়ার সঙ্গে। ছবি পিন্টারেস্ট থেকে।

নতুন করে বলার নয়, সত্যজিৎ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। চিত্রনাট্য রচনা, চরিত্রায়ন, সঙ্গীত-স্বরলিপি রচনা, চিত্রগ্রহণ, শিল্পনির্দেশনা, সম্পাদনা ও সর্বোপরি কল্পকাহিনির সফল লেখক। গোয়েন্দা প্রফেসর শঙ্কু কিশোরের অবিচ্ছেদ্য বন্ধু। বাংলা চলচ্চিত্র তো বটেই, এমনকি পুরো উপমহাদেশের চলচ্চিত্রকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন। পুরো ভারত তো বটেই, ভারতের বাইরেও তাঁর ছবি জনপ্রিয়তা এবং সম্মান লাভ করেছিল। সব মিলিয়ে, সত্যজিৎ রায়- এই নামটাই যেন যথেষ্ট। বাঙালি শুধু নয়, গোটা বিশ্ববাসীর কাছে তিনি জনপ্রিয়।

হয়তো এটা বললে ভুল হবে না যে শুধুমাত্র সত্যজিৎ রায়ের কারণেই আজ বাংলা ভাষায় তৈরি চলচ্চিত্রকে পৃথিবী জুড়ে সম্মানের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি, তিনি শুধু সিনেমার নন, সাহিত্যেরও। সাহিত্যের প্রতি, বিশেষত ছোটোদের সাহিত্যের প্রতি তাঁর অন্তর উৎসারিত ভালোবাসা লেখক সত্যজিৎকেও অবিস্মরণীয় করে তুলেছে।

সত্যজিতের ছবিতে মানবতা প্রধান উপাদান আপাত কিন্তু আড়ালে জটিলতা জড়িত। তাঁকে নিয়ে আকিরা কুরোসাওয়ার অবিস্মরণীয় উক্তি- “সত্যজিতের চলচ্চিত্র না দেখা আর পৃথিবীতে বাস করে চন্দ্র-সূর্য না দেখা একই কথা”। প্রশস্তির পাশে সমালোচনাও কম সহ্য করতে হয়নি তাঁকে। সমালোচকরাও এমনও বলেছেন, তাঁর ছবিগুলি অত্যন্ত ধীর গতির যেন ‘রাজকীয় শামুকে’র চলার মতো। এখানেও পাল্টা দিয়েছেন কুরোসাওয়া। বলেছেন, সত্যজিতের ছবিগুলো মোটেই ধীর গতির নয়, বরং এগুলোকে বলা হোক শান্ত চরিত্রে বহমান এক বিশাল নদী। মজার বিষয় হল, আরেক বরেণ্য পরিচালক মৃণাল সেনও ‘নায়ক’ ছবিতে উত্তম কেন প্রশ্ন তুলেছিলেন। প্রত্যুত্তরে সত্যজিতের বক্তব্য ছিল, মৃণাল কেবল সহজ লক্ষ্যগুলোতে আঘাত হানতে জানেন। অর্থাৎ মৃণালের বিষয়বস্তু বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি।

সৃষ্টি থাকবে, সঙ্গে থাকবে সমালোচনাও। তবে আঙ্গিক, মেজাজ, প্রকৃতি-সহ আগাগোড়া খোলনলচে বদলে সত্যজিৎ বাংলা ছবিকে এনে দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক ছবির স্বীকৃতি। তাঁর মৃত্যুর ২৯ বছর পরেও তিনি আছেন। থাকবেন-ও বিশ্বচলচ্চিত্রের গম্ভীর চর্চায়। আজকের মতো বাস্তব যতই রুক্ষ ও নিষ্ঠুর হোক না কেন!

আরও পড়ুন: রাজনৈতিক ধারাভাষ্য না হলেও সত্যজিতের বেশির ভাগ ছবির আনাচেকানাচে তো রাজনীতিরই অনুরণন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.