হাই-প্রোফাইল পরিবারেই তিন তালাক, আইন পৌঁছেছে তো আম-আদমির দরজার ওপারে?

0
তিন তালাক কমছে? প্রতীকী ছবি

বেশ কিছু ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, আইন রয়েছে, আবার প্রথাও রয়েছে। নেই কোনো নিম্নবিত্ত-উচ্চবিত্ত অথবা চেতন-অসচেতনের ভেদাভেদ। যা আইনের প্রতি আস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। লিখছেন জয়ন্ত মণ্ডল

২০১৯-এর পয়লা আগস্ট দিনটিকে ভারতীয় সংসদীয় ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী মুখতার আব্বাস নাকভি। ওই দিনটিতে তিন তালাক প্রথার বিরুদ্ধে একটি আইন কার্যকর হয়। তাই পয়লা আগস্ট দিনটি ভারতীয় গণতন্ত্র এবং সংসদীয় ইতিহাসে এক সোনালি মুহূর্ত হিসাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা জানান দিচ্ছে, আইন করে নিষিদ্ধ করা হলেও আর পাঁচটা অপরাধের মতোই প্রাচীন প্রথাটি এখন বহাল সমাজে। এমনকি আইনের প্রতি আস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে ওই সব ঘটনা।

Loading videos...

মুসলিমসমাজে তিন তালাক প্রথা রোধ করতে কড়া আইন এনেছিল কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। সেই আইনে এই তিন তালাক প্রথা এখন ফৌজদারি অপরাধ। আইন ভঙ্গ করলে তিন বছর পর্যন্ত জেলও হতে পারে। তার পরেও কিন্তু বেশ কিছু ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, আইন রয়েছে, আবার প্রথাও রয়েছে। নেই কোনো নিম্নবিত্ত, উচ্চবিত্ত অথবা চেতন-অসচেতনের ভেদাভেদ। যে কোনো আইনের উদ্দেশ্য বহুবিধ। যেমন অপরাধ ঠেকানো, অপরাধীকে থামানো অথবা অপরাধ কমানোও। নইলে তো অপরাধী নিজের কাজ চালিয়ে যাবে, পাশাপাশি আইনানুগ প্রক্রিয়াও চলবে। মাঝখান থেকে দুর্দশায় পড়া ভুক্তভোগী আইনের পথে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। হয় তাঁকে দিতে হবে ধৈর্যের পরীক্ষা, নচেৎ হার মেনে নেওয়াই ভবিতব্য।

এক মাসে দুই ‘তিন তালাক’

মূলত নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীসমাজের মুক্তির লক্ষ্যেই নিয়ে আসা হয়েছিল এই আইন। সেই আইনের কার্যকারিতা অবশ্যই রয়েছে। ভুক্তভোগীরা তা অনুভব করতে পারবেন। কিন্তু আইনের রক্ষক হিসেবে যাঁরা পরিচিত, তাঁদের দরজার ওপার থেকে যখন এই আইনকে পিষে ফেলার খবর উঠে আসে, তখন অবাক হওয়াটা কি অমূলক?

গত বুধবার (২৩ জুন) রাতের একটি ঘটনাও ফের তিন তালাক প্রথাকে জিইয়ে রাখার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ দিচ্ছে। এবং সেটা হাই-প্রোফাইল সোসাইটির একটা অন্ধকার দিককে সঙ্গী করেই। ঘটনাটি উত্তরপ্রদেশের। জানা গিয়েছে, বুধবার রাতে অভিযোগকারিণী মহিলা যখন একা ছিলেন তখন শ্বশুর নাজির আহমদ তাঁকে ধর্ষণ করে। নাজির রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স প্রভিন্সিয়াল আর্মস কনস্টেবুলারি (পিএসি)-তে কর্মরত। অন্য দিকে মেরঠের একটি স্থানীয় থানায় কর্মরত ওই মহিলা। নিজের স্বামীর কাছে সেই ঘটনার কথা প্রকাশ করেন ওই মহিলা। তাঁর স্বামী আবিদও এক জন পুলিশ অফিসার। কিন্তু নিজের স্ত্রীকে সাহায্য করার পরিবর্তে নিষিদ্ধ তিন তালাক প্রথাতেই স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন আবিদ।

এ মাসেরই আরও একটি ঘটনা এবং এ রাজ্যেরই। পণের দাবিতে শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন বিন্নাগুড়ি চা বাগান এলাকা বাসিন্দা জিয়াত খাতুন। আইনি পথে নয়, ধর্মীয় সংগঠনের মধ্যস্থতায় সমস্যা মিটিয়ে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সালিশি সভায় তিন তালাক দিয়ে দাম্পত্যজীবনে ইতি টানল স্বামী! থানায় অভিযোগ দায়ের হলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন পুলিশ। এই ঘটনাটি ঘটে চলতি জুন মাসের প্রথম দিকে।

