বিজেপির উদ্বাস্তুপ্রেম নতুন কী? ‘চিন্তারাজ্যে দেউলিয়াপনা’র কথা তো কবেই বলে গিয়েছেন ঋত্বিক ঘটক

0

চিরঞ্জীব পাল:  বিজেপির খুব মুশকিল! কিছুতেই বাংলার বুদ্ধিজীবীদের বাগে আনতে পারছে না। পরিবর্তনের সময়ে বাম মনোভাবাপন্ন বুদ্ধিজীবীদের একাংশ তৃণমূলকে সমর্থন করেছিলেন। কেউ কেউ সরাসরি ঘাসফুল শিবিরেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিজেপি ভাবনা অনুযায়ী ‘পরিবর্তনের ক্ষণ’ উপস্থিত হলেও গুটি কয়েক টলিউড অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়া কেউ আর তাদের শিবির আসছেন না। নিদেন পক্ষে তাদের সমর্থন—সে সবও তেমন মিলছে না। উল্টে বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছেন তাঁরা। অগত্যা ঋত্বিক স্মরণ।

এই সময়ের খবর অনুযায়ী, সিএএ-এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে বিজেপির যুব মোর্চা ছ’মিনিটের একটি ছবি বানিয়েছে। সেই ছবিতে ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র সংলাপ থাকছে। ২৩ তারিখ নাগরিকত্ব আইনের পক্ষে যে মিছিল হবে, সেখানেও ঋত্বিকের ছবির সংলাপের কোলাজ তুলে ধরা হবে।

বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু বলেছেন, ‘‘ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা, কোমলগান্ধারের মতো বহু ছবিতে হিন্দু বাঙালি শরণার্থীদের দুর্দশার কথা বলা হয়েছে।আমরা সেই ছবির সংলাপ তথ্যচিত্র বা কোলাজের মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরব”।

বাংলার চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে সব থেকে বেশি বাংলাভাগ ও উদ্বাস্তুদের কথা উঠে এসেছে। কিন্তু তিনি কি শুধু হিন্দু শরণার্থীদের কথা বলতেন? এ নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণের আগে আসুন দেখে নিই ঋত্বিক নিজে এ নিয়ে কী বলতেন?

“প্রত্যক্ষ স্তরে ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিতে উপস্থাপিত সংকট উদ্বাস্তু সমস্যাকে অবলম্বন করে আছে। কি্ন্তু ‘উদ্বাস্তু’ বা ‘বাস্তুহারা’ বলতে এ ছবিতে কেবল পূর্ববঙ্গের বাস্তুহারা বোঝাচ্ছে না—ঐ কথাটির সাহায্যে আমি অন্যতর ব্যাঞ্জনা দিতে চেয়েছি। আমাদের দিনে আমরা সকলেই জীবনের মূল হারিয়ে বাস্তুহারা হয়ে আছি—এটাও আমার বক্তব্য। ‘বাস্তুহারা’ কথাটিকে এই ভাবে বিশেষ ভৌগলিক স্তুর থেকে সামান্য স্তরে উন্নীত করাই আমার অন্বিষ্ট। ছবিতে হরপ্রসাদের মুখের সংলাপে (আমরা বায়ুভূত, নিরালম্ব)  কিংবা ছবির প্রথমেই প্রেসের একজন কর্মচারীর মুখে, ‘উদ্বাস্তু! কে উদ্বাস্তু নয়?’ এই কথায় সেই ইঙ্গিতই দেওয়া হয়েছে”।

কোমলগান্ধার ছবিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “সমসাময়িক বঙ্গদেশ দেশবিভাগের দায়ভারে ক্ষতবিক্ষত, অনিশ্চিত স্বাধীনতায় দ্বন্দ্বসংকুল, রাষ্ট্রীয় ঐক্যের আদর্শ বিনা বিবেচনায় চাপিয়ে দেবার ফলে অবদমিতচিত্ত (স্বভাবতই ঐক্যাদর্শ বাস্তব জগতের অনেক স্বাভাবিক প্রবৃত্তির পরিপন্থী) আর সেই অবদমনের ফলস্বরূপ পশ্চিমী সভ্যতার রসে পরিপুষ্টচিত্ত জাতীয় নেতাদের চিন্তারাজ্যে দেউলিয়াপনা—ইত্যাকার দেশজ ও আন্তর্জাতিক কারণের ফলশ্রুতিতে দেশের চরম দুর্গতি। এ ছবির লক্ষ্য সেই অধোগমনের, সেই মূলহীনতা ও আশ্রয়হীনতার চিত্রায়ণ”।

ঋত্বিকের লেখার অংশবিশেষ দু’টি থেকে স্পষ্ট শুধুমাত্র ‘হিন্দু উদ্বাস্তুদের দুর্দশা দেখানোর জন্য তিনি সূবর্ণরেখা বা কোমলগান্ধার বানাননি। উদ্বাস্তুদের জীবনযন্ত্রণাকে প্রেক্ষিত করে তিনি সমস্যার গভীরে গিয়েছেন। প্রকৃত কারণকে মানুষের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু সে সব সরিয়ে রেখে সায়ন্তন বসুরা ছবি থেকে কোটেশন তুলে নাগরিকত্ব আইনের সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে চেয়েছন। এতে কি চিঁড়ে ভিজবে?

অতি বড় ঋত্বিক ভক্তও বলবেন না যে, তিনি সত্যজিৎ রায়ের মতো আমজনতার কাছে জনপ্রিয়। সিনেমা সম্পর্কে আগ্রহীরা মানুষরাই ঋত্বিক ঘটকের ছবি দেখেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁর নাম জানেন। সত্যজিৎ রায়ের মতো তিনিও ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে একটি উল্লেখোগ্য নাম, সেটা জানেন। আর সেটাকেই বোধহয় কাজে লাগাতে চাইছেন সায়ন্তন বসুরা। পূরণ করে নিতে চাইছেন বুদ্ধিজীবী শূণ্যতাকে। মানুষ বুদ্ধিজীবীদের মুখে কোনো কথা শুনলে একটু গুরত্ব দেয়। তাই ঋত্বিকের সিনেমার কোটেশন দেখে বঙ্গ বিজেপির আশা, জনতা নাগরিকত্ব আইনের গুরুত্ব বুঝবে।

রবিবার দিল্লিতে রামলীলা ময়দানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, কংগ্রেস আর ‘আরবান নকশাল’রা নাগরিকত্ব আইন নিয়ে মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছেন। এ দিকে বঙ্গ বিজেপি নাগরিকত্ব আইনের স্বপক্ষে জনমত জোগাড় করতে তেতাল্লিশ বছর আগে প্রয়াত এক ‘আরবান নকশালে’র সিনেমা থেকে কোটেশন ব্যবহার করছে। বেঁচে থাকলে ঋত্বিক ঘটক আজকে ‘আরবান নকশাল’ বলেই চিহ্নিত হতেন, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

[ আরও পড়ুন: অর্থনৈতিক সংকটে মুখোশ চড়ানোই মোদী-শাহের চরম প্রাপ্তি ]

------------------------------------------------
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।
কোভিড১৯ বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করুনপশ্চিমবঙ্গ সরকারের জরুরি ত্রাণ তহবিলে দান করুন।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.