কোথায় দিশা, বাজেটে ব্যাগ ভরতি হতাশা!

0

জয়ন্ত মণ্ডল: প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় ধরে ২০২০-২১ অর্থবর্ষের বাজেট প্রস্তাব পেশ করে রেকর্ড গড়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন। সরকারি ভাবে স্বীকার করা হোক না হোক, বাজারের দশা থেকে স্পষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে এ বারের বাজেট চরম প্রত্যাশা জাগিয়েছিল দেশের প্রতিটা ক্ষেত্রকেই। কিন্তু উচ্চতর মানের শিক্ষা, অনলাইন শিক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে চাকরির ক্ষেত্রে জোর দেওয়ার কথা বলা হলেও অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাবে বিস্তৃত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের কোনো উল্লেখই করা হল না।

বাজেট প্রস্তাব পেশের শুরুতেই অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, করকাঠামোর পুনর্বিন্যাসই এ বারের বাজেটে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাজেটের ক’দিন আগে থেকেই কর কাঠামোর পুনর্গঠন নিয়ে ব্যাপক প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল সাধারণ মানুষের মনে। মনমোহনী করে তুলতে এ দিন বাস্তবিক ভাবেই চমকপ্রদ করকাঠামো ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। পড়ুন নীচের লিঙ্কে ক্লিক করে-

আয়করে বড়োসড়ো ছাড়! এক নজরে দেখে নিন প্রস্তাবিত পর্যায় এবং হার

তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, পুরনো হারে কর দিলে মিলবে ছাড়। নতুন হারে দিলে কোনো ছাড় মিলবে না।

কিন্তু শিল্পায়ন এবং প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান নিয়ে তেমন কোনো আশার বাণী উঠে আসেনি বাজেট প্রস্তাবে। উদ্ভাবনী উদ্যোগ হিসাবে স্টার্ট-আপদের টার্নওভারের সীমা ২৫ থেকে বাড়িয়ে ১০০ কোটি করার কথা বলা হয়েছে। জানানো হয়েছে, কোম্পানিগুলিকে ডিভিডেন্ট ডিস্ট্রিবিউশন ট্যাক্স দিতে হবে না।

এই ব্যাগে ছিল ২০১৯-২০ অর্থবর্ষের বাজেট। যেখানে বৃদ্ধির প্রস্তাবিত হার ছিল ৭ শতাংশ। এখন যা ঠেকতে চলেছে ৫ শতাংশে। এ বারের বাজেটে জিডিপি বৃদ্ধির প্রস্তাবিত হার ৬-৬.৫ শতাংশ। বাস্তবে কোথায় গিয়ে ঠেকে, সেটাই দেখার!

অর্থনীতির সাদামাটা সমীকরণ- কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের হাতে টাকা আসবে। তৈরি হবে ক্রেতা। বাজারে চাহিদা থাকলেই চড়চড়িয়ে বাড়বে উৎপাদন। হাল ফিরবে ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতির। স্বাভাবিক ভাবে পরিকাঠামোয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই কর্মসংস্থান বাড়তে বাধ্য। তখনই তো আসে করছাড় বা কর পুনর্বিন্যাসের প্রসঙ্গ।

সরকারি পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট, বিগত ৪৫ বছরে কর্মসংস্থান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। রেকর্ড গড়েছে বেকারত্ব। তবে এ বারের বাজেটে শিল্প এবং বাণিজ্যে উন্নয়নের জন্য ২৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এরই মধ্যে রয়েছে ১০০টি বিমানবন্দর নির্মাণ। বিনিয়োগ নিয়ে স্পষ্ট কোনো দিশা অধরা। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছরে বিনিয়োগের বৃদ্ধি ঠেকেছে ১ শতাংশে। সেই জায়াগায় দাঁড়িয়ে কোনো সদুত্তর মেলেনি এ বারের বাজেট প্রস্তাবে।

আসা যেতে পারে করকাঠামোয়। এমনিতেই ২০ বছরের মধ্যে সব থেকে বেশি হ্রাস পেতে চলেছে চলতি বছরের প্রত্যক্ষ কর সংগ্রহ। জানা গিয়েছে, চলতি ২০১৯-২০ আর্থিক বছরের জন্য নরেন্দ্র মোদী নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যক্ষ কর আদায়ের লক্ষ্য হিসাবে স্থির করেছিল ১৩.৫ লক্ষ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় কর আদায়ের লক্ষ্য পরিমাণে ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়। চলতি অর্থবছরের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৩১ মার্চ।

ও দিকে সরকারি ভাঁড়ারেও টান পড়েছে। বড়োসড়ো ঘাটতি ধরা পড়েছে রাজকোষে। রাজস্ব আদায়ের সব থেকে বড়ো মাধ্যম জিএসটি নিয়ে চলমান বিতর্ক সেখানেও হতাশা ছুড়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। সেই জায়গায় প্রত্যক্ষ কর (আয়কর এবং কর্পোরেট কর) থেকে আয় না বাড়িয়ে গত্যন্তর নেই সরকারের।

সরকারি আয় বাড়‌াতে এলআইসির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় সরকারি অংশীদারিত্ব (বড়ো অংশ) বেচে দিয়ে, সংস্থাটিকে স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্তির ঘোষণা করা হয়েছে। (বিস্তারিত পড়ুন এখানে ক্লিক করে: এলআইসির অংশীদারিত্ব বেচে দেবে সরকার)

এমন পরিস্থিতিতে মানুষকে বাজারমুখী করার তাগিদে যেন সব কিছুই তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। অর্থনীতির গোলকধাঁধায় পড়ে একটা চমকধর্মী বাজেট পেশ করার চেষ্টা, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকারে ফেরা বিজেপিকে মাইলেজ কতটা দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, বেকারত্ব ঘোঁচানোর সদিচ্ছার অভাবকে স্পষ্ট করে দেয়।

ফলে বাজেটে আর সব কিছু থাকলেও নেই যুবসম্প্রদায়ের জন্য কোনো বার্তা। অর্থমন্ত্রী ২ ঘণ্টা ৩৭ মিনিটের ভাষণে রাজ্যওয়াড়ি স্কিল ডেভেলপমেন্ট তৈরি করে স্টার্টআপ বা শিক্ষাক্ষেত্রের আমুল বদল করে চাকরি জোগানোর মতো প্রতিশ্রুতি থাকলেও দেশের বেকার যুবদের তেমন কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেননি তিনি। কমানো হয়েছে কর, কিন্তু হাতে যদিও আয়-ই না থাকে, কী তার প্রাসঙ্গিকতা? নরেন্দ্র মোদী সরকার বিষয়টি বোঝে না তেমনটা নয়, যে কারণে সমস্যাকে পাশ কাটানোর আপ্রাণ প্রয়াস!

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন