mamata and adhir
debarun roy
দেবারুণ রায়

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীর অনন‍্য শব্দকোষে কংগ্রেসের দেওয়া আরও একটি বিশেষণ যুক্ত হল। এবং সেই সঙ্গে আরও নির্দিষ্ট হল মোদীকথিত মেরুকরণ, অর্থাৎ বিভাজন। এই লোকসভা ভোটের প্রচারপর্বেই তিনি হরিয়ানার এক সমাবেশে বহু বর্ণের নামাবলি পেশ করেছিলেন। কংগ্রেসের শক্তি বৃদ্ধি আঁচ করে মূল বিরোধী দলকে রুখতে মোদী তখন একের পর এক তুরুপের তাস ফেলছেন জনতার সামনে। মূল কারণ, ‘চৌকিদার চোর হ‍্যায়’, এই প্রচারোজ্বল ব্রহ্মাস্ত্রটি। মোদী কংগ্রেসের কুৎসা-প্রচারের ধরন বোঝাতে এবং পালটা আক্রমণ শানানোর জন্য জমি জরিপ করতেই কংগ্রেসি গালির গালিচা পাতছিলেন। হরিয়ানার মতো কংগ্রেস অধ্যুষিত রাজ‍্যে। গালাগালির তালিকার শীর্ষে আছে ‘মওত কি সওদাগর’। এ থেকেই আরও। ‘বন্দর’, ‘পাগলা কুত্তা’, ‘নীচ কিসম কে আদমি’, ইত্যাদি উপাচার। মোদী জানতেন ‘চৌকিদার চোর হ‍্যায়’ – স্টাইলে ও কৌশলে ব্রহ্মাস্ত্র। তাই অন‍্য পথে মোকাবেলা। সফল হলেন। কিন্তু তাঁর শব্দকোষে জুড়ল আরও একটি শব্দ, বিশেষণ। বেশ আহত হলেন মোদী।কারণ অধীর, বাংলার সাংসদ ও লোকসভায় কংগ্রেস সেনাপতি।

আরও পড়ুন মমতা বলেছিলেন কাটমানির টাকা ফেরত দিতে, চাইতে তো বলেননি!

ক’দিন আগেই সর্বদলীয় বৈঠক শেষের পর অধীরের পিঠ চাপড়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সত্যিকারের লড়াকু একেই বলে।”  সেই লড়াকু লোকসভায় এ বার প্রথম বিতর্ক শুরু করলেন বিতর্ক আরও বাড়িয়ে। প্রথমে মোদীকে উদ্দেশ করেই বললেন, আপনি নামের গুণে নরেন্দ্রনাথ দত্তর সঙ্গে নিজেকে ভেজাল দিতে পারেন না। সেই চেষ্টা খুবই অন্যায়। কেউ ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া’ উক্তির প্রসঙ্গ তুললে অধীর মা গঙ্গার সঙ্গে ‘গন্ধি নালির’ তুলনা টানায় ধিক্কার দেন। লোকসভায় তুমুল হইচই বাধলে অবশ্য তিনি তাঁর হিন্দির সীমাবদ্ধতার কথা বলেন। দু’বারের প্রধানমন্ত্রীকে প্রাপ্য সম্মান দিয়ে বলেন, আপনি দুঃখ পেলে আমি অবশ্যই ক্ষমা চাইছি। তবে আমি গন্ধি বলিনি, বলেছি ‘নালি’। লোকসভার বাইরে এসেও ব‍্যাখ‍্যা দেন। বলেন, মোদী আমারও প্রধানমন্ত্রী। সাকুল্যে দেখা গেল, ব‍্যক্তি-মোদীকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক-মোদীর রাজনীতিকে ‍চ‍্যালেঞ্জ করলেন বাংলায় কংগ্রেসের মুকুটহীন জননায়ক বহরমপুরের চার বারের এমপি অধীর। এবং জাতীয় দলেরও ঋত্বিক, সংসদীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোয়।