এই দু’টি ঘটনায় আইনের প্রতি আস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের ঘটনায় অভিযুক্তরা খোদ আইনের রক্ষক। আর পশ্চিমবঙ্গের ঘটনায় ভুক্তভোগী মহিলা আইনের পথে না গিয়ে সেই ধর্মীয় সংগঠনেরই দ্বারস্থ হলেন। পশ্চিমবঙ্গের ঘটনাটির ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবের ধুয়ো তুললেও উত্তরপ্রদেশের ঘটনাটির ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। কিন্তু দু’টির ক্ষেত্রেই একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেল, এই বহুচর্চিত আইন সেখানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-ই নয়।

২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ১২৫.০৩ কোটির দেশ ভারত। এর মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের নাগরিক ১৪.২৩ শতাংশ। ফলে এই বিশালাকার জনগোষ্ঠীকে এই দুই ঘটনা দিয়ে মেপে ফেলা সম্ভব নয়। আবার উল্টোটা হল, এই বিশাল জনগোষ্ঠীতে এ ধরনের দু’-একটা ঘটনা প্রকাশ্যে এলেও বাকি কতগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে, সেটাও ভাবনার।

তিন তালাক কমছে?

সংসদে আইন পাশ হয় অনেক পরে, তবে ওই প্রথাকে অসাংবিধানিক বলে ২০১৭ সালে রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। ওই বছরেই প্রথাটি রদ করতে আইনের এই প্রস্তাবটি প্রথম উত্থাপন করা হয়। ‘দ্য মুসলিম উইমেন প্রোটেকশন অব রাইটস ইন ম্যারেজ অ্যাক্ট’ নামে একটি বিলও আনা হয়, যা সাধারণ ভাবে ‘তিন তালাক বিল’ নামেই পরিচিত। যা নিয়ে লোকসভায় ততটা বিতর্ক না হলেও রাজ্যসভায় বিপাকে পড়তে হয় কেন্দ্রীয় সরকারকে।

[তিন তালাক বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ফাইল ছবি]

যদিও এর আগে মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, পাকিস্তান, বাংলাদেশের মতো মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তিন তালাক প্রথাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভারতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু। শেষমেশ রাজ্যসভাতেও উতরে যায় এই বিল। আইনে পরিণত হয় ওই বিল।

এই আইনের এক বছর পূর্তিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ জানিয়েছিলেন, কেন্দ্রের সংখ্যালঘু উন্নয়ন বিভাগের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, আইন কার্যকরের পর তিন তালাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। এর আগের থেকে অনেকটাই কমেছে মুখের কথায় স্ত্রী-কে বিচ্ছেদ। বিভিন্ন ওয়াকফ বোর্ড এবং অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত রাজ্যওয়ারি তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কথা জানিয়েছে বিভাগ। অন্য দিকে এই আইনের প্রয়োগে অনেক ক্ষেত্রে সম্মানজনক সমঝোতাও আদায় করা গিয়েছে।

ভিন্ন ছবি, অন্য কথা

সরকারি ভাবে দাবিদাওয়ার বাইরে তৃণমূল স্তরে উঠে আসছে ভিন্ন ছবি, অন্য কথা। মানবাধিকারকর্মী আলতাফ আহমেদ বলেন, “সমাজে এই আইনের কতটা প্রভাব পড়েছে, তা আমরা জানি না। কারণ, আমাদের চোখে তেমন কিছু পরিবর্তনই ধরা পড়েনি। আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মত না নিয়ে যদি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তা কার্যকর করে দেওয়া হয়, তার প্রভাব না পড়াটাই সম্ভবত স্বাভাবিক। যাঁদের জন্য এই আইন তাঁদের সমস্যাগুলো খতিয়ে দেখা এবং তার নিরিখে সমাধানের জন্য আইন করলে ভালো। না হলে তো ফাঁকফোকর থেকেই যায়। মানুষের কোনটা দরকার, সেটা আগে বোঝা দরকার”।

শুধু সচেতন আর অসচেতনের নিরিখে বিচার করা ঠিক হবে না জানিয়ে আলতাফ বলেন, “সচেতনতার অভাব তো রয়েইছে, তবে সমাজের একটা শ্রেণি রয়েছে, যারা সব সময়ই চায় সুবিধা নিতে। তারা আইন সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। কিন্তু অপরাধ করলে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে কী ভাবে পাশ কাটিয়ে এড়ানো যাবে, সেটাও তারা জানে”।

একই সঙ্গে আইনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও ইঙ্গিত দিলেন আলতাফ। বললেন, “যে কোনো আইনের ক্ষেত্রেই সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটগুলোকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা করলে ভালো। তবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আইন করলে, যা হওয়ার সেটাই হচ্ছে। আইন তৈরি করে দিয়ে দায় সেরে ফেলা হল, অথচ আইনের কার্যকারিতা খতিয়ে দেখার ফুরসত নেই। তা হলে সেই আইনের প্রভাব চোখে পড়বে কী করে”!

সব মিলিয়ে তিন তালাক কি তিন তালাকেই, প্রশ্ন কিন্তু থাকছেই!

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন