সোমলেখা

একজন মানুষের মনের জগৎ কী ভাবে তৈরি হয়?

Loading videos...

খুব ধীরে ধীরে। আশেপাশের ছোটোখাটো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় আর বিনিময়ের মাধ্যমে! অনেকটা যেন আমের আচারের মজা ধীরে ধীরে উপভোগ করার মতো। আমাদের মাথা আস্তে আস্তে ভয় পেতে শেখে, ভালোবাসতে শেখে, রঙ করতে শেখে। সত্যজিৎ রায় আমাদের প্রত্যেকটা বোধের সঙ্গে অঙ্গাগি ভাবে জড়িত ছিলেন, আছেন।

গুপী গাইন বাঘা বাইন।

তখন আমার মধ্যে ভয় পাওয়ার বোধ সবে জন্মাচ্ছে। আমার ঘর থেকে ছাদ পেরিয়ে পড়ার ঘরে যেতে গিয়ে মনে হল এই বুঝি ভূতের রাজার দেখা পাব। “সেমোরানি কাছে আয় কাছে আয়” – একটা তারার মতো দেখতে পাব, প্রথমে একটু ভয় পাব, কিন্তু তার পরই মজা পাব যে ভূতের রাজা বোধহয় এই একটা বর দেবেন। তখন অনেক ছোটো আমি। সত্যজিৎবাবু বুঝিয়ে দিলেন, ভূত কোনো ভয়ের জিনিস নয়, একটা মজার জিনিস।

তার পর একটু বড়ো যখন হলাম, মানুষ চিনতে শিখলাম তখন মনে হত আমি বোধহয় ফেলু মিত্তির। সব গোপন কথা জেনে ফেলা আমার আয়ত্তে। তাতে যে সব সময় ভালো ফল হত তা নয়, কারণ বড়োরা তো এই জন্যই লুকোত যাতে আমি ঘটনাটা না বুঝতে পারি! “খুব হয়েছে পাকামো! পড়তে বসো” – বলে মা এই ঘোর অচিরেই কাটিয়ে দিত।

আমার ভাই এখন অনেক বড়ো মানুষ, অনেক বড়ো বিজ্ঞানী। মনে হয় প্রফেসর শঙ্কুর মতো ওর বোধহয় একটা বিশাল ল্যাবরেটরি আছে! আর অনেক অনেক জিনিস রোজ আবিষ্কার করে চলেছে যা আমাদের মতো আটপৌরে লোক বুঝতেই পারবে না।

আগুন্তুক।

মাঝে মাঝে ভাবি, ‘আগন্তুক’-এর উৎপল দত্ত মার্কা মামা থাকলে বেশ ভালো হত, কত জ্ঞান। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় একটা তারিণীখুড়ো থাকলে মন্দ হত না।

সত্যজিৎ আমাদের জীবনের আনাচে কানাচে মিশে আছেন, শুধু শিশুসুলভ ভাবনায় নয়; অনেক রোমানটিক অঞ্চলেও ছিল ওঁর অবাধ আনাগোনা।

‘সদগতি’তে দুখিজনের সঙ্গে জীবন যাপন করলাম, হাসলাম, কাঁদলাম, ব্যথিত হলাম। যাকে ইংরেজিতে বলে ‘হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভ নটস’। নিজের শহরের চরিত্র চিনলাম ‘মহানগর’ দেখে। তার নানা রঙ, নানা রূপ…। সেই প্রথম দিন কলেজ যাচ্ছি কলকাতার খুব পরিচিত অঞ্চল দিয়ে। তাকিয়ে আছি শ্যামবাজারের অশ্বারোহী সুভাষের দিকে। বাবার কথা মনে  পড়ল, “রাস্তা পেরোতে না পারলে পুলিশকাকুকে বলবে”! আমার ওপরে বাবার কত ভরসা ছিল বুঝতে পারছেন তো? ইয়ে যাক গে! অন্য কথায় চলে যাচ্ছি, আবার ফিরে আসি…।

অপু সংসার করেছিল, করেছি আমিও। ছোটো ছোটো ভালো লাগা, একটা ছোটো হাসি, একটা আবদারের বারণ যে কত হৃদয় জুড়ে থাকে, সে আর কী বলি। মনে হত লজ্জা পেলে আমাকেও শর্মিলা ঠাকুর মনে হয়। সম্বিত ফেরে পরিচারিকার ‘বৌদি সাবান শেষ হয়ে গেছে’ ডাকে। বুঝতে শিখলাম আমাদের ‘চারুলতা’ আর ‘দেবী’রা কতটা একা। আর তারা কত রকম ভাবে জয়ী ‘ঘরে বাইরে’ ছবির বিদ্রোহী বিমলার মতো। অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম থাকেন বই-কি, যাঁরা বলেন, “বাড়ির বউদের সবার শেষে ভাত নিতে হয়”!

অপুর সংসার।

রাজনীতি। এ বিষয়ে কিছু না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যে…।

পলিটিক্যাল স্যাটেয়ার বলতে যা বুঝেছি এ যাবৎ, শুরু কিন্তু সেই ‘পরশপাথর’ দিয়েই! আর ‘হীরক রাজার দেশে’ – এত সূক্ষ ভাবে জটিল একটা সমীকরণ সত্যজিৎবাবুই পারতেন বোঝাতে| ‘মহাপুরুষ’ও কিছু কম যায় না! উত্থান, পতন আর বিনাশ! তার পর ‘গণশত্রু’! শিখলাম সত্যের লড়াই লড়তে হলে একা লড়তে হয়।

ঠাকুমার কাছে শুনেছিলাম আমরা জমিদার ছিলাম, বিড়লাপুরের। কিন্তু সেটা আদপে কেমন ছিল দেখে নিলাম ‘জলসাঘর’-এ! ঠিক করলাম আর কোনো দিন জমিদার হব না! না না এমন করে মুচকি হেসো না…।

জলসাঘর।

আজ আসি তা হলে? রয় রেট্রোস্পেকটিভ দেখতে যাব যে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.