রাহুল নেতা হতে নারাজ হওয়ায় অধীরকে লোকসভায় নেতার এই অত্যন্ত গুরুত্বের পদটি অর্পণ করে সনিয়া বোঝালেন কংগ্রেসের কোর রাজনীতি ও মতাদর্শের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা কত দূর বিস্তৃত। বিরোধী জোটের রাজনীতির দিক থেকেও কতটা সাহসী সিদ্ধান্ত। রাজ‍্য রাজনীতিতে লাগাতার তৃণমূলি ব্ল‍্যাকমেলের শিকার কংগ্রেস, কট্টর ঘাসফুলবিরোধী রাজনীতির প্রতীক হয়ে ওঠা নেতাকে জাতীয় মঞ্চের সর্বোচ্চ স্তরে বসিয়ে দ্ব‍্যর্থহীন বার্তাও দিল। বার্তা যেমন তৃণমূলকে, তেমনি সিপিএম ও বামফ্রন্টকেও। এই নির্বাচনে বেয়াল্লিশে বেয়াল্লিশ স্লোগান দিয়ে বাংলায় বিরোধী জোটের সম্ভাবনাকেই নির্মূল করেছে তৃণমূল। সারা দেশে জোটের নেতা হয়ে প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসার স্বপ্ন ফিরি করেছে তারা। নেত্রীও বারবার বলেছেন, কেন্দ্রে সরকার গড়বে তৃণমূল। হয়তো এই স্লোগান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনেও সংশয় ও আশংকার ঝড় তুলেছে। কারণ বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিজেপির বিরুদ্ধে সব চাইতে শক্তিশালী নেতা হিসেবে মানলেও সারা ভারতে কংগ্রেসের মতো বড়ো ও সব রাজ‍্যে ছড়ানো দল ছাড়া কেউই বিজেপির বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবে না বলে মনে করে। মনে করে, একমাত্র কংগ্রেসই কখনও প্রত‍্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জোট করেনি বিজেপির সঙ্গে। সুতরাং সেই কংগ্রেস দলকে বঙ্গে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা ত়াঁরা মন থেকে মানতে পারেনি। মমতার নির্দেশে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব নিয়ে মুর্শিদাবাদ ও মালদা জেলাকে কংগ্রেসমুক্ত করার লক্ষ্যে শুভেন্দু রায়চৌধুরী ঘাঁটি গেড়েও অধীরের কূলকিনারা পাননি। উলটে একটা রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে কংগ্রেস নেতা কট্টর কংগ্রেস-বিরোধীদেরও মানসিক সমর্থন ও শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছেন। যেমন মতাদর্শের ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মতো রাজনীতিবিদেরও নজর কেড়েছেন অধীর।

এবং শেষ পর্যন্ত সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও তাঁর জয় কার্যত মিথ করে তুলেছে তাঁকে। তাঁর টানে টানেই মালদা দক্ষিণ কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থী ডালুবাবুর জয় সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, মুর্শিদাবাদই জিতিয়েছে মালদা দক্ষিণের প্রার্থীকে। এ ক্ষেত্রেও ভোলার নয়, পশ্চিমবঙ্গের দু’টি আসনেই সিপিএম একতরফা ভাবে সমর্থন করেছে কংগ্রেসকে। বিনিময়ের কথা না ভেবেই। অন্য দিকে ২০১৪ থেকে কেরলে কংগ্রেসের ঘর করা আরএসপি সমদূরত্বের তত্ত্ব আউড়ে দাঁড় করায় মুসলিম প্রার্থীকে। বিজেপি, তৃণমূলের অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সচেতন সংখ্যালঘুরা যদিও সদল কংগ্রেস-বাম জোটের প্রার্থী অধীরকেই গরিষ্ঠ ভোট দিয়েছেন। এটা আরও স্পষ্ট  হয়ে উঠেছে মালদা উত্তর কেন্দ্রে। মৌসম নূরের দলত‍্যাগকে শিক্ষা দিতেই ওখানে আদিবাসী ও মুসলিমরা সিপিএম এমের দলত‍্যাগী খগেন মুর্মুকে জিতিয়েছে। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে বিজেপি। কারণ মালদায় বরকত গনি খানের ভাগ্নির কংগ্রেসত‍্যাগ অন্য যে কোনো একই ধরনের ঘটনার চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঈশা খানকে যে কোনো কারণেই হোক জেতানো যেত না বলেই খগেন মুর্মুর জয়। আদিবাসী ভোট, দলিত ভোট, সিপিএমের নিচুতলার ভোট এবং বিজেপির ভোট সব মিলিয়ে মৌসম বদলেছে। এটা কাজীর বিচার। ফায়দা মোদীর। আর অধীর জয়ের পর ভাষণে বলেন, “অন‍্যের ক্ষতি করলে নিজের ক্ষতি হবেই। কোথায় গেল বেয়াল্লিশে বেয়াল্লিশের গল্প? কংগ্রেসের তো শূন্য হলেও লোকে বিস্মিত হত না। কারণ কংগ্রেসের আছেটা কী। দিদির ৪২ হলে কংগ্রেসের ওই ‘০’টা ৪২-এর পাশে গিয়ে বসত। হত ৪২০! কাজেই কংগ্রেসকে শেষ করতে গিয়ে তৃণমূলের কী হল দেখুন। সিপিএমের ভোট ভাঙানোর ফলও তো জল হয়ে গেল। ওদের এমনিতেই দুরবস্থা আর খারাপের জায়গা কই? কিন্তু বিজেপি এসে গেল এই বাংলায়। এ জন্য কে দায়ী?”

আরও পড়ুন সিপিএমের ভোট গেল, আর মুকুল-অর্জুন? পচা শামুকে পা কাটছে কার?

স্মরণীয়, মুকুল রায় ভোটের আগেই বারবার বুক ঠুকে বলেছেন, কুড়িতেই মুড়িয়ে দেব তৃণমূলকে। কেউ সে ভাবে নেয়নি। কিন্তু মুকুল বসে ছিলেন না। লখিন্দরের লৌহবাসরের ঠিক কোনখানে কালনাগিনীর ছিদ্রপথটি রেখেছেন মনসা, সে তো তাঁর নখদর্পণেই। সুতরাং কুড়ির বদলে বাইশ, নাকের বদলে নরুন। বিজেপির হাতে আর দুই নয়, দুয়ে দুয়ে চার হয়েছে। বাংলা বিরোধীশূন্য হওয়ার স্বপ্ন সফল হয়নি তো কী হল। বাংলা তো বামশূন‍্য হয়েছে। কংগ্রেস বিজেপির পুরোনো চেহারায়। হাতে মাত্র দু’টি আসন। এ-ও তো স্বপনসম। সিপিএম শূন্য, কংগ্রেস প্রায় নিশ্চিহ্ন। বিজেপির তুমুল তারুণ্য। আর তৃণমূল আচ্ছন্ন। ৪২-এ ২২ পাওয়ার বিমূঢ়তায়। একেবারেই ক‍্যাচ টোয়েন্টিটু। আগে পিছে দু’ দিকেই বিপদ। বালুরঘাটে বালির বাঁধ ভেঙেছে। লোকসভা আসন হাতছাড়া হওয়ার পর জেলা পরিষদও বিজেপির। প্রথম জেলা পরিষদ তৃণমূলী উপহার। দক্ষিণ দিনাজপুরের ডাকসাইটে তৃণমূল নেতা মোদীর শরণাগত। এ দিকে বালুরঘাটের ধসের পাশাপাশি চব্বিশ পরগণার ভাটপাড়ায় বালুর (জ্যোতিপ্রিয়) মুষ্টি শিথিল। অর্জুনের লক্ষ্যভেদের পর সমানে এলাকা দখলের মুষলপর্ব চলছে। তৃণমূলিরা পা বাড়িয়ে। তাসের ঘর ভাঙছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